কেউ কি আমাকে সত্যিই বুঝবে?
কখন যে এই বাক্যটা আমার নিজের ভেতরে বাসা বেঁধে ফেলেছে; আমি ঠিক জানি না। হয়তো কোনো ঝগড়ার পরে, হয়তো কোনো নীরব ডিনার টেবিলে, যেখানে সামনে বসে থাকা মানুষটি মন দিয়ে শুনছিল, তবু আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন অনুবাদে হারিয়ে যাচ্ছি; সেখানেই প্রথম মনে হয়েছিল, “কেউ কি আমাকে সত্যিই বুঝবে?” তখন বাক্যটা খুব ব্যক্তিগত মনে হয়েছিল, যেন একান্তই আমার নিজের আবিষ্কার। পরে জানলাম, এই সময়ের প্রায় সবারই মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো একধরনের ক্লান্ত প্রার্থনা এটা; “ক্লোজার চাই”, “নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত”; এইসব বাক্যের পাশে বসে থাকা, একটু বেশি নরম, একটু বেশি বিষণ্ন একটি বাক্য।
কিন্তু এই ইচ্ছেটা; সম্পূর্ণ বোঝাতে পারার ইচ্ছা; আসলে কী? অনেকদিন আমি ধরে নিয়েছিলাম, এটা ভালোবাসার অন্য নাম। এখন মনে হয়, বিষয়টা এত সহজ না। বরং, কখনো কখনো আমি সন্দেহ হয়, এই চাওয়ার ভিতরে লুকিয়ে থাকে এক ধরনের অলসতা; নিজেকে ব্যাখ্যা করার শ্রম থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। নিজের জটিলতাকে গুছিয়ে বলা, নিজের ভেতরের অসংলগ্নতা স্বীকার করা, নিজের বিরোধগুলো নিয়ে বসে থাকা; এই কাজগুলো ইজি না। তাই আমরা হয়তো চুপিসারে এমন কাউকে খুঁজি, যে আমাদের অগোছালো খসড়া কপি হাতে নিয়ে বলবে, “হ্যাঁ, আমি বুঝেছি”; এবং তখন আমরা একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচবো।
কিন্তু সেটা কি সত্যিই বোঝা হয়? নাকি একটু অন্য কিছু; ক্ষমা পাওয়ার মতো, স্বীকৃতি পাওয়ার মতো, একধরনের মুক্তি? এক্ষেত্রে আমার হেগেলের কথা মনে পড়ে; খুব সহজ করে বললে, মানুষ নাকি অন্যের স্বীকৃতির ভেতর দিয়েই নিজেকে সত্যি করে তোলে। কথাটা চমৎকার, এবং কিছুটা সত্যিও বটে। আমি নিজেও অনুভব করেছি, অন্যের চোখে নিজের একটা রূপরেখা তৈরি হয়। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন এই ধারণাটা একটু বদলে গিয়ে আমাদের মাথায় ঢোকে; যদি কেউ আমাকে ভালোবাসে, তাহলে সে আমাকে সম্পূর্ণ বুঝবে। যেন ভালোবাসা আর বোঝা; একই ক্রিয়া।
আমার অভিজ্ঞতায়, তারা এক না। এবং এই গুলিয়ে ফেলা থেকে অনেক সম্পর্ক ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
আমার জীবনে এমন সময় গেছে, যখন আমি বিশ্বাস করতাম, ভাষা দিয়ে সবকিছু বলা সম্ভব; যতক্ষণ না বলছি, ততক্ষণ পর্যন্ত না-বোঝা হচ্ছে। পরে ধীরে ধীরে টের পেলাম, ভাষার একটা সীমা আছে। কিছু জিনিস আছে, যা শরীরে থাকে, স্মৃতির আগের কোনো স্তরে থাকে, অথবা এমনভাবে গেঁথে থাকে যে তাকে শব্দে আনা মানেই তাকে বদলে ফেলা। রবীন্দ্রনাথ যেভাবে ভাষার সীমা নিয়ে কথা বলেন; আমি সেটা বইয়ে পড়ে বুঝিনি, বরং ধীরে ধীরে নিজের জীবনে টের পেয়েছি। অনেক রাত জেগে, অনেক কথা বলার পরও, একটা অংশ ঠিক অনুবাদে আসে না।
