ব্যক্তিসত্তার অরণ্য, আত্মার দেবতা, এবং জীবনের সম্মতি
মানুষকে বাইরে থেকে যত সহজ মনে হয়, ভেতর থেকে সে ততটাই জটিল। প্রতিদিনের ব্যবহার, কথাবার্তা, সিদ্ধান্ত, রাগ, সংযম, আকাঙ্ক্ষা, ব্যর্থতা, দায়িত্ব, প্রেম, অনুশোচনা, এই সমস্ত কিছু মিলিয়ে আমরা যে-মানুষটিকে দেখি, সে যেন এক সম্পূর্ণ মুখ, অথচ সেই মুখের নেপথ্যে আছে বহু অসমাপ্ত রেখা, বহু অর্ধেক উচ্চারিত শব্দ, বহু পরস্পরবিরোধী সত্তা। ব্যক্তিত্বের এই বড় paradox বা বিপরীত সত্য এখানেই যে, মানুষ তার অংশগুলির যোগফলের চেয়ে কখনও কখনও অনেক বেশি সহজ, অনেক বেশি বোধগম্য, আবার নিজের ভেতরে প্রবেশ করলেই সে অসংখ্য স্তর, অরণ্য, ছায়া, প্রতিধ্বনি এবং অদৃশ্য স্রোতে বিভক্ত হয়ে যায়। আমরা যে জীবন যাপন করি, তা বাহির থেকে একরৈখিক; কিন্তু ভেতরে তার পথ বহু, তার বাঁক বহু, তার দেবতা বহু, তার ভয়ও বহু।
মানুষ পৃথিবীতে হাঁটে একটি totality বা সমগ্রতা নিয়ে। তাকে চেনা হয় একটি নাম দিয়ে, একটি মুখ দিয়ে, একটি পেশা দিয়ে, একটি সম্পর্ক দিয়ে, একটি স্মৃতি দিয়ে। সমাজ মানুষকে এভাবেই পড়তে চায়। কারণ সমাজের পক্ষে মানুষকে জটিল অরণ্য হিসেবে বোঝা কঠিন; সমাজ তাকে পরিচয়ের সংক্ষিপ্ত বাক্যে আটকে রাখতে চায়। কিন্তু মানুষ নিজেকে জানে অন্যভাবে। সে জানে, তার মধ্যে যে সিদ্ধান্ত নেয়, সে সব সময়ে সেই মানুষ নয় যে সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করে; যে মুহূর্তে সে উত্তেজিত হয়ে কথা বলে, পরে যে মানুষ অনুতাপে নীরব হয়ে থাকে, সেই দুজনের মধ্যে অদ্ভুত এক দূরত্ব আছে; যে মানুষ আকাঙ্ক্ষায় অন্ধ, যে মানুষ নীতির কথা ভাবে, যে মানুষ ক্লান্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিতে চায়, যে মানুষ আবার ভোরে উঠে নিজের ব্যর্থতার দিকে তাকিয়ে নতুন করে শুরু করে, এরা সবাই একই মানুষ, তবু এদের স্বর, প্রবণতা, জেদ, ভয়, কামনা, লজ্জা এক নয়। এই কারণে মানুষকে বিচার করা সহজ, কিন্তু মানুষকে বোঝা কঠিন।
ব্যক্তিত্ব অনেক সময়ে এক ধরনের costume বা পোশাকের মতো কাজ করে। আমরা আমাদের স্বভাব, রুচি, অভ্যাস, ভাষা, ভঙ্গি, সামাজিক ব্যবহার দিয়ে একটি বাহ্যিক রূপ নির্মাণ করি। সেই রূপ আমাদের প্রয়োজনও বটে, কারণ পোশাকহীন আত্মা নিয়ে কেউ সমাজে চলতে পারে না। কিন্তু এই পোশাকের নিচে থাকে এক অস্থির ভিতরজগৎ, যেখানে অংশগুলি পরস্পরের সঙ্গে কখনও লড়ছে, কখনও সমঝোতা করছে, কখনও ক্ষমতা চাইছে, কখনও শান্তি। মানুষের মধ্যে যে অংশটি সম্মান চায়, সে হয়তো একই সঙ্গে স্বাধীনতাও চায়; যে অংশটি ভালবাসা চায়, সে আবার আঘাতের ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখে; যে অংশটি সত্য বলতে চায়, সে কখনও সম্পর্ক রক্ষার জন্য চুপ থাকে; যে অংশটি সৃজনশীল, সে অনেক সময়ে দৈনন্দিন জীবনের শৃঙ্খলার কাছে পরাজিত হয়; যে অংশটি শান্তি চায়, সে রাগের আগুনে নিজেকেই পুড়িয়ে ফেলে। এই সমস্ত ভাঙন নিয়েই মানুষ সম্পূর্ণ।
