বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা
সমস্যা হলো, আমরা বিস্ময়ের ক্ষমতা নিয়ে জন্মালেও বড় হতে হতে সেই ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। আমাদের চারপাশের সমাজ, পরিবার এবং শিক্ষাব্যবস্থা খুব যত্ন করে এই কাজটি করে।
মানুষের বেঁচে থাকার জন্যে খাবার দরকার। পানি দরকার। ঘুম দরকার। মাঝে মাঝে টাকারও দরকার হয়। টাকা ছাড়া পৃথিবীতে অনেক সমস্যার সমাধান হয় না। তবে মানুষ শুধু সমস্যার সমাধান করে বেঁচে থাকে না।
বেঁচে থাকার জন্যে তার বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতাও দরকার।
সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালার পাশে দাঁড়ালে দেখা যায়, একটি ছোট গাছের পাতায় শিশির জমে আছে। শিশিরের ফোঁটাটি খুবই ছোট। আঙুল দিয়ে ছুঁতে গেলে গড়িয়ে পড়ে যাবে। অথচ তার ভেতরে পুরো আকাশের ছবি ধরা আছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা সাধারণত ভাবি না। আমাদের অফিসে যেতে হবে। বাচ্চাকে স্কুলে দিতে হবে। ইলেকট্রিক বিল বাকি আছে। আকাশ পরে দেখা যাবে।
শেষ পর্যন্ত আকাশ আর দেখা হয় না।
বিস্ময়ের একটা ভালো দিক আছে। সে বড়-ছোট বিচার করে না। রাজা-প্রজা বোঝে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি দেখতে চায় না। একটি টবে ফোটা দোলনচাঁপা ফুল দেখে যে বিস্মিত হতে পারে, সে একটি গ্যালাক্সির ছবির দিকেও একই চোখে তাকাতে পারে। ছোট ঝরনার পানির শব্দ তার ভালো লাগে। আবার বাখের ‘গোল্ডবার্গ ভ্যারিয়েশনস’ শুনেও সে চুপ করে বসে থাকে।
ওয়াল্ট হুইটম্যান লিখেছিলেন, ঘাসের একটি পাতার মধ্যে নক্ষত্রের পরিশ্রমের চেয়ে কম কিছু নেই।
কথাটি খুব বড়। তবে ঘাসের পাতা খুব ছোট।
বড় কথাগুলি মাঝে মাঝে ছোট জিনিসের ভেতর লুকিয়ে থাকে। আমরা ছোট জিনিস বলে তাদের দিকে তাকাই না। এই কারণে কথাগুলিও আমাদের চোখে পড়ে না।
বিস্ময় আসলে দেখার মধ্যে থাকে। চোখ খুললেই দেখা হয় না। চোখ খোলা রেখেও মানুষ দীর্ঘ জীবন অন্ধের মতো কাটিয়ে দিতে পারে। সে ঘর দেখে, রাস্তা দেখে, মানুষ দেখে, গাছ দেখে। কোনো কিছুর ভেতরে ঢোকে না। কেবল নাম জানে।
এটা কদমগাছ।
এটা নদী।
এটা সন্ধ্যাতারা।
নাম জেনে ফেললেই আমাদের কাজ শেষ। আমরা ধরে নিই, জিনিসটিকেও জেনে ফেলেছি।
অথচ একটি কদমফুল কাছে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে বোঝা যায়, জিনিসটি খুবই রহস্যময়। গোল একটি ফুলের গায়ে শত শত সূক্ষ্ম সাদা কাঁটা। প্রতিটি কাঁটার মাথায় আলোর বিন্দুর মতো ছোট অংশ। কে এত যত্ন করে এই নকশা করেছে? কেন করেছে? কদমগাছ কি জানে, বর্ষাকালে তার ফুল দেখে কোনো এক বিষণ্ন মানুষ হঠাৎ আনন্দ পাবে?
