জানালার ওইটুকু আকাশ
রিটন খানের ছোটগল্প
সেদিন বৃষ্টি নামার আগে বাতাস থেমে গিয়েছিল। বৃদ্ধনিবাসের দোতলার ঘরে তিনটে ফ্যান ঘুরছিল, কিন্তু বাতাস দিচ্ছিল না। ঘটরঘটর শব্দ করে গরমটাকে এক বিছানা থেকে আরেক বিছানায় ঠেলে দিচ্ছিল। মেঝেতে ফিনাইলের গন্ধ। তার নিচে প্রস্রাব, পুরোনো কাপড় আর সেদ্ধ ডালের গন্ধ চাপা পড়ে আছে। চাপা পড়ে আছে, মরেনি।
আমি জানালার পাশে চেয়ার পেতে বসলাম। মাসের দ্বিতীয় শনিবার। ব্যাগ থেকে বই বের করতেই মৃণালিনী দেবী বললেন, আজ কত পাতা?
আমি বললাম, পনেরো-ষোলো।
তিনি জিভ দিয়ে বিরক্তির শব্দ করলেন।
পনেরো পাতা পড়তে পড়তে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। তারপর চা ঠাণ্ডা।
চা তখনো আসেনি। তবু তাঁর ঠাণ্ডা চায়ের চিন্তা হচ্ছিল। বয়স বিরাশি। দাঁত আছে পাঁচটি। ওই পাঁচ দাঁত দিয়ে তিনি বিস্কুট চিবোন, কর্মচারীদের বেতন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং প্রতি মাসে অন্তত একবার সকলকে মনে করিয়ে দেন যে পরের রবিবার তাঁর ছোট ছেলে তাঁকে নিয়ে যাবে।
ছোট ছেলের নাম কেউ জানে না।
ঘরে এগারোজন বসেছিলেন। কেউ হুইলচেয়ারে, কেউ প্লাস্টিকের চেয়ারে, দুজন বিছানায়। তাঁদের অধিকাংশই জানালার দিকে মুখ করে ছিলেন। জানালার বাইরে পাশের হাসপাতালের টিনের ছাদ, তার ওপরে আকাশের চারকোনা এক টুকরো। সেই আকাশে সেদিন মেঘ জমেছিল। কালচে, ভারী। নিচে টিনের ওপর একটা কাক ঠোঁট হাঁ করে বসে ছিল।
আমি পড়া শুরু করলাম।
বইয়ের গল্পে একজন লোক পঁয়ত্রিশ বছর পর নিজের গ্রামে ফিরছে। নদীর ঘাট বদলে গেছে, রাস্তা বদলে গেছে, তার বাড়ির জায়গায় সার গুদাম। লোকটি একটি নিমগাছ দেখে বুঝতে পারে, এখানেই তাদের উঠান ছিল।
আমি পড়া থামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, একটা জায়গা নিজের বলে চেনা যায় কী দিয়ে?
কেউ উত্তর দিলেন না।
আবদুস সাত্তার সাহেবের বুকের ভেতর ঘড়ঘড় করছিল। তিনি একসময় ডাকঘরে চাকরি করতেন। এখন প্রতিটি শ্বাস নেবার আগে তাঁকে খানিকটা মুখ হাঁ করে থাকতে হয়। মনে হয় বাতাসের কাছ থেকে অনুমতি নিচ্ছেন। তাঁর পাশে কনক বালা নিজের ফোলা পায়ের ওপর হাত বোলাচ্ছিলেন। চামড়া টান খেয়ে চকচক করছে। নখের পাশে নীল রঙের ওষুধ শুকিয়ে আছে।
সবাই আকাশ দেখছিলেন।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, গাছ দিয়ে? গন্ধ দিয়ে? মানুষের মুখ দিয়ে?