সচেতন জীবন এই অর্থে কেবল চিন্তার জীবন নয়, বরং নিজস্ব ভেতরকার বহুস্বরকে শুনে থাকার কঠিন অনুশীলন। consciousness বা চেতনা মানুষকে শুধু জানার ক্ষমতা দেয় না; তা মানুষকে নিজের ভেতরের দায়ের সামনে দাঁড় করায়। আমি রাগ করেছি, কিন্তু রাগই কি আমার পুরো সত্তা? আমি ভয় পেয়েছি, কিন্তু ভয় কি আমাকে শাসন করবে? আমি আকাঙ্ক্ষা করেছি, কিন্তু আকাঙ্ক্ষা কি আমার বিচারবোধকে গ্রাস করবে? আমি ভুল করেছি, কিন্তু ভুল কি আমার পরিচয়ের শেষ বাক্য হয়ে থাকবে? এই প্রশ্নগুলি মানুষকে ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে সে নিজের সমস্ত অংশকে অস্বীকার না করে, আবার কোনও একক অংশের দাসও হয়ে ওঠে না। আত্মশাসন মানে নিজের ভেতরের কোনও প্রবণতাকে হত্যা করা নয়; আত্মশাসন মানে কোন প্রবণতার ভাষা কখন শুনব, কোন প্রবণতাকে কখন বিরত রাখব, কোন অন্ধকারকে আলোয় আনব, এবং কোন আলোকে অহংকারে পরিণত হতে দেব না, সেই মননশীল বিচার।
এখানেই প্রেমের প্রসঙ্গ আসে। নিজেকে ভালবাসা হোক, অন্য কাউকে ভালবাসা হোক, প্রেমের গভীরতা নির্ধারিত হয় আমরা কতটা গ্রহণ করতে পারি তার ওপর। ভালবাসা যদি কেবল নির্বাচিত অংশকে গ্রহণ করে, তবে তা খুব দ্রুত শর্তে পরিণত হয়। মানুষকে ভালবাসা মানে তার সমস্ত দুর্বলতা, অসম্পূর্ণতা, অসংগতি, আঘাত, ক্লান্তি, অজ্ঞানতা, ভ্রান্তি, সম্ভাবনা এবং আলোর দিকে একসঙ্গে তাকানো। এই গ্রহণে অন্ধ সমর্থন নেই, আছে গভীর বোঝাপড়া; এতে নৈতিকতা বিলীন হয় না, বরং আরও কঠিন হয়, কারণ ভালবাসা তখন মানুষকে তার সমগ্রতার মধ্যে দেখতে শেখায়। যে নিজেকে ভালবাসে, সে নিজের প্রতিটি ত্রুটিকে ন্যায্যতা দেয় না; সে বুঝতে শেখে কোন অংশটি ক্ষুধার্ত, কোন অংশটি আহত, কোন অংশটি অন্ধ, কোন অংশটি সত্যের দিকে যেতে চায়। যে অন্যকে ভালবাসে, সে তাকে দেবতা করে না; সে তার মধ্যে দেবতা, মানুষ, অরণ্য, ভয়, সীমা এবং সম্ভাবনা, সবকিছুর উপস্থিতি স্বীকার করে।