তবু আমরা এক অদ্ভুত আশাবাদে বেঁচে থাকি; যদি আরও একটু বলি, আরও একটু বিশ্লেষণ করি, আরও একটু খুঁড়ি; তাহলে হয়তো একদিন নিজেকে পুরোপুরি বুঝে ফেলবো, এবং তারপর অন্যকে বুঝিয়ে ফেলবো। এই বিশ্বাসের ওপর একটা পুরো শিল্প গড়ে উঠেছে। আমি তা অস্বীকার করছি না; তার প্রয়োজন আছে, উপকারও আছে; কিন্তু এর ভেতরে একটা নীরব প্রতিশ্রুতি থাকে: “শেষ পর্যন্ত সব বলা সম্ভব।” আমি এখন আর পুরোপুরি সেই প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করি না।
একটা সম্পর্কের কথা বলি, তখন আমি মনে করতাম, আমাকে কেউ ভীষণভাবে বুঝতে পারছে। পরে বুঝলাম, আমি আসলে প্রতিফলিত হচ্ছিলাম। সে শুনত, এবং তারপর আমার কথাগুলোকে একটু সুন্দর করে আমাকে ফিরিয়ে দিত। তখন সেটা দারুণ লাগত; যেন কেউ আমাকে খুব মন দিয়ে পড়ছে। কিন্তু ধীরে ধীরে একটা অদ্ভুত ফাঁকা জায়গা তৈরি হল; আমি বুঝলাম, আমি যেন নিজের প্রতিধ্বনির মধ্যেই কথা বলছি। সেখানে অন্য কেউ ছিল, কিন্তু তার নিজের কোনো অদেখা অঞ্চল আমার সামনে দৃশ্যমান হচ্ছিল না। আমি আয়নাকে জানালা ভেবেছিলাম; এই ভুলটা তখন বুঝতে পারিনি। তারপর থেকে আমি একটু সতর্ক হয়েছি “সম্পূর্ণ বোঝা” এই ধারণাটার প্রতি।
এখন আমার কাছে সম্পর্কের প্রশ্নটা একটু অন্যরকম। কেউ আমাকে পুরোপুরি বুঝছে কি না; এই প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কেউ কি আমাকে নিয়ে কৌতূহলী? সে কি ভুল বোঝে, এবং সেই ভুল থেকে শেখে? সে কি আমার নীরবতার ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, ব্যাখ্যা না চেয়েও? কারণ আমি দেখেছি, যখন আমরা জোর করে বোঝাতে চাই, তখন আমরা নিজেরাই ক্লান্ত হয়ে পড়ি; নিজেকে নোটস, ফুটনোট, ব্যাখ্যা দিয়ে পরিবেশন করতে করতে সম্পর্কটা কখন যেন একধরনের বিচারপ্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।
খেয়াল করে দেখবেন ছোট বাচ্চাদের। তারা আমাদের বোঝে না, অন্তত সেই অর্থে না, যেভাবে আমরা বোঝার কথা ভাবি। তবু তাদের উপস্থিতিতে একটা অদ্ভুত আনন্দ হয়। তারা পাশে বসে থাকে; এবং সেটাই যথেষ্ট। এই “যথেষ্ট” হওয়ার অনুভূতিটা আমরা বড় হতে হতে ভুলে যাই, কারণ আমরা সবকিছুকে ভাষার ভেতরে আনতে চাই।
আমরা নিজেদের গল্প বানাতে ভালোবাসি। একটা সুশৃঙ্খল বর্ণনা; শুরু আছে, মাঝ আছে, একটা ধারাবাহিকতা আছে। কিন্তু সত্যি বলতে, আমি নিজের ভেতরে তাকালে এমন কোনো পরিষ্কার গল্প পাই না। বরং স্তরের পর স্তর, মুছে ফেলা লেখা, আবার তার ওপর লেখা; একটা অসম্পূর্ণ খাতা। এর অনেকটাই আমি নিজেই বুঝি না, সেখানে অন্য কেউ এসে কীভাবে পুরোটা বুঝবে; এই প্রশ্নটা এখন আর আমাকে তেমন বিচলিত করে না।
তবু, ভুল বোঝার কষ্টটা আমি অস্বীকার করতে পারি না। যখন কেউ আপনার ভয়কে ইগনোর করে, বা আপনার একা থাকার প্রয়োজনকে অবহেলা হিসেবে নেয়; তখন একটা বাস্তব আঘাত লাগে। কিন্তু সেই আঘাতের সমাধান কি এমন কাউকে খোঁজা, যে কখনো ভুল বুঝবে না? নাকি এমন কাউকে খোঁজা, যে ভুল বুঝলেও সম্পর্ক ছেড়ে যাবে না?
