আমার হেয়ার স্টাইলিস্ট একজন ইরানি মহিলা। নামটা এখানে বলছি না। নাম বললে বিপদ আছে। কারণ তিনি আমার চুল কাটেন, আর যিনি মানুষের মাথার এত কাছে ধারালো কাঁচি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। রাজা-মহারাজার সঙ্গে শত্রুতা করে মানুষ বেঁচেছে, নাপিতের সঙ্গে শত্রুতা করে কারও কানের ভবিষ্যৎ ভালো হয়েছে বলে শুনিনি।
প্রায় পনেরো বছর ধরে তিনি আমার চুল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। আমার মাথাটা তাঁর কাছে মাথা নয়, একটা গবেষণাগার। কখনও বলেন, “এইবার আমরা একটু লেয়ার করব।” কখনও বলেন, “সাইডটা ছোট, টপটা লং।” আবার কোনও দিন গভীর চিন্তিত মুখে আমার মাথার চারদিকে ঘুরে বলেন, “আমি কিছু নতুন ট্রাই করতে চাই।”
আমি বলি, “নতুন মানে কী?”
তিনি বলেন, “ট্রাস্ট মি।”
এই “ট্রাস্ট মি” শুনলেই আমার বুকের ভেতর একটু ধক করে ওঠে। সার্জন অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার আগে “ট্রাস্ট মি” বলেন, বিমানের পাইলট ঝড়ের মধ্যে “ট্রাস্ট মি” বলেন, আর আমার হেয়ার স্টাইলিস্ট কাঁচি হাতে “ট্রাস্ট মি” বলেন। তিন ক্ষেত্রেই রোগী, যাত্রী এবং আমি, কারও হাতে আর বিশেষ কিছু থাকে না।
পনেরো বছরে আমার মাথার ওপর তিনি বহু যুগের শিল্পচর্চা চালিয়েছেন। কখনও আমার চুলকে ইতালীয় অভিনেতার মতো করেছেন, যদিও মুখটা তখনও ঢাকারই ছিল। কখনও চুল সামনে নামিয়ে দিয়েছেন। কখনও পেছনে তুলেছেন। কখনও ডান দিকে ভাগ করেছেন, কখনও বাঁ দিকে। একবার মাঝখানে সিঁথি করে আয়না ধরেছিলেন। আমি নিজের মুখ দেখে বললাম, “এইটা কি আমি, নাকি আশির দশকের কোনও ব্যর্থ বাংলা সিনেমার জমিদারের ছোট ছেলে?”
তিনি বললেন, “ইউ লুক ভেরি ইয়াং।”
আমি বললাম, “ইয়াং তো লাগতেছি, কিন্তু মনে হচ্ছে বাবার সম্পত্তি পাই নাই।”
তিনি আমার কথা সবসময় পুরো বোঝেন না। আমি তাঁর ফারসি-ঘেঁষা ইংরেজি বুঝি অর্ধেক, তিনি আমার বাঙালি ইংরেজি বোঝেন আরও অর্ধেক। বাকি অর্ধেক আমরা দুজনেই হাসি দিয়ে চালিয়ে দিই। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এভাবেই টিকে আছে। জাতিসংঘ এত সভা করে যে কাজ পারে না, একটি সেলুনের আয়না আর দুজন মানুষের ভুল উচ্চারণ তার চেয়ে বেশি কাজ করে।
এই পনেরো বছরে আমার চুলের রংও তিনি বহুবার বিচার করেছেন। বলেছেন, “কিছু গ্রে এসেছে।”
আমি বলেছি, “গ্রে না, অভিজ্ঞতা।”
তিনি বলেছেন, “ইউ নিড কালার।”
আমি বলেছি, “আমি লেখক মানুষ। একটু সাদা চুল না থাকলে লোকজন সিরিয়াসলি নেবে না।”
তিনি চোখ কুঁচকে বলেছেন, “টু মাচ গ্রে উইল মেক ইউ ওল্ড।”
আমি বলেছি, “এই বয়সে মানুষকে ইয়াং দেখাতে বেশি চেষ্টা করলে আরও ওল্ড লাগে।”
তিনি আমার যুক্তি মানেননি। চুলের ব্যাপারে তাঁর কাছে গণতন্ত্র নেই। মাথা আমার, সিদ্ধান্ত তাঁর। আমি কেবল বিল দিই।
যাই হোক, গতকাল নিয়মমতো তাঁর সেলুনে গেছি। তিনি আমার মাথায় হাত দিলেন, চুল উলটে দেখলেন, আলোয় এনে পরীক্ষা করলেন। তারপর হঠাৎ তাঁর মুখের ভাব বদলে গেল। যে মুখে এতদিন শিল্পীর আত্মবিশ্বাস দেখেছি, সেই মুখে কাল একেবারে শোকসভার ছায়া।
তিনি মাথার সামনের দিকটা দুহাতে আলাদা করে বললেন, “ওহ মাই গড!”