সম্ভবত জানে না।
গাছেরা অনেক কিছুই জানে না। তারপরেও তারা আমাদের অনেক কিছু দেয়।
আমার ঠিক মনে নেই, তবে কোথায় যেন পড়েছিলাম যে, ফুল নিয়ে লিখতে গিয়ে কেউ বলেছিলেন, সৃষ্টিশীল জীবনের কাজ হচ্ছে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা বিস্ময়ের সূর্যকে খুঁড়ে বের করা।
‘চাপা পড়া সূর্য’ কি অদ্ভুত। সূর্য আবার মাটির নিচে চাপা পড়ে কীভাবে?
পড়ে।
মানুষের অভ্যাসের নিচে পড়ে। ব্যস্ততার নিচে পড়ে। হিসাবের খাতার নিচে পড়ে। প্রতিদিন একই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে করতে রাস্তার গাছগুলিকে আর দেখা হয় না। একই মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন বাস করতে করতে তার মুখের পরিবর্তন চোখে পড়ে না। একদিন হঠাৎ পুরোনো ছবি দেখে মনে হয়, মানুষটি কত তরুণ ছিল!
আমরা অবাক হই। অথচ পরিবর্তনটি প্রতিদিনই আমাদের সামনে ঘটেছে।
ডিলান টমাস বলেছিলেন, বিস্মিত শিশুর চোখে নক্ষত্র দেখা জীবনের লক্ষ্য এবং সমাপ্তি।
শিশুরা নক্ষত্রের নাম জানে না। কোনটা সিরিয়াস, কোনটা ভেগা, কোনটা ধ্রুবতারা, এসব তাদের মাথাব্যথা না। তারা শুধু তাকিয়ে থাকে।
বড়রা নক্ষত্রের নাম জানে। দূরত্ব জানে। রাসায়নিক গঠন জানে। তারপর বাসায় ফিরে নেটফ্লিক্স দেখে।
জ্ঞানের সমস্যা, জ্ঞান যখন বিস্ময় বাড়ায়, তখন সে আলো। জ্ঞান যখন বিস্ময়ের জায়গা দখল করে বসে, তখন সে ভারী আলমারি। আলমারির ভেতর অনেক বই থাকে, কিন্তু জানালা ঢেকে যায়।
আমি মনে করি একটি শিশুকে সবচেয়ে মূল্যবান যে উপহার দেওয়া যায়, তা হলো এমন এক বিস্ময়বোধ, যা বয়সের সঙ্গে নষ্ট হবে না। পরবর্তী জীবনের একঘেয়েমি, কৃত্রিমতা এবং হতাশার বিরুদ্ধে এই বিস্ময় কাজ করবে ওষুধের মতো। আমার দাদি আমাকে সেই উপহার দিয়েছিলেন।
শিশুরা জন্মের পর থেকেই বিস্মিত হয়। একটি পিঁপড়া দেয়াল বেয়ে উঠছে। শিশুটি বসে বসে দেখবে। পিঁপড়াটি পড়ে গেলে তার মন খারাপ হবে। আবার উঠতে শুরু করলে সে আনন্দ পাবে।
বড় মানুষ এই দৃশ্য দেখে কী করবে?
