মেসি বনাম রোনালদো: ফিফা পক্ষপাত ও শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্ক
ফুটবল এখন মাঠে যতটা খেলা হয়, তার চেয়ে বেশি হয় মোবাইলের স্ক্রিনে, কমেন্ট বক্সে, রাত দুইটার লাইভে, কফির কাপের পাশে আধখাওয়া বিস্কুট রেখে, অফিসের লাঞ্চ টেবিলে, বন্ধুর ইনবক্সে, আর সেইসব তর্কের ভেতরে একজন মানুষ যখন মেসি বা আর্জেন্টিনার নাম শুনলেই চোখ টিপে বলে, বুঝলা না ভাই, সব সেট করা, ফিফা আছে না, ইনফান্তিনো আছে না, আর্জেন্টিনাকে সামনে ঠেলে দেওয়ার ব্যবস্থা ওরাই করে, তখন কথাটা শুনে বিরক্ত লাগে। কারন বাস্তবের হিসাবটা তত সহজে মেলে না। শুধু মুখে বললেই হলো? ফিফা মেসিকে সাহায্য করছে, আর্জেন্টিনাকে সহজ রাস্তা বানিয়ে দিচ্ছে, এই ধারণা তথ্যের সঙ্গে দাঁড়ায় না, বরং দাঁড়াতে গেলেই হাঁটু কাঁপে।
অনেকে ভাবে, টুর্নামেন্টের ড্র যেন কোনো অদৃশ্য টেবিলে বসে সাজানো হয়, কোথায় আর্জেন্টিনা থাকবে, কোথায় মেসি থাকবে, কোন রাউন্ডে কাকে এড়িয়ে যাবে, কোন রাস্তায় কম কাঁটা থাকবে, সব যেন আগে থেকে হিসাব করা; কিন্তু টুর্নামেন্টের কাঠামো আসলে বানানো হয় বড় দলগুলোর সম্ভাব্য সংঘর্ষ একটু দেরিতে ঘটানোর জন্য, যাতে স্পেন, উরুগুয়ে, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, এইসব নাম একেবারে শুরুতেই একে অন্যকে খেয়ে না ফেলে। বড় দললের জন্য টিভির দর্শক, বিজ্ঞাপনের টাকা, স্টেডিয়ামের টিকিট, শহরের হোটেল, এয়ারপোর্টের ভিড়, রাতভর খোলা রেস্টুরেন্ট, ফিফার নিজের বাজারও সেখানে গাঁথা থাকে। তাই ড্র এমনভাবে করা হয় যাতে জনপ্রিয় দলগুলো শেষের দিকে এসে ধাক্কা খায়। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও হিসাব ছিল শক্ত প্রতিপক্ষের সঙ্গে দেখা হওয়ার। স্পেনের মতো দল, উরুগুয়ের মতো দল, যাদের নাম শুনলেই মাঠের ভেতর আলাদা একটা চাপ নেমে আসে, তাদের সঙ্গে আর্জেন্টিনার দেখা হওয়ার পথ খোলা ছিল। কিন্তু পথ খোলা থাকলেই তো কেউ হাঁটতে পারে না; পথ ধরে আসতে হয় নিজের পায়ে, নিজের গোল করে, নিজের ডিফেন্স সামলে, নিজের ভুলের শাস্তি খেয়ে, নিজের রাতের ঘুম হারিয়ে।
সেইখানেই মূল কথা। অন্য বড় দলগুলো নিজেদের কাজ ঠিকমতো করতে পারেনি। কেউ গ্রুপে হোঁচট খেয়েছে, কেউ নকআউটে গিয়ে কেঁপে গেছে, কেউ নামের ওজন নিয়ে মাঠে নেমে বলের ওজন সামলাতে পারেনি, কেউ পাস দিয়েছে কিন্তু গোল পায়নি, কেউ গোল খেয়ে দাঁত চেপে তাকিয়ে থেকেছে, কেউ শেষ বাঁশির পর মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে, আর তখন আর্জেন্টিনা নিজের ম্যাচগুলো জিতেছে। এই জেতাটাকে ফিফার দয়া বললে মাঠের ঘামকে অস্বীকার করা হয়। আর্জেন্টিনা যে সহজ প্রতিপক্ষ পেয়েছে বলে মনে