পুরুষ হওয়া মানে কী?
পুরুষত্ব যেন একটা নির্দিষ্ট সফটওয়্যার প্যাকেজ—ইনস্টল করলেই কাজ হয়ে যাবে। যেন এর একটা চেক-লিস্ট আছে: অর্থ, পেশি, সাফল্য, কর্তৃত্ব, নির্লিপ্ততা এবং জয়।
এই প্রশ্নটা শুনলেই আমাদের সমাজ খুব দ্রুত দু’টো আলমারি খুলে বসে। একটায় রাখা থাকে লোহার ডাম্বেল, দাঁত চেপে সহ্য করার উপদেশ, গোঁফে তেল, “ছেলেরা কাঁদে না” জাতীয় ফসিল। আরেকটায় থাকে আতঙ্ক, অপমান, অযোগ্যতার ভয়, প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার জ্বালা, চাকরি না-পাওয়ার হীনম্মন্যতা, আর সেই সব ব্যর্থতার দায় কার ঘাড়ে চাপানো যায় তার প্রস্তুত তালিকা। প্রথম আলমারিটা ড্রইংরুমে সাজানো। দ্বিতীয়টা খাটের নীচে। লুই থেরুর নতুন ডকুমেন্টারি Inside the Manosphere (Netflix) সেই খাটের নীচের আলমারিটার দিকেই টর্চ ধরতে চেয়েছে। আর টর্চ পড়তেই দেখা গেল, ওমা, এ তো নিছক “পুরুষালি আত্মবিশ্বাস” নয়, এ এক অদ্ভুত ব্যবসা, আধুনিক কুঠিরশিল্প, যেখানে ছেলেদের অনিশ্চয়তাকে কিমা বানিয়ে তার থেকে বানানো হচ্ছে মতাদর্শ, মার্চেন্ডাইজ, কোর্স, ক্লিপ, ক্লিক, ক্যাশ।
নেটফ্লিক্স একে বলছে “নো-হোল্ডস-বার্ড” তদন্ত, “আল্ট্রা-ম্যাসকিউলিন নেটওয়ার্ক”-এর ভিতর ঢুকে দেখা। ভাষাটা যথেষ্ট সিনেম্যাটিক। যেন একটু পরেই ধোঁয়া কেটে দেখা যাবে, পাঁচজন লোক চামড়ার জ্যাকেট পরে দাঁড়িয়ে আছে, পেছনে মোটরবাইক, সামনে পিতৃতন্ত্র। কিন্তু বাস্তবের ম্যানোস্ফিয়ার এতটা স্টাইলিশ নয়। বরং বেশি চেনা, বেশি সস্তা, বেশি গা-সওয়া। এখানে “traditional masculinity” বলে যা ফেরি করা হয়, তার সারকথা মোটামুটি এই: পুরুষ শাসন করবে, নারী মানবে, সম্পর্কে ক্ষমতা একদিকে থাকবে, আবেগের বদলে আধিপত্য হবে মুদ্রা, আর জীবনের প্রতিটি জটিল সমস্যার উত্তর নাকি পাওয়া যাবে দু’একটা বুলি মুখস্থ করলেই। “রেড পিল”, “দ্য ম্যাট্রিক্স”, “ওয়েজ স্লেভ”, “পুরুষরা আজ বঞ্চিত” ইত্যাদি শব্দবন্ধগুলো এমন ভঙ্গিতে পরিবেশন করা হয় যেন সক্রেটিস, নীৎশে আর জিমের ট্রেনার মিলে গোপনে একখানা পিডিএফ লিখে দিয়েছেন, আর সেটাই সভ্যতার শেষ সত্য।
এই দুনিয়ার বড় বড় মুখগুলো নিজেদের এমন ভাবে হাজির করে যেন তারা শুধু সফল নয়, সাফল্যের পাইকারি ডিলার। তাদের চারপাশে টাকা, গাড়ি, ফিটনেস, দামি ঘড়ি, কমবয়সী নারী, আত্মবিশ্বাসের কৃত্রিম আলো। তারা বলছে, এই দেখো, আমরা বেরিয়ে এসেছি সিস্টেমের বাইরে, তোমরাও বেরিয়ে আসো। যেন প্লেটোর গুহা থেকে নয়, দুবাইয়ের বিজনেস লাউঞ্জ থেকে আলোর দেখা মিলছে। তারা কোর্স বেচে, সাবস্ক্রিপশন বেচে, জীবনদর্শন বেচে, আর সব কিছুর নীচে বিক্রি করে একটাই বস্তু: insecurity-এর ওপর