সে পিঁপড়াটিকে আঙুল দিয়ে মেরে ফেলবে। তারপর বলবে, ঘরে পিঁপড়ার খুব উপদ্রব হয়েছে।
গ্যেটে বলেছিলেন, আমি পৃথিবীতে এসেছি বিস্মিত হওয়ার জন্যে।
মানুষ কেন পৃথিবীতে আসে, এই প্রশ্নের উত্তর কঠিন। ধর্ম এক রকম উত্তর দেয়। দর্শন আরেক রকম। বিজ্ঞান সাধারণত এই প্রশ্ন থেকে দূরে থাকে। গ্যেটের উত্তরটি সহজ।
আমি এসেছি বিস্মিত হতে।
এই উত্তর শুনে মনে হয়, পৃথিবীতে আসার ব্যাপারটি খুব খারাপ হয় নি।
হারমান হেসে এই বিস্ময় নিয়েই ভেবেছেন। মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর মাঝখানে একটি দাগ দেওয়া হয়। সেই দাগের নাম জীবন। কারও দাগ ছোট, কারও লম্বা। হেসের দাগটি দীর্ঘ ছিল। তিনি সেই দীর্ঘ সময়ের অনেকখানি ব্যয় করেছেন মানুষ কীভাবে নিজের ভেতরের মানুষটির কাছে ফিরে যেতে পারে, তা ভেবে।
প্রায় একশ বছর আগে লেখা একটি ছোট রচনায় তিনি বলেছিলেন, বিস্ময় দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। বিস্ময়ের কাছেই যাত্রা শেষ হয়। একই জায়গায় শুরু এবং শেষ বলে এই পথ অর্থহীন না।
একজন মানুষ শ্যাওলার ছোট আস্তরণ দেখে মুগ্ধ হতে পারে। একটি স্বচ্ছ স্ফটিক হাতে নিয়ে আলোয় ঘুরিয়ে দেখতে পারে। ফুলের গন্ধ নিতে পারে। সোনালি রঙের একটি গুবরে পোকা দেখে থমকে দাঁড়াতে পারে। মেঘভরা আকাশ, ঢেউয়ের দীর্ঘ নিঃশ্বাস, নদী, পাহাড়, প্রজাপতির ডানা, সবই তাকে কিছুক্ষণের জন্যে নিজের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।
প্রজাপতির ডানার দিকে খুব কাছে থেকে তাকালে মনে হয়, সেখানে কেউ অত্যন্ত সূক্ষ্ম অক্ষরে একটি গোপন চিঠি লিখেছে। রেখা আছে। বিন্দু আছে। রঙের ভেতর আরেক রঙ ঢুকে গেছে। কোথাও তামাটে, কোথাও নীল, কোথাও সোনালি। এক রঙ কোথায় শেষ হয়েছে এবং অন্য রঙ কোথা থেকে শুরু হয়েছে, বোঝা যায় না।
প্রজাপতি অবশ্যি এসব নিয়ে চিন্তিত না। সে উড়ে বেড়ায়।
চিন্তা করে মানুষ।
হেসে বলছেন, প্রকৃতির কোনো কিছুর সামনে মানুষ যখন নিজের দুয়ার খুলে দেয়, তখন কয়েক মুহূর্তের জন্যে সে লোভী পৃথিবী থেকে বেরিয়ে আসে। সেই পৃথিবীতে সবাই কিছু পেতে চায়। কিনতে চায়। দখল করতে চায়। আদেশ দিতে চায়। ব্যবহার করতে চায়। জয় করতে চায়।
বিস্ময়ের মুহূর্তে মানুষ কিছুই চায় না।
সে শুধু দেখে।
এই দেখার মধ্যে এক ধরনের মুক্তি আছে।
ধরা যাক, একজন মানুষ নদীর তীরে বসে আছে। নদীর জল ধীরে ধীরে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে, মানুষটি জানে না। জানার প্রয়োজনও বোধ করছে না। পানিতে বিকেলের আলো পড়েছে। একটি শুকনো পাতা ভেসে যাচ্ছে। মানুষটি পাতাটির দিকে তাকিয়ে আছে।
এই কয়েক মুহূর্তে সে অফিসের কর্মচারী না। কারও বাবা না। কারও স্বামী না। ঋণগ্রস্ত না। সফল না। ব্যর্থও না।
সে শুধু একটি প্রাণী, আরেকটি জীবন্ত পৃথিবীর সামনে চুপ করে বসে আছে।