আরও একটা জিনিস আমি ধীরে ধীরে বুঝেছি; পুরোপুরি বোঝা হওয়ার ভেতরে একধরনের বিপদও আছে। যদি কেউ আমাকে সম্পূর্ণ বুঝে ফেলে, তাহলে কি আমি তার কাছে শেষ হয়ে যাবো না? আমি কি তখন আর অবাক করার মতো থাকবো না? ভালোবাসা কি তখন একটু প্রশাসনিক হয়ে যাবে না; পরিচিত, নথিভুক্ত, পূর্বানুমানযোগ্য?
যে সম্পর্কগুলো আমাকে এখনো টানে; পড়াশোনায়, জীবনে; তাদের ভেতরে একটা অসমাপ্ততা থাকে। অন্যজনকে পুরোপুরি জানা যায় না; এই অনুভূতিটা বিরক্তিকর না, বরং জীবন্ত রাখে। একটা অদ্ভুত উত্তেজনা থাকে; আজ যা জানলাম, কাল সেটা বদলাবে।
এইসব ভেবে আমি একটা জায়গায় এসে থেমেছি। হয়তো বোঝা নয়, বরং মনোযোগই আসল। দীর্ঘদিন ধরে কারও দিকে তাকিয়ে থাকা, তাকে শেষ না করে; এই কাজটাই কঠিন। হয়তো ভালোবাসা একটু ধর্মীয় অভ্যাসের মতো; একটা রহস্যের সামনে বারবার ফিরে আসা, তাকে সমাধান না করেও।
আমি নিজেও একসময় বলতাম; “ওরা আমাকে বুঝতে পারেনি।” এখনো মাঝে মাঝে বলি, স্বীকার করছি। কিন্তু এখন সেই বাক্যের ভেতরে একটু সাবধানতা ঢুকে গেছে। কারণ আমি জানি, এই বাক্যটা আমাকে নির্দোষ রাখে, আর সম্পর্ককে দূরে সরিয়ে দেয়।
এখন আমি একটু অন্যরকমভাবে ভাবতে চেষ্টা করি। কেউ কি আমাকে পুরো বুঝেছে; এই প্রশ্নের বদলে, কেউ কি আমার পাশে থেকেছে, যখন আমি নিজেকেই ঠিক বুঝতে পারিনি?
হয়তো শেষ পর্যন্ত কেউ আপনাকে পুরো বুঝবে না। তবু, কেউ কেউ আপনার পাশে থাকবে; আপনার অর্ধেক কথার ভেতরেও, আপনার না-বলা অংশের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে।
রিটন খানকেউ কি আমাকে সত্যিই বুঝবে?
কখন যে এই বাক্যটা আমার নিজের ভেতরে বাসা বেঁধে ফেলেছে; আমি ঠিক জানি না। হয়তো কোনো ঝগড়ার পরে, হয়তো কোনো নীরব ডিনার টেবিলে, যেখানে সামনে বসে থাকা মানুষটি মন দিয়ে শুনছিল, তবু আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন অনুবাদে হারিয়ে যাচ্ছি; সেখানেই প্রথম মনে হয়েছিল, “কেউ কি আমাকে সত্যিই বুঝবে?” তখন বাক্যটা খুব ব্যক্তিগত মনে হয়েছিল, যেন একান্তই আমার নিজের আবিষ্কার। পরে জানলাম, এই সময়ের প্রায় সবারই মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো একধরনের ক্লান্ত প্রার্থনা এটা; “ক্লোজার চাই”, “নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত”; এইসব বাক্যের পাশে বসে থাকা, একটু বেশি নরম, একটু বেশি বিষণ্ন একটি বাক্য।
কিন্তু এই ইচ্ছেটা; সম্পূর্ণ বোঝাতে পারার ইচ্ছা; আসলে কী? অনেকদিন আমি ধরে নিয়েছিলাম, এটা ভালোবাসার অন্য নাম। এখন মনে হয়, বিষয়টা এত সহজ না। বরং, কখনো কখনো আমি সন্দেহ হয়, এই চাওয়ার ভিতরে লুকিয়ে থাকে এক ধরনের অলসতা; নিজেকে ব্যাখ্যা করার শ্রম থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। নিজের জটিলতাকে গুছিয়ে বলা, নিজের ভেতরের অসংলগ্নতা স্বীকার করা, নিজের বিরোধগুলো নিয়ে বসে থাকা; এই কাজগুলো ইজি না। তাই আমরা হয়তো চুপিসারে এমন কাউকে খুঁজি, যে আমাদের অগোছালো খসড়া কপি হাতে নিয়ে বলবে, “হ্যাঁ, আমি বুঝেছি”; এবং তখন আমরা একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচবো।
