পকেটের ভেতর এক টুকরো মৃত্যু
শেক্সপিয়র নাকি বলেছিলেন, মানুষের প্রতি তৃতীয় চিন্তাটি হওয়া উচিত নিজের কবর সম্বন্ধে।
কথাটা প্রথম শুনে আমি একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। প্রতি তৃতীয় চিন্তা! সর্বনাশ! আমার মাথায় সারাদিন কত রকম চিন্তা আসে। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম চিন্তা, কফি কোথায়। দ্বিতীয় চিন্তা, মোবাইলটা কে চার্জে দেয়নি। তৃতীয় চিন্তায় যদি কবর এসে হাজির হয়, তাহলে কফিটা আর শান্তিতে খাওয়া যাবে?
ধরুন, আমি বাজারে গেছি।
প্রথম চিন্তা, টমেটোর দাম এত কেন?
দ্বিতীয় চিন্তা, বাড়িতে পেঁয়াজ আছে তো?
তৃতীয় চিন্তা, একদিন এই শরীর মাটির নিচে পড়ে থাকবে।
এই অবস্থায় বাজার করা মুশকিল। মাছওয়ালা বলবে, “ভাই, রুইটা নেবেন?”
আমি মাছের চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবব, এই রুই আর আমি, গন্তব্যে বিশেষ তফাত নেই। শুধু রুইটা একটু আগে পৌঁছে গেছে।
শেক্সপিয়র মহাশয় বড় কবি ছিলেন, সন্দেহ নেই। রাজা, রানি, প্রেম, হত্যা, ভূত, বিশ্বাসঘাতকতা, পাগলামি, বিষ, ছুরি, যুদ্ধ, সবকিছু নিয়ে তাঁর কারবার। তাঁর নাটকে দুজন লোক কথা বলতে শুরু করলে দর্শক নিশ্চিন্তে বসতে পারে না। কে কখন কাকে মেরে ফেলবে, বলা যায় না। সেই মানুষ প্রতি তৃতীয় চিন্তায় কবরের কথা বলবেন, সেটাই স্বাভাবিক। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে দিনে একবারই যথেষ্ট।
আমি সেই ব্যবস্থাই করেছি।
আমার পকেটে একটি মুদ্রা থাকে। খুব দামি মুদ্রা নয়। প্রাচীন রোমের সম্রাটের মুখখচিত কোনো দুর্লভ স্বর্ণমুদ্রাও নয় যে নিলামে তুললে সংসারের ভাগ্য ফিরবে। সাধারণ একটি কয়েন। মানুষ যেমন সাধারণ, মৃত্যুও তেমন সাধারণ। তবে আমরা দুইটাকেই অসাধারণ ভাব করে লুকিয়ে রাখি।
দিনে অন্তত একবার আমি পকেটে হাত দিয়ে মুদ্রাটি ছুঁই।
কখনো লিফটে দাঁড়িয়ে।
কখনো ট্রাফিক লাইটে।
কখনো কোনো অর্থহীন তর্কের মাঝখানে।
কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও এমন মন্তব্য পড়ে, যার উত্তর দিলে আমার আত্মসম্মান বাঁচবে বলে মনে হচ্ছে, অথচ উত্তর দেওয়ার পাঁচ মিনিট পরেই বুঝব আত্মসম্মানের সঙ্গে ওই মন্তব্যের কোনো পরিচয়ই ছিল না।
তখন পকেটে হাত দিই। মুদ্রাটা আঙুলে ঠেকে।
সে কিছু বলে না। মুদ্রাদের এই একটি ভালো গুণ, তারা বক্তৃতা দেয় না। মানুষ হলে এতক্ষণে বলত, “আমি তো আগেই বলেছিলাম।” কয়েন শুধু চুপ করে মনে করিয়ে দেয়, তোমার সময় সীমিত। এই সীমিত সময়ের কতটুকু তুমি একজন অপরিচিত লোকের ভুল বানান শোধরাতে ব্যয় করবে, সেটা তোমার ব্যাপার।
এই ছোট্ট ধাতব টুকরোটি আমার ব্যক্তিগত ঘণ্টা। মন্দিরের ঘণ্টা নয়, স্কুলের ঘণ্টাও নয়। স্কুলের ঘণ্টা বাজলে ছুটি হতো, এই ঘণ্টা ছুটির আগে পড়া শেষ করতে বলে।
আমাদের ছোটবেলায় বাড়ির বড়রা মৃত্যু নিয়ে বেশ সহজভাবে কথা বলতেন। এখনকার মতো কথাটা তুললেই সবাই মুখ গম্ভীর করে বলতেন না, “আহা, এসব অশুভ কথা বলো না।”
আমার এক আত্মীয়া ছিলেন, তিনি প্রায়ই বলতেন, “আমি মরলে আমার ওই লাল শাড়িটা পরিয়ে দিস।”
বাড়ির কেউ বলত, “ও শাড়িটা তো এখনই পরেন।”
তিনি বলতেন, “এখন পরলে পুরোনো হয়ে যাবে। মরার সময় আমাকে কি পুরোনো শাড়ি পরাবি?”
