প্রোডাক্টিভ থাকার অভিনয়
এই প্রশ্নগুলো প্রায় অশ্রুত এক কম্পনের মতো; মাথার ভেতরে একটা নিচু ফ্রিকোয়েন্সির শব্দের মতো, যেটা সারাক্ষণ বাজতে থাকে, থামে না, কিন্তু চিৎকারও করে না।
একটা সময় আসে; কখন, সেটা আগে থেকে বলে দেওয়া যায় না; যখন হঠাৎ করেই নিজের জীবনের ভেতরে দাঁড়িয়ে আমি নিজেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করি: এতদিন যা করলাম, তার মানে কী? এত কাজ, এত ব্যস্ততা, এত “প্রোডাক্টিভ” থাকার অভিনয়; এসবের শেষটা কোথায়? সাফল্য বলে যেটাকে এতদিন ধরে জড়িয়ে ধরেছিলাম, সেটা কি সত্যিই কোনো গুরুত্ব আছে, নাকি সেটা কেবল অন্যদের চোখে ধরা পড়ার মতো এক ধরনের মসৃণ শব্দ?
এই প্রশ্নগুলো প্রায় অশ্রুত এক কম্পনের মতো; মাথার ভেতরে একটা নিচু ফ্রিকোয়েন্সির শব্দের মতো, যেটা সারাক্ষণ বাজতে থাকে, থামে না, কিন্তু চিৎকারও করে না। আমি কাজ করি, কথা বলি, হাসি; সবই করি, কিন্তু কোথাও যেন একটা ভেতরের অংশ শুকিয়ে যেতে থাকে। একে কেউ বলে বার্নআউট, কেউ বলে মিডলাইফ ক্রাইসিস, কেউ বলে ক্রিয়েটিভ ব্লক। নাম যাই হোক, অনুভূতিটা একই; এক ধরনের ফাঁপা হয়ে যাওয়া।
মজার বিষয়, এই অবস্থাটা প্রায়ই বাইরে থেকে সবকিছু ঠিকঠাক দেখায়। কোনো বড় কাজ শেষ হয়েছে, কোনো অর্জন হয়েছে, মানুষ বলছে, “ভালো করেছ”; আর আমি ভিতরে ভিতরে ভাবছি, এটাই কি সব? এতদিন ধরে যার দিকে ছুটছিলাম, সেখানে এসে দাঁড়িয়ে যদি এই প্রশ্নটাই ওঠে, তাহলে এত দৌড়ঝাঁপের মানেটা কী ছিল?
অনেক সময় এই প্রশ্নগুলো ভোর পাঁচটায় আসে। শহর তখন ঘুমিয়ে থাকে, আলো নিভে থাকে, আর আমি একা; নিজের সঙ্গে, নিজের নীরবতার সঙ্গে। তখন কোনো শব্দ আমাকে বাঁচিয়ে রাখে না। ফোন, বই, কাজ; সবকিছু হঠাৎ করে অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়। আমি বুঝতে পারি, এখানে কোনো শর্টকাট নেই। এই অংশটা আমাকেই বাঁচতে হবে। পার হয়ে যেতে হবে, কোনো উত্তর ছাড়াই।
পরে বুঝেছি, এই সময়টা আসলে এক ধরনের বিরতি; কিন্তু সে বিরতি কষ্টের । জমি যেমন ফসল কাটার পর কিছুদিন ফাঁকা পড়ে থাকে, সেইরকম; উপর থেকে দেখলে মনে হয়, কিছুই হচ্ছে না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে মাটি নিজেকে ঠিক করছে, নতুন কিছু জন্মানোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
ব্রায়ান ইনোর একটা ডায়েরি পড়তে গিয়ে এই অভিজ্ঞতাটা অন্যভাবে চিনতে পেরেছিলাম। তিনি লিখেছিলেন, কাজ করতে করতে একটা সময় আসে, যখন সবকিছু “কাজ” হয়ে যায়; যেন আর কোনো উৎস নেই, শুধু অভ্যাস আছে, ডেডলাইন আছে। আইডিয়াগুলো আর জন্মায় না, বরং চেপে ধরলে কষ্ট করে বের হয়। আর সেই ফাঁকে ফাঁকে কিছু নিষ্ঠুর চিন্তা মাথার ভেতরে ঘুরতে থাকে; তুমি শেষ, তোমার ভেতরে আর কিছু নেই।