কিন্তু সেটা কি সত্যিই বোঝা হয়? নাকি একটু অন্য কিছু; ক্ষমা পাওয়ার মতো, স্বীকৃতি পাওয়ার মতো, একধরনের মুক্তি? এক্ষেত্রে আমার হেগেলের কথা মনে পড়ে; খুব সহজ করে বললে, মানুষ নাকি অন্যের স্বীকৃতির ভেতর দিয়েই নিজেকে সত্যি করে তোলে। কথাটা চমৎকার, এবং কিছুটা সত্যিও বটে। আমি নিজেও অনুভব করেছি, অন্যের চোখে নিজের একটা রূপরেখা তৈরি হয়। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন এই ধারণাটা একটু বদলে গিয়ে আমাদের মাথায় ঢোকে; যদি কেউ আমাকে ভালোবাসে, তাহলে সে আমাকে সম্পূর্ণ বুঝবে। যেন ভালোবাসা আর বোঝা; একই ক্রিয়া।
আমার অভিজ্ঞতায়, তারা এক না। এবং এই গুলিয়ে ফেলা থেকে অনেক সম্পর্ক ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
আমার জীবনে এমন সময় গেছে, যখন আমি বিশ্বাস করতাম, ভাষা দিয়ে সবকিছু বলা সম্ভব; যতক্ষণ না বলছি, ততক্ষণ পর্যন্ত না-বোঝা হচ্ছে। পরে ধীরে ধীরে টের পেলাম, ভাষার একটা সীমা আছে। কিছু জিনিস আছে, যা শরীরে থাকে, স্মৃতির আগের কোনো স্তরে থাকে, অথবা এমনভাবে গেঁথে থাকে যে তাকে শব্দে আনা মানেই তাকে বদলে ফেলা। রবীন্দ্রনাথ যেভাবে ভাষার সীমা নিয়ে কথা বলেন; আমি সেটা বইয়ে পড়ে বুঝিনি, বরং ধীরে ধীরে নিজের জীবনে টের পেয়েছি। অনেক রাত জেগে, অনেক কথা বলার পরও, একটা অংশ ঠিক অনুবাদে আসে না।
তবু আমরা এক অদ্ভুত আশাবাদে বেঁচে থাকি; যদি আরও একটু বলি, আরও একটু বিশ্লেষণ করি, আরও একটু খুঁড়ি; তাহলে হয়তো একদিন নিজেকে পুরোপুরি বুঝে ফেলবো, এবং তারপর অন্যকে বুঝিয়ে ফেলবো। এই বিশ্বাসের ওপর একটা পুরো শিল্প গড়ে উঠেছে। আমি তা অস্বীকার করছি না; তার প্রয়োজন আছে, উপকারও আছে; কিন্তু এর ভেতরে একটা নীরব প্রতিশ্রুতি থাকে: “শেষ পর্যন্ত সব বলা সম্ভব।” আমি এখন আর পুরোপুরি সেই প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করি না।
একটা সম্পর্কের কথা বলি, তখন আমি মনে করতাম, আমাকে কেউ ভীষণভাবে বুঝতে পারছে। পরে বুঝলাম, আমি আসলে প্রতিফলিত হচ্ছিলাম। সে শুনত, এবং তারপর আমার কথাগুলোকে একটু সুন্দর করে আমাকে ফিরিয়ে দিত। তখন সেটা দারুণ লাগত; যেন কেউ আমাকে খুব মন দিয়ে পড়ছে। কিন্তু ধীরে ধীরে একটা অদ্ভুত ফাঁকা জায়গা তৈরি হল; আমি বুঝলাম, আমি যেন নিজের প্রতিধ্বনির মধ্যেই কথা বলছি। সেখানে অন্য কেউ ছিল, কিন্তু তার নিজের কোনো অদেখা অঞ্চল আমার সামনে দৃশ্যমান হচ্ছিল না। আমি আয়নাকে জানালা ভেবেছিলাম; এই ভুলটা তখন বুঝতে পারিনি। তারপর থেকে আমি একটু সতর্ক হয়েছি “সম্পূর্ণ বোঝা” এই ধারণাটার প্রতি।
এখন আমার কাছে সম্পর্কের প্রশ্নটা একটু অন্যরকম। কেউ আমাকে পুরোপুরি বুঝছে কি না; এই প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কেউ কি আমাকে নিয়ে কৌতূহলী? সে কি ভুল বোঝে, এবং সেই ভুল থেকে শেখে? সে কি আমার নীরবতার ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, ব্যাখ্যা না চেয়েও? কারণ আমি দেখেছি, যখন আমরা জোর করে বোঝাতে চাই, তখন আমরা নিজেরাই ক্লান্ত হয়ে পড়ি; নিজেকে নোটস, ফুটনোট, ব্যাখ্যা দিয়ে পরিবেশন করতে করতে সম্পর্কটা কখন যেন একধরনের বিচারপ্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।