চড়া সুদে আশা। কুড়ির কোঠায় দাঁড়ানো এক যুবক যদি ভাবে তার সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, সে এখনও ধনী নয়, বিখ্যাত নয়, কাঙ্ক্ষিত নয়, তাহলে এই লোকগুলো এসে বলে, সমস্যা তোমার নয়, সমস্যার নাম feminism, equality, softness, compassion, modern society, women’s rights, কখনও immigrants, কখনও minorities, কখনও Jews, কখনও “the weak.” অর্থাৎ নিজের ব্যর্থতার কারণ নিজের মধ্যে খুঁজতে হবে না, একটা তৈরি শত্রু আছে, সেটাকে ঘৃণা করো, আর সেই ঘৃণাকে নিজের ব্যক্তিত্ব বলে চালাও।
থেরু যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ এতদিন ধরেই এই ব্যবসায় পাকা যে ক্যামেরার সামনে বসেও তারা জানে কখন শক ভ্যালু দিতে হবে, কখন রেগে যেতে হবে, কখন “আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন” বলতে হবে, আর কখন এমন একটা কথা ছুড়ে দিতে হবে যাতে ক্লিপ ভাইরাল হয়। কারণ ম্যানোস্ফিয়ারের অর্থনীতি একেবারেই সরল: যত বেশি বিভাজন, তত বেশি মনোযোগ; যত বেশি মনোযোগ, তত বেশি অনুসারী; যত বেশি অনুসারী, তত বেশি বিক্রি। এখানে misogyny কেবল মতাদর্শ নয়, content strategy-ও বটে। নারীকে হেয় করা, সম্পর্ককে ক্ষমতার খেলা বানানো, সহমর্মিতাকে দুর্বলতা বলা, সমতার ধারণাকে পুরুষবিদ্বেষ বলে তুলে ধরা, সবই একটা পণ্য-পরিকল্পনার অংশ। একসময় বিষবিজ্ঞানে শোনা যেত, বিষও ওষুধ হতে পারে ডোজ়ের তারতম্যে। এখানে উল্টোটা হয়েছে। ওষুধের শিশিতে ভরা হচ্ছে বিষ, তার গায়ে লেবেল লাগানো হচ্ছে self-improvement।
সবচেয়ে লক্ষণীয় হলো, অনেক তরুণ প্রথমে এই কনটেন্ট দেখেছে “মজার” বলে, “জোকস” বলে, “হালকা” বলে। ক্লিপে কেউ কোনও outrageous কথা বলছে, লোকে হেসে উড়িয়ে দিচ্ছে, algorithm বলছে, বাহ, তুমি আগ্রহী, এই নাও আরও কিছু। তারপর একটু একটু করে রসিকতা মতাদর্শে বদলে যায়। প্রথমে meme, পরে mantra। প্রথমে irony, পরে identity। এই পথটা খুব নতুন নয়। ইতিহাসে বহু বিষাক্ত ধারণাই মশকরা, ব্যঙ্গ, আড্ডা, ক্লাব-সংস্কৃতি, “আরে বললামই তো”র রাস্তা ধরে স্বাভাবিকতা অর্জন করেছে। বিষ যদি সরাসরি পান করাতে যাও, মানুষ সন্দেহ করে। লেমনেডে মিশিয়ে দাও, অনেকে তফাত টেরই পায় না।
ডকুমেন্টারি দেখে যে কয়েকজন তরুণের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ সত্য ফুটে ওঠে। তারা বলছে, আগে এসব কনটেন্টকে মজা মনে হতো, পরে বুঝছে, এ শুধু মজা নয়। কেউ বলছে, বন্ধুরা বদলে গেছে, সম্পর্ক ছিঁড়ে ফেলছে, কারণ তাদের শেখানো হয়েছে, “তুমি ধনী না হলে তোমার কোনও দাম নেই”, “যারা তোমার growth-এ কাজে লাগে না তাদের বাদ দাও”, “বন্ধুত্বও