যেটা সহজে মনে আসে, সেটাকেই বেশি সত্যি মনে হয়।
Cognitive Bias কি?
দুই হাজার বছর আগে মানুষ রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। উঠোনে শুয়ে, খেজুরপাতার ফাঁক দিয়ে, নদীর পাড়ে বসে, কিংবা মরুভূমির বালির ওপর চিত হয়ে। তাকিয়ে দেখত, ওপরে সবকিছু নড়ছে। সূর্য উঠছে, ডুবছে। চাঁদ ক্ষয়ে যাচ্ছে, আবার ভরছে। তারা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই, ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। পৃথিবী? পৃথিবীকে তো কেউ নড়তে দেখছে না। মাটির ওপর কলস যেমন থাকে, খুঁটির সঙ্গে বাঁধা গরু যেমন থাকে, তেমনি পৃথিবীও আছে। স্থির। একদম থির।
এই গল্পে ভুল কোথায়? ভুল তো তেমন চোখে পড়ে না। বরং গল্পটা খুব আরামদায়ক। মানুষের নিজেরে মাঝখানে বসাইয়া রাখার পুরোনো একটা নেশা আছে। নিজের পাড়া, নিজের ধর্ম, নিজের দেশ, নিজের পরিবার, নিজের শরীর, সবশেষে নিজের মাথার ভেতরকার নিজের কণ্ঠস্বর, সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকেই রাখতে ইচ্ছা করে। আজও করে। দুই হাজার বছর আগে করলে দোষ কী?
আমি যদি ওই সময় জন্মাইতাম, খুব সম্ভবত আমিও বিশ্বাস করতাম। কইতাম, আরে চোখে তো দ্যাখি সবকিছু ঘুরতেছে। পৃথিবী দাঁড়াইয়া আছে। এইখানে আবার সন্দেহের কী আছে?
কিন্তু মানুষের ইতিহাসের অদ্ভুত জায়গাটা অন্যখানে। মানুষ তার ভুল বিশ্বাসকে সারাজীবন বুকের কাছে নিয়ে বসে থাকেনি। মানুষ মাঝে মাঝে নিজের বিশ্বাসের গায়ে লাথি মারছে। নিজের গল্প থেকে বের হয়ে এসেছে। তারপর হাতে নিয়েছে অন্য এক জিনিস। বিজ্ঞানের ভাষায় নাম বিজ্ঞান, কিন্তু জিনিসটা আসলে অভ্যাস। সন্দেহ করার অভ্যাস। জিজ্ঞেস করার অভ্যাস। নিজের চোখকেও বলার অভ্যাস, দাঁড়াও, তোমার কথায় পুরো ভরসা করতে পারছি না।
কোপার্নিকাস যখন বললেন পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, তখন তিনি শুধু একটা জ্যোতির্বিজ্ঞানের তথ্য দেননি। মানুষের গালে আলতো একটা থাপ্পড় মেরেছিলেন। বলেছিলেন, তোমরা মাঝখানে বসে নাই।
মানুষ তখন থেকে শিখতে শুরু করল যে কিছু কিছু প্রশ্ন খুব বড়। এত বড় যে শুধু অনুভূতি দিয়ে উত্তর দেওয়া যায় না। শুধু “আমার মনে হয়” দিয়ে চলে না। কারণ মানুষের মাথার ভেতর একটা কারখানা আছে, সেখানে সারাক্ষণ শর্টকাট তৈরি হয়। মগজ অলস না, বরং অতিরিক্ত ব্যস্ত। সব সময় হিসাব করে, কোথায় কম শক্তি খরচ করা যায়।
এই শর্টকাটগুলোরই নাম হিউরিস্টিক।
খুব দরকারি জিনিস। ধরেন বহু হাজার বছর আগে জঙ্গলের মধ্যে হাঁটতেছে একজন মানুষ। হঠাৎ ঝোপ নড়ল। সে বসে বিশ্লেষণ শুরু করল না, “এখন দেখি সম্ভাব্যতার হিসাব করি, বাতাসের গতি বিবেচনা করি, পরিসংখ্যানগতভাবে…” না। সে দৌড় দিছে। কারণ ঝোপ নড়া মানে বিপদ হতে পারে।
এই শর্টকাট জীবন বাঁচিয়েছে।
গরম আগুনে হাত দিলে পোড়ে, একবার শিখে গেলে দ্বিতীয়বার আর ভাবতে হয় না। বিষাক্ত গাছের পাতা খেলে অসুখ হয়, মনে থাকে। পায়ের ছাপ দেখে শিকার চেনা যায়, মানুষ শিখে যায়।
এইভাবে মানুষ বেঁচেছে।
কিন্তু এই একই ব্যবস্থা মানুষেরে ফাঁদেও ফেলে।
কারণ মগজের একটা বদঅভ্যাস আছে। সে প্যাটার্ন দেখতে ভালোবাসে। খুব ভালোবাসে। যেখানে কিছু নাই, সেখানেও প্যাটার্ন বানায়। মেঘের মধ্যে মুখ খুঁজে পায়। সংখ্যার মধ্যে রহস্য খুঁজে পায়। দুটো ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক বানায়।
গল্পও আসলে প্যাটার্ন। শুরু, মাঝখান, শেষ।
মানুষ গল্প ছাড়া থাকতে পারে না।
সমস্যা শুরু হয় যখন গল্প বাস্তবতার ওপর চেপে বসে।
ধরেন ২০২৫ সালে আকাশে একটা বাণিজ্যিক বিমান আর সামরিক হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ হলো। তারপর হঠাৎ মানুষ দেখল, প্রতিদিনই যেন প্লেন নিয়ে খবর আসছে। কোথাও রানওয়েতে সমস্যা, কোথাও জরুরি অবতরণ, কোথাও কাছাকাছি দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে।
টিভি চিৎকার করছে।
ফেসবুক চিৎকার করছে।
ইউটিউবের থাম্বনেইল চিৎকার করছে।
মানুষ বলতে শুরু করল, বিমান ভ্রমণ তো এখন বিপজ্জনক।
কিন্তু পরিসংখ্যান বসে ছিল ঠান্ডা মাথায়। বলল, কই? সংখ্যায় তো কোনো বড় পরিবর্তন নাই। আগের বছরের মতোই আছে।
তাহলে মানুষ ভয় পেল কেন?
