ক্যালিপ্সোর চার বছর
ক্যালিপ্সো হয়তো ওডিসিউসকে চাইত। তাকে স্বামী করতে চাইত। অমরত্ব দিতে চাইত। হয়তো ছাড়তে তার কষ্টও হয়েছে। এসব বাদ দেওয়ার দরকার নেই। মানুষের, এমনকি দেবীরও, ইচ্ছা একরকম হয় না।




ওডিসির চরিত্রদের মধ্যে, বিশেষ করে যেসব নারী গল্পের মূল আলো থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকে, যাদের কথা আসে, কাজ আসে, শরীর আসে, তাঁত আসে, বিছানা আসে, দ্বীপের গন্ধ আসে, তারপর পুরুষের যাত্রা আবার শুরু হতেই তারা কাহিনির কিনারায় গিয়ে বসে, তাদের মধ্যে ক্যালিপ্সোকে নিয়ে ভাবতে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। কারণ ওডিসির শুরুতেই এই নারীটি এমনভাবে বসে আছে যে তাকে সরানো না গেলে গোটা কাহিনিই আর এগোয় না। জাহাজ ভাঙা, সঙ্গীহারা ওডিসিউস সাত বছর ধরে তার দ্বীপে পড়ে আছে, সমুদ্র পেরোতে পারছে না, ইথাকায় ফিরতে পারছে না, পেনেলোপি তাঁতের সুতো খুলছে আর বাঁধছে, টেলেমাকাস বড়ো হচ্ছে, প্রাসাদের দালানে পাত্রেরা গরু ছাগল কাটছে, মদ খাচ্ছে, ভৃত্যদের ধমকাচ্ছে, অথচ বীরপুরুষটি বসে আছে ওগিজিয়ায়, কখনো সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে, কখনো দেবীর গুহায় ঘুমোচ্ছে। কাহিনির চাকা কাদায় বসে গেছে। এই চাকা ঠেলে তুলতে অ্যাথেনাকে অলিম্পাসে উঠতে হয়, দেবতাদের সভায় কথা তুলতে হয়, জিউসকে মনে করিয়ে দিতে হয় যে লোকটার বাড়ি বলে একটা জায়গা আছে, স্ত্রী আছে, ছেলে আছে, রাজ্য আছে, এবং দীর্ঘকাল ধরে তাকে এক দ্বীপে রেখে দিলে মহাকাব্যেরও একটু অসুবিধা হয়।
তারপর ওডিসিউস ওগিজিয়া ছাড়ে। সমুদ্র পেরিয়ে, আরও বিপদ সামলে, অন্য মানুষের সামনে বসে যখন নিজের কাহিনি বলতে শুরু করে, তখন ক্যালিপ্সোর দ্বীপে কাটানো বছরগুলোর একটা ব্যবহারযোগ্য ব্যাখ্যাও তৈরি হয়ে যায়। সে বন্দি ছিল। ক্যালিপ্সো তাকে আটকে রেখেছিল। দেবীটি তার জন্য পাগল ছিল, তাকে স্বামী করতে চাইত, ছাড়তে চাইত না। পুরুষটি ঘরে ফেরার জন্য ব্যাকুল, আর নারীটি তার পথের ওপর সাত বছরের পাথর হয়ে বসেছিল। এই গল্প বললে অনেক সুবিধা। নিজের স্থবিরতার দায় আর নিজের থাকে না, দ্বীপের নরম বিছানা, সুগন্ধি গুহা, অমরত্বের প্রস্তাব, দেবীর সঙ্গ, সাত বছরের শরীরী ও গৃহস্থ সময় সব ধুয়ে গিয়ে কেবল একটি শব্দ থাকে: বন্দিত্ব।
ক্যালিপ্সো তারপর দ্রুত গল্পের বাইরে চলে যায়। সে আর নিজের কথা বলে না। ওডিসিউস বলে। কবি বলে। পণ্ডিতেরা বলেন। অনুবাদকরা বলেন। আধুনিক গবেষণাতেও আমরা প্রায়ই একই ভাষা শুনি: ওডিসিউসের বন্দিদশা, তার নারী-অপহরণকারী, তার জোরপূর্বক আটকে থাকা, তার মুক্তি। এমনকি নারীবাদী আলোচনার মধ্যেও কখনো কখনো এই একই বাক্য চলে আসে, যেন পুরুষের মুখে একবার উচ্চারিত অভিযোগ নারীসম্পর্কিত চূড়ান্ত দলিল, তার নিচে আর কোনো মাটি নেই, ঘামে ভেজা কোনো কাজ নেই, কাঠের তন্তু নেই, উলের আঁশ নেই, তাঁতের প্যাডেলে বহু বছরের পায়ের চাপ নেই।