investment.” পুঁজিবাদ যখন জীবনের সব কিছুকেই বাজারে তোলে, তখন বন্ধুত্বও LinkedIn endorsement হয়ে যায়, প্রেম KPI হয়ে যায়, আর masculinity হয়ে যায় start-up pitch। পুরুষ হওয়া মানে তখন মানুষ হওয়া নয়, বরং ছোটখাটো এক কর্পোরেট প্রকল্প হওয়া। নিজের শরীর brand, নিজের গার্লফ্রেন্ড status symbol, নিজের দুঃখ weakness, নিজের সহিংসতা authenticity।
এখানে একটা জিনিস বুঝতে হবে। ম্যানোস্ফিয়ারের প্রভাব শুধু নারী সম্পর্কে খারাপ মতামত তৈরি করা নয়। এটি পুরুষদের কাছ থেকেও পুরুষত্ব কেড়ে নেয়। কারণ এটি তাদের শেখায় না কী করে ভালো মানুষ হতে হয়, কী করে স্নায়ুর ভিতর ভাঙনের শব্দ শুনেও টিকে থাকতে হয়, কী করে বন্ধুত্ব করতে হয়, প্রত্যাখ্যান সামলাতে হয়, ব্যর্থতা মেনে নিতে হয়, ঈর্ষা চিনতে হয়, কষ্টকে ভাষা দিতে হয়, ক্ষমতাকে দায়িত্বে বদলাতে হয়। বরং শেখায়, vulnerability লুকাও, জোরে কথা বলো, dominance দেখাও, সন্দেহকে রাগে অনুবাদ করো, আর যাকে বোঝো না তাকে অবমাননা করো। ফলত যে তরুণটি প্রথমে guidance খুঁজতে গিয়েছিল, সে guidance নয়, costume পায়। বাইরে armor, ভিতরে panic।
অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, ছেলেরা তবে এ সবের দিকে যাচ্ছে কেন? এখানে “ওরা খারাপ” বলে হাত ধুয়ে ফেললে হবে না। কিছু তরুণের বক্তব্যে যে অসহায়তার সুর শোনা যায়, সেটা সত্যি। দীর্ঘদিন পড়াশোনা করেও কাজ নেই, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, সমাজে মর্যাদা নেই, বাড়িভাড়া বাড়ছে, সুযোগ কমছে, যুবক হওয়া যেন ক্রমশ এক দীর্ঘ ওয়েটিং রুম। এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় ভেঙে পড়া community life, youth centre-এর অভাব, শিল্প-সংস্কৃতিতে বিনিয়োগ কমে যাওয়া, অর্থাৎ এমন জায়গার অভাব যেখানে তরুণরা নিজেদের গড়তে পারে, ব্যর্থ হতে পারে, শিখতে পারে, বন্ধুত্ব করতে পারে, তাহলে তারা কোথায় যাবে? যাবে স্ক্রিনে। আর স্ক্রিন কোনও নিরপেক্ষ শিক্ষক নয়। স্ক্রিন মমতাময় মশাই নন, স্ক্রিন শক-দেবতা। সে আপনাকে সেই কনটেন্টই খাওয়াবে যা আপনাকে বেশি সময় আটকে রাখে। আর ঘৃণা, অপমান, আধিপত্য, উত্তেজনা, ষড়যন্ত্র, সহজ শত্রু, দ্রুত সাফল্যের প্রতিশ্রুতি, এ সবই মনোযোগ-শিল্পের প্রিয় উপাদান।
অর্থাৎ ম্যানোস্ফিয়ারকে কেবল সাধারণ সমস্যার মতো দেখলে ভুল হবে। এটা সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, মানসিক, সাংস্কৃতিক সব মিলিয়ে তৈরি এক জট। বেকারত্ব আছে, বিচ্ছিন্নতা আছে, algorithmic amplification আছে, spectacle economy আছে, masculine anxiety আছে, আর আছে বহু পুরনো পিতৃতান্ত্রিক কল্পনা, যেগুলো এখন রিং লাইট, পডকাস্ট মাইক, শোর্টস, রিলস, কোর্স ফানেল, ডিসকর্ড সার্ভার, সাবস্ক্রিপশন পেওয়ালের হাত ধরে নতুন জীবন পেয়েছে। আগেকার দিনে গ্রামে গ্রামে যাঁরা তেল বেচতেন, তাঁরা অন্তত মাথায় মালিশের প্রতিশ্রুতি দিতেন। এরা মগজে কেরোসিন ঢেলে বলে empowerment।
