মা দিবসে যে লেখাটি লিখতে চেয়েছিলাম কিন্তু কাঁদতে কাঁদতে আর লেখা হয়
আমার বন্ধু তালিকার সকল মায়েদের জন্য উৎসর্গ করলাম।
মায়ের সম্পর্কে মানুষের সবচেয়ে কঠিন উপলব্ধিগুলোর একটা সম্ভবত এই, মা আসলে দেবী নন। তিনি এমন কোনো সুপারহিরো নন যিনি নিখুঁত ধৈর্য, সীমাহীন ত্যাগ আর অলৌকিক বোঝাপড়ার ভাণ্ডার নিয়ে পৃথিবীতে আসেন। বরং তিনি একজন মানুষ। ভয় ছিল, অপূর্ণতা ছিল, ঈর্ষা ছিল, ক্লান্তি ছিল, নিজের না-পাওয়া জীবন নিয়ে আড়াল করা ক্ষোভ ছিল, ছিল সময়ের সামাজিক শাসন, পারিবারিক চাপ, দাম্পত্যের নিঃশব্দ অবমাননা, অর্থকষ্ট, অসমাপ্ত স্বপ্ন, আর ছিল সেই যুগের শিক্ষা, যেখানে নারীদের শেখানো হতো কীভাবে নিজেদের ইচ্ছাকে ধীরে ধীরে গিলে ফেলতে হয়। তারপরও সেই মানুষটাই আমাদের ভালোবেসেছেন, যতটুকু তিনি জানতেন, যতটুকু তিনি পেরেছেন, যেসব ভাঙা যন্ত্রপাতি হাতে পেয়েছিলেন জীবন থেকে, সেগুলো দিয়েই।
এই সত্য মেনে নিতে আমার প্রায় অর্ধেক জীবন কেটে যায়। কারণ শিশুকালে আমরা মাকে দেখি এক ধরনের মহাজাগতিক কেন্দ্র হিসেবে। পৃথিবী তখন তাঁর শরীরের গন্ধ, তাঁর হাঁটার শব্দ, তাঁর রাগের ভঙ্গি, রান্নাঘরের ভাপ ওঠা হাঁড়ি, অসুখের রাতে মাথায় রাখা ঠান্ডা কাপড়, স্কুলে যাওয়ার আগে জামার বোতাম লাগিয়ে দেওয়া আঙুল, আর গভীর রাতে বাবা-মায়ের ঝগড়ার পর তাঁর চুপচাপ বসে থাকা মুখের মধ্যে সীমাবদ্ধ। শিশুর কাছে মা মানে শুধু একজন ব্যক্তি নয়, বরং নিরাপত্তার পুরো অবকাঠামো। তাই বড় হয়ে যখন দেখা যায় সেই মানুষটিও ভুল করেছেন, অন্যায় করেছেন, কখনো আমাদের ক্ষত তৈরি করেছেন, কখনো নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন, কখনো ভালোবাসার নামে শ্বাসরোধ করেছেন, তখন মানুষের ভিতরে একধরনের নৈতিক ভূমিকম্প শুরু হয়।
অনেকেই এই জায়গায় এসে আটকে যায়। কেউ সারাজীবন মাকে দোষ দেয়। কেউ আবার উল্টো দিকে গিয়ে মাকে সম্পূর্ণ পবিত্র বানিয়ে ফেলে, যেন তাঁর কোনো অন্ধকার ছিল না। অথচ পরিণত হওয়ার কাজটা সম্ভবত এর মাঝখানে। সেখানে মানুষ বুঝতে শেখে, ভালোবাসা আর ক্ষত একে অপরকে বাতিল করে না। একজন মানুষ আপনাকে গভীরভাবে ভালোবেসেও আপনাকে আঘাত করতে পারেন। কারণ তিনি নিজেও অসম্পূর্ণ। তিনি নিজেও একসময় কারও সন্তান ছিলেন। তাঁর ভিতরেও ভয় ছিল।