এই প্রেক্ষিতেই ডি. এইচ. লরেন্সের ব্যক্তিগত credo বা বিশ্বাসপত্র বিশেষ তাৎপর্য পায়। বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন মানুষের চরিত্রগঠনের জন্য যে তেরোটি গুণের কথা বলেছিলেন, temperance বা সংযম, silence বা নীরবতা, order বা শৃঙ্খলা, resolution বা সংকল্প, frugality বা মিতব্যয়িতা, industry বা কর্মনিষ্ঠা, sincerity বা আন্তরিকতা, justice বা ন্যায়বোধ, moderation বা পরিমিতি, cleanliness বা পরিচ্ছন্নতা, tranquility বা প্রশান্তি, chastity বা ব্রহ্মচর্য, humility বা বিনয়, সেগুলির মধ্যে একটি যুক্তিবাদী, প্রোটেস্ট্যান্ট, আত্মশৃঙ্খলাপূর্ণ মানুষ গড়ার চেষ্টা ছিল। ফ্র্যাঙ্কলিনের এই গুণতালিকা ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আধুনিক নাগরিক সত্তা, উৎপাদনশীলতা, নৈতিক জীবন, স্বনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক মর্যাদা, এই সবের সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে। কিন্তু লরেন্স মানুষের ভেতরকে এত সুশৃঙ্খল তালিকায় ধরতে রাজি ছিলেন না। মানুষের আত্মা তাঁর কাছে কোনও neatly arranged cabinet নয়, যেখানে প্রত্যেক গুণ নির্দিষ্ট খোপে রাখা যায়; মানুষের আত্মা তাঁর কাছে অন্ধকার বন, dark forest, যেখানে অজানা দেবতারা আসে, থাকে, চলে যায়।
লরেন্স লিখেছিলেন, তাঁর বিশ্বাস এই যে, “আমি আমি।” এই বাক্যটি প্রথম দৃষ্টিতে সহজ, কিন্তু এর গভীরতা আছে। মানুষকে যখন সমাজ, নীতি, ধর্ম, প্রতিষ্ঠান, সংস্কার, সভ্যতার শিষ্টাচার, উৎপাদনের ব্যবস্থা, সবকিছু মিলে এক প্রস্তুত ছাঁচে ঢালতে চায়, তখন “আমি আমি” বলা এক ধরনের অস্তিত্বগত ঘোষণা। এই ঘোষণা স্বেচ্ছাচার নয়; বরং নিজের ভেতরের সত্যকে স্বীকার করার সাহস। এরপর তিনি বলেন, তাঁর আত্মা একটি অন্ধকার অরণ্য। তাঁর জানা সত্তা সেই অরণ্যের কেবল একটি ছোট clearing, সামান্য উন্মুক্ত ভূমি। এই চিত্রকল্প মানুষের আত্মজ্ঞানকে বিনয়ী করে। আমরা নিজেদের নিয়ে যতই বলি, আমি এমন, আমি তেমন, আমার রুচি এই, আমার বিশ্বাস এই, আমার চরিত্র এই, আসলে আমাদের জানা সত্তা অল্প। অজানা অংশই বেশি। মানুষের মনোজগৎ, স্মৃতি, দেহ, কামনা, স্বপ্ন, উত্তরাধিকার, সংস্কৃতি, অচেতন প্রবণতা, শৈশবের অব্যক্ত ক্ষত, সামাজিক প্রশিক্ষণ, ভাষার ভিতরকার লুকোনো নীতি, সব মিলিয়ে মানুষ নিজের কাছেও কখনও পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়।
লরেন্সের “strange gods” বা অদ্ভুত দেবতাদের কথা এই অস্বচ্ছতারই এক কবিতাময় নাম। কখনও আমাদের মধ্যে হঠাৎ এক দয়া আসে, যার উৎস আমরা জানি না; কখনও এক রাগ আসে, যা বর্তমান ঘটনার চেয়ে অনেক পুরনো; কখনও এক আকর্ষণ আসে, যা যুক্তির অনুবাদ মানে না; কখনও এক ভয় আসে, যা কোনও দৃশ্যমান বিপদের সঙ্গে মেলে না; কখনও এক সৃষ্টিশক্তি আসে, যা আমাদের দৈনন্দিন ব্যক্তিত্বের মাপ ছাড়িয়ে