এই চিন্তাগুলো আমরা সাধারণত এড়িয়ে যাই। আমি নিজেও চেষ্টা করেছি; ব্যস্ততা বাড়িয়ে, অন্যদিকে মন দিয়ে, মানুষজনের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে। কিন্তু একটা সময় বুঝেছি, এগুলো এড়িয়ে যাওয়া মানে শুধু সময় কিনে নেওয়া। সমস্যাটা থেকে যায়।
ইনো বলেছিলেন, তিনি ইচ্ছে করে একা কোথাও চলে যেতেন; যেখানে কিছুই ঘটছে না। কোনো বিনোদন নেই, কোনো বিভ্রান্তি নেই। শুধু নিজের সঙ্গে থাকা। প্রথমে সেটা অসহ্য লাগে। নিজের সঙ্গই যেন সবচেয়ে বিরক্তিকর জিনিস হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ঠিক সেখানেই ভাঙনটা আসে; নিজেকে নিয়ে যে অতিরিক্ত গুরুত্ববোধ, সেইটা একটু একটু করে আলগা হয়।
আমি লক্ষ্য করেছি, এই অন্ধকারের মধ্যেই কোথাও একটা ছোট ফাটল তৈরি হয়। খুব তুচ্ছ কিছু দিয়ে; একটা বিমান আকাশ কেটে যাচ্ছে, বিকেলের আলো জানলার কাঁচে এসে পড়ছে, কোনো পুরনো রসিকতা মনে পড়ছে; হঠাৎ দেখি, আমি ভালো লাগা অনুভব করছি। কোনো উত্তর পাইনি, কোনো প্রশ্নের সমাধান হয়নি; কিন্তু প্রশ্নগুলো হঠাৎ করে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে।
আসলে আমরা যতটা ভাবি, ততটা নিজেদের কেন্দ্র করে পৃথিবী ঘোরে না। বরং আমরা যত বেশি নিজেদের গুরুত্ব কমাতে পারি, ততই বেঁচে থাকার অনুভূতিটা ফিরে আসে। একে হয়তো বলা যায় “নিজেকে সরিয়ে রাখা”; নিজের উদ্বেগ, নিজের প্রমাণ করার ইচ্ছা, নিজের মূল্য নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা; এসব একটু পাশে সরিয়ে রাখা।
পরে জেনেছিলাম, সেই সময়ের পর ইনো নতুন ধরনের সংগীত নিয়ে কাজ শুরু করেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে গিয়ে অনাথ শিশুদের সঙ্গে সংগীতচর্চা করেন। অর্থাৎ, নিজের ভেতরের সংকট থেকে বেরিয়ে এসে আবার বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হওয়া; কিন্তু এবার অন্যভাবে।
রেবেকা ওয়েস্ট অনেক আগে লিখেছিলেন, শিল্প কোনো বিলাসিতা না; এটা প্রয়োজন। এটা একটা পাত্র, যেখানে জীবনকে ঢেলে আমরা স্বাদ নিতে পারি। কথাটা তখন খুব তাত্ত্বিক মনে হয়েছিল। এখন একটু একটু করে বুঝি; শেষ পর্যন্ত আমাদের বাঁচিয়ে রাখে এই স্বাদটাই, “বেঁচে থাকার” স্বাদ।
কিন্তু এই স্বাদ নিজে থেকে তো আসে না। কাপটা তুলে নিতে হয়। কখনো কখনো, কাপটা নিজেকেই বানাতে হয়।
মনে হয়, যেন একটা গভীর খাদে পড়ে যাচ্ছি; কিন্তু পড়তে পড়তে বুঝি, আমি ভেসে আছি। বাতাসের ভেতর, অদৃশ্য স্রোতের ওপর।
এই আনন্দটার বয়স নেই। এটা নতুনও না, পুরনোও না। বরং খুব চেনা; শুধু মাঝে মাঝে হারিয়ে যায়, আবার ফিরে আসে। যেন খাদটির একেবারে নিচে একটি স্বচ্ছ জলধারা বয়ে চলেছে; নীরব, স্থির, কিন্তু অবিরাম।
আমি এখনো সেই জায়গাটাকে পুরোপুরি বুঝি না। শুধু এটুকু জানি, সেখানে পৌঁছাতে হলে, একবার অন্তত অন্ধকারের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। আর সেই পথটা কেউ আমার হয়ে হাঁটতে পারে না।