ক্যালিপ্সোকে নিয়ে আমার আপত্তি সেখানেই। গ্রিক ভাষায় ওডিসিউস যে শব্দগুলো ব্যবহার করে, সেগুলোতে আটকে রাখা, বেঁধে রাখা, পেছনে টেনে ধরা, পথ রোধ করার অভিযোগ খুব স্পষ্ট। সেই ভাষা পরে বারবার লেখা হয়েছে, ব্যাখ্যা হয়েছে, উদ্ধৃত হয়েছে, এতবার হয়েছে যে মনে হয় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে সবাই যেন দেবীর হাতে দড়ি দেখেছে। কিন্তু ওডিসিউসের কথাই কেন আমরা হুবহু মেনে নেব? যে লোক নিজের বেঁচে থাকার জন্য গল্পকে বারবার বাঁকায়, দরকারমতো নাম গোপন করে, দরকারমতো পরিচয় বানায়, দরকারমতো নিজের দুর্বলতাকে কৌশল বলে, তার আত্মবিবরণও তো পরীক্ষা করা যায়। একটু কাছে গিয়ে দ্বীপটা দেখা যায়। গুহার ভেতর দেখা যায়। দরজার পাশে রাখা কুঠার, বাটালি, দড়ি, কাটা কাঠ দেখা যায়। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ক্যালিপ্সোর তাঁত।
ওডিসিউস যখন ওগিজিয়ায় পৌঁছায়, তার জাহাজ তখন আর জাহাজ নেই। তক্তা আলাদা, মাস্তুল আলাদা, পাল নেই, দাঁড় নেই, নাবিক নেই, সমুদ্রে নামার মতো কোনো বাহন নেই। লোকটি যতই ঘরে ফেরার কথা বলুক, সাঁতার কেটে ইথাকা যাওয়া সম্ভব নয়। তাকে নতুন করে কিছু বানাতে হবে, ভেলা হোক, নৌকা হোক, সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে লড়ে কয়েক দিন টিকে থাকার মতো কাঠের কোনো শরীর হোক। তার জন্য দরকার গাছ কাটার হাতিয়ার, কাঠ সমান করার যন্ত্র, ছিদ্র করার উপকরণ, দড়ি, খাদ্য, পানি, আর দরকার একটি পাল।
হার্মিস দেবতাদের আদেশ নিয়ে দ্বীপে না আসা পর্যন্ত ক্যালিপ্সো সেই যন্ত্রগুলো ওডিসিউসকে দেয় না। এখানেই গল্পটি আমাদের পরিচিত বাঁক নেয়। দেবী অনিচ্ছায় ছাড়ছে, তাই তাকে আটককারী বলা সহজ। কিন্তু যাওয়ার সময় ক্যালিপ্সো শুধু কুঠার আর হাতিয়ার দেয় না। সে তাকে পালও দেয়। সেই পালটি কোথা থেকে এলো? দ্বীপের ঝোপের ভেতর কি তৈরি পাল ঝুলছিল? সমুদ্র কি এক সকালে ভাসিয়ে এনে গুহার সামনে রেখে গিয়েছিল? হার্মিস কি অলিম্পাস থেকে বগলে করে এনেছিল? এসবের কোনো লক্ষণ নেই।
প্রাচীন পৃথিবীতে কাপড় আকাশ থেকে নামত না। সুতো নিজে নিজে পাক খেত না। তাঁত রাতের অন্ধকারে একা একা চলত না। পশম বা উদ্ভিদের তন্তু সংগ্রহ করতে হতো, পরিষ্কার করতে হতো, আঁচড়াতে হতো, কাততে হতো, সুতো পাকাতে হতো, তারপর তাঁতে বসে সারি সারি সুতো টেনে, চাপ দিয়ে, গিঁট সামলে, ভাঙা সুতো জোড়া দিয়ে, দিন থেকে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা থেকে রাত, ঋতুর পর ঋতু কাপড় তুলতে হতো। একটি পোশাক আর একটি সমুদ্রযাত্রার পাল এক জিনিস নয়। পালকে বাতাস ধরতে হবে, টান সহ্য করতে হবে, নোনা জল খেতে হবে, আবার শুকোতে হবে, ভিজে ভারী হয়ে ছিঁড়ে গেলে মানুষসহ ভেলা ডুববে। এই কাপড় ঘরের পর্দা না, শোবার চাদর না, শরীর ঢাকার পাতলা বস্ত্রও না। এটি জাহাজের একটি অঙ্গ।