মৃত্যুর মধ্যেও তাঁর সামাজিক মর্যাদার চিন্তা ছিল। জীবনে পাড়ার বিয়েবাড়িতে সবাইকে টেক্কা দিয়ে সাজতেন, মৃত্যুর দিনেও প্রতিযোগিতা ছাড়বেন না। মানুষ চরিত্র নিয়ে জন্মায়, চরিত্র নিয়েই মরে। মাঝখানে আমরা শুধু জামাকাপড় বদলাই।
আমাদের সমাজে মৃত্যুর সঙ্গে এক অদ্ভুত সম্পর্ক। আমরা মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে ভয় পাই, অথচ অন্যের মৃত্যু নিয়ে বিশদ আলোচনা করি। কে কখন মারা গেলেন, কী অসুখ হয়েছিল, শেষ মুহূর্তে কে পাশে ছিলেন, সম্পত্তি কে পেল, জানাজায় কত লোক হলো, শ্রাদ্ধে মাছের টুকরো কেমন ছিল, সব খবর আমাদের চাই।
নিজের মৃত্যুর কথা উঠলেই বলি, “ওসব এখন থাক।”
মৃত্যুও বোধহয় দূরে দাঁড়িয়ে হাসে। ভাবে, তোমার অনুমতি নিয়েই বুঝি আসতে হবে!
আমাদের ধারণা, মৃত্যুকে মনে রাখলে জীবন বিষণ্ন হয়ে যাবে। আমার অভিজ্ঞতা উল্টো। মৃত্যুকে ভুলে থাকলেই জীবনের অনেকটা তুচ্ছ বিষয়ে নষ্ট হয়। তখন মনে হয় সব তর্ক জিততে হবে, সব অপমানের উত্তর দিতে হবে, সব মানুষকে খুশি রাখতে হবে, সব আমন্ত্রণে যেতে হবে, সব খবর জানতে হবে, সব জিনিস কিনতে হবে।
মৃত্যুর কথা একবার মনে পড়লে হিসাবটা বদলে যায়।
যে লোকটি আমাকে অপছন্দ করে, সে আমাকে অপছন্দ করেই পৃথিবী ছেড়ে যাবে। তার আগে আমি কেন তাকে আমাকে পছন্দ করানোর জন্য কোমর বেঁধে নামব?
যে সম্পর্ক বহুদিন আগে প্রাণ হারিয়েছে, তাকে শুধু পুরোনো দিনের ভদ্রতায় কাঁধে করে বহন করার কী দরকার?
যে কাজটি বছরের পর বছর করতে চাইছি, সেটি শুরু করার জন্য আর কোন শুভ গ্রহের অপেক্ষা করছি?
যে মানুষটিকে ভালোবাসি, তাকে কথাটা বলার জন্য এত কৃপণতা কেন?
যে বইটি পড়তে চাই, সেটি তাকেই সুন্দর দেখায় বলে না খুলে রেখে দিয়েছি কেন?
আমরা বই কিনে ভাবি, অবসর হলে পড়ব। বন্ধুকে বলি, একদিন বসব। সন্তানকে বলি, পরে খেলব। নিজের শরীরকে বলি, আগামী মাস থেকে যত্ন নেব। নিজের স্বপ্নকে বলি, পরিস্থিতি একটু ভালো হোক।
এই “একদিন”, “পরে”, “আগামী মাস”, “পরিস্থিতি ভালো হলে” নামের কথাগুলো সময়ের বিরাট দালাল। এরা আমাদের বর্তমানটুকু নিয়ে যায়, বদলে ভবিষ্যতের একটি জাল দলিল ধরিয়ে দেয়।
মৃত্যু সেই দলিল দেখে বলে, “সইটা তো আমার।”
এই জন্যই পকেটের মুদ্রাটি আমার কাছে ভয়ের বস্তু নয়। এটি আমাকে তাড়া করে না। বরং আমাকে থামায়।
রাগের সময় বলে, একটু থামো।
লোভের সময় বলে, কতটুকু লাগবে?