যায়। এই দেবতারা আসে অরণ্য থেকে, কিছুক্ষণ আমাদের known self-এর clearing-এ দাঁড়ায়, তারপর আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। মানুষ যদি এই আগমন-প্রস্থানকে সহ্য করতে না পারে, তবে সে হয় repression বা দমনে যাবে, নয়তো possession বা অধিকারভুক্তির মধ্যে পড়ে যাবে। দমন করলে সে শুকিয়ে যায়; অধিকারভুক্ত হলে সে নিজেকে হারায়। লরেন্সের বড় শিক্ষা এখানেই, দেবতাদের আসতে দিতে হবে, যেতে দিতেও হবে। কোনও এক দেবতার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করলে মানুষ সংকীর্ণ হয়, আর সমস্ত দেবতাকে নির্বাসিত করতে চাইলে সে নিঃস্ব হয়।
ফ্র্যাঙ্কলিনের নৈতিকতা সমাজোপযোগী মানুষ নির্মাণের দিকে যায়; লরেন্সের নৈতিকতা আত্মার জীবন্ত বহুত্বকে স্বীকার করে। তবে এই দুয়ের সংঘাতকে একেবারে সরল বিরোধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। মানুষের জীবনে শৃঙ্খলা দরকার, নইলে সে নিজের শক্তিকে কাজে লাগাতে পারে না। আবার শৃঙ্খলা যদি অরণ্যকে কেটে ফেলে কেবল পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণ বানাতে চায়, তবে জীবনের গভীরতা নষ্ট হয়। সভ্যতা মানুষের ভেতরের অরণ্যকে ভয় পায়, কারণ অরণ্যে পূর্বনির্ধারিত রাস্তা নেই। কিন্তু সৃজনশীলতা, প্রেম, ধর্মীয় অভিজ্ঞতা, শিল্প, ভাষার গভীরতা, এমনকি নৈতিক সাহসও অনেক সময়ে সেই অরণ্য থেকেই উঠে আসে। মানুষ যে কেবল নিয়মের প্রাণী নয়, কেবল যুক্তির যন্ত্র নয়, কেবল সামাজিক পরিচয়ের ধারক নয়, লরেন্স এই কথাই তাঁর credo-তে স্মরণ করিয়ে দেন।
“আমি মানবসমাজকে আমার ওপর কিছু চাপিয়ে দিতে দেব না,” লরেন্সের এই বাক্যে এক ধরনের অন্তর্জাগতিক স্বাধীনতার দাবি আছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলেন, তিনি নিজের মধ্যে এবং অন্য নারী-পুরুষের মধ্যে যে দেবতারা আছে, তাদের চিনতে এবং তাদের কাছে নত হতে চেষ্টা করবেন। এই দ্বিতীয় অংশটি প্রথম অংশকে ভারসাম্য দেয়। নইলে ব্যক্তিস্বাধীনতা অহংকারে পরিণত হতে পারত। লরেন্স সমাজের আরোপ প্রত্যাখ্যান করছেন, কিন্তু মানুষের ভেতরের গভীর শক্তি, অজানা আহ্বান, রহস্যময় জীবনীশক্তিকে অস্বীকার করছেন না। বরং তিনি বলছেন, নিজের দেবতাকে যেমন চিনতে হবে, অন্যের দেবতাকেও চিনতে হবে। এখানেই ব্যক্তিসত্তা থেকে সম্পর্কের দিকে, আত্মা থেকে মানবসমাজের দিকে, অরণ্য থেকে বৃহত্তর cosmos-এর দিকে পথ খুলে যায়।