প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য এবং পরীক্ষামূলক প্রত্নতত্ত্বের হিসাব ধরে দেখা যায়, একজন নারীর একটিমাত্র পাল তৈরি করতে প্রায় চার বছর লেগে যেতে পারে। চার বছর। প্রতিদিনের কাজের ফাঁকে একটু আধটু নয়, দীর্ঘ, নিয়মিত, শরীরক্ষয়ী শ্রম। আঙুলে কড়া পড়বে, কবজি ব্যথা করবে, কোমর শক্ত হয়ে যাবে, চোখ ঝাপসা হবে, সুতো ছিঁড়বে, আবার বাঁধতে হবে। বাতাসের জন্য কাপড় বানাতে বানাতে নারী নিজে গুহার স্থির বাতাসে বসে থাকবে। পুরুষটি সমুদ্রতীরে বসে ঘরের কথা ভাববে, আর তার ঘরে ফেরার ভবিষ্যৎ ধীরে ধীরে জন্ম নেবে নারীর তাঁতে।
হার্মিস যখন ওগিজিয়ায় আসে, হোমার আমাদের ক্যালিপ্সোকে বসে থাকতে দেখান তাঁতের সামনে। দ্বীপটি সবুজ, ভেজা, ফলভরা, সুগন্ধি কাঠের ধোঁয়া উঠছে, লতা গুহার মুখ ঢেকেছে, পাখিরা গাছে বসে আছে, ঝরনার জল বয়ে যাচ্ছে, আর সেই সৌন্দর্যের মাঝখানে ক্যালিপ্সো কাজ করছে। সে অলস প্রেমিকা হয়ে শুয়ে নেই। ওডিসিউসকে বুকে বেঁধে রাখার জন্য কোনো জাদুর দড়ি পাকাচ্ছে না। সে তাঁত বুনছে। কবি এই তথ্য দিয়েছেন, কিন্তু গল্পের পরবর্তী ব্যবহারে তথ্যটি ঝরে গেছে, যেমন কাপড় কাটার সময় মেঝেতে ছোট ছোট সুতো পড়ে থাকে, কেউ আর কুড়িয়ে দেখে না।
তখন সাত বছরকে অন্যভাবে দেখা যায়।
ওডিসিউস দ্বীপে সাত বছর ছিল, আর একটি পাল তৈরি করতে একজন নারীর প্রায় চার বছর লাগতে পারে। তার জাহাজ ভাঙা ছিল। তার কাছে হাতিয়ার ছিল না। যাওয়ার সময় সে ক্যালিপ্সোর কাছ থেকে হাতিয়ার পেল, খাদ্য পেল, জল পেল, পথের নির্দেশ পেল, বাতাস পেল, আর পেল সেই বিশাল বস্ত্র, যা ছাড়া তার কাঠের ভেলা সমুদ্রের ওপর কেবল ভাসমান কয়েকটি গাছের গুঁড়ি হয়ে থাকত। তখন ক্যালিপ্সোকে কেবল বন্দিকারিণী বলা কঠিন হয়ে যায়। তার দ্বীপে পুরুষটি থেমে ছিল, কিন্তু সেই থেমে থাকার বছরগুলোর মধ্যে নারীটি হয়তো তার যাত্রার উপকরণ বানাচ্ছিল। ওডিসিউসের মুক্তির দাম তখন ক্যালিপ্সোর শ্রম। পুরুষের ঘরে ফেরার কাহিনির পেছনে বসে থাকা এক নারীর চার বছরের তাঁত।