থেরুর ছবির একটা সীমাবদ্ধতাও আছে। অনেকে বলছেন, নতুন কিছু জানাল না। সেটাও ঠিক। যারা এই দুনিয়া অনেক দিন ধরে দেখছে, তাদের কাছে খুব চমকপ্রদ লাগার কথা নয়। আবার এটাও সত্যি, mainstream দর্শকের কাছে এই জগতের রুক্ষ ভিতরটা পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কাজে এর গুরুত্ব আছে। সব কাজ অগ্নিবাণ নিক্ষেপ নয়। কিছু কাজ দরজা খুলে দেওয়া। এই ডকুমেন্টারি হয়তো সেই কাজটাই করছে। তবে সমালোচনা এখানেই থামে না। ছবিতে নারী-স্বরে ঘাটতি আছে, নারীর অভিজ্ঞতা তুলনায় কম এসেছে, অথচ misogyny-র আসল অভিঘাত তো শেষ পর্যন্ত নারীর শরীর, মন, নিরাপত্তা, সম্পর্ক, সামাজিক অস্তিত্বের ওপরেই পড়ে। যদি আমরা কেবল পুরুষ-সংকটের নাটক দেখে যাই, আর নারী-ক্ষতকে backstory বানিয়ে রাখি, তা হলে ছবিটা অসম্পূর্ণই থাকবে।
কারণ ম্যানোস্ফিয়ার নিছক কিছু বখাটে উক্তি বা আপত্তিকর জোকসের সমষ্টি নয়। এর সঙ্গে বাস্তব জীবনের সহিংসতার সংযোগ আছে। নারীকে মানুষ নয়, শ্রেণি হিসেবে দেখতে শেখানো হলে সম্পর্ক বদলে যায়। সমতাকে অপমান বলে শেখানো হলে প্রেম বদলে যায়। যখন নারীকে প্রতারক হিসেবে শেখানো হয়, তখন তা ঘনিষ্ঠতাকে বদলে দেয়। মেয়েদের ‘অধীনস্থ’ হওয়া উচিত; এই ধারণা শুধু শয়নকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি কর্মক্ষেত্র, সংসার, ডেটিং, স্কুল, সংসদ, মন্তব্য বিভাগ, গালি, হাতের চাপ, নীরব হুমকি, এমনকি প্রকাশ্য মারধরের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। চিন্তা কখনও অমূর্ত থাকে না; প্রতিটি মতাদর্শই শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেয়। এই কারণেই নারী-অধিকার সংগঠনগুলি এই বিষয়টিকে কেবল অস্বস্তিকর নয়, বরং “অপরিহার্য দর্শন” বলে অভিহিত করছে। কারণ এই অস্বস্তি প্রায়শই শিক্ষার প্রথম সোপান।
তবে একটা কথা স্পষ্ট করে বলতেই হয়। ম্যানোস্ফিয়ারের উত্থানকে যদি আমরা শুধু “খারাপ পুরুষদের দোষ” বলে চালাই, তা হলে সমস্যার অর্ধেকও বুঝব না। এখানে আছে পুরুষদের এক গভীর বিভ্রান্তি। তাদের বলা হয়েছে, সফল না হলে তুমি কেউ নও। পুরুষদের সামনে কেবল একটি পথ খোলা রাখা হয়েছে: অবিরাম ‘পারফর্ম’ করা। যেন মানুষ হওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই।
ধনী না হলে, তাদের প্রেম পাওয়ার অধিকার নেই।
