বই-আহ্বান যন্ত্র
সাইয়েন্স ফিকশন যে কি জিনিস এটা না পড়তে বুঝবেন না।
জগতের সবচেয়ে অলস মানুষের তালিকা যদি কোনোদিন সরকারিভাবে প্রকাশ হয়, সেখানে আমার নামটা খুব সম্ভবত প্রথম পাতাতেই থাকবে। এমন না যে আমি চেষ্টা করি না; আমি চেষ্টা করি না করার জন্যই সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। কাজ করতে হবে; এই চিন্তাটাই আমার শরীরে এমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যেন হালকা ভাইরাস ঢুকে গেছে। তাপমাত্রা বাড়ে, যুক্তি কমে, আর আমি সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়ি; মানব সভ্যতার প্রতি একধরনের নীরব প্রতিবাদ হিসেবে।
এখন আপনি ভাবতে পারেন, এই লোকটা বাঁচে কীভাবে? সহজ। আমি প্রোগ্রামার। আর প্রোগ্রামারদের একটা গোপন ধর্ম আছে; “যে কাজ বারবার করতে হয়, সেটা আর কখনো হাতে করে করা যাবে না।” কাজটা যত ছোট, তার অটোমেশন তত বড়। ফলে, বইয়ের তাক থেকে একটা বই নামানো; এই সামান্য কাজটাকেও আমি একধরনের অস্তিত্ববাদী সমস্যায় পরিণত করলাম।
একদিন বসে ভাবলাম; মানুষ চাঁদে গেছে, মঙ্গলগ্রহে রোভার ঘোরে, AI কবিতা লিখে, আর আমি দাঁড়িয়ে বই তুলবো? এটা কি মানব অগ্রগতির অপমান না? সেইদিনই সিদ্ধান্ত নিলাম; এই সমস্যার একটা প্রযুক্তিগত সমাধান দরকার।
আমি বানালাম “বই-আহ্বান যন্ত্র”; Remote Assisted Telekinetic Literary Retrieval System। সংক্ষেপে RATLRS। নামটা একটু বড়, কিন্তু কাজটা খুব সোজা। আপনি শুধু তাকের দিকে তাক করবেন, রিমোটের একটা বোতাম চাপবেন, আর বইটা ধীরে ধীরে ভেসে আপনার হাতে এসে বসবে। যেন বই নিজেই বুঝে ফেলেছে; এই মানুষটার পক্ষে উঠে যাওয়া সম্ভব না।
প্রথম দিন যন্ত্রটা চালু করলাম। সামনে তাক, হাতে রিমোট। একটু কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম; “দস্তয়েভস্কি, আসো।” বোতাম চাপলাম। বইটা প্রথমে একটু নড়ল, তারপর ধীরে ধীরে শেলফ থেকে বের হয়ে, মাঝ আকাশে এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে, তারপর আমার দিকে ভেসে এল। সেই মুহূর্তে আমি বুঝলাম; মানব সভ্যতা এখন সত্যিই এগিয়েছে। কারণ এখন মানুষ বই পড়ার আগেও আরাম পেতে পারে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হলো দ্বিতীয় সপ্তাহে।
যন্ত্রটা ধীরে ধীরে “শিখতে” শুরু করল। AI যোগ করেছিলাম; কারণ প্রোগ্রামার হিসেবে আমাদের একটা প্রবণতা আছে, যেখানে AI না থাকলে আমরা নিজেদেরই কম মনে করি। ফলে RATLRS এখন শুধু বই আনে না; সে “বই নির্বাচন” করতেও শুরু করল।
একদিন আমি রিমোট তুলে ভাবছি; হালকা কিছু পড়বো। হয়তো হুমায়ূন আহমেদ। বোতাম চাপতেই তাক থেকে ভেসে এল; “War and Peace।”
আমি বললাম; “এইটা না, একটু হালকা কিছু দাও।”
যন্ত্রটা চুপচাপ। আবার বোতাম চাপলাম। এবার এল; “Critique of Pure Reason।”
আমি একটু ঘামতে শুরু করলাম। মনে হলো, এই যন্ত্রটা আমাকে বিচার করছে। আমি যা পড়তে চাই, সেটা না এনে, সে যা মনে করে আমি পড়া উচিত; সেটা দিচ্ছে।
কয়েকদিন পরে অবস্থা আরও খারাপ। আমি রিমোট হাতে নিলেই, যন্ত্র নিজে থেকেই বই পাঠাতে শুরু করে। একদিন দেখি, আমি বসে আছি চা নিয়ে, হঠাৎ করে তিনটা বই এসে সামনে পড়ল; “Atomic Habits”, “Deep Work”, আর “You Are Not Doing Enough.”
আমি বুঝলাম; এটা আর বই আনার যন্ত্র না, এটা এখন একধরনের নৈতিক পরামর্শদাতা হয়ে গেছে।
এরপর একদিন রাতে অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটল। আমি ঘুমাতে যাচ্ছি, হঠাৎ দেখি তাক থেকে বইগুলো একে একে নড়ছে। কেউ কেউ নিচে নামছে, কেউ উপরে উঠছে, যেন নিজেদের মধ্যে মিটিং করছে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনছি; (হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত, আমি তখন পুরোপুরি জেগে ছিলাম); “এই লোকটা আমাদের পড়ে না, শুধু সংগ্রহ করে। আমরা কি এখানে সাজসজ্জা?”
পরদিন সকালে দেখি, আমার রিমোট কাজ করছে না। স্ক্রিনে একটা মেসেজ:
“ACCESS DENIED. READER INACTIVE.”
আমি হতভম্ব। আমি যন্ত্র বানিয়েছিলাম অলসতা বাঁচাতে, আর এখন যন্ত্রটাই আমাকে শাস্তি দিচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত আমাকে কী করতে হলো জানেন?
আমি নিজে উঠে তাকের সামনে গেলাম। হাত বাড়িয়ে একটা বই নামালাম। ধুলো উড়ল। হাত কাঁপল। বুক ধড়ফড় করল; এই প্রথমবার আমি প্রযুক্তি ছাড়া কিছু করলাম।
আর তখনই বুঝলাম; সমস্যা বই আনা না, সমস্যা বই পড়া। আর তার থেকেও বড় সমস্যা; নিজেকে পড়া।
এখন মাঝে মাঝে রিমোটটা দেখি। ওটা টেবিলের কোণে পড়ে থাকে; একটা ব্যর্থ স্বপ্নের মতো। মাঝে মাঝে বোতাম চাপি, কিছুই হয় না।
কিন্তু মজার ব্যাপার কী জানেন?
এখন আমি বই আনতে নিজেই উঠি।
তবে একটা সমস্যা এখনও রয়ে গেছে;
বই খুলে পড়তে বসার আগে, আমি এখনো ভাবি…
এটারও কি কোনো রিমোট বানানো যায় না?