ফ্লোরিডা স্কট-ম্যাক্সওয়েল যখন লিখছেন, মা তার সন্তানকে ছেড়ে দিতে পারেন না, কারণ তাঁর ভিতরে এক ধরনের বেদনাদায়ক আইন কাজ করে, তখন কথাটা শুধু আবেগের নয়, অস্তিত্বেরও। সন্তান মায়ের শরীরের ভিতর দিয়ে পৃথিবীতে আসে। সেই শরীরের স্মৃতি সহজে শেষ হয় না। তাই অনেক মা সন্তানকে আঁকড়ে ধরেন, নিয়ন্ত্রণ করেন, অতিরিক্ত চিন্তা করেন, সন্তানের স্বাধীনতায় আতঙ্কিত হন। বাইরে থেকে তা কখনো দমবন্ধ করা মনে হয়, কিন্তু তার ভিতরে প্রায়ই কাজ করে হারানোর ভয়। ঠিক যেমন আতঙ্কিত বিড়াল নিজের বাচ্চাকে মুখে করে লুকিয়ে নিয়ে যায়, কখনো ভুল করে কামড়েও ফেলে। ভালোবাসা আর ভয়ের এই মিশ্রণটাই মানবিক সম্পর্কের সবচেয়ে জটিল রসায়নগুলোর একটি।
এ কারণেই ঘনিষ্ঠতা আর স্বাধীনতার ভারসাম্য এত কঠিন। মানুষ চায় তাকে ভালোবাসা হোক, কিন্তু সে একইসঙ্গে মুক্তও থাকতে চায়। মা সন্তানের কাছে থাকতে চান, আবার জানেন একদিন তাকে ছেড়ে দিতেও হবে। এই টানাপোড়েন শুধু মা-সন্তানের সম্পর্কেই নয়, প্রেমেও ফিরে আসে। খলিল জিবরান লিখেছিলেন, ভালোবাসো, কিন্তু পরস্পরের মধ্যে ফাঁকও রাখো। কারণ খুব বেশি আঁকড়ে ধরা সম্পর্ককে হত্যা করে। অথচ মানুষ প্রায়ই ভালোবাসাকে মালিকানা ভেবে বসে। বিশেষ করে পিতামাতারা। তারা ভাবে সন্তান তাদের জীবনের সম্প্রসারণ।
তাই মায়েরা বৃদ্ধ বয়সেও সন্তানদের “উন্নতির লক্ষণ” খোঁজেন। পঞ্চাশ বছরের ছেলের মধ্যেও তাঁরা সেই স্কুলপড়ুয়া ছেলেটিকে দেখতে চান যে একদিন হয়তো “মানুষ হবে”। এই “মানুষ হওয়া” ধারণাটার মধ্যেও ভয়ঙ্কর সামাজিক ও মানসিক চাপ আছে। সন্তান যেন শুধু সন্তান নয়, মায়ের জীবনের সার্থকতার প্রমাণ। তাঁর সমস্ত ত্যাগ বৃথা যায়নি, তা দেখার আকাঙ্ক্ষা। ফলে সন্তান ব্যর্থ হলে মা কষ্ট পান শুধু সন্তানের জন্য নয়, নিজের জীবনকেও ব্যর্থ মনে হয় তাঁর।
আর এখানেই আসে সেই অদ্ভুত ব্যাপারটি, যেটা স্কট-ম্যাক্সওয়েল বলছিলেন, মায়েরা অবাক হন যে তাঁদের সন্তানরাও শেষ পর্যন্ত “স্রেফ মানুষ”। যেন ভিতরে ভিতরে তাঁরা আশা করেছিলেন এই শিশুটি পৃথিবী বদলাবে, এমন কিছু হবে যা তাঁদের নিজের অপূর্ণ জীবনকে উদ্ধার করবে। প্রায় সব মা-বাবার ভিতরেই এই গোপন মেসিয়ানিক কল্পনা কাজ করে। সন্তানের রিপোর্ট কার্ড, ক্যারিয়ার, বিয়ে, সামাজিক সাফল্য, সবকিছুর ভিতরে তারা নিজেদের অসমাপ্ত আত্মজীবনী খুঁজতে থাকে।
