স্থির থাকে শুধু মৃতেরা
মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়, কারণে-অকারণে বদলায়। - মুনীর চৌধুরী
রিটন খান
মানুষের ব্যাপারে আমরা সাধারণত এত স্পষ্ট ভাষা পছন্দ করি না। আমরা বলি, মানুষ চলে যায়, প্রয়াত হয়, স্মৃতিতে বেঁচে থাকে, নক্ষত্র হয়ে যায়, ইত্যাদি। নক্ষত্র হওয়ার ব্যাপারটা বিশেষ সুবিধাজনক, কারণ তাতে মৃত মানুষটির আর কোনও আপত্তি করার সুযোগ থাকে না। জীবিত অবস্থায় যে মানুষটি বাজারে পচা বেগুন নিয়ে ফেরিওয়ালার সঙ্গে দশ মিনিট তর্ক করতেন, মৃত্যুর পর তাঁকেই আমরা মহাজাগতিক আলোর সঙ্গে যুক্ত করে ফেলি। এ আমাদের স্নেহেরও লক্ষণ, আবার সামান্য অসহায়তারও। মৃত্যু আমাদের এতটাই অস্বস্তিতে ফেলে যে আমরা তাকে ফুল, ধূপ, শোকবার্তা এবং কিছু নির্বাচিত বাক্যের আড়ালে রাখি। কিন্তু শরীরের নিজস্ব ব্যাকরণ আছে। মানুষ মরে গেলে সে আর চরিত্র নয়, দেহ। দেহেরও এক গণতান্ত্রিক পরিণতি আছে। রাজা, কবি, দার্শনিক, সুন্দরী, বদমাশ, প্রেমিক, বিপ্লবী, অফিসের সাপ্তাহিক মিটিং-প্রিয় ম্যানেজার, সবাই শেষ পর্যন্ত একই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার অধীন। প্রকৃতি মানুষের সামাজিক পদমর্যাদার প্রতি খুব বেশি ভদ্রতা দেখায় না।
কিন্তু বেঁচে থাকা আরও অদ্ভুত ব্যাপার। কারণ বেঁচে থাকলে মানুষ বদলায়। এবং আমাদের বিপদ, আমরা মানুষকে বদলাতে দিই না। আমরা তাকে একদিনের, এক ঘটনার, এক কথার, এক সম্পর্কের, এক অপমানের, এক ভুল সিদ্ধান্তের মধ্যে আটকে রাখতে চাই। যে মানুষটি একদিন আমাদের ভালোবাসেনি, সে যেন সারাজীবন ভালোবাসাহীনই থাকে। যে বন্ধু একবার বিশ্বাস ভেঙেছিল, সে যেন আর কখনও সত্য বলতে না পারে। যে বাবা একসময় কঠোর ছিলেন, তাঁর বার্ধক্যের নরম হাত আমরা সন্দেহের চোখে দেখি। যে সন্তান একদিন অবুঝ ছিল, তাকে আমরা বড় হতে দিই না। আমরা মানুষের পরিবর্তনকে প্রায়ই বিশ্বাসঘাতকতা বলে ভুল করি, কারণ স্মৃতি, নিজের রাজত্ব বাঁচাতে, বর্তমানের বিরুদ্ধে মামলা করে।
আমি দেখেছি, মানুষ বদলায় খুব ধীরে, আবার কখনও এক বিকেলের মধ্যে। একদিন যে লোকের ওপর রাগে গা জ্বলত, বহু বছর পরে তার কথা ভাবলে শুধু করুণা লাগে। আবার যাকে একসময় প্রায় দেবতার আসনে বসিয়েছিলাম, পরে দেখি তিনি আসলে সাধারণ মানুষ, একটু বেশি চতুর, একটু বেশি ভাগ্যবান, আর একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী। দেবতা থেকে মানুষে নামার ঘটনাটি অনেকের কাছে পতন, আমার কাছে বরং মুক্তি। মানুষকে মানুষ হতে দেওয়া দরকার। দেবতারাও শেষ পর্যন্ত বড় ক্লান্তিকর। তাঁদের সঙ্গে চা খাওয়া যায় না।