মৃণালিনী দেবী বললেন, পাওনাদার দিয়ে।
ঘরে দু-একটা হাসির শব্দ উঠল। সাত্তার সাহেব হাসতে গিয়ে কাশলেন। কাশি তাঁর বুকের মধ্যে আটকে রইল। তিনি দুহাতে পাঁজর চেপে ধরে বললেন, নিজের জায়গায় ফিরলে পাওনাদার আগে চিনবে। ছেলে পরে।
এইটুকুই সেদিনের আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। সাধারণত এর পর আমি পড়ি, তাঁরা শোনেন কিংবা শোনেন না। কেউ ঘুমিয়ে পড়েন। কেউ জানালার আকাশ থেকে চোখ নামান না। আমি তবু আসি। ভাবি, এঁদের সঙ্গে কথা বললে মানুষ বুড়ো হওয়ার আগে বুড়ো হওয়ার খবর কিছুটা জানতে পারে।
ঘরের দরজায় তখন লতিফা বেওয়া দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁকে আগে দেখিনি। ছোটখাটো শরীর, ভেজা চুলের গোছা ঘাড়ে লেগে আছে। ডান হাতে একটা বাদামি খাম। বাঁ হাতে শাড়ির সামনের অংশ মুঠো করে ধরে আছেন।
তিনি ঘরে ঢুকে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনে কি বই পড়েন?
জি।
চিঠিও পড়েন?
পড়ি।
খামটা আমার দিকে বাড়িয়ে আবার টেনে নিলেন।
জোরে পড়বেন না। আমারে একলা পড়ে শোনাবেন।
তত্ত্বাবধায়ক রহিমা আপা পেছন থেকে এসে তাঁর কাঁধ ধরলেন। ধরার চেয়ে চাপ দিলেন বেশি।
ওটা চিঠি না, খালা। অফিসের কাগজ। চলেন, আপনার গোসল হয়নি।
হইছে।
হয়নি। গায়ে গন্ধ।
লতিফা নিজের বগলের কাছে নাক নিয়ে শুঁকলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, বুড়া মানুষের গায়ে গোলাপের গন্ধ হয় না মা।
মৃণালিনী দেবী হেসে উঠলেন। তাঁর পাঁচ দাঁতের মধ্যে তিনটি দেখা গেল।
রহিমা আপা এবার আমাকে বললেন, আপনি পড়েন। আগামী সপ্তাহে সমাজসেবা অফিসের লোক আসবে। এঁদের একটু প্রাণবন্ত রাখতে হবে।
প্রাণবন্ত কথাটা ঘরের মধ্যে কিছুক্ষণ ঝুলল। সাত্তার সাহেব তখনো শ্বাস নেবার অনুমতি পাচ্ছিলেন না। কনক বালার পায়ের একটা ফোসকা ফেটে স্বচ্ছ জল বেরোচ্ছিল। মেঝেতে একটি মাছি সেই জলের কাছে বসে সামনের পা ঘষতে লাগল।
লতিফা বেওয়া খামটা বুকে চেপে ধরলেন।
আমার পোলা দিছে। ঠিকানা লেখা আছে। ঈদের আগে নিতে আসব কইছে।
রহিমা আপা আমার দিকে একবার তাকালেন। সেই তাকানোর মধ্যে নির্দেশ ছিল। বৃদ্ধনিবাসে অনেক নিয়ম আছে। ওষুধের নিয়ম, দেখা করার নিয়ম, জানালা কতখানি খোলা যাবে তার নিয়ম। সত্যি কথা কখন বলা যাবে, তারও নিয়ম আছে।
বৃষ্টি শুরু হলো। প্রথমে মোটা তিন-চারটি ফোঁটা টিনে পড়ল। তারপর একসঙ্গে হাজার শব্দ। কাকটা উড়ে গেল। সবাই জানালার দিকে ঘাড় বাড়ালেন। বৃষ্টির ছাট ভেতরে আসছিল না, কিন্তু ঠাণ্ডা গন্ধটা আসছিল। শুকনো মাটি জল খেলে যে গন্ধ বেরোয়, এই দোতলায় মাটি না থাকলেও সেই গন্ধ এল।
লতিফা আমার সামনে বসে পড়লেন।
পড়েন।
খামটি তাঁর হাত থেকে নিলাম। ভেতরে চিঠি ছিল না। ছিল ভর্তি-সংক্রান্ত তিন পাতার ফরম। প্রথম পাতায় লতিফা বেওয়ার নাম, বয়স আনুমানিক পঁচাত্তর, রোগের তালিকা। উচ্চ রক্তচাপ, বাত, জরায়ু নেমে আসা, স্মৃতিবিভ্রমের প্রাথমিক লক্ষণ।
দ্বিতীয় পাতায় তাঁর ছেলে কামাল হোসেনের স্বাক্ষর। লেখা আছে, পারিবারিক ও আর্থিক কারণে তিনি মায়ের দায়িত্ব নিতে অপারগ। প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। মৃত্যু ঘটলে নির্দিষ্ট নম্বরে সংবাদ দিতে হবে। বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে কেউ মরদেহ গ্রহণ না করলে প্রতিষ্ঠান আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারবে।
শেষ লাইনে লেখা, আবাসিকের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে কোনো দাবি উত্থাপন করা যাবে না।
আমি প্রথম পাতার নাম, বয়স, ঠিকানা পড়লাম। রোগের জায়গাটি বাদ দিলাম। দ্বিতীয় পাতায় এসে থামলাম।
লতিফা বললেন, আমার পোলার নাম আছে?