দুর্বলতা প্রকাশ করলে, তারা হয় হাস্যকর।
সহমর্মী হলে, তাদের বলা হয় ‘নরম’ (soft)।
নারীর সমতাকে স্বীকৃতি দিলে, তারা হয় ‘শাসিত’ বা dominated।
তাদের ক্রমাগত অভিনয় করে যেতে হয়; সম্পদের, কাঠিন্যের, নিয়ন্ত্রণের, এবং অভেদ্যতার। এই অভিনয় করতে গিয়ে ভেতরের মানুষটি যখন শুকিয়ে যায়, তখন একদল ইনফ্লুয়েন্সার এসে সান্ত্বনা দেয়: তোমার এই কষ্টের নাম ‘জ্ঞানার্জন’ (enlightenment), তোমার এই রাগের নাম ‘সত্য’ (truth), তোমার এই একাকীত্বের নাম ‘আলফা যাত্রা’ (alpha journey)। কিন্তু রোগের নাম বদলালেই কি রোগ সেরে যায়?
‘পুরুষ হওয়া মানে কী’—এই প্রশ্নটির উত্তর ম্যানোস্ফিয়ার দিতে পারে না। তাদের আগ্রহ পুরুষে নয়, ক্ষমতায়; মানুষে নয়, পদমর্যাদায় (hierarchy-তে); সম্পর্কে নয়, সুবিধা-গ্রহণে (leverage-এ); পরিণতিতে নয়, সাফল্যে (performance-এ)। তারা পুরুষকে শেখায় কেবল কীভাবে জিততে হয়, কিন্তু শেখায় না কীভাবে বাঁচতে হয়। শেখায় কীভাবে দাপট দেখাতে হয়, কিন্তু শেখায় না কীভাবে লজ্জা সামলাতে হয়। শেখায় কীভাবে হুকুম করতে হয় (command করতে হয়), কিন্তু শেখায় না কীভাবে যত্ন নিতে হয় (care করতে হয়)। শেখায় কীভাবে নারীকে সন্দেহ করতে হয়, কিন্তু শেখায় না কীভাবে নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়। ফলস্বরূপ, তারা একধরনের কার্টুন-পুরুষ তৈরি করে; যার চোয়াল, বুক, ঘড়ি এবং অনুসারী আছে, কিন্তু নৈতিক মেরুদণ্ড আছে কি না, সেই প্রশ্ন তুলতেই তারা মানা করে।
“পুরুষ হওয়া” বিষয়টিকেই অনেক সময় ভুলভাবে দেখা হয়। মনে করা হয়, পুরুষত্ব যেন একটা নির্দিষ্ট সফটওয়্যার প্যাকেজ—ইনস্টল করলেই কাজ হয়ে যাবে। যেন এর একটা চেক-লিস্ট আছে: অর্থ, পেশি, সাফল্য, কর্তৃত্ব, নির্লিপ্ততা এবং জয়। অথচ মানুষ হওয়ার কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই। একজন পুরুষের সত্যিকারের ক্ষমতা কতজনকে হারাল তাতে প্রমাণিত হয় না, বরং কাকে আঘাত না-করে সে থামতে পারল তাতে। তার শক্তি কত জোরে গর্জন করল তাতে নয়, বরং কত সততার সঙ্গে সে নিজের ভয়কে চিনল তাতে। সে কতজনকে নিয়ন্ত্রণ করল তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কতজনের সঙ্গে সে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করল। যে পুরুষ নিজের অনিশ্চয়তাকে ঘৃণায় রূপান্তর না-করে বুঝতে শেখে, প্রত্যাখ্যানকে অপমান না-ভেবে অভিজ্ঞতা বলে মেনে নিতে শেখে, নারীর স্বাধীনতাকে নিজের পুরুষত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে না-দেখে মানবিক ন্যায় বলে বোঝে, সেও পুরুষ। বরং সম্ভবত সেখানেই পুরুষ হওয়া শুরু।