কিন্তু জীবন খুব কম মানুষকেই মুক্তিদাতা বানায়। বেশিরভাগ মানুষ অফিস করে, বাজার করে, বিল দেয়, সম্পর্ক বাঁচানোর চেষ্টা করে, রাতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তবু হয়তো মায়েরা পুরোপুরি ভুলও নন। কারণ শিশুর ভিতরে যে দীপ্তি তাঁরা একদিন দেখেছিলেন, সেটা পুরোপুরি মরে যায় না। সমাজ, কাজ, হতাশা, ব্যর্থতা, দায়িত্বের নিচে চাপা পড়ে থাকলেও কোথাও একটা শিশুসত্তা বেঁচে থাকে। মরিস সেন্ডাক সম্ভবত সেটাই বলতে চেয়েছিলেন, মানুষের সবচেয়ে বড় কাজ নিজের শিশুসত্তাকে জীবিত রাখা।
ডোনাল্ড উইনিকট “good enough mother” ধারণা দিয়ে আধুনিক মনোবিজ্ঞানে একটা মৌলিক পরিবর্তন এনেছিলেন। তিনি বলেননি আদর্শ মা হতে হবে। বরং তিনি বলেছিলেন, যথেষ্ট ভালো মা হওয়াই যথেষ্ট। কারণ শিশুকে বাঁচতে শেখাতে গেলে তাকে কিছু হতাশাও দিতে হয়। সব চাওয়া সঙ্গে সঙ্গে পূরণ হলে মানুষ বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে শেখে না। অর্থাৎ মায়ের অপূর্ণতাও সন্তানের গঠনের অংশ। এই ধারণা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি মাতৃত্বকে দেবীত্ব থেকে নামিয়ে মানবিকতার মধ্যে ফিরিয়ে আনে।
আর এই জায়গায় এসে হয়তো ক্ষমার দরজা একটু খোলে। ক্ষমা মানে ভুলে যাওয়া নয়। ক্ষমা মানে এই নয় যে যা ঘটেছে তা ঠিক ছিল। বরং ক্ষমা কখনো কখনো কেবল এই বোঝাপড়া যে, মানুষটি সর্বশক্তিমান ছিলেন না। তিনি তাঁর সময়, তাঁর ক্ষত, তাঁর ভয়, তাঁর সীমাবদ্ধতা নিয়েই আপনাকে ভালোবেসেছেন।
বয়স বাড়লে এই উপলব্ধি আরও গভীর হয়। বিশেষ করে যখন মানুষ নিজেই ভালোবাসার দায়িত্ব নিতে শুরু করে। তখন বোঝা যায় কাউকে ভালোবাসা মানে সবসময় সঠিক হওয়া নয়। কখনো কখনো ভালোবাসা মানে ভুল করা, অতিরিক্ত ভয় পাওয়া, নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া, আবার রাতে লুকিয়ে কাঁদা।
আর একদিন যখন মা বুড়ো হয়ে যান, হাঁটার সময় ধীরে ধীরে দেয়াল ধরেন, একই গল্প বারবার বলেন, ফোনে জিজ্ঞেস করেন খেয়েছ কিনা, তখন মানুষ হঠাৎ বুঝতে শুরু করে, এই নারীটি কোনোদিনই সর্বশক্তিমান ছিলেন না। তিনি শুধু চেষ্টা করছিলেন।
সম্ভবত পরিণত ভালোবাসা শুরু হয় এই জায়গা থেকে। যখন মানুষ মাকে বিচারকের আসন থেকে নামিয়ে মানুষের আসনে বসাতে পারে। যখন সে বুঝতে শেখে, মা তাকে নিখুঁত জীবন দিতে পারেননি, কিন্তু নিজের অসম্পূর্ণ জীবন দিয়েই তাকে পৃথিবীতে ধরে রেখেছিলেন।
রিটন খান।



