মানুষ বলে আকর্ষণ শরীরের জিনিস। বিজ্ঞানীরা টেবিল সাজিয়ে বসেন, গ্রাফ বের করেন, গবেষণাপত্রের স্তূপ খুলে দেখান, এই মুখের মাপ ওর সঙ্গে মিলে, ওই ত্বকে দাগ কম, কোমরের এই অনুপাত প্রজননের সংকেত বহন করে, চোখের নিচে ক্লান্তি কম, দাঁত সোজা, চুল ঘন। বাজারও তার নিজের কাজ করে যায়। মেয়েদের বলা হয় লাল লিপস্টিক পরো, ঠোঁটকে একটু বেশি দৃশ্যমান করো। পুরুষদের বলা হয় দাড়ি রাখো, চোয়ালটাকে স্পষ্ট হতে দাও। মানুষ পছন্দের তালিকা বানায়। কারো নীল চোখ ভালো লাগে, কারো কাঁধের গঠন, কারো হাঁটার ভঙ্গি। যেন মানুষকে ধীরে ধীরে একটি ক্যাটালগে নামিয়ে আনা হয়েছে। যেন ভালোবাসারও একটা স্পেসিফিকেশন শিট আছে।
কিন্তু মুশকিল হলো, মানুষের ভেতরকার জিনিসগুলো এভাবে হিসাব মানতে চায় না।
কারণ কিছু মানুষ আছে, তাদের মুখ আপনি তিন মাস পরে ভুলে যাবেন, কিন্তু তারা একটা বাক্য বলে চলে যাবে, তারপর দেখবেন দুই বছর পর রাত আড়াইটায় রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে পানি খেতে গিয়ে হঠাৎ সেই বাক্য মাথায় ফিরে এসেছে। ফ্রিজের মৃদু গুঞ্জন, জানালার বাইরে দূরের গাড়ির শব্দ, আধো অন্ধকার ঘর, আর আপনি দাঁড়িয়ে আছেন একা, কিন্তু আসলে একা না। একটা পুরনো চিন্তা এসে আবার আপনার পাশে দাঁড়িয়েছে।
সেখানেই ঝামেলা।
সেখানে শরীরের নিয়ম শেষ হয়ে যায়।
আমার মনে হয়েছে, সৌন্দর্য চামড়ার নিচে থাকে না। তারও নিচে থাকে। স্নায়ুর মধ্যে। নিউরনের ছোট ছোট বৈদ্যুতিক আগুনের মধ্যে। কেউ কেউ শরীর ছুঁয়ে যায়, কেউ কেউ মস্তিষ্কে হাত দিয়ে বসে থাকে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষগুলো বিছানা এলোমেলো করে না।
তারা আপনার চিন্তার ভেতর এলোমেলো করে দেয়।
একটা আলাদা ক্ষুধা আছে মানুষের। শরীর দিয়ে যার শেষ হয় না। সেই ক্ষুধা থাকে কথার ফাঁকে। অফিসের মিটিং টেবিলে কেউ হঠাৎ একটা মন্তব্য করল, আর আপনি মাথা তুললেন। কেউ একটা বইয়ের নাম বলল, যেটা আপনি ভেবেছিলেন শুধু আপনি মনে রেখেছেন। কেউ আপনার বলা কথা পরের সপ্তাহে আবার টেনে আনল, “তুমি সেদিন বলছিলে না…”। সেই মুহূর্তে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। মনে হয়, এই পৃথিবীর কয়েকশো কোটি মানুষের মধ্যে কেউ একজন আপনার চিন্তার পথ দিয়ে একবার হেঁটে গেছে।
সেই অনুভূতির কোনো শরীর নেই, অথচ তার ওজন আছে।
শার্লট ব্রন্টি এই জিনিসটা অনেক আগেই ধরে ফেলেছিলেন। জেন আয়ার-এ রচেস্টার যখন জিজ্ঞেস করেন তিনি সুন্দর কিনা, জেন খুব শান্তভাবে বলে, “না, স্যার।” কী নির্মম উত্তর। আবার কী আশ্চর্য সৎ। কারণ তার চেহারা বড় কথা না। চেহারা তো রাস্তার মোড়েও আছে। কিন্তু মাথার মধ্যে আগুন ধরিয়ে দেওয়া মানুষ খুব বেশি নেই।