আজকের ডিজিটাল বাজারে পুরুষত্বর বহু ফেরিওয়ালা আছে। পুরুষত্ব বা “be a man” বলতে ভিন্ন ভিন্ন ধারণা বোঝানো হয়। কারও মতে, এর অর্থ হলো না কাঁদা, অর্থাৎ আবেগ সংবরণ করা। আবার কেউ মনে করেন, এর অর্থ আধিপত্য বিস্তার করা (dominate)। অনেকের কাছে এর মানে উপার্জন করা। আবার কারও কারও ধারণা, এর মানে হলো নারীদের “তাদের নির্দিষ্ট স্থানে” রাখা। কিন্তু হয়তো প্রশ্নটা একটু অন্য রকম হওয়া উচিত। মানুষ হিসাবে তুমি কী রকম? ক্ষমতা পেলে কী করো? অপমান পেলে কী করো? না-পাওয়াকে কী ভাবে বহন করো? কাকে দোষ দাও? কাকে রক্ষা করো? কাকে শুনতে পারো? কাকে সমান ভাবতে পারো? নিজের ভাঙনকে কিসে মেরামত করো? যদি উত্তর শুধু এতটাই হয় যে “আমি প্রমাণ করব আমি উচ্চতর”, তা হলে সেটা পুরুষত্ব নয়, আত্মার ইনসিকিউরিটির জিম-মেম্বারশিপ।
Inside the Manosphere এই পুরো সমস্যার শেষ কথা নয়।যে তরুণটি প্রথমে কৌতুক দেখে এসেছিল, সে যদি পরে বুঝতে পারে, এ কৌতুক নয়, এ ফাঁদ, তা হলে ছবির কিছু কাজ হয়েছে। যে অভিভাবক, শিক্ষক, বন্ধু, সমাজকর্মী, নীতিনির্ধারক এতদিন ভেবেছিলেন এসব কেবল internet nonsense, তিনি যদি এখন দেখেন এর ভিতরে ব্যবসা আছে, মতাদর্শ আছে, সহিংসতার সূত্র আছে, তা হলেও কাজ হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ডকুমেন্টারি যতই হোক, সমাজ যদি তরুণদের জন্য সম্মানজনক জীবন, কাজের সুযোগ, সম্প্রদায়, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সম্পর্কবিষয়ক শিক্ষা, আর সমতার ভাষা তৈরি না করে, তা হলে শূন্যস্থান আবারও কেউ না কেউ এসে ভরবে। ইতিহাসে শূন্যস্থান কখনও খালি থাকে না। শুধু প্রশ্ন, সেখানে শিক্ষক বসবে, না ঠগ?
পুরুষ হওয়া মানে কী? সম্ভবত এ নয় যে নারীর উপর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এ নয় যে কষ্টকে ঘুষি বানাতে হবে। এ নয় যে নিজেকে বাজারে ব্র্যান্ড করে তুলতে হবে। এ নয় যে ভালোবাসাকে অধিকার ভাবতে হবে। পুরুষ হওয়া মানে হয়তো এইটুকুই: নিজের শক্তিকে অন্যের ভয়ের কারণ না-করে, নিরাপত্তার কারণ করা। নিজের অনিশ্চয়তার দায় অন্যের স্বাধীনতার উপর না-চাপানো। নিজের ক্ষতকে মতাদর্শের লাইসেন্স না-বানানো। আর মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা, target audience, dating market, status ladder, gender role, content niche হিসেবে নয়।
কারণ শেষ পর্যন্ত, ম্যানোস্ফিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রতারণা এইখানেই। তারা ছেলেদের বলে, তোমরা হারিয়ে গেছ। তারপর পথ দেখানোর বদলে বিক্রি করে গোলকধাঁধা।
ডকুমেন্টারির লিঙ্কঃ https://www.netflix.com/title/81920687



