যে শব্দটি ইংরেজরা ভারত থেকে লুট করে নিয়ে গেল
লুট।
শব্দটা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে একটা পরিষ্কার দৃশ্য ভেসে ওঠে। দরজা ভাঙা, সিন্দুক খোলা, উঠোনে ছড়ানো বাসনপত্র, কারও হাতে গয়নার বাক্স, কারও বগলে কাপড়ের পুঁটলি। যে যা পাচ্ছে নিয়ে দৌড় দিচ্ছে। কেউ হয়তো একটা বিশাল পিতলের হাঁড়ি মাথায় তুলে ছুটছে। হাঁড়িটা কেন নিচ্ছে, বাড়িতে কোথায় রাখবে, তাতে রান্না করার মতো পরিবার তার আছে কি না, এসব প্রশ্ন করার সময় নেই। লুটের সময় মানুষের প্রয়োজনের চেয়ে হাতের গতি বেশি থাকে।
আমাদের ঢাকাইয়া কুট্টিরা হলে এই দৃশ্য দেখে বলত,
“হালার পোলা, ঘরে ভাত নাই, চুরি করছে ফুলদানি!”
মানুষ অনেক কিছুই লুট করে। টাকা লুট করে, জমি লুট করে, গয়না লুট করে, রাষ্ট্র লুট করে। ইংরেজরা ভারতবর্ষে এসে এগুলো সবই করেছে। তবে তাদের একটি বিশেষ কৃতিত্ব আছে। তারা লুট করতে করতে শেষে ‘লুট’ শব্দটাও লুট করে নিয়ে গেছে।
অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারির সূত্রে জানা যায়, আঠারো শতকের শেষভাগের আগে উত্তর ভারতের সমতলভূমির বাইরে শব্দটি খুব বেশি শোনা যেত না। অথচ অল্প দিনের মধ্যেই শব্দটি ব্রিটেনে এমনভাবে চালু হয়ে গেল, যেন লন্ডনের কোনও পুরোনো পাড়ায় তার জন্ম। ইংরেজি ভাষায় এর প্রথম দিকের লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় ১৭৮৮ সালের Indian Vocabulary নামের একটি গ্রন্থে। সেখানে loot শব্দের অর্থ দেওয়া হয়েছিল plunder বা pillage। শব্দটির উৎস হিন্দি লুট, তারও পেছনে সংস্কৃতের লুণ্ঠনজাতীয় শব্দমূল।
ইংরেজদের একটা গুণ স্বীকার করতেই হবে। তারা বিদেশে গিয়ে কোনও জিনিস পছন্দ করলে সহজে ছাড়ত না। মসলার স্বাদ ভালো লেগেছে, নিয়ে গেছে। মসলিন ভালো লেগেছে, নিয়ে গেছে। হীরে ভালো লেগেছে, নিয়ে গেছে। রাজস্ব ভালো লেগেছে, নিয়ে গেছে। সিংহাসনের পাশে রাখা রুপোর হুক্কা ভালো লেগেছে, সেটাও গেছে। শেষে দেখল, এই সমগ্র কর্মকাণ্ডকে এক কথায় প্রকাশ করার জন্য স্থানীয় মানুষের কাছে একটি বেশ ঝরঝরে শব্দ আছে।
লুট।
দুই অক্ষরের শব্দ। উচ্চারণে কোনও কষ্ট নেই। অভিধানে জায়গাও কম লাগে। কাজের সঙ্গে এমন চমৎকার মিল যে ইংরেজরা নিশ্চয়ই শুনে বলেছিল,
“বাহ! জিনিসপত্রের সঙ্গে শব্দটাও প্যাক করে দাও।”
শব্দের যাত্রা অনেক সময় মানুষের যাত্রার চেয়েও আশ্চর্য। কোনও শব্দ ব্যবসায়ীর নৌকায় ওঠে, কোনও শব্দ সৈন্যের মুখে মুখে ঘোরে, কোনও শব্দ কেরানির রিপোর্টে ঢুকে পড়ে। ‘লুট’ শব্দটি ইংরেজিতে প্রবেশ করেছিল সাম্রাজ্যের বুটের তলায় চাপা পড়ে। তার পাসপোর্ট ছিল না, কিন্তু সঙ্গে ছিল সোনা, রুপো, জমির খাজনা, পরাজিত রাজাদের ধনরত্ন এবং বহু মানুষের দীর্ঘশ্বাস।
এই জায়গায় আমাদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কথা বলতে হবে।
নাম শুনলে মনে হয় ভদ্র একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। যেন চৌরঙ্গিতে অফিস খুলে মশলা, কাপড় আর চায়ের ব্যবসা করছে। দরজায় পিতলের ফলক:
দ্য অনারেবল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
অফিসের সময়: সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা।
টিফিন: একটা থেকে দেড়টা।
শনিবার অর্ধদিবস।