মানুষের জীবনে এমনও হয়, কেউ একটা লাইন উদ্ধৃত করল, আর আপনার বুকের ভেতর ধপ করে কিছু একটা নড়ে উঠল। কারণ লাইনটা আপনি জানতেন। শুধু জানতেন না আরেকজনও জানে। তারও চেয়ে ভয়ের কথা, সে লাইনটা আপনাকে ভেবে মনে রেখেছে।
নেশা বলতে মানুষ অনেক কিছু বোঝে। মদ, নিকোটিন, শরীর, ক্ষমতা।
কিন্তু কেউ যদি মন দিয়ে আপনার কথা শোনে, থামিয়ে না দেয়, মাঝপথে নিজের গল্প না ঢুকিয়ে দেয়, এমনভাবে আপনার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে যেন ওই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আপনার মুখ থেকে পরের বাক্যটা বের হওয়া, তখনও মানুষ একটু মাতাল হয়ে যায়।
আমরা ভুলে যাই, শোনার ক্ষমতাও আকর্ষণীয়।
এই পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষ উত্তর নিয়ে আসে। খুব কম মানুষ প্রশ্ন নিয়ে আসে।
আরও কম মানুষ প্রশ্নের পাশে বসে থাকে।
আজকাল বুদ্ধিমত্তার সঙ্গেও এক ধরনের বাজারি ভাব জুড়ে গেছে। কে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, কার বুকশেলফে কী বই আছে, কে কত জটিল শব্দ বলতে পারে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে গরম কিছু নেই। ধার করা বুদ্ধিতে তাপ তৈরি হয় না।
কেউ ফুকো মুখস্থ করে বলতে পারে, কেউ বার্তেসের নাম ছুঁড়ে দিতে পারে, কেউ ম্যাকার্থির উদ্ধৃতি জানে। কিন্তু উদ্ধৃতি মানুষ না। উদ্ধৃতি দরজা না। ওগুলো চাবি হতে পারে, দরজা নয়।
আসল আকর্ষণ হয় যখন কেউ একটা চিন্তা বহু বছর ধরে নিজের ভেতরে বয়ে বেড়ায়, তারপর খুব সাবধানে আপনার হাতে দেয়। যেন কাঁচের কিছু ধরিয়ে দিচ্ছে।
এই নাও।
আমি এতদিন এটা একা বহন করেছি।
দেখো।
সাবধানে।
এই মুহূর্তগুলো খুব নিরীহ দেখায় বাইরে থেকে। দুইজন মানুষ বসে আছে। চা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। কেউ তাকিয়ে আছে জানালার দিকে। কেউ টেবিলে আঙুল ঠুকছে।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে বিশাল ঘটনা ঘটছে।
একজন মানুষ তার ভেতরের দরজা অল্প একটু খুলেছে।
আপনাকে ঢুকতে দিয়েছে।
আর মানুষের ভেতরের ঘরগুলো বড় অদ্ভুত জায়গা। সেখানে পুরনো লজ্জা আছে, শৈশবের ভয় আছে, না বলা কথা আছে, মৃত মানুষ আছে, অসমাপ্ত বাক্য আছে। কেউ সেখানে কাউকে সহজে ঢুকতে দেয় না।
তাই বোধহয় এই ধরনের আকর্ষণের মধ্যে একটু ভূতের ব্যাপারও আছে।
কারণ যে মানুষ মন খোঁজে, সে একটু ভৌতিক জীবনই কাটায়। সে সবসময় ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে অন্য কিছুর অপেক্ষা করে। তার মনে হয় কথাবার্তা চলছে, কিন্তু আসল কথা এখনও শুরু হয়নি। সে অপেক্ষা করে এমন একজনের জন্য যে তার কথার ওজন দেখে ভয় পাবে না, তার কৌতূহল দেখে পিছিয়ে যাবে না, তার অসমাপ্ত বাক্য শুনে বলবে না, “আচ্ছা থাক।”
সে বলবে,
“তারপর?”
এই “তারপর” শব্দটার মধ্যেও কখনো কখনো পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর প্রেম লুকিয়ে থাকে।
রিটন খান
ছবি ক্রেডিট: হেইলি।