বদলানোর কারণও সব সময় মহৎ হয় না। কেউ দুঃখে বদলায়, কেউ টাকায় বদলায়, কেউ প্রেমে বদলায়, কেউ অপমানে বদলায়, কেউ আবার শুধু সময়ের ঘর্ষণে বদলায়। কিছু মানুষ বই পড়ে বদলায়, যদিও বই পড়ে বদলানোর দাবি যারা বেশি করে, তাদের ওপর আমি একটু সাবধানে বিশ্বাস করি। কারণ অনেকেই বই পড়ে শুধু নিজের পূর্বধারণার জন্য সুন্দর পোশাক সংগ্রহ করে। কেউ ধর্মে গিয়ে বদলায়, কেউ ধর্ম থেকে বেরিয়ে বদলায়। কেউ রাজনীতিতে ঢুকে মানুষের মুখ চিনতে শেখে, কেউ রাজনীতিতে ঢুকে নিজের মুখটাই হারিয়ে ফেলে। কেউ বিদেশে গিয়ে দেশকে ভালোবাসতে শেখে, কেউ দেশে থেকে দেশকে কেবল গাল দেয়, আবার কেউ দেশকে ভালোবাসার নামে প্রতিবেশীকে ঘৃণা করার লাইসেন্স নিয়ে ফেলে। মানুষের পরিবর্তনের ইতিহাসে নৈতিক উন্নতির পাশাপাশি কৌতুক, ভণ্ডামি, লজ্জা, ভয়, আকাঙ্ক্ষা, সুবিধাবাদ, সবই থাকে। একে সরল রেখায় আঁকা যায় না।
আমরা অনেক সময় ভাবি, মানুষ বদলেছে মানেই সে উন্নত হয়েছে। কথাটা ঠিক নয়। পচন শুধু মৃত্যুর পর হয় না, জীবনের মধ্যেও হয়। শুধু পার্থক্য এই যে, জীবিত মানুষের পচন সব সময় গন্ধ ছড়ায় না। কেউ ধীরে ধীরে নিষ্ঠুর হয়ে যায়। কেউ ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে নিজের পুরনো দরিদ্রতা ভুলে যায়। কেউ সামান্য স্বীকৃতি পেয়ে এমনভাবে হাঁটে যেন সভ্যতার ভার তার কাঁধে। কেউ একদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলত, পরে অন্যায়ের সরকারি মুখপাত্র হয়ে বসে। আবার কেউ উলটো পথেও যায়। যে ছেলেটি একদিন উদ্ধত ছিল, সে একদিন সন্তানের জ্বরের রাতে বিনীত হয়ে যায়। যে মানুষটি সবাইকে ছোট করত, বার্ধক্যে এসে বুঝতে পারে, কারও ওপর দাঁড়িয়ে বড় হওয়া যায় না। যে নারী সারাজীবন চুপ ছিলেন, একদিন হঠাৎ নিজের কণ্ঠ খুঁজে পান। যে পুরুষ নিজেকে খুব যুক্তিবাদী ভাবত, একদিন মায়ের পুরনো শাড়ির গন্ধে কান্না চেপে রাখে। এসবও বদল।
মানুষের মধ্যে এই বদলের ক্ষমতা আছে বলেই তাকে একেবারে বিচার করা কঠিন। আবার এই কারণেই তাকে একেবারে ক্ষমা করাও সহজ নয়। মানুষ বদলাতে পারে, কিন্তু তার কাজের ইতিহাস থাকে। ইতিহাসেরও স্মৃতি আছে, ব্যক্তিগত স্মৃতির চেয়ে অনেক বেশি জেদি। তবু মানুষকে তার পুরনো মুখের সঙ্গে নতুন মুখের তুলনা করার সুযোগ না দিলে আমাদের সমাজ কেবল শাস্তির কারখানা হয়ে দাঁড়ায়। আমরা তখন প্রত্যেককে বলি, তুমি একবার যা ছিলে, চিরকাল তাই থাকবে। অথচ নিজের ক্ষেত্রে আমরা অদ্ভুত উদার। নিজের ভুলের নাম দিই পরিস্থিতি, অন্যের ভুলের নাম দিই চরিত্র। নিজের বদলকে বলি পরিণতি, অন্যের বদলকে বলি অভিনয়। এই দ্বৈত নৈতিকতা ছাড়া মধ্যবিত্ত জীবন বোধহয় অচল হয়ে যেত।