কিন্তু এই কোম্পানির কর্মচারীরা হিসাবের খাতা নিয়ে ভারতে এসে কিছুদিনের মধ্যেই কামান নিয়ে বেরোল। ব্যবসার সঙ্গে দুর্গ বানাল, দুর্গের সঙ্গে সৈন্য রাখল, সৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করল, যুদ্ধের পরে রাজা বসাল, রাজাকে দিয়ে চুক্তি করাল, তারপর সেই চুক্তির টাকা নিজেরাই গুনল।
আমাদের পাড়ায় এক মুদি দোকানদার ছিলেন। তিনি প্রথমে বাকিতে বিস্কুট দিতেন। তারপর যার কাছে বেশি বাকি জমত, তার বাড়ির হাঁড়ি-পাতিল বন্ধক রাখতেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পদ্ধতিটা মোটামুটি ওই রকম, শুধু মুদি দোকানদারের নিজস্ব সেনাবাহিনী ছিল না।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আমবাগানে যে যুদ্ধ হয়েছিল, তার নাম আমরা সবাই জানি। যুদ্ধ কথাটা অবশ্য একটু উদার হয়ে বলা। নবাব সিরাজউদ্দৌলার বাহিনী সংখ্যায় বড় ছিল, কিন্তু তাঁর সেনাপতিদের একটি অংশ আগেই ষড়যন্ত্রের জালে ঢুকে গিয়েছিল। মীরজাফর যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে এমন ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন যে আধুনিক ক্রিকেটে হলে তাঁকে ‘নন-স্ট্রাইকিং এন্ডের শ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যান’ বলা যেত। তিনি মাঠে ছিলেন, খেলায় ছিলেন না।
রবার্ট ক্লাইভের বাহিনী পলাশীতে জয় পেল। সেই জয়ের মাধ্যমে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে ভূখণ্ডের রাজনৈতিক মালিক হয়ে উঠল। পলাশী এবং পরে ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধের পর কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজস্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। অর্থাৎ যে কোম্পানি একদিন ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কাপড় কিনত, অল্পদিনের মধ্যে সেই কোম্পানিই কৃষকের কাছ থেকে কর আদায় করতে শুরু করল।
পলাশীর পর মুর্শিদাবাদের কোষাগারের দরজা খুলে গেল। টাকা, সোনা, রুপো, রত্ন, উপঢৌকন, ব্যক্তিগত পুরস্কার, সামরিক পুরস্কার, চুক্তির টাকা, গোপন চুক্তির টাকা, প্রকাশ্য চুক্তির আড়ালে গোপন টাকা, সব মিলিয়ে এমন এক অর্থপ্রবাহ শুরু হলো যার শব্দ সম্ভবত ভাগীরথীর জলেও শোনা গিয়েছিল।
সেই সময় ইংরেজ অফিসারদের একেকজনের অবস্থা দেখলে আমাদের ঢাকার গাড়োয়ানরা নিশ্চয়ই বলত,
“আইছিল কাপড় কিনতে, ফিরতাছে জমিদারি লইয়া!”
রবার্ট ক্লাইভ ভারতবর্ষে এসেছিলেন কোম্পানির কর্মচারী হিসেবে। ফিরে গেলেন বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে। তাঁর ব্যক্তিগত আর্থিক হিসাব, জাগির ও কোম্পানির সঙ্গে লেনদেনসংক্রান্ত বহু নথি আজও ব্রিটিশ লাইব্রেরির সংগ্রহে আছে।
ক্লাইভ একা ছিলেন না। তাঁর মতো আরও বহু কোম্পানি কর্মচারী ভারতে এসে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল ধনসম্পদ অর্জন করে ইংল্যান্ডে ফিরেছিলেন। ব্রিটেনে তাঁদের বলা হতো নবাব, ইংরেজি উচ্চারণে nabob। নবাব শব্দটিও ভারত থেকে গেছে। তবে ভারতীয় নবাবদের সিংহাসন কমতে কমতে একসময় ইংরেজ নবাবদের প্রাসাদ বাড়তে লাগল।
এই নবাবরা দেশে ফিরে বিশাল বাড়ি কিনতেন, জমিদারি করতেন, সংসদীয় আসন কেনার চেষ্টা করতেন, ঘোড়ার গাড়ি চালাতেন, দেয়ালে ভারতীয় অস্ত্র ঝোলাতেন, ড্রয়িংরুমে মুঘল কারুকাজের বাক্স রাখতেন। তাঁদের স্ত্রীদের গলায় ভারতীয় রত্ন, টেবিলে ভারতীয় রুপোর বাসন, বাগানে বিদেশি গাছ। অতিথিরা এসে বলত,
“কী সুন্দর সংগ্রহ!”