অহংকারের সময় বলে, নামটা পাথরে লিখলেও পাথর একদিন ক্ষয়ে যাবে।
দুঃখের সময় বলে, এটাও চিরকাল থাকবে না।
আনন্দের সময় বলে, মন দিয়ে উপভোগ করো। ছবি তুলতে তুলতে মুহূর্তটা হারিয়ে ফেলো না।
আমরা মৃত্যুকে জীবনের বিপরীত ভাবতে অভ্যস্ত। অথচ মৃত্যুর উপস্থিতিই জীবনকে আকার দেয়। নদীর দুই পাড় না থাকলে জল ছড়িয়ে জলাভূমি হয়ে যেত। সময়েরও একটি পাড় আছে। সেই পাড়ের নাম মৃত্যু। তাই সময় নদী হয়ে সামনে এগোয়।
অমরত্বের কথা গল্পে ভালো লাগে। বাস্তবে মানুষ অমর হলে কী করত, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। যে মানুষ আশি বছরের জীবনেও একটি চিঠির উত্তর দিতে তিন সপ্তাহ নেয়, তাকে অনন্তকাল দিলে সে বলবে, “আগামী শতাব্দীতে উত্তর দেব।”
অমর মানুষ বই পড়া পিছিয়ে দিত পাঁচশো বছর। ক্ষমা চাইত হাজার বছর পরে। প্রেম নিবেদন করার আগে বলত, “আরও একটু নিশ্চিত হই।” বাড়ির অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য একটি আলাদা ভূতাত্ত্বিক যুগ বরাদ্দ করত।
সময় সীমিত বলেই আজকের বিকেলটির দাম আছে। শেষ আছে বলেই গল্পের অর্থ আছে। নাটক যদি কোনোদিন শেষ না হয়, দর্শক প্রথমে বিরক্ত হবে, পরে ক্ষুধার্ত হবে, শেষে অভিনেতাদের ওপর চেয়ার ছুড়বে।
জীবনেরও পর্দা নামবে। এই খবরটি দুঃসংবাদ হতে পারে, তবে এটি একটি নির্দেশনাও।
তুমি মঞ্চে আছ।
সংলাপ ভুলে বসে থেকো না।
যার হাত ধরার, ধরো।
যাকে ধন্যবাদ দেওয়ার, দাও।
যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা দরকার, করো।
যে হাসিটা আটকে রেখেছ, হাসো।
নিজের ভূমিকাটুকু অন্যের করতালির ওপর ছেড়ে দিয়ো না।
মৃত্যুকে মনে রাখার জন্য প্রায় মরতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। পাহাড় থেকে গাড়ি পড়ে যাওয়া, হাসপাতালের আইসিইউতে শুয়ে থাকা, বিমানে প্রবল ঝাঁকুনি খাওয়া, এসবের পরে মানুষ হঠাৎ জীবনের মূল্য বুঝতে পারে। কিন্তু জীবন যে মূল্যবান, সেটা বোঝার জন্য জীবনকে আগে ভয় দেখাতে হবে কেন?
আমরা আগুনে হাত না দিয়েও জানি আগুন পোড়ায়। ক্যালেন্ডারের শেষ পৃষ্ঠা দেখে বছর শেষ হবে বুঝি। সূর্য ডোবার আগে আকাশের রং বদলায়। শরীরও প্রতিদিন ছোট ছোট সংবাদ পাঠায়। চুলে রুপালি অক্ষর বসায়, চোখে চশমা ধরায়, হাঁটুতে শব্দ করে, পরিচিত মুখের পাশে জন্ম-মৃত্যুর তারিখ যোগ করে।
তবু আমরা ভাব করি, অনুষ্ঠানটি বুঝি অনির্দিষ্টকাল চলবে।
চলবে না।
এ কথা শুনে মন খারাপ করার আগে একটু চারদিকে তাকানো দরকার। আজও আলো আছে। কফির গন্ধ আছে। প্রিয় মানুষের কণ্ঠ আছে। অসমাপ্ত বই আছে। ফোন করার মতো বন্ধু আছে। ভুল শোধরানোর সময় আছে। নিজের ভেতর একটু সাহস জড়ো করার সুযোগ আছে।
মৃত্যুচিন্তা আমাকে জীবন থেকে দূরে সরায় না। বরং জীবনের গায়ে হাত রাখতে শেখায়। যেমন বহুদিন পর পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে আমরা তার হাত একটু বেশি সময় ধরে রাখি। জানি, আবার কবে দেখা হবে তার নিশ্চয়তা নেই।
দিনে একবার পকেটে হাত দিয়ে আমি সেই মুদ্রাটি ছুঁই।
মনে মনে বলি, সময় কম।
তারপর সাধারণত খুব মহৎ কোনো কাজ করি না। কখনো কফি খাই। কখনো বই খুলে বসি। কখনো ছেলেকে ডাকি। কখনো কাউকে উত্তর না দিয়ে ফোনটা উল্টে রাখি। কখনো স্ত্রীর সঙ্গে পুরোনো গল্প করি। কখনো শুধু জানালার বাইরে তাকাই।
জীবনের উদ্দেশ্য সবসময় ইতিহাস সৃষ্টি করা নয়। মাঝে মাঝে উদ্দেশ্য হলো উপস্থিত থাকা। নিজের জীবনের সময় নিজের জীবনে থাকা।
একদিন মুদ্রাটি আমার পকেটেই থেকে যাবে, আমি আর সেটি ছুঁতে পারব না। তখন হয়তো কেউ জামাকাপড় গুছাতে গিয়ে কয়েনটি খুঁজে পাবে।
বলবে, “এই পুরোনো মুদ্রাটা পকেটে রেখেছিল কেন?”
আমি তখন উত্তর দিতে পারব না।
এটাই মৃত্যুর শেষ রসিকতা। সারা জীবন মানুষ কত কথা বলে, শেষ প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার সময় তার মুখ বন্ধ।



