প্রাণশক্তিময় সম্পর্ক
মানুষের জীবনে এমন কিছু সম্পর্ক আছে, যেগুলো বাইরে থেকে দেখতে একেবারেই স্বাভাবিক লাগে। সেখানে মারধর নেই, চিৎকার নেই, বিশ্বাসঘাতকতাও নেই। অথচ ধীরে ধীরে মানুষটিকে ভিতর থেকে ফাঁকা করে দিতে থাকে। যেন পুরোনো কোনো বাড়িতে অদৃশ্য ঘুণ ধরেছে। বাইরে রং অটুট, জানালায় পর্দা ঝুলছে, অতিথি এলে চা-নাশতাও পরিবেশন হচ্ছে যথারীতি, কিন্তু ভিতরের কাঠ ধীরে ধীরে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। অনেক সম্পর্ক ঠিক এভাবেই মানুষকে নিঃস্ব করে।
জীবন খুব ব্যয়বহুল। এই কথাটা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য অর্থ নিতে শুরু করে। তরুণ বয়সে আমরা ভাবি ব্যয় মানে টাকা, বাড়ি ভাড়া, হাসপাতালের বিল, সন্তানের টিউশন ফি। পরে বুঝি, আসল ব্যয় অন্য জায়গায়। আপনি কাকে আপনার মনোযোগ দিচ্ছেন, কার জন্য নিজের স্বর নিচু করে ফেলছেন, কার উপস্থিতিতে নিজের স্বাভাবিক হাসিটুকু মেপে ব্যবহার করছেন, তারও একটা মূল্য আছে। এখন সময়ের খুব কাছের কেউ আপনার ভেতরের আবহাওয়াটা বদলে দেয়। আপনি আগে যে মানুষ ছিলেন, যে সহজতায় কথা বলতেন, যে কৌতূহলে বই পড়তেন, যে আনন্দে হঠাৎ রাত দুটোয় গান শুনতেন, সেই মানুষটাকেই ধীরে ধীরে সরিয়ে দেয়। একসময় আপনি নিজেই নিজের কাছে অতিথি হয়ে যান।
আমি অনেককে দেখেছি যারা সম্পর্কের মধ্যে থেকে ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, অথচ সেই ক্লান্তির ভাষা খুঁজে পায়নি। কারণ আমাদের সমাজ এখনও সম্পর্ককে মূলত নৈতিকতার চোখে দেখে, প্রাণশক্তির চোখে নয়। কেউ যদি দায়িত্ব পালন করে, বাইরে থেকে “ভালো মানুষ” বলে গণ্য হয়, তাহলে আমরা ধরে নিই সম্পর্কটিও সুস্থ। কিন্তু মানুষের আত্মা শুধু দায়িত্বে বাঁচে না। সে বাঁচে সাড়া পেয়ে, বাঁচে সম্মানে, বাঁচে নিজের স্বর অক্ষুণ্ণ রাখতে পারার স্বাধীনতায়। এমন অনেক মানুষ আছে, যাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেই মনে হয় জানালাটা খুলে গেছে। আবার এমনও আছে, যাদের পাশে বসে থাকতে থাকতে মনে হয় ঘরের অক্সিজেন কমে আসছে। এই পার্থক্য বিজ্ঞান দিয়ে মাপা যায় না, কিন্তু জীবন এর ফল ভোগ করে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপার হলো, এই ক্ষয় খুব ধীরে ঘটে। প্রথমে আপনি শুধু একটু কম কথা বলেন। তারপর কিছু বিষয় শেয়ার করা বন্ধ করেন। তারপর নিজের আনন্দগুলোকে “অপ্রয়োজনীয়” ভাবতে শুরু করেন। আপনি লক্ষ্য করবেন, আগে যে বইগুলো আপনাকে আলোড়িত করত, এখন আর মন বসে না। আগে যে মানুষটির ফোন পেলে আপনার দিন বদলে যেত, এখন ফোন বেজে উঠলে বুকের মধ্যে অদ্ভুত ক্লান্তি নামে। কিন্তু মানুষ আশ্চর্যরকমভাবে মানিয়ে নিতে পারে। কারাগারের সঙ্গেও। বিশেষ করে যদি সেই কারাগারে পর্দা থাকে, নরম আলো থাকে, এবং সামাজিক স্বীকৃতি থাকে।