মৃত মানুষের সঙ্গে আমাদের ব্যবহারও আলাদা ধরনের। তিনি আর বদলাবেন না বলে আমরা তাঁকে স্থির করে ফেলি। কেউ মৃত্যুর পরে হঠাৎ মহান হয়ে যান, কেউ চিরকালের দোষী। জীবিত অবস্থায় যার সঙ্গে কথা বলার সময় আমাদের ধৈর্য ছিল না, মৃত্যুর পরে তার ছবির সামনে আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলি। ছবির মানুষটি খুব সুবিধাজনক। তিনি উত্তর দেন না। জীবিত মানুষ উত্তর দেয়, তর্ক করে, ভুল বোঝে, বদমেজাজ দেখায়, ক্ষমা চায় না, আবার কোনও একদিন নিঃশব্দে বদলেও যায়। তাই জীবিত মানুষকে ভালোবাসা কঠিন। মৃত মানুষকে ভালোবাসা তুলনায় অনেক নিরাপদ।
আমার মনে হয়, বেঁচে থাকা মানেই নিজের বহু সংস্করণের সঙ্গে বসবাস করা। আমি যে ছিলাম, আমি যে আছি, আমি যে হতে চাই, এবং আমি যে হতে পারিনি, তারা সবাই একই ঘরে থাকে। ঘরটি সব সময় শান্ত থাকে না। কখনও পুরনো আমি নতুন আমিকে সন্দেহ করে, কখনও নতুন আমি পুরনো আমির ওপর বিরক্ত হয়, কখনও দুজনেই চুপচাপ বসে থাকে। মানুষের ভেতরের সংসারও বাইরের সংসারের মতোই। সেখানে অভিমান আছে, হিসাব আছে, অপ্রকাশিত লজ্জা আছে, মাঝে মাঝে উৎসবও আছে। কেউ যদি সত্যিই নিজেকে দেখে, সে জানে, স্থায়ী চরিত্র বলে কিছু থাকলেও তা পাথরে খোদাই করা নয়। বরং নদীর পাড়ের মতো, প্রতি বর্ষায় একটু করে ভাঙে, একটু করে জোড়ে, কোথাও পলি জমে, কোথাও ঘরবাড়ি সরে যায়।
মানুষ মরে গেলে পচে যায়, এই সত্য যত নির্মম, মানুষ বেঁচে থাকলে বদলায়, এই সত্য ততই বিপজ্জনক এবং আশাব্যঞ্জক। বিপজ্জনক, কারণ বদল ভালো দিকেও যেতে পারে, মন্দ দিকেও। আশাব্যঞ্জক, কারণ কোনও মানুষকে তার একমাত্র ব্যর্থতার মধ্যে চিরদিন বন্দি করে রাখা উচিত নয়। আমরা কেউই নিজের জীবনের প্রথম খসড়া নই, আবার শেষ সংস্করণও নই। মৃত্যুই কেবল চূড়ান্ত সম্পাদনা। তার আগে পর্যন্ত মানুষে কাটাকুটি চলে, সংযোজন চলে, ভুল বানান থাকে, কোথাও অপ্রয়োজনীয় অলংকার, কোথাও বেখাপ্পা নীরবতা। জীবন, শেষ পর্যন্ত, খুব পরিপাটি বই নয়। বরং পুরনো খাতার মতো, যেখানে আগের পাতার কালি পরের পাতায় লেগে থাকে।
আর সেই কারণেই, মানুষের প্রতি আমার সন্দেহ, কিন্তু আগ্রহও আছে। কারণ যে মানুষ আজ এমন, সে কাল অন্যরকম হতে পারে। অবশ্য সব সময় ভালো হবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। জীবনের কোনও গ্যারান্টি কার্ড থাকে না। তবু এই বদলানোর সম্ভাবনাটুকু না থাকলে মানুষ কেবল দেহ হতো, আর দেহের পরিণতি আমরা জানিই। বেঁচে থাকার মর্যাদা বোধহয় এখানেই যে, পচনের আগে মানুষ অন্তত বদলাতে পারে। কখনও কারণে, কখনও অকারণে, কখনও নিজেই বুঝে, কখনও না বুঝেই। এবং আমরা যারা পাশে দাঁড়িয়ে দেখি, তাদের কাজ হয়তো সঙ্গে সঙ্গে রায় দেওয়া নয়, একটু লক্ষ্য করা, একটু মনে রাখা, আর মাঝে মাঝে নিজের বদলটাকেও সন্দেহের চোখে দেখা। কারণ বিচারকের আসনটাও মানুষকে বদলে দেয়। সব আসনের মধ্যে সেটাই বোধহয় সবচেয়ে বিপজ্জনক।