আমি ভয় পেয়ে বললাম, “কী হইছে? উকুন?”
তিনি বললেন, “নো। ওয়ার্স।”
আমি বললাম, “উকুনের চেয়ে খারাপ কী আছে?”
তিনি আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন আমি জীবনের গভীর ট্র্যাজেডি বুঝতে অক্ষম এক বালক। তারপর খুব নিচু গলায় বললেন, “ইউ আর লুজিং হেয়ার।”
আমি বললাম, “চুল কি আলাদা বাসা নিয়েছে?”
তিনি আমার রসিকতা শুনলেন না। মাথার ওপরে আঙুল চালিয়ে আবার বললেন, “হিয়ার। লুক। অ্যান্ড হিয়ার।”
আমি আয়নায় তাকিয়ে বিশেষ কিছু বুঝলাম না। নিজের মাথার ওপরে কী হচ্ছে, মানুষ সাধারণত জীবনে খুব দেরিতে জানতে পারে। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। উপরে কী কমে যাচ্ছে, নিচের লোকেরা বুঝতে বুঝতে নির্বাচন চলে আসে।
আমি বললাম, “দুই-চারটা চুল গেছে। এত চিন্তার কী আছে?”
তিনি এবার সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলবার মতো মুখ করলেন। বললেন, “আই ওয়ার্ক অন দিস হেয়ার ফর ফিফটিন ইয়ার্স।”
কথাটা শুনে আমি প্রথমবার উপলব্ধি করলাম, চুলগুলো শুধু আমার ছিল না। তাঁরও ছিল। আমি মাথায় নিয়ে ঘুরেছি, তিনি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেছেন। আমি হয়তো সকালে আয়নায় তাকিয়ে হাত চালিয়ে বেরিয়ে গেছি, কিন্তু তিনি প্রতিটি চুলের সম্ভাবনা দেখেছেন। কোনটা সামনে থাকবে, কোনটা কানের কাছে নেমে আসবে, কোনটা জেল দিলে ভদ্র হবে, কোনটা শ্যাম্পু বদলালে সভ্য হবে, সব তাঁর জানা।
তিনি একগাছা চুল হাতে নিয়ে বললেন, “দিস ওয়ান ওয়াজ সো স্ট্রং।”
আমি মনে মনে ভাবলাম, লোকটার চাকরির বার্ষিক মূল্যায়ন হচ্ছে। বেচারা এতদিন ভালো পারফরম্যান্স করেছে, এখন একটু দুর্বল হয়েছে বলে ম্যানেজার কেঁদে দিচ্ছে।
তিনি আবার বললেন, “ইউ ডোন্ট টেক কেয়ার।”
আমি বললাম, “আমি যত্ন নিই।”
“নো। ইউ আর স্ট্রেসড।”
এই অভিযোগটা সব হেয়ার স্টাইলিস্টেরই আছে। চুল পড়লে স্ট্রেস। চুল না বাড়লে স্ট্রেস। চুল সাদা হলে স্ট্রেস। চুল বেশি তেলতেলে হলে স্ট্রেস। যেন চুল মানুষের মাথায় জন্মায় না, মনোবিজ্ঞান বিভাগে জন্মায়।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ডু ইউ স্লিপ?”
আমি বললাম, “মাঝে মাঝে।”
“ডু ইউ ইট?”