আমাদের এই অদ্ভুত সংস্কৃতিতে আমরা emotional exhaustion-কে maturity বলে চালিয়ে দিই। কেউ যদি সবসময় ক্লান্ত, নিঃশেষ, নিজের প্রয়োজন নিয়ে অপরাধবোধে ভোগে, তাকে “ভালোবাসতে জানে” বলে প্রশংসা করি। অথচ ভালোবাসা যদি কেবল নিঃশেষ হওয়ার আরেকটি নাম হয়, তাহলে গাছেরা বসন্তকে ভয় পেত। ভালো সম্পর্ক মানুষকে ছোট করে না। মানুষকে সংকুচিত করে না। বরং তার ভিতরের ঘরগুলো খুলে দেয়। সেখানে আপনি নিজের মতো থাকতে পারেন। এমনকি নীরবতাও অপমানজনক লাগে না।
আমার মতে, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য হয়তো সেই মানুষটিকে পাওয়া, যার পাশে নিজের সত্তাকে পাহারা দিতে হয় না। কারণ পৃথিবীতে এমন অনেক সম্পর্ক আছে, যেখানে মানুষ প্রেমের চেয়ে বেশি শক্তি ব্যয় করে আত্মরক্ষায়। প্রতিটি বাক্য মেপে বলতে হয়, প্রতিটি আনন্দ justify করতে হয়, প্রতিটি দুর্বলতা ব্যবহৃত হওয়ার ভয় থাকে। ধীরে ধীরে মানুষ নিজের মধ্যেই গুটিয়ে যায়। বাইরে থেকে সব স্বাভাবিক দেখায়। শুধু ভিতরে ঋতু বদলে যায়।
এবং সত্যি বলতে কী, মানুষ সবসময় সঙ্গে সঙ্গে তা বুঝতেও পারে না যে সে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। কারণ এই দেউলিয়াত্ব একদিনে হয় না। এক সকালে উঠে কেউ বলে না: “আজ থেকে তুমি ভিতরে ফাঁকা।” বরং সেটা টের পাওয়া যায় খুব সাধারণ কিছু মুহূর্তে। হয়তো একদিন আয়নায় তাকিয়ে মনে হয়, অনেকদিন নিজের চোখে সেই পুরোনো দীপ্তিটা দেখা যায় না। হয়তো পুরোনো কোনো বন্ধুর সঙ্গে হঠাৎ প্রাণ খুলে হেসে উঠে বুঝতে পারেন, আপনি কতদিন হাসিটাকে রেশন করে ব্যবহার করেছেন। অথবা একা কোথাও বসে হঠাৎ মনে হয়, আপনার ভিতরে একসময় যে বিশাল আকাশ ছিল, এখন সেখানে আবহাওয়া সবসময় মেঘলা।
মানুষের জীবন এত দীর্ঘও নয় যে সব সম্পর্ককে শুধু সহ্য করে কাটিয়ে দেওয়া যায়। এবং এত সস্তাও নয় যে নিজের আলোর বিনিময়ে অন্যের অন্ধকারের ভাড়া দিতে হবে। কিছু মানুষ আছে যারা আপনার জীবনে এসে আপনাকে আরও বেশি নিজের মতো করে তোলে। আবার কিছু মানুষ আছে, যারা ধীরে ধীরে আপনাকে নিজের কাছ থেকেই সরিয়ে দেয়। এত দিনে আমি অন্তত এইটুকু বুঝেছি, শান্তি আর নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। বাইরে থেকে দুটো কখনও কখনও একই রকম দেখাতে পারে। কিন্তু একটিতে মানুষ বিশ্রাম পায়, অন্যটিতে মানুষ ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়।
রিটন খান