তবু এই জীবন সহজ নয়। মানুষের মধ্যে যে-সব দেবতা আসে, তারা সব সময়ে শান্ত দেবতা নয়। কেউ কামনার, কেউ ক্রোধের, কেউ সৃষ্টির, কেউ ধ্বংসের, কেউ ক্ষমতার, কেউ ভয়ের, কেউ স্বাধীনতার, কেউ আত্মবিসর্জনের। প্রত্যেকেই মানুষকে আলাদা পথে টানে। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই মানবিকতা তৈরি হয়। আমরা অনেক সময়ে ভাবি, চরিত্র মানে স্থিরতা; কিন্তু চরিত্রের অন্য অর্থ হতে পারে, নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে চিনে নেওয়ার ক্ষমতা। কোনও মানুষ কখনও পুরোপুরি একরকম থাকে না। বয়স, প্রেম, ক্ষতি, পাঠ, রোগ, মৃত্যু, যন্ত্রণা, সাফল্য, পরাজয়, শহর, ভাষা, পরিবার, ইতিহাস, সবই তাকে বদলায়। এই বদলকে বিশ্বাসঘাতকতা ভাবলে মানুষ নিজের জীবনকেই অস্বীকার করে। বরং মানুষকে বুঝতে হবে, সত্তা নদীর মতো, তার একটি নাম আছে, একটি পথ আছে, কিন্তু জল প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে।
লরেন্স জীবনের এই অন্তর্গত বহুত্বকে শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর Apocalypse গ্রন্থে, মৃত্যুর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে, যক্ষ্মায় আক্রান্ত শরীর নিয়ে, তিনি যে “living unison” বা জীবন্ত ঐক্যের কথা বলেন, তা কেবল দর্শনের বিমূর্ত ধারণা নয়; তা শরীর, পৃথিবী, সূর্য, রক্ত, সমুদ্র, মানবজাতি, সমস্ত জীবন্ত cosmos-এর সঙ্গে একাত্মতার অনুভব। মানুষ নিজের ভেতরের খণ্ড-বিখণ্ড অংশ নিয়ে যতই ব্যস্ত থাকুক, সে আসলে এক বিরাট জীবনের অংশ। তার চোখ সূর্যের সঙ্গে যুক্ত, তার পা পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত, তার রক্ত সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত, তার আত্মা মানবসমাজের বৃহৎ আত্মার সঙ্গে যুক্ত। এই ভাবনায় আত্মকেন্দ্রিক সংকট ছোট হয়ে যায়, কিন্তু মুছে যায় না। বরং নিজের ক্ষুদ্র যুদ্ধকে বৃহত্তর প্রেক্ষিতে দেখা সম্ভব হয়।
জীবিত থাকা, লরেন্সের কাছে, এক অনন্য বিস্ময়। মৃতেরা পরবর্তী জগতের খবর রাখুক, অনাগতরা সম্ভাবনার অন্ধকারে থাকুক, কিন্তু flesh বা দেহে জীবিত থাকার যে এখানে-এখনকার মহিমা, তা আমাদের। এই দেহ, এই শ্বাস, এই রক্ত, এই আলো, এই মাটি, এই অস্থায়ী সময়, এই স্পর্শযোগ্য পৃথিবী, এগুলিই জীবনের উপহার। মানুষের মন অনেক সময়ে নিজেকে আলাদা, absolute, একক বলে ভাবতে চায়। কিন্তু লরেন্স মনে করিয়ে দেন, mind বা মন নিজে নিজে সম্পূর্ণ অস্তিত্ব নয়; তা জলের ওপর সূর্যের ঝিলিকের মতো। ঝিলিক আছে, তীব্রতা আছে, সৌন্দর্য আছে, কিন্তু তার উৎস বৃহত্তর। মানুষ যদি কেবল নিজের মনের মধ্যে আটকে থাকে, তবে সে জীবনের দেহী, জৈব, বিশ্বজনীন সংযোগ হারায়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক মানুষের জন্য বিশেষ জরুরি। আমাদের যুগে ব্যক্তিসত্তাকে নিয়ে আলোচনার বিস্তার অনেক। psychology, therapy, selfhood, identity, trauma, authenticity, productivity, mindfulness, এই সব শব্দে চারপাশ ভরে আছে। কিন্তু অনেক সময় এই আলোচনা মানুষকে নিজের ভেতরের দিকে ফিরিয়ে আনলেও, তাকে বৃহত্তর জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। মানুষ তখন নিজের ক্ষত, নিজের উদ্বেগ, নিজের আকাঙ্ক্ষা, নিজের পরিচয়, নিজের বর্ণনা, নিজের narrative-এর মধ্যে এমনভাবে আবদ্ধ হয় যে, পৃথিবী, সমাজ, ভাষা, ইতিহাস, অন্য মানুষ, জীবনের জৈব ঐক্য, এগুলি পেছনে সরে যায়। লরেন্সের ভাবনা এখানে একটি correction এনে দেয়। তিনি বলেন, নিজের ভেতরের অরণ্যকে চিনো, কিন্তু অরণ্যকে universe থেকে বিচ্ছিন্ন ভেবো না। নিজের দেবতাকে মানো, কিন্তু অন্যের দেবতাকেও চিনো। নিজের জীবনকে গ্রহণ করো, কিন্তু তাকে বৃহত্তর জীবনের প্রবাহে স্থাপন করো।
কারেন হর্নি মানুষের inner conflicts বা অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়ে যে কাজ করেছেন, তার সঙ্গে এই আলোচনার গভীর সম্পর্ক আছে। হর্নি দেখিয়েছিলেন, মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা, স্বীকৃতি, স্বাধীনতা, ক্ষমতা, স্নেহ, দূরত্ব, আত্মরক্ষা, আত্মপ্রসার, এই সব প্রবণতা অনেক সময়ে পরস্পরের বিরোধে দাঁড়ায়। মানুষ কখনও মানুষের দিকে এগোয়, কখনও মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, কখনও মানুষ থেকে দূরে সরে যায়। এই তিন গতির মধ্যে, movement toward, movement against, movement away, আধুনিক স্নায়বিকতার একটি মানচিত্র পাওয়া যায়। লরেন্সের দেবতা-চিন্তার সঙ্গে হর্নির মনোবিশ্লেষণী ভাষা আলাদা হলেও, দুজনেই মানুষের ভেতরের এককেন্দ্রিকতার ধারণাকে প্রশ্ন করেন। মানুষকে সুস্থ করতে হলে তাকে একমাত্রিক করা যায় না; তাকে তার অন্তর্দ্বন্দ্বের সঙ্গে পরিচিত হতে হয়, নিজের আকাঙ্ক্ষার উৎস চিনতে হয়, এবং ধীরে ধীরে এমন এক কেন্দ্র তৈরি করতে হয়, যা কোনও এক প্রবণতার বন্দী নয়।
জন ম্যাকমারের wholeness বা পূর্ণতার ধারণাও এই জায়গায় এসে মিলিত হয়। ম্যাকমারে মানুষের সত্তাকে কেবল চিন্তার সত্তা হিসেবে দেখেননি; তিনি action, relation, personal life, এই সবের ওপর জোর দিয়েছিলেন। মানুষ ভাবনার মধ্যে সম্পূর্ণ হয় না, সম্পর্ক ও কর্মের মধ্যে সে নিজের পরীক্ষা দেয়। যে মানুষ নিজেকে কেবল অন্তর্মুখী বিশ্লেষণে খুঁজে বেড়ায়, সে অসম্পূর্ণ থাকে; যে মানুষ নিজের ভেতরকে না জেনে কেবল বাহ্যিক কাজে ছুটে চলে, সেও অসম্পূর্ণ। পূর্ণতার জন্য দরকার আত্মজ্ঞান, দায়িত্ব, সম্পর্ক, কর্ম, এবং অন্য মানুষের সামনে নিজেকে সত্য রাখার ক্ষমতা। ফলে ব্যক্তিসত্তার অরণ্য, সমাজের নৈতিকতা, প্রেমের গ্রহণশক্তি, দেহী জীবনের cosmos-সংযোগ, সবই মিলে মানুষকে একটি বৃহত্তর পাঠের দিকে নিয়ে যায়।