আমি বললাম, “সুযোগ পেলে।”
তিনি কাঁচি নামিয়ে আমার দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে ইরানি ইতিহাস, পারস্যের সাম্রাজ্য, শাহের পতন, নির্বাসন, বিপ্লব, কবিতা, জাফরান, গোলাপজল, সব মিলেমিশে এক ধরনের মাতৃসুলভ ধমক হয়ে উঠল।
“ইউ মাস্ট ইট। ইউ মাস্ট স্লিপ। ইউ মাস্ট নট ওয়ার্ক অল দ্য টাইম।”
আমি বললাম, “চুল বাঁচাতে গেলে চাকরি ছাড়তে হবে নাকি?”
তিনি বললেন, “মেবি।”
সেলুনের পাশের চেয়ারে বসা এক ভদ্রমহিলা এতক্ষণ মোবাইল দেখছিলেন। এবার মাথা তুলে আমাদের দিকে তাকালেন। তাঁর মুখে এমন ভাব, যেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ কনসালটেশন চলছে। আমার হেয়ার স্টাইলিস্ট সেই মহিলাকে বললেন, “ফিফটিন ইয়ার্স আই টেক কেয়ার অব হিজ হেয়ার। নাউ হি ইজ লুজিং ইট।”
ভদ্রমহিলা সহানুভূতির সঙ্গে আমার দিকে তাকালেন। আমি আয়নায় নিজের মুখ দেখলাম। মনে হল আমি চুল কাটাতে আসিনি, পরিবারের এক বৃদ্ধ সদস্যকে আইসিইউতে ভর্তি করেছি।
তারপর শুরু হল চিকিৎসা। কোন শ্যাম্পু ব্যবহার করতে হবে, কোন ভিটামিন খেতে হবে, কত দিন পরপর মাথায় তেল দিতে হবে, গরম পানি চলবে না, ঠান্ডা পানি ভালো, হেয়ার ড্রায়ার কমাতে হবে, ঘুম বাড়াতে হবে, প্রোটিন খেতে হবে, স্ট্রেস কমাতে হবে। তাঁর কথার গতি দেখে মনে হল আমার মাথার চুল এখনও যায়নি, সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছে। এখনই ব্যবস্থা নিলে পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব।
আমি বললাম, “সব চুল যদি একদিন চলেই যায়?”
তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “নো।”
এই “নো”-এর মধ্যে এমন দৃঢ়তা ছিল, যেন তিনি একাই টাক ঠেকাবেন। আলেকজান্ডার পারস্য জয় করেছেন, চেঙ্গিস খান শহর উজাড় করেছেন, কিন্তু আমার হেয়ার স্টাইলিস্টের অনুমতি ছাড়া আমার মাথা থেকে একটা চুলও বেরোতে পারবে না।
আমি একটু সাহস করে বললাম, “টাক হলে খারাপ কী? অনেক বুদ্ধিমান মানুষ টাক ছিলেন।”
তিনি বললেন, “আই ডোন্ট কেয়ার।”
আমি বললাম, “সক্রেটিস?”
তিনি বললেন, “নো।”
“গান্ধী?”
“নো।”
“স্টিভ জবস?”
তিনি আমার মাথায় স্প্রে করতে করতে বললেন, “ইউ আর নট স্টিভ জবস।”
আমি আর কথা বাড়ালাম না। মানুষ জীবনে বহু জায়গায় নিজের সীমাবদ্ধতা জানতে পারে। সেদিন সেলুনের আয়নার সামনে জেনে গেলাম, আমি স্টিভ জবস নই। এই তথ্য জানার জন্য কলেজে এত পড়াশোনা করার দরকার ছিল না।
তিনি চুল কাটতে কাটতে বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন। কাঁচি চলছিল, কিন্তু আগের মতো আত্মবিশ্বাসী শব্দে নয়। যেন প্রতিটি “কচ কচ” শব্দে বিদায়ের সংগীত। মাঝে মাঝে থেমে মাথার ওপর হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। আমার মনে হল, তিনি চুল কাটছেন না, আহত সৈনিকদের গুনছেন।
আমি বললাম, “আপনি এত মন খারাপ করছেন কেন?”