আছে। কামাল হোসেন।
দেখছেন। আমি কইছিলাম না?
তিনি ঘরের সবার দিকে তাকালেন। কেউ তাঁর কথায় সন্দেহ করেছিল কি না জানি না, তবু তাঁর মুখে জিতে যাওয়ার ভাব ফুটল।
আর কী লিখছে?
আমি বললাম, আপনার দেখাশোনার দায়িত্ব এখন এই প্রতিষ্ঠানের।
ও আসব কবে?
কাগজে তারিখ নেই।
ঈদের কথা আছে?
না।
তিনি কিছুক্ষণ আমার হাতের কাগজের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অক্ষরগুলো বুঝতে পারছিলেন না, কিন্তু কোথায় কত কথা লেখা আছে তা দেখতে পাচ্ছিলেন।
সবটা পড়েন।
রহিমা আপা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাইরে থেকে কেউ তাঁকে ডাকল। তিনি চলে গেলেন। তাঁর স্যান্ডেলের শব্দ সিঁড়িতে নেমে গেল।
আমি বাকি অংশ পড়লাম।
অপারগ। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। মৃত্যু। মরদেহ। বাহাত্তর ঘণ্টা। আইনানুগ ব্যবস্থা। কোনো দাবি নেই।
বৃষ্টির শব্দের মধ্যেও প্রতিটি শব্দ শোনা গেল। আমি পড়া শেষ করে কাগজ ভাঁজ করতে গেলাম। লতিফা হাত বাড়িয়ে থামালেন।
আর কিছু নাই?
না।
আমার পোলা নিজের হাতে সই করছে?
জি।
সইটা দেখান। আমি আঙুল দিয়ে দেখালাম। তিনি কাগজের ওপর ঝুঁকে পড়লেন। কামাল হোসেন নামের নীল কালির আঁকাবাঁকা দাগের ওপর আঙুল রাখলেন। তাঁর নখের নিচে কালো ময়লা। আঙুল কাঁপছিল না।
ওর হাতের লেখা ভালো না। ছোটবেলায় মাস্টার কত মারছে।
তারপর তিনি কাগজটি ভাঁজ করে খামে ঢোকালেন।
রহিমা এইডা আমারে দিতে চায় না। কয় অফিসের কাগজ। অফিস কি আমার পোলার সই রাখব? আমি রাখব না?
মৃণালিনী দেবী বললেন, রাখেন। ছেলে না আসুক, সই তো আসছে।
আবার হাসি উঠল। এবার লতিফাও হাসলেন। হাসতে গিয়ে তাঁর পেটের নিচে চাপ পড়ল। মুখ কুঁচকে গেল। তিনি উরু দুটো শক্ত করে চেপে ধরলেন।
ও মা, কাপড়ে হয়ে গেল।
কথাটা এত স্বাভাবিক গলায় বললেন যে আমি প্রথমে বুঝিনি। তারপর চেয়ারের নিচে জল জমতে দেখলাম। বৃষ্টির জল নয়। লতিফা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন। পারলেন না। তাঁর মুখে লজ্জা ছিল না, ছিল বিরক্তি।
এই শরীরটা কোনো কথা শোনে না।
আমি দরজার দিকে তাকালাম। কাউকে দেখা গেল না। ডাকতে গিয়ে গলা আটকে গেল।
কনক বালা নিজের ফোলা পা মেঝেতে নামালেন। দাঁড়াতে তাঁর অনেক সময় লাগল। বিছানার লোহার রেল ধরে, চেয়ারের পিঠ ধরে তিনি লতিফার কাছে গেলেন।
আসেন। আমার কাপড় আছে।
আপনের কাপড় আমি পরব?