এই পাঠ সহজ নয়, কারণ মানুষ নিজের সম্পর্কে এমন সত্য জানতে চায় না যা তার সাজানো self-image-কে ভেঙে দেয়। আমরা নিজেদের কাছে অনেক সময়ে এক সংক্ষিপ্ত, সম্মানজনক, নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য autobiography রেখে দিই। কিন্তু গভীর পাঠ, সে গ্রন্থের হোক অথবা নিজের আত্মার, সেই autobiography-কে প্রশ্ন করে। বই যেমন পাঠককে নিজের অজানা জায়গায় নিয়ে যায়, তেমনি আত্মপাঠ মানুষকে নিজের অরণ্যে নিয়ে যায়। সেখানে আলো আছে, কিন্তু আলোই সব নয়; সেখানে অন্ধকার আছে, কিন্তু অন্ধকারও শেষ কথা নয়; সেখানে শব্দ আছে, কিন্তু শব্দের পেছনে অর্থের অপেক্ষা আছে। সংস্কৃতি, সাহিত্য, দর্শন, মনোবিশ্লেষণ, প্রেম, দুঃখ, সবই মানুষের এই আত্মপাঠের সহযাত্রী।
মানুষের পরিণত জীবন সম্ভবত শুরু হয় তখনই, যখন সে বুঝতে পারে, নিজের সব অংশকে সঙ্গে নিয়েই তাকে বাঁচতে হবে। নিজের মধ্যে যে ভীরুতা আছে, তাকে চিনতে হবে; যে নিষ্ঠুরতা আছে, তাকে সংযত করতে হবে; যে কোমলতা আছে, তাকে লজ্জা না পেয়ে গ্রহণ করতে হবে; যে আকাঙ্ক্ষা আছে, তাকে অন্ধ দেবতা হতে দেওয়া যাবে না; যে সৃজনশক্তি আছে, তাকে দৈনন্দিনতার ধুলোর নিচে মরে যেতে দেওয়া যাবে না; যে অপরাধবোধ আছে, তাকে আত্মধ্বংসে পরিণত না করে দায়িত্বে রূপান্তরিত করতে হবে। নিজের মধ্যে কোনও অংশকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করলে তা ছায়ায় গিয়ে আরও শক্তিশালী হয়; কোনও অংশকে সম্পূর্ণ ক্ষমতা দিলে তা মানুষকে গ্রাস করে। তাই সচেতনতা মানে ownership without enslavement, নিজের সব অংশের মালিকানা গ্রহণ, কিন্তু কোনও অংশের দাসত্ব নয়।
ভালবাসার ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা প্রযোজ্য। কাউকে ভালবাসা মানে তার chosen face, social face, pleasing face, এইটুকুকে গ্রহণ করা নয়। মানুষকে ভালবাসতে হলে তার অরণ্যের সম্ভাবনাকে বুঝতে হয়, যদিও সেই অরণ্যে সম্পূর্ণ প্রবেশাধিকার কখনও পাওয়া যায় না। যে মানুষকে আমরা অনেক বছর ধরে চিনি, তার মধ্যেও অচেনা দেবতা আসতে পারে। সে বদলাবে, ভাঙবে, উঠবে, হারাবে, ফিরে আসবে। প্রেমের পরিপক্বতা এই বদলকে আতঙ্ক হিসেবে না দেখে, জীবনপ্রবাহ হিসেবে দেখার মধ্যে। এতে boundaries বা সীমা অপ্রয়োজনীয় হয় না; বরং সীমা আরও প্রয়োজনীয় হয়, কারণ গ্রহণশীলতা আর আত্মবিলোপ এক জিনিস নয়। প্রেমের পরিণত রূপে আছে গ্রহণ, দায়, সততা, দূরত্বের জ্ঞান, এবং অন্যের অরণ্যকে দখল না করার নৈতিক সংযম।