হয়েছে, তার পেছনে ফিফার কোনো রাতের আঁধারের স্ক্রিপ্টের চেয়ে বেশি কাজ করেছে অন্যদের ব্যর্থতা আর নিজেদের ধারাবাহিকতা। ইংল্যান্ড যদি নিজের রাস্তা ধরে রাখতে না পারে, স্পেন যদি নিজের ক্ষমতার সঙ্গে ফল মেলাতে না পারে, নেদারল্যান্ডস যদি সময়মতো দাঁড়াতে না পারে, সেখানে আর্জেন্টিনা জিততে জিততে এগোলে তাদের সামনে কে থাকবে সেটা শুধু ফিফার ড্র ঠিক করে না, বাকিদের পতনও ঠিক করে।
এই কথাটা আমাদের ফুটবল তর্কে অনেকেই মানতে চায় না। কারণ ষড়যন্ত্রের গল্পে আরাম আছে। বললেই হলো, সব সেট করা। এই কথায় নিজের দলের হার কম লাগে, প্রিয় তারকার ব্যর্থতা ঢেকে যায়, চোখের সামনে যে দল ঠিকমতো খেললো তাকে ছোট করা যায়। কিন্তু আর্জেন্টিনা নিজের দায়িত্ব পালন করেছে। যে ম্যাচ জিততে হয়েছে জিতেছে, যে রাউন্ড পার হতে হয়েছে পার হয়েছে, আর বড় দলগুলো একে একে পড়ে যাওয়ায় সামনে তুলনামূলক সহজ নাম এসেছে। এই ঘটনাকে সাজানো নাটক বললে টুর্নামেন্টের ভাঙাচোরা বাস্তবতাকে দেখা হয় না। ফুটবল মাঠে কাগজের হিসাব বারবার মরে। বড় নাম ছোট দলের সামনে গিয়ে থেমে যায়। পেনাল্টি মিস হয়। গোলরক্ষক একদিন দেবতার মতো দাঁড়ায়। ফরোয়ার্ডের পা হঠাৎ কাঠ হয়ে যায়। আর যারা টিকে থাকে, তারা পরে বলে না, আমাদের জন্য রাস্তা বানানো ছিল; তারা বলে, আমরা জিতেছি।
যদি ফিফার পক্ষপাতিত্বের কথা তুলতেই হয়, যদি ইতিহাস ঘাঁটতেই হয়, যদি কে কখন সুবিধা পেল সেই তালিকা খুলতেই হয়, তাহলে মেসি বা আর্জেন্টিনার দিকে আঙুল তোলার আগে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর প্রসঙ্গ দেখা দরকার। কারণ বিভিন্ন সময়ে ফিফা বরং রোনালদোর ক্ষেত্রেই বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। এই দাবির পেছনে দুটো ঘটনা বলি, যা ফুটবল প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ভেতর ঢুকে থাকা অস্বস্তিকর প্রশ্নও তৈরি করে।
প্রথম ঘটনা রেড কার্ডের শাস্তি নিয়ে। বিশ্বকাপের আগে বাছাইপর্বের এক ম্যাচে রোনালদো রেড কার্ড দেখেছিলেন। নিয়মের স্বাভাবিক পথে গেলে তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার কথা আসে। তিন ম্যাচ মানে শুধু তিনটা খেলা নয়, বিশ্বকাপের দরজায় দাঁড়ানো এক তারকার জন্য তিনটা রাতের ঘুম, দেশের হিসাব, কোচের পরিকল্পনা, টিভি সম্প্রচারের উত্তেজনা, বিজ্ঞাপনের মুখ, পোস্টারের চোখ। কিন্তু বক্তার দাবি অনুযায়ী, রোনালদোকে বিশ্বকাপে পাওয়ার সুবিধা রাখতে ফিফা ফুটবল ইতিহাসে এক বিরল রাস্তা নেয়, রেড কার্ডের শাস্তির ক্ষেত্রে স্থগিত শাস্তি বা suspended sentence ব্যবহার করে, তার দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা কার্যত সরিয়ে দেয়। এই সিদ্ধান্তকে আমি সাধারণ নিয়মের চলতি প্রয়োগ হিসেবে দেখি না। এটা এক বিশেষ খেলোয়াড়কে টুর্নামেন্টে রাখার জন্য প্রশাসনিক নমনীয়তা। যে নমনীয়তা অন্য কারও ক্ষেত্রে এত সহজে দেখা যায় না, সেই প্রশ্নটাই এখানে থেকে যায়।