কারণ মাথার ভেতরে আরেকটা শর্টকাট আছে। Availability bias।
যেটা সহজে মনে আসে, সেটাকেই বেশি সত্যি মনে হয়।
বিমান দুর্ঘটনা বিরল। কিন্তু হলে সবাই শুনে। গাড়ি দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মানুষ মারা যায়, অথচ সেগুলো আমাদের মাথায় ছবি বানায় না। বিমানের খবর বানায়।
মগজ বলে, অনেক শুনছি, নিশ্চয় অনেক ঘটছে।
এইখানেই মগজ ঠকায়।
আরেকটা আছে। Confirmation bias।
এইটা আরও সাংঘাতিক।
মাথা নিজের পছন্দের খবর শুনতে ভালোবাসে। নিজের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গেলে মুখ বাঁকায়।
যদি আপনি আগেই বিশ্বাস করেন বিমান বিপজ্জনক, তাহলে দুর্ঘটনার খবর আপনার বিশ্বাসকে আরও শক্ত করবে।
যদি আপনি বিশ্বাস করেন নির্দিষ্ট ধরনের শিক্ষা পদ্ধতিতে মানুষ ভালো শেখে, তাহলে আপনি এমন ঘটনাগুলোকেই মনে রাখবেন যেগুলো আপনার বিশ্বাসকে সমর্থন করে।
যেমন বহু মানুষ বিশ্বাস করে কেউ ভিজ্যুয়াল লার্নার, কেউ অডিটরি লার্নার। ক্লাসে শিক্ষকরা বলেন, বইয়ে লেখা থাকে, কর্মশালায় শেখানো হয়।
কিন্তু গবেষণা বলছে, ব্যক্তিগত “লার্নিং স্টাইল” তত্ত্বের পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই।
তাও বিশ্বাসটা মরে না।
কারণ বিশ্বাস সহজে মরে না। মানুষের বিশ্বাস পাড়ার পুরোনো দোকানের মতো। ব্যবসা না চললেও বন্ধ হয় না।
তাই বিজ্ঞান একটা ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ নিজের মাথার বিরুদ্ধে লড়াই করে।
কারণ বিজ্ঞানীরা ফেরেশতা না। তাদেরও পক্ষপাত আছে। তাদেরও অহংকার আছে। তাদেরও প্রিয় ধারণা আছে।
এইজন্য তারা পদ্ধতি বানিয়েছে।
Randomized controlled trial বানিয়েছে।
Control group বানিয়েছে।
Placebo বানিয়েছে।
Double blind study বানিয়েছে।
এমনকি এমন ব্যবস্থাও করেছে, যেখানে গবেষক নিজেও জানে না কে আসল ওষুধ পেয়েছে, কে নকলটা।
কী অদ্ভুত ব্যাপার। মানুষের মগজ এমন একটা যন্ত্র বানিয়েছে, যেটা নিজের ভুল ধরার চেষ্টা করে।
নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষী দাঁড় করায়।
এটা কোনো ছোট ঘটনা না।
কারণ পৃথিবী খুব অদ্ভুত জায়গা। মানুষের অনুভূতির চেয়ে অদ্ভুত। মানুষের গল্পের চেয়ে অদ্ভুত।
তাই মাঝে মাঝে নিজের মাথাকে বলতে হয়, দাঁড়াও। তুমি হয়তো ভুলও হতে পারো।
ইন্টারনেটের এই সময়ে, চিৎকারের এই সময়ে, অ্যালগরিদমের এই সময়ে, এই কথাটা বলা খুব সহজ না।
“আমি ভুল হতে পারি।”
কিন্তু মানুষের ইতিহাস যদি কিছু শিখিয়ে থাকে, তাহলে এইটুকু শিখিয়েছে, আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা মানুষ একদিন বুঝেছিল পৃথিবী মাঝখানে নেই।
হয়তো আমাদেরও মাঝে মাঝে বুঝতে হবে, আমাদের মাথাটাও সবসময় মাঝখানে বসে নাই।
রিটন খান



