পলাতক তুফান
ঊনবিংশ শতকের শেষভাগের বাংলা সমাজে বিজ্ঞানের ভাষা তখনও সাধারণ পাঠকের ঘরে ঢুকতে শুরু করেছে মাত্র। একদিকে ইউরোপীয় বিজ্ঞানচর্চার দ্রুত বিস্তার, অন্যদিকে বাঙালি শিক্ষিত সমাজের কৌতূহল; এই দুইয়ের মিলনে তখন নানা বিচিত্র রকমের রচনা তৈরি হচ্ছিল। বিজ্ঞানের কঠিন সূত্রকে গল্প, উপকথা, বা কৌতুকের আকারে পাঠকের সামনে হাজির করার এক অদ্ভুত চেষ্টা দেখা যায় সেই সময়ের পত্রপত্রিকায়। এই পরিপ্রেক্ষিতেই জগদীশচন্দ্র বসুর সাহিত্যিক উদ্যোগটিকে দেখতে হয়।
১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘কুন্তলীন কেশ তৈল’ আয়োজিত গল্প প্রতিযোগিতায় তিনি ‘নিরুদ্দেশের কাহিনি’ নামে একটি গল্প পাঠান। প্রতিযোগিতায় সেই গল্প প্রথম স্থান অধিকার করে। পরে তিনি গল্পটি সংশোধন ও পরিমার্জন করে নিজের গ্রন্থ অব্যক্ত-এ অন্তর্ভুক্ত করেন, তখন তার নাম বদলে হয় ‘পলাতক তুফান’। এই নাম পরিবর্তনের মধ্যেই গল্পটির প্রকৃত স্বরূপ কিছুটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে; এটি কেবল বিজ্ঞানের গল্প নয়, বরং প্রকৃতির অশান্ত শক্তিকে বুদ্ধি ও কৌশলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার এক কৌতুকময় কল্পনা।
গল্পটির কেন্দ্রে আছে উত্তাল সমুদ্রের দৃশ্য। ঝড়ে উত্তেজিত ঢেউ, অস্থির জাহাজ, বিপন্ন মানুষ; এই অবস্থার মধ্যে এক অদ্ভুত উপায়ে সমুদ্রকে শান্ত করা হয়। সমুদ্রগর্ভে ঢেলে দেওয়া হয় মাত্র এক শিশি ‘কুন্তলীন কেশ তেল’। আশ্চর্যভাবে সেই তেল ঢেউয়ের উপর ছড়িয়ে পড়ে এবং উত্তাল জলরাশিকে শান্ত করে দেয়। এই ঘটনার মধ্যে জগদীশচন্দ্র বসু আসলে ব্যবহার করেছেন তরল পদার্থের পৃষ্ঠটান বা surface tension-এর বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। বাস্তবে সমুদ্রের ঢেউয়ের উপর তেল ছড়ালে তরলের পৃষ্ঠটান পরিবর্তিত হয়, ফলে ঢেউয়ের অস্থিরতা কিছুটা কমে আসে; এই বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকে তিনি গল্পের ভেতর কৌতুকের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন।
তবে গল্পের আসল মজা অন্য জায়গায়। বাস্তবে যেখানে বিপুল পরিমাণ তেল দরকার হতে পারে, সেখানে গল্পে মাত্র এক শিশি তেলেই সমুদ্রকে শান্ত করে দেওয়া হয়েছে। এই অতিরঞ্জন ইচ্ছাকৃত। এর মাধ্যমে একদিকে বিজ্ঞানের ধারণাকে গল্পে প্রবেশ করানো হয়েছে, অন্যদিকে কুন্তলীন তেলের আশ্চর্য শক্তির প্রচারও ঘটেছে। অর্থাৎ বিজ্ঞানের সূত্র, কল্পনা, এবং বিজ্ঞাপন; এই তিনটি স্তর গল্পের মধ্যে একসঙ্গে কাজ করছে।
এই কারণেই ‘পলাতক তুফান’ গল্পটি বাংলা সাহিত্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এখানে বিজ্ঞান গল্পের ঘটনার চালিকাশক্তি। যদিও তখন ‘কল্পবিজ্ঞান’ শব্দটি বাংলা ভাষায় প্রচলিত হয়নি, তবু পরবর্তী সাহিত্যসমালোচকেরা এই গল্পটিকে বাংলার প্রথম কল্পবিজ্ঞানের গল্পগুলির অন্যতম বলে স্বীকার করেছেন। কারণ গল্পটির কেন্দ্রে রয়েছে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের কল্পনামূলক প্রয়োগ।
তবে এই দাবির বিরুদ্ধেও কিছু মত রয়েছে। সাহিত্যগবেষক সিদ্ধার্থ ঘোষ উল্লেখ করেছিলেন যে ১৮৮২ সালে বিজ্ঞান দর্পণ পত্রিকায় প্রকাশিত হেমলাল দত্তের ‘রহস্য’ গল্পটিই সম্ভবত বাংলা ভাষায় প্রথম কল্পবিজ্ঞানের গল্প। কিন্তু সেই গল্পে বিজ্ঞান কেবল অলঙ্কারস্বরূপ উপস্থিত, ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করার মূল শক্তি হিসেবে কাজ করে না। জগদীশচন্দ্র বসুর গল্পে বিজ্ঞান কাহিনির কেন্দ্রে অবস্থান করে; এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণে ‘পলাতক তুফান’ উনবিংশ শতকের বাংলা সমাজে বিজ্ঞানচেতনার বিস্তারের একটি ছোট দলিলও বটে। এখানে আমরা দেখি; বিজ্ঞানের কঠিন সূত্রকে কীভাবে গল্পের শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, কীভাবে পাঠককে একই সঙ্গে বিস্মিত, কৌতুকিত, এবং কৌতূহলী করা যায়।
জগদীশচন্দ্র বসুর এই গল্পটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অদ্ভুত সংযোগরেখা তৈরি করে; একদিকে বিজ্ঞানচর্চা, অন্যদিকে কল্পনার জগৎ। পরবর্তী কালে যে ধারাকে আমরা কল্পবিজ্ঞান বা science fiction বলে চিনি, তার সূক্ষ্ম বীজ যেন এখানে, এই ছোট্ট গল্পের মধ্যেই অঙ্কুরিত হয়ে আছে।
পলাতক তুফান সম্পূর্ণ গল্পটি এই লিংকে পড়তে পারবেন।



https://riton.substack.com/p/1a4?r=1k1e3&utm_medium=ios&utm_source=post-publish