তিনি বললেন, “বিকজ আই নো দিস হেয়ার।”
কথাটা আমার মনে লাগল। পনেরো বছর খুব কম সময় নয়। এই পনেরো বছরে পৃথিবীতে কত সরকার গেছে, কত ফোন বদলেছে, কত বন্ধু দূরে সরে গেছে, কত পরিচিত মুখ ছবির মধ্যে আটকে গেছে। অথচ এই মহিলা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার মাথার চুলের ওঠানামা দেখেছেন। কখন চুল ঘন ছিল, কখন একটু সাদা হল, কোন বছর আমি বেশি ক্লান্ত ছিলাম, কোন সময় মুখ শুকনো দেখাত, সব তাঁর চোখে ধরা পড়েছে।
মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক থাকে যেগুলোর কোনও সুন্দর নাম নেই। আত্মীয় নয়, বন্ধু নয়, সহকর্মীও নয়। তবু তারা আমাদের সময়ের সাক্ষী। দোকানের সেই বৃদ্ধ লোক, যে বিশ বছর ধরে একইভাবে কফি বানায়। লাইব্রেরির কর্মী, যে জানে আপনি কোন তাকের সামনে বেশি দাঁড়ান। ডাকপিয়ন, যে আপনার সন্তানের ছোটবেলার চিঠি থেকে কলেজের কাগজ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। আর একজন হেয়ার স্টাইলিস্ট, যে জানে আপনার মাথার কোন পাশে চুল আগে সাদা হয়েছে।
আমি একটু নরম গলায় বললাম, “চুল গেলে আবার নতুন স্টাইল করবেন।”
তিনি কাঁচি থামিয়ে বললেন, “হোয়াট স্টাইল উইদাউট হেয়ার?”
আমি বললাম, “তখন মাথাটাই পালিশ করবেন।”
তিনি কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর তাঁর মুখে প্রথম হাসি ফুটল। বললেন, “আই উইল চার্জ এক্সট্রা।”
এই হল ব্যবসায়ী মন। শোক আছে, কান্না আছে, পনেরো বছরের আবেগ আছে, কিন্তু বিলের জায়গায় কোনও ছাড় নেই।
চুল কাটা শেষ হলে তিনি আয়না ধরে পেছনটা দেখালেন। তারপর বললেন, “প্রমিস মি, ইউ উইল টেক কেয়ার।”
আমি বললাম, “প্রমিস।”
তিনি বললেন, “স্লিপ।”
আমি বললাম, “চেষ্টা করব।”
“ইট।”
“চেষ্টা করব।”
“নো স্ট্রেস।”
এইবার আমি চুপ করে গেলাম। মানুষ ঘুমের প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, খাওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া যায়। স্ট্রেস না করার প্রতিশ্রুতি দিলে সেটা মিথ্যা সাক্ষ্য হয়ে যায়।
বেরিয়ে আসার সময় তিনি আবার আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। যে ভঙ্গিতে মা স্কুলে যাওয়ার আগে ছেলের চুল ঠিক করে দেন। বললেন, “উই উইল সেভ ইট।”
আমি সেলুন থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে আয়নায় নিজের চুল দেখলাম। এখনও যথেষ্ট আছে। তবে চুলের স্বভাব মানুষের মতো। যতদিন থাকে, তার উপস্থিতি বোঝা যায় না। দু-চারজন বিদায় নিলেই বাকিদের দাম বেড়ে যায়।
বাড়ি ফেরার পথে মনে হল, চুল পড়ে যাওয়ার মধ্যে বয়সের একটা গোপন চিঠি থাকে। শরীর সরাসরি কিছু বলে না। একটু একটু করে নোটিশ পাঠায়। চোখে ছোট অক্ষর ঝাপসা হয়, হাঁটু সিঁড়ি দেখে আলোচনা শুরু করে, ঘুম মাঝরাতে চাকরি ছেড়ে দেয়, আর চুল মাথার সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের ইতি টেনে একদিন নিঃশব্দে প্রস্থান করে।
তবে আমার চুলদের ব্যাপারে একটা সুবিধা আছে। তারা পালানোর আগে একজন ইরানি মহিলা সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে কাঁচি, চোখে জল, মুখে হুমকি।
চুলগুলোও নিশ্চয়ই নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে, “যামু কই? মহিলা তো পাসপোর্টই দিতেছে না!”