হেসের মতে, এই সময় মানুষ বিচ্ছিন্নতার পৃথিবী থেকে বের হয়ে ঐক্যের পৃথিবীতে ঢোকে। তখন প্রজাপতি, পোকা, মেঘ, নদী, পাহাড়, মানুষ, সবকিছু আলাদা মনে হয় না। মনে হয়, সবাই একই রহস্যের অংশ।
এই অনুভূতি বেশিক্ষণ থাকে না।
মোবাইল ফোন বেজে ওঠে।
কেউ ডাকে।
মশা কামড়ায়।
মানুষ আবার নিজের জীবনে ফিরে আসে।
তারপরেও অল্প সময়ের ঐ অনুভূতি তাকে বদলে দেয়। অন্ধকার ঘরে জানালা এক মুহূর্তের জন্যে খুললে যতটুকু আলো আসে, ততটুকু আলোও কম না।
সমস্যা হলো, আমরা বিস্ময়ের ক্ষমতা নিয়ে জন্মালেও বড় হতে হতে সেই ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। আমাদের চারপাশের সমাজ, পরিবার এবং শিক্ষাব্যবস্থা খুব যত্ন করে এই কাজটি করে।
শিশু একটি প্রশ্ন করলে বড়রা প্রথমে উত্তর দেয়। দ্বিতীয় প্রশ্নে বিরক্ত হয়। তৃতীয় প্রশ্নে বলে, চুপ করো।
শিশু চুপ করে।
তারপর স্কুলে যায়।
সেখানে সে শেখে, সঠিক উত্তর একটি। বইয়ের শেষে সেই উত্তর লেখা আছে। পরীক্ষার খাতায় ঠিক উত্তরটি লিখতে হবে। একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে গাছের গন্ধ নেওয়ার জন্যে কোনো নম্বর নেই। পাতার ভেতর দিয়ে আলো পড়া দেখে আনন্দিত হলে তাকে মেধাবী বলা হবে না। পাতার শিরার নাম মুখস্থ করতে পারলে সে ভালো ছাত্র।
হেসে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জ্ঞানের সহজ পথ ধরে প্রজ্ঞার দিকে নিয়ে যায় না। তারা বিস্মিত হতে শেখায় না। তারা শেখায় গণনা করতে। মাপতে। ভাগ করতে। তালিকা বানাতে।
আনন্দের বদলে পরিমাপ।
মুগ্ধতার বদলে শুষ্কতা।
সমগ্রের বদলে বিচ্ছিন্ন অংশ।
একটি ফুলকে দেখা যেতে পারে। আবার ফুলটিকে পাপড়ি, বৃতি, পুংকেশর, গর্ভকেশর এইসব অংশে ভাগ করা যায়। অংশের নাম জানা দরকার। নাম জানা ভালো। কিন্তু নাম শিখতে শিখতে ফুলের গন্ধ ভুলে গেলে সমস্যা আছে।
হেসে বলেছিলেন, এগুলি প্রজ্ঞার বিদ্যালয় নয়। এগুলি জ্ঞানের বিদ্যালয়। তারা এমন একটি বিষয় আগে থেকেই ধরে নেয়, যা তারা নিজেরা শেখাতে পারে না।
সেই বিষয় হলো অনুভব করার ক্ষমতা।
কোনো কিছু দেখে ভিতরে নড়ে ওঠার ক্ষমতা।
গ্যেটের মতো বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা।
আমাদের শিক্ষা মানুষকে অনেক তথ্য দেয়। পৃথিবীর বয়স কত, সূর্যের ভর কত, মানবদেহে কতটি হাড়, সব শেখায়। তথ্য প্রয়োজনীয়। তথ্য ছাড়া সভ্যতা চলে না। সেতু বানানো যায় না। ওষুধ তৈরি করা যায় না। মহাকাশযান আকাশে তোলা যায় না।
তবে তথ্য দিয়ে একা জীবন চালানো যায় কি না, সেই প্রশ্ন থেকে যায়।
একজন মানুষ নক্ষত্রের রাসায়নিক গঠন জানে। কিন্তু গভীর রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে তার কিছুই মনে হয় না। আরেকজন রাসায়নিক গঠন জানে না। সে আকাশ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
এই দুই মানুষের মধ্যে কে বেশি জানে?