এইখানে কাহিনিটি কেমন যেন হয়ে ওঠে। কারণ বীরপুরুষের গৌরব একটু কমে যায়। যে ভেলা সে বানায়, তার কাঠে তার হাত আছে, কিন্তু পালটিতে অন্য কারও জীবন কাটা আছে। যে সমুদ্র সে পাড়ি দেয়, সেই সমুদ্রযাত্রার বাতাস ধরেছে এক নারীর বোনা কাপড়। পরে সে বলতে পারে, আমাকে আটকে রাখা হয়েছিল; কিন্তু তার চলে যাওয়ার ব্যবস্থাটি কে তৈরি করেছিল, সেই কথা গল্পে আর তেমন জায়গা পায় না। বন্দিত্বের অভিযোগ থাকে, শ্রমের হিসাব থাকে না। পুরুষের দুঃখ মহাকাব্য হয়, নারীর চার বছর গৃহস্থালির কাজে মিশে যায়।
ক্যালিপ্সো হয়তো ওডিসিউসকে চাইত। তাকে স্বামী করতে চাইত। অমরত্ব দিতে চাইত। হয়তো ছাড়তে তার কষ্টও হয়েছে। এসব বাদ দেওয়ার দরকার নেই। মানুষের, এমনকি দেবীরও, ইচ্ছা একরকম হয় না। কাউকে ভালোবেসে কাছে রাখতে চাওয়া, তার জন্য কাজ করা, তাকে ছাড়তে না চাওয়া, শেষে তার যাওয়ার ব্যবস্থা নিজ হাতে করে দেওয়া, এই সবকিছু একই শরীরের মধ্যে থাকতে পারে। ক্যালিপ্সোর রাগও ছিল। দেবতাদের আদেশ শুনে সে যে প্রতিবাদ করে, তার ভিতরে দেবপুরুষদের দ্বিমুখী নিয়ম নিয়ে ক্ষোভ আছে। পুরুষ দেবতারা মানবী নারীদের নিয়ে গেলে চলে, দেবী কোনো পুরুষকে রাখলে অলিম্পাসে সভা বসে। তার এই অভিযোগও পরে ওডিসিউসের বীরত্বের শব্দে চাপা পড়ে যায়।
পেনেলোপিও তাঁত বোনে। তার তাঁত সময়কে আটকে রাখে। দিনে বোনে, রাতে খোলে, পাত্রদের অপেক্ষা দীর্ঘ করে। ক্যালিপ্সোর তাঁত অন্য কাজ করে। তার কাপড় সময়কে পাড়ি দেওয়ার উপায় বানায়। পেনেলোপি ঘরের ভেতরে অনুপস্থিত স্বামীর জন্য সময় বোনে, ক্যালিপ্সো দ্বীপের ভেতরে উপস্থিত পুরুষটির প্রস্থানের জন্য বাতাস বোনে। দুজন নারীর হাতেই সুতো, দুজনের শ্রমেই ওডিসিউসের কাহিনি টিকে থাকে, কিন্তু মহাকাব্যের নাম তাদের কারও নামে নয়।
ওডিসির নারীদের দিকে একটু বেশি সময় তাকালে এমন অনেক চাপা দরজা খুলে যায়। সির্সি কেবল পুরুষকে পশু বানানো জাদুকরী থাকে না, নওসিকা কেবল সৈকতে কাপড় ধোয়া রাজকন্যা থাকে না, পেনেলোপি কেবল অপেক্ষমাণ বিশ্বস্ত স্ত্রী থাকে না, ক্যালিপ্সোও কেবল কামনায় উন্মত্ত বন্দিকারিণী থাকে না। তারা প্রত্যেকে এমন কিছু কাজ করে, এমন কিছু জিনিস তৈরি করে, এমন কিছু সময় বহন করে, যার ওপর পুরুষের যাত্রা দাঁড়িয়ে থাকে। পুরুষ চলে যায় বলে তার পথ দৃশ্যমান। নারী থেকে যায় বলে তার শ্রম অদৃশ্য।
ওডিসিউসের ভেলা যখন ওগিজিয়ার তীর ছাড়ে, সমুদ্রের হাওয়ায় যে পাল ফুলে ওঠে, সেখানে ক্যালিপ্সোর চার বছরের আঙুলও ফুলে ওঠে। সে আর কাহিনিতে নেই, তবু বাতাস তাকে বহন করে। ওডিসিউস সামনে তাকিয়ে আছে, ইথাকার দিকে, পেছনে দ্বীপ ছোট হয়ে আসছে, গুহা দেখা যায় না, তাঁত দেখা যায় না, যে নারীটি বহু বছর ধরে সুতো টেনেছে তাকেও আর দেখা যায় না। শুধু তার বানানো কাপড় পুরুষটির মাথার ওপর টান খেয়ে আছে, নোনা বাতাস খাচ্ছে, ভেলাকে ঘরের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে।