খেয়াল করে দেখবেন ছোট বাচ্চাদের। তারা আমাদের বোঝে না, অন্তত সেই অর্থে না, যেভাবে আমরা বোঝার কথা ভাবি। তবু তাদের উপস্থিতিতে একটা অদ্ভুত আনন্দ হয়। তারা পাশে বসে থাকে; এবং সেটাই যথেষ্ট। এই “যথেষ্ট” হওয়ার অনুভূতিটা আমরা বড় হতে হতে ভুলে যাই, কারণ আমরা সবকিছুকে ভাষার ভেতরে আনতে চাই।
আমরা নিজেদের গল্প বানাতে ভালোবাসি। একটা সুশৃঙ্খল বর্ণনা; শুরু আছে, মাঝ আছে, একটা ধারাবাহিকতা আছে। কিন্তু সত্যি বলতে, আমি নিজের ভেতরে তাকালে এমন কোনো পরিষ্কার গল্প পাই না। বরং স্তরের পর স্তর, মুছে ফেলা লেখা, আবার তার ওপর লেখা; একটা অসম্পূর্ণ খাতা। এর অনেকটাই আমি নিজেই বুঝি না, সেখানে অন্য কেউ এসে কীভাবে পুরোটা বুঝবে; এই প্রশ্নটা এখন আর আমাকে তেমন বিচলিত করে না।
তবু, ভুল বোঝার কষ্টটা আমি অস্বীকার করতে পারি না। যখন কেউ আপনার ভয়কে ইগনোর করে, বা আপনার একা থাকার প্রয়োজনকে অবহেলা হিসেবে নেয়; তখন একটা বাস্তব আঘাত লাগে। কিন্তু সেই আঘাতের সমাধান কি এমন কাউকে খোঁজা, যে কখনো ভুল বুঝবে না? নাকি এমন কাউকে খোঁজা, যে ভুল বুঝলেও সম্পর্ক ছেড়ে যাবে না?
আরও একটা জিনিস আমি ধীরে ধীরে বুঝেছি; পুরোপুরি বোঝা হওয়ার ভেতরে একধরনের বিপদও আছে। যদি কেউ আমাকে সম্পূর্ণ বুঝে ফেলে, তাহলে কি আমি তার কাছে শেষ হয়ে যাবো না? আমি কি তখন আর অবাক করার মতো থাকবো না? ভালোবাসা কি তখন একটু প্রশাসনিক হয়ে যাবে না; পরিচিত, নথিভুক্ত, পূর্বানুমানযোগ্য?
যে সম্পর্কগুলো আমাকে এখনো টানে; পড়াশোনায়, জীবনে; তাদের ভেতরে একটা অসমাপ্ততা থাকে। অন্যজনকে পুরোপুরি জানা যায় না; এই অনুভূতিটা বিরক্তিকর না, বরং জীবন্ত রাখে। একটা অদ্ভুত উত্তেজনা থাকে; আজ যা জানলাম, কাল সেটা বদলাবে।
এইসব ভেবে আমি একটা জায়গায় এসে থেমেছি। হয়তো বোঝা নয়, বরং মনোযোগই আসল। দীর্ঘদিন ধরে কারও দিকে তাকিয়ে থাকা, তাকে শেষ না করে; এই কাজটাই কঠিন। হয়তো ভালোবাসা একটু ধর্মীয় অভ্যাসের মতো; একটা রহস্যের সামনে বারবার ফিরে আসা, তাকে সমাধান না করেও।
আমি নিজেও একসময় বলতাম; “ওরা আমাকে বুঝতে পারেনি।” এখনো মাঝে মাঝে বলি, স্বীকার করছি। কিন্তু এখন সেই বাক্যের ভেতরে একটু সাবধানতা ঢুকে গেছে। কারণ আমি জানি, এই বাক্যটা আমাকে নির্দোষ রাখে, আর সম্পর্ককে দূরে সরিয়ে দেয়।
এখন আমি একটু অন্যরকমভাবে ভাবতে চেষ্টা করি। কেউ কি আমাকে পুরো বুঝেছে; এই প্রশ্নের বদলে, কেউ কি আমার পাশে থেকেছে, যখন আমি নিজেকেই ঠিক বুঝতে পারিনি?
হয়তো শেষ পর্যন্ত কেউ আপনাকে পুরো বুঝবে না। তবু, কেউ কেউ আপনার পাশে থাকবে; আপনার অর্ধেক কথার ভেতরেও, আপনার না-বলা অংশের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে।
রিটন খান