প্রশ্নটির সহজ উত্তর নেই।
নিটশে শিক্ষার মূল্য নিয়ে ভেবেছিলেন। তাঁর কাছে শিক্ষা মানুষকে নিজের সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যাবে। তাকে সাহসী করবে। স্বাধীনভাবে ভাবতে শেখাবে। নিজের ভেতরের শক্তিকে চিনতে সাহায্য করবে।
আজকের শিক্ষা অনেক সময় মানুষকে চাকরির জন্যে তৈরি করে। চাকরি পাওয়া জরুরি। চাকরি না থাকলে বিস্ময়ও বেশিদিন টেকে না। বাড়িওয়ালা বিস্মিত চোখ পছন্দ করেন না। তিনি মাসের শুরুতে ভাড়া চান।
তারপরেও শিক্ষা যদি শুধু জীবিকা দেয় এবং জীবন সম্পর্কে কোনো অনুভব না দেয়, তাহলে তার ভেতরে একটি ঘাটতি থেকে যায়।
স্নায়ুবিজ্ঞানী চার্লস স্কট শেরিংটন মানুষের বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতাকে এক ধরনের আধ্যাত্মিক দায়িত্ব হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর কাছে মানবমস্তিষ্ক নিজেই ছিল মহাবিশ্বের বিস্ময়কর সৃষ্টি। এই মস্তিষ্ক দিয়ে মানুষ মহাবিশ্বকে দেখে। আবার মহাবিশ্বের একটি অংশ হিসেবেই সে দেখে।
বিষয়টি খানিকটা আয়নার মতো।
মহাবিশ্ব মানুষ তৈরি করেছে। তারপর মানুষের চোখ দিয়ে নিজেকেই দেখছে।
এই চিন্তা মাথায় এলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকতে হয়।
হেসে বারবার নিজের ভেতরের কণ্ঠের কাছে ফিরে যাওয়ার কথা বলেছেন। মানুষ চারপাশের এত শব্দের মধ্যে বাস করে যে নিজের কণ্ঠ শুনতে পায় না। পরিবার বলে এক কথা। সমাজ বলে আরেক কথা। ধর্ম, রাষ্ট্র, বাজার, বিজ্ঞাপন, সবাই মানুষকে কিছু না কিছু বলছে।
এটা কিনুন।
এভাবে বাঁচুন।
ওরকম হোন।
এদের মতো পোশাক পরুন।
ওদের মতো সফল হোন।
মানুষ সারাজীবন অন্যদের কথা শুনতে শুনতে একদিন আবিষ্কার করে, নিজের কী বলার ছিল তা আর মনে নেই।
এই কারণে হেসের কাছে নিঃসঙ্গতা দরকার ছিল। নিঃসঙ্গতা মানে মানুষকে ঘৃণা করা না। কিছুক্ষণের জন্যে শব্দের বাইরে যাওয়া। নিজের ভেতরের ক্ষীণ কণ্ঠটি শোনা।
সেই কণ্ঠ প্রায়ই খুব সহজ কথা বলে।
ধীরে চলো।
এই কাজটি তোমার জন্যে না।
এই মানুষটিকে ভালোবাসো।
এই অন্যায়টি মেনে নিও না।
আজ বিকেলে কোথাও যেও না। জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখো।
আমরা এইসব কথা শুনি না। কারণ বাইরে থেকে বেশি জোরে শব্দ আসে।
হেসে একদিন একটি গাছের মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছিলেন। গাছ কথা বলে না। তারপরেও গাছের ভাষা আছে। তার শিকড় মাটির গভীরে। ডাল আকাশের দিকে। ঝড় এলে সে নড়ে। শীত এলে পাতা ফেলে দেয়। বসন্ত এলে আবার নতুন পাতা গজায়।
