লেখার কষ্ট এবং বুদ্ধির নির্মাণ
স্কুলজীবনে রচনা লিখতে আমি ভীষণ অপছন্দ করতাম। এখন ফিরে তাকালে বুঝি, সেই অপছন্দের জিনিসটাই নিঃশব্দে আমার জীবন বদলে দিয়েছিল। বিষয়বস্তুর জন্য নয়। সত্যি বলতে কী, বেশিরভাগ রচনার বিষয়ই আজ আর মনে নেই। কিশোরবয়সের স্মৃতিগুলো এমনিতেই অদ্ভুত, কিছু মুহূর্তকে তারা অসম্ভব উজ্জ্বল করে রাখে, বাকিগুলোকে কুয়াশার ভেতর ফেলে দেয়।
তবে কলেজের প্রথম সেমিস্টারের একটি রচনা মনে আছে। ইংরেজি ক্লাস। আমাদের শিক্ষক মিসেস কোল একটি প্রশ্ন দিয়েছিলেন: Fitzgerald তার The Great Gatsby উপন্যাসে কীভাবে এবং কেন এক দুর্নীতিগ্রস্ত সময়ের আমেরিকান ড্রিমকে অনুসন্ধান করে, সেটা বিশ্লেষণ করতে হবে। তখন “আমেরিকান ড্রিম” কথাটার গভীরতা আমি পুরো বুঝতাম না। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত ছাত্রদের কাছে সেটা ছিল বিজ্ঞাপনের ভাষা, সিনেমার ভাষা, বড়লোক হওয়ার এক চকচকে প্রতিশ্রুতি। কিন্তু ফিটজেরাল্ডের উপন্যাসে সেই স্বপ্নের ভেতরে যে পচন ছিল, যে নৈতিক ক্লান্তি ছিল, সেটা লিখতে গিয়ে প্রথমবার আমি বুঝেছিলাম সাহিত্য আসলে গল্পের চেয়ে বড় কিছু। সাহিত্য মানুষের আত্মপ্রবঞ্চনারও ইতিহাস।
পরদিন মিসেস কোল আমার রচনাটা প্রিন্ট করে পুরো ক্লাসে আলোচনা করেছিলেন। আজও দৃশ্যটা মনে আছে। সস্তা স্কুল প্রিন্টারের কাগজ। কালো কালির অক্ষর। ক্লাসরুমের হালকা ধুলো-মেশানো দুপুর। জানালার বাইরে বেসবল ফিল্ড। আর আমি, যে সাধারণত নিজের অস্তিত্ব নিয়ে খুব বেশি ভাবতাম না, হঠাৎ অনুভব করলাম কেউ আমার ভেতরের চিন্তাটাকে গুরুত্ব দিয়ে পড়েছে।
হয়তো সেই প্রথম আমি অনুভব করেছিলাম যে আমি সম্পূর্ণ সাধারণ নাও হতে পারি। আমাদের জীবনে এই ধরনের মুহূর্ত খুব কম আসে। কেউ আমাদের প্রতিভা আবিষ্কার করে না; বরং আমাদের সম্ভাবনার দিকে আঙুল তোলে। অনেক শিক্ষক আসলে পাঠ্যবইয়ের চেয়ে বড় কাজ করেন। তারা শুধুই ভবিষ্যৎ অনুমান করেন না, তারা সম্ভাবনাকে বৈধতা দেন।
পরে আমি মিসেস কোলের কাছে ইউনিভার্সিটি ভর্তির জন্য একটি রিকোমেনডেশন লেটার চেয়েছিলাম। যে ইউনিতে শেষ পর্যন্ত আমার সুযোগই হয়নি। জীবন এরকম ছোট ছোট ব্যঙ্গ করতে ভালোবাসে। কিন্তু সেই চিঠির একটি লাইন এখনও মনে আছে। তিনি লিখেছিলেন, “আই উইশ তোমার মতো লিখতে পারতাম।”
আমি অমন ভালো একদমই পারি না। সত্যি বলতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজের প্রতিভা সম্পর্কে একটু সংযত হয়ে যায়। কৈশোরের আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে বাস্তবতার সঙ্গে আপস করে। তবে এটুকু বলতে পারি, সেই রচনা, এবং তার পরের অসংখ্য রচনা, আমাকে একটি গভীর জিনিস শিখিয়েছিল: কীভাবে নিজের মস্তিষ্ক ব্যবহার করতে হয়।
রচনা লেখা হলো ভাবনার ব্যায়াম। একটি বিষয়ে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখা। নিজের অস্পষ্ট অনুভূতিকে ভাষায় নামানো। কোন যুক্তি টিকছে, কোনটা ভেঙে পড়ছে, সেটা দেখা। আমরা প্রায়ই মনে করি চিন্তা আগে আসে, লেখা পরে। বাস্তবে ব্যাপারটা উল্টোও হয়। আমরা লিখতে লিখতেই বুঝতে পারি আমরা আসলে কী ভাবছি।
