রবীন্দ্রনাথ, ইয়েটস, এলিয়ট এবং বাংলা কবিতার আধুনিকতার দীর্ঘ যাত্রা
১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে নোবেল পুরস্কারের খবরটি যখন এল, তখন শান্তিনিকেতনের শুকনো পথ, কলকাতার সভাঘর, জোড়াসাঁকোর লম্বা বারান্দা, কবির দেশি পাঠকমণ্ডলী এবং দূরের ইউরোপীয় সাহিত্যজগৎ যেন একবারে একই তারে বাঁধা পড়ে গেল। গীতাঞ্জলির জন্য এই পুরস্কার রবীন্দ্রনাথকে রাতারাতি কবি বানায়নি, তাঁর কবিজীবন তখন অনেক দূর গড়িয়ে এসেছে, কত গান, কত কবিতা, কত নাটক, গল্প, প্রবন্ধ, স্বদেশী আন্দোলনের উত্তাপ, বঙ্গভঙ্গের ক্ষত, জমিদারির নৌকায় নদীপাড়ের মানুষ দেখা, সন্তান হারানোর শোক, নিজের ঘরের মৃত্যু, দেশের দুঃখ, মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের মুখ খোঁজা, এই সব কিছুর ভেতর দিয়ে তিনি নিজের ভাষায় নিজের ভূমি তৈরি করে রেখেছিলেন। নোবেল পুরস্কার সেই ভূমির ওপর পশ্চিমের একটা বড় আলো ফেলে দিল, ফলে এতদিন যাঁরা দূর থেকে ভারতবর্ষ বলতে গরম হাওয়া, সাপুড়ে, উপনিষদ, সন্ন্যাসী আর রহস্যময় প্রাচ্যের কুয়াশা বুঝতেন, তাঁদের সামনে এক জীবন্ত কবিকণ্ঠ এসে দাঁড়াল।
এই ঘটনার আগের বছর, ১৯১২ সালে, লন্ডনের শিল্পী উইলিয়াম রটেনস্টাইনের বাড়ির এক সান্ধ্য আসরে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের পরিচয় হয়েছিল। সেখানে হয়তো ঘরের ভেতর মৃদু আলো, চায়ের কাপ, পোর্সেলিনের পিরিচ, কয়েকজন শিল্পী, কবি, কথাবার্তার ফাঁকে তামাকের গন্ধ, কেউ চেয়ার ছেড়ে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ নতুন আগন্তুকের দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকাচ্ছে, আর সেই ঘরের মধ্যে অসুস্থ শরীর, লম্বা দাড়ি, ঢিলেঢালা পোশাক, শান্ত অথচ নিবিষ্ট চোখের এক বাঙালি কবি নিজের অনূদিত কবিতাগুলো নিয়ে বসে আছেন। রটেনস্টাইন তাঁর কাছে থাকা গীতাঞ্জলির পাণ্ডুলিপির অনুলিপি ইয়েটসের কাছে পাঠিয়েছিলেন। ইয়েটস পড়লেন, তারপর তিনি যে ধরনের আবেগে আক্রান্ত হলেন, তা নিছক ভদ্রলোকের প্রশংসা ছিল না। তাঁর মনে হলো, তিনি এমন এক কাব্যকণ্ঠের সন্ধান পেয়েছেন যার মধ্যে প্রার্থনা আছে, কিন্তু গির্জার কাঠের বেঞ্চের বাধ্য ভক্তি নেই; প্রেম আছে, কিন্তু তা কেবল নারীপুরুষের দেহসংলগ্ন আকাঙ্ক্ষায় আটকে নেই; মৃত্যু আছে, অথচ কবরের ঠাণ্ডা মাটি শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায় না; প্রকৃতি আছে, কিন্তু তা চোখের সামনে সাজানো দৃশ্যপটের মতো পড়ে থাকে না, শ্বাস নেয়, মানুষের ভেতরে ঢোকে, ঈশ্বরের গন্ধ বহন করে।