পরলে আমার জাত যাবে না। আপনারও বাঁচবে না।
কনক বালা তাঁকে ধরে নিয়ে গেলেন। লতিফার ভেজা শাড়ি পায়ের সঙ্গে জড়িয়ে মেঝেতে শপশপ শব্দ করছিল। যাওয়ার সময়ও তিনি খামটি আমার হাতে রেখে যাননি। বুকে চেপে রেখেছিলেন।
আমি বই বন্ধ করে বসে রইলাম।
সাত্তার সাহেব জানালার দিকে চেয়ে বললেন, গল্পের লোকটা নিমগাছ পাইছিল না?
পেয়েছিল।
তাইলে পড়েন। দেখি ঘর পায় কি না।
আমি আবার পড়তে শুরু করলাম। লোকটি নিমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে নিজের বাড়ি খুঁজছিল। সার গুদামের লোকেরা তাকে সরে যেতে বলছিল। আকাশের নিচে বৃষ্টি ঘন হচ্ছিল। এ ঘরে আমার কণ্ঠের সঙ্গে টিনের শব্দ মিশে গেল। কেউ আর আলোচনা করলেন না।
পরের মাসের প্রথম শনিবার গিয়ে দেখি লতিফার চেয়ার খালি। তার ওপর বাদামি খামটা রাখা।
আমি রহিমা আপাকে জিজ্ঞেস করলাম, লতিফা বেওয়া কোথায়?
ছেলে নিয়ে গেছে।
কখন?
গত মঙ্গলবার।
মৃণালিনী দেবী জানালা থেকে মুখ না ফিরিয়ে বললেন, মরা মানুষ নিতে ছেলে আসে নাকি?
রহিমা আপার ঠোঁট সরু হয়ে গেল।
আপনারা সব বিষয়ে কথা বলেন কেন? গাড়ি এসেছিল। নিয়মমতো সব হয়েছে।
কোন গাড়ি?
তিনি উত্তর দিলেন না। খামটি তুলে আলমারির দিকে যাচ্ছিলেন। সাত্তার সাহেব হাত বাড়িয়ে বললেন, ওইটা এখানে থাক।
অফিসের কাগজ।
ওর ছেলের হাতের লেখা।
রহিমা আপা খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে খামটি চেয়ারের ওপর ফেলে দিলেন। চলে যাওয়ার সময় বললেন, আজকে সবাইকে পরিষ্কার জামা পরাবেন। পরিদর্শক আসতে পারেন।
আমি বই বের করলাম। গতবারের গল্পের শেষে লোকটি তার বাড়ি পেয়েছিল কি না, মনে করতে পারছিলাম না। পাতা উল্টে জায়গাটা খুঁজছিলাম।
মৃণালিনী দেবী বললেন, আজ বই থাক।
তাহলে কী পড়ব?
ওই কাগজ পড়েন।
আমি লতিফার খাম খুললাম। সবাই জানালার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বাইরের আকাশ ধোয়া নীল। হাসপাতালের টিনের ছাদে সেই কাকটি বসে আছে কি না বোঝা গেল না। রোদে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল।
আমি প্রথম লাইন থেকে পড়লাম।
নাম, লতিফা বেওয়া।
বয়স, আনুমানিক পঁচাত্তর।
পিতা, মৃত মনসুর আলী।
স্বামী, মৃত আজিজুল মণ্ডল।
পুত্র, কামাল হোসেন।
কামাল হোসেনের নাম পড়তেই জানালার দিক থেকে মৃণালিনী দেবীর গলা এল।
ওই নামটা আরেকবার পড়েন।