এই কাজ ধীর। বিরক্তিকরও বটে। এতে ধৈর্য লাগে। শৃঙ্খলা লাগে। হতাশার সঙ্গে বসে থাকার ক্ষমতা লাগে। একটি বাক্য ঠিক করতে কখনো কখনো আধঘণ্টা চলে যায়। একটি অনুচ্ছেদে কী বলতে চাইছি সেটা বোঝার জন্য কয়েকদিন লাগে। আজকের পৃথিবীতে, যেখানে সবাই তাড়াহুড়ো করে কনটেন্ট তৈরি করছে, সেখানে এই ধীর চিন্তার অভ্যাস বিলুপ্তপ্রায়। চিন্তা মানে নিজের মনের বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলায় আনা। নিজের অভিজ্ঞতা, পড়াশোনা, স্মৃতি, অন্তর্দৃষ্টি সবকিছুকে একসঙ্গে বসিয়ে একটি সুস্পষ্ট অবস্থান তৈরি করা।
এই কারণেই AI নিয়ে আমার উদ্বেগ। বিশেষ করে লেখালেখি আর স্কুল কলেজের essay নিয়ে। আমি যখন এই লেখা লিখছি, তখন সফটওয়্যার আমাকে বানান ঠিক করে দিচ্ছে, বাক্য সাজেস্ট করছে, আরও “ভালো” শব্দ প্রস্তাব করছে। চাইলে আমি কয়েক সেকেন্ডে অন্য একটি সফটওয়্যারে গিয়ে পুরো আইডিয়া লিখিয়ে আনতে পারি। প্রযুক্তির সুবিধা অস্বীকার করার কিছু নেই। আমিও প্রযুক্তির মানুষ। আমি জানি অটোমেশন মানুষের শ্রম কমায়। কিন্তু এখানে বিপদ অন্য জায়গায়।
যদি পুরো চিন্তার প্রক্রিয়াটাই আউটসোর্সিং হয়ে যায়?
যদি মানুষ উত্তর পেয়ে যায়, কিন্তু প্রশ্ন নিয়ে লড়াই করার অভিজ্ঞতাটা না পায়?
একটি রচনার আসল উদ্দেশ্য তো ফাইনাল পরীক্ষা নয়। আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই দীর্ঘ সংগ্রাম, যার ভেতর দিয়ে একজন মানুষ নিজের চিন্তাকে চিনতে শেখে।
আমরা এই কথাটাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছি না। একটি প্রজন্ম হয়তো ধীরে ধীরে চিন্তা করার পেশিগুলো হারিয়ে ফেলছে।
কারণ আমরা লিখতে লিখতেই ভাবি। বাক্য শেষ না করা পর্যন্ত চিন্তাটাও শেষ হয় না। একটি অনুচ্ছেদের ভেতরে বিরোধী ধারণাগুলোর সঙ্গে লড়াই করতে করতে আমরা সূক্ষ্মভা শিখি। কলম বা কিবোর্ড তখন হয়ে ওঠে এক ধরনের তৃতীয় চোখ।
একটি কোটেশন হাতে লিখে নামানোর মধ্যেও এক ধরনের শিক্ষা আছে। শব্দগুলো শরীরের ভেতর দিয়ে যায়। আমরা ওজন করি। থামি। পুনর্বিবেচনা করি। সত্যিকারের বুদ্ধিমত্তা প্রায়ই ধীর।
আরসম্পাদনা? সেটাও আসলে ইন্ট্রোগেশন; নিজের চিন্তাকে জেরা করা। “আমি আসলে কী বলতে চাইছি?” “এখানে কি আমি নিজেকেই ফাঁকি দিচ্ছি?” “এই যুক্তিটা কি সত্যিই টিকে?”
এই যুদ্ধ শুধু অন্যদের বিরুদ্ধে নয়। নিজের অলসতা, নিজের অস্পষ্টতা, নিজের পূর্বধারণার বিরুদ্ধেও।
কলেজের রচনার উদ্দেশ্য কখনোই কেবল কাগজের ওপর কিছু শব্দ বসানো ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল রচনা লিখতে লিখতে আমি যে মানুষে পরিণত হচ্ছি, সেটা।
AI আমাকে একটি রচনা দিতে পারবে। একটি article, briefing, এমনকি পুরো বইও দিতে পারবে। কিন্তু যে মানুষটি ধীরে ধীরে তৈরি হয় রাত জেগে একটি অনুচ্ছেদ নিয়ে লড়তে লড়তে, যে মানুষটি ফ্রাসটেশনের ভেতর বসে থেকেও চিন্তা চালিয়ে যায়, যে মানুষটি নিজের ভাষা খুঁজে পায় বারবার ভুল করতে করতে, তাকে কোনো AI তৈরি করে দিতে পারবে না।
সেই মানুষটিকে যে এখনো নিজেকেই লিখে তৈরি করতে হয়।
রিটন