লরেন্স আমাদের যে শিক্ষা দেন, তা ব্যক্তিসত্তা নিয়ে কোনও সহজ সূত্র নয়। তিনি আমাদের বলেন না যে মানুষকে কেবল নীতি দিয়ে মাপতে হবে, আবার এটাও বলেন না যে মানুষ কেবল প্রবৃত্তির স্বাধীনতায় মুক্ত। তিনি মানুষের আত্মাকে অরণ্য বলেন, কারণ সেখানে জীবন আছে, অন্ধকার আছে, বিপদ আছে, দেবতার আগমন আছে, রহস্য আছে। তিনি known self-কে clearing বলেন, কারণ মানুষ নিজেকে আংশিক জানে। তিনি দেবতাদের আসতে-যেতে দিতে বলেন, কারণ জীবন্ত মানুষকে স্থির পাথর বানানো যায় না। তিনি জীবনের flesh-কে উদ্যাপন করেন, কারণ বিমূর্ত মন অনেক সময়ে জীবনের দেহী বিস্ময় ভুলে যায়। তিনি cosmos-এর অংশ হিসেবে মানুষকে দেখেন, কারণ আত্মার যুদ্ধকে একমাত্র সত্য ভেবে বসলে মানুষ জীবনের বিশালতা হারায়।
এই ভাবনা থেকে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়, তা হল, মানুষকে বুঝতে হলে তাকে খণ্ডে খণ্ডে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায়, কিন্তু তাকে বাঁচাতে হলে তার সমগ্রতাকে চিনতে হয়। আমরা আমাদের রাগ, ভয়, প্রেম, লজ্জা, আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি, শরীর, ভাষা, সম্পর্ক, সমাজ, ইতিহাস, সব নিয়ে মানুষ। আমাদের মধ্যে বহু দেবতা আসে, বহু দেবতা ফিরে যায়। আমাদের কাজ তাদের সিংহাসন দেওয়া নয়, তাদের নির্বাসন দেওয়াও নয়; আমাদের কাজ তাদের আগমন চিনে রাখা, তাদের শক্তির উৎস বোঝা, তাদের সঙ্গে দায়িত্বশীল সম্পর্ক স্থাপন করা। এই সম্পর্কই আত্মশাসন, এই সম্পর্কই আত্মপ্রেম, এই সম্পর্কই অন্যকে ভালবাসার প্রাথমিক নৈতিকতা।
জীবনের প্রতি শেষ সম্মতি এখানেই। অরণ্য অন্ধকার বলে তাকে কেটে ফেলতে হবে না; অরণ্য রহস্যময় বলে তাতে হারিয়ে যেতে হবে না। clearing ছোট বলে তাকে অবজ্ঞা করার দরকার নেই; ছোট উন্মুক্ত ভূমিতেই মানুষ আগুন জ্বালে, কথা বলে, গান গায়, প্রার্থনা করে, সিদ্ধান্ত নেয়, অন্যের মুখ দেখে। মানুষ সেই অরণ্য এবং সেই clearing, সেই দেবতা এবং সেই দায়, সেই দেহ এবং সেই মন, সেই একাকিত্ব এবং সেই মানবসমাজের অংশ। এইসব নিয়েই তাকে বলতে হয়, হ্যাঁ, আমি জীবিত; হ্যাঁ, আমি অসম্পূর্ণ; হ্যাঁ, আমি বৃহত্তর জীবনের সঙ্গে যুক্ত; হ্যাঁ, এই ক্ষণস্থায়ী দেহী অস্তিত্বের মধ্যেই আমার বিস্ময়, আমার ভরসা, আমার পাঠ, আমার দায়িত্ব।
রিটন খান