গাছ তাড়াহুড়া করে না।
পাশের গাছের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে না।
নিজেকে অন্য গাছ বানানোর চেষ্টা করে না।
একটি আমগাছ সারাজীবন আমগাছই থাকে। তার মনে কখনো দুঃখ হয় না যে সে দেবদারু হতে পারল না।
মানুষের এই দুঃখ আছে।
মানুষ প্রায়ই অন্য মানুষ হতে চায়।
হেসে সম্ভবত বলতেন, নিজের মতো হওয়ার সাহসও বিস্ময়েরই অংশ। মানুষ যখন নিজের ভেতরের জীবন্ত সত্তাটির দিকে বিস্মিত হয়ে তাকাতে পারে, তখন সে অন্যের নকশা অনুসারে জীবন কাটাতে চায় না।
পৃথিবীতে আমাদের সময় খুব বেশি না। প্রথমে সময়কে অনেক মনে হয়। শৈশবের একটি দুপুর শেষ হতে চায় না। তারপর বয়স বাড়ে। বছরগুলি দ্রুত চলে যেতে শুরু করে। মানুষ একদিন অবাক হয়ে দেখে, তার মাথার চুলে সাদা রং এসেছে। ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেছে। যেসব মানুষকে চিরকাল পাশে থাকার কথা ছিল, তাদের কেউ কেউ নেই।
তখন পৃথিবীকে নতুন করে দেখার ইচ্ছা হয়।
সমস্যা হলো, তখন চোখ ক্লান্ত।
এই কারণে বিস্ময়ের অভ্যাস ছোটবেলা থেকে রাখা ভালো। প্রতিদিন বিশাল কোনো অভিজ্ঞতা দরকার নেই। গ্যালাক্সি দেখতে টেলিস্কোপও দরকার নেই।
একটি পাতার নিচে বৃষ্টির ফোঁটা ঝুলছে।
একটি পাখি তার ঠোঁট দিয়ে পালক ঠিক করছে।
রাতে দূরের কোনো বাড়ির জানালায় একটি বাতি জ্বলছে।
শীতের সকালে চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে।
পুরোনো বই খুললে কাগজের গন্ধ আসছে।
এসবই যথেষ্ট।
মানুষ হয়তো পৃথিবীতে এসেছে অনেক কাজ করতে। ঘর বানাতে। সন্তান জন্ম দিতে। বই লিখতে। রোগ সারাতে। সেতু বানাতে। যুদ্ধ করতে। যুদ্ধ থামাতে। টাকা জমাতে। আবার সেই টাকা খরচ করতে।
এইসব কাজের ফাঁকে যদি সে কয়েকবার সত্যিকারভাবে বিস্মিত হতে পারে, তার জীবন একেবারে বৃথা যায় না।
মৃত্যুর আগে আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিস কী দেখলে, আমি হয়তো বড় কোনো ঘটনার কথা বলতে পারবো না।
আমি বলতে পারি, ছোটবেলায় এক বর্ষার রাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ব্যাঙের ডাক শুনেছিলাম।
আমি বলতে পারি, আমার ছেলে প্রথমবার আমার আঙুল ধরেছিল।
সে বলতে পারে, এক শীতের সকালে কুয়াশার ভেতর দিয়ে সূর্য উঠতে দেখেছিলাম।
সে বলতে পারি, একদিন একটি প্রজাপতি এসে অনেকক্ষণ আমার হাঁটুর ওপর বসে ছিল।
বিস্ময় খুব তোড়জোড় করে আসে না।
সে চুপ করে আসে।
এসে কিছুক্ষণ থাকে।
আমরা তাকালে তাকে দেখা যায়।