দ্বিতীয় ঘটনা ২০১৩ সালের ব্যালন ডি’অর। ভোটিং বন্ধ হওয়ার কথা ছিল ১৫ নভেম্বর। নিয়ম, সময়সীমা, ভোট, সবকিছু যেন নিজের পথে চলছিল। তারপর ১৯ নভেম্বর সুইডেনের বিপক্ষে রোনালদো হ্যাটট্রিক করেন। সেই হ্যাটট্রিক চারদিকে আলোড়ন তুলেছিল। ঠিক এরপর ফিফা প্রথমবারের মতো ভোটিংয়ের সময়সীমা বাড়িয়ে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত নিয়ে যায়, যাতে রোনালদোর সেই সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স ভোটারদের চোখে ঢুকে পড়তে পারে। কারণ ভোটিং শেষ হয়ে গেলে শেষ। কিন্তু সময় বাড়লে নতুন স্মৃতি পুরোনো হিসাবকে ঠেলে দেয়। মানুষ শেষ দেখা দৃশ্যই বেশি মনে রাখে। মাঠে রোনালদোর হ্যাটট্রিক, তার উদযাপন, তার মুখের আগুন, পরদিন পত্রিকার ছবি, টিভির আলোচনার উত্তাপ, সব এসে ভোটের টেবিলে বসে পড়ে। তাই বক্তার বক্তব্য, এখানে সুবিধা মেসির দিকে যায়নি, আর্জেন্টিনার দিকেও যায়নি; সুবিধার বাতাস বরং রোনালদোর দিকেই বইেছে।
আর্জেন্টিনা ‘সহজ প্রতিপক্ষ’ পেয়েছে; এমন অভিযোগ পুরোপুরি একপাক্ষিক এবং পক্ষপাতদুষ্ট। বড় দলগুলো যখন নিজেদের ছন্দ হারিয়েছে, আর্জেন্টিনা তখন নিজেদের পথেই অটল ছিল, তাই স্বাভাবিকভাবেই তাদের সামনে ভিন্ন প্রতিপক্ষ এসেছে। এর জন্য আর্জেন্টিনা বা মেসিকে দায়ী করা বা ফিফার ষড়যন্ত্র খোঁজা অবান্তর। উল্টো দিকে, ফিফার পক্ষপাতের কথা বললে রোনালদোর ঘটনাগুলোই বেশি সামনে আসে—যেমন রেড কার্ডের শাস্তি মওকুফ বা ব্যালন ডি’অরের ভোটিং সময় বাড়ানো। যে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে আনা হয়, বাস্তবে সেই প্রভাব রোনালদোর ক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট ছিল।
ফুটবল তর্কে শেষ কথা বলে কিছু নেই। রাত শেষ হয়, কিন্তু কমেন্ট বক্স বন্ধ হয় না। কেউ মেসির ছবি নিয়ে বসে থাকে, কেউ রোনালদোর গোল গুনে, কেউ ফিফার বিরুদ্ধে শপথ করে, কেউ পরের ম্যাচের আগে আবার সব ভুলে যায়। তবু তথ্যের একটা জেদ আছে। সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, কে জিতলো দেখো, কে হারলো দেখো, কার জন্য নিয়ম শিথিল হলো দেখো, কার জন্য সময়সীমা বদলালো দেখো। শুধু নামের প্রেমে বা নামের ঘৃণায় মাঠের হিসাব মেলাতে গেলে ভুল হবেই। আমি বলি কি ফুটবল ভালোবাসো, তর্ক করো, ঝগড়া করো, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কারও জয়ের ওপর ফিফার সিল মেরে দিও না।
রিটন