সংগ্রহের জিনিসগুলো কোথা থেকে এল, সেই প্রশ্ন করলে চায়ের স্বাদ নষ্ট হতে পারে। ইংরেজ সমাজে চায়ের স্বাদ রক্ষা করা বহুদিন ইতিহাস রক্ষার চেয়ে জরুরি ছিল।
এই নবাবদের দেখে ব্রিটেনের পুরোনো অভিজাতদেরও হিংসে হতো। কারণ বংশগত লর্ডদের সম্পদ তৈরি হয়েছিল কয়েক পুরুষ ধরে। কোম্পানির একজন কেরানি ভারতে গিয়ে দশ বছর পরে ফিরে এসে পাশের জমিদারি কিনে ফেলছে। পুরোনো লর্ড তাঁর জানালা দিয়ে দেখে ভাবছেন,
“আমার পূর্বপুরুষ নরম্যান বিজয়ের সময় থেকে এই বাড়িতে। পাশের ছোকরা মুর্শিদাবাদে তিনখানা কাগজে সই করিয়ে আমার চেয়ে বড় বাড়ি করল!”
হিংসার সঙ্গে নৈতিক আপত্তিও দেখা দিল। ব্রিটিশ সংসদে কোম্পানির দুর্নীতি, কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ এবং ভারতের শাসন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে লাগল। ১৭৭২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজেই আর্থিক সংকটে পড়ে। যে কোম্পানি বাংলা থেকে সম্পদ তুলছিল, সেই কোম্পানিকেই বাঁচাতে ব্রিটিশ সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। ১৭৭৩ সালে পার্লামেন্টে কোম্পানির কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়।
ঘটনাটা অনেকটা এমন, একজন লোক পাড়ার সবার ঘর থেকে চাল-ডাল নিয়ে নিজের গুদামে তুলেছে। তারপর একদিন এসে বলল,
“আমাকে একটু ধার দিন, আমার ব্যবসায় নগদ টাকার সংকট চলছে।”
বাংলার সম্পদ তখন ব্যক্তিগত পকেট, কোম্পানির হিসাব এবং ব্রিটিশ অর্থনীতির ভেতর দিয়ে নানা পথে প্রবাহিত হচ্ছিল। কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত বাণিজ্য করত, উপঢৌকন নিত, স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে গোপন চুক্তি করত। রাজস্ব আদায়ের নতুন ব্যবস্থায় কৃষক, কারিগর ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। বাংলার তাঁতিদের তৈরি কাপড় ইউরোপে বহুদিন ধরেই সমাদৃত ছিল। কোম্পানির রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেই বাণিজ্যিক সম্পর্ক আর সমান দুই পক্ষের কেনাবেচা রইল না। এক পক্ষের হাতে দাঁড়িপাল্লা, অন্য পক্ষের হাতে কামান থাকলে দরদাম বেশিক্ষণ চলে না।
এই সময় ইংরেজি ভাষায় ভারতীয় শব্দের প্রবেশও বাড়ছিল। কারণ ব্রিটিশদের ভারত শাসন করতে গিয়ে ভারতীয় বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিদিন লড়তে হচ্ছিল। নবাব, জাগির, পণ্ডিত, চাটনি, পায়জামা, বাংলো, ঠগ, জঙ্গল, খাকি, অবতার, গুরু, এসব শব্দ একসময় ইংরেজির ঘরে গিয়ে বসেছে। ভাষা বড় উদার জিনিস। যে জাতিকে মানুষ অপমান করে, সেই জাতির শব্দ ব্যবহার করতে তার বাধে না।
তবে ‘লুট’ শব্দটির ব্যাপার আলাদা। শব্দটি ইংরেজিতে প্রবেশ করেছে এমন সময়ে, যখন ব্রিটিশদের ভারতীয় সম্পদ আত্মসাৎ নিয়ে ইংল্যান্ডেই আলোচনা চলছিল। ১৭৮৮ সালের অভিধানজাত গ্রন্থে শব্দটির উল্লেখ তাই নিছক ভাষাবিজ্ঞানের ঘটনা ছিল না। ইংরেজ পাঠকের ভারতীয় শব্দ জানা দরকার হয়েছিল, কারণ ভারত তখন ব্রিটেনের কাছে দূরবর্তী রূপকথার দেশ নয়। ভারত হয়ে উঠেছে অর্থ, পদোন্নতি, সামরিক গৌরব, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং ব্যক্তিগত সম্পদের উৎস।
ইংল্যান্ডের কোনও ড্রয়িংরুমে হয়তো একদিন কথোপকথন হচ্ছিল।
একজন বললেন,
“তোমার ছেলে এখন কোথায়?”
অন্যজন গর্ব করে বললেন,
“বেঙ্গলে।”
“কী করে?”
“কোম্পানিতে।”
প্রথমজন মাথা নেড়ে বললেন,
“আহা, ছেলেটার ভবিষ্যৎ হয়ে গেল।”
আজ আমরা কাউকে দুবাই, আমেরিকা বা কানাডায় চাকরি পেতে দেখলে যেমন বলি, “ছেলেটা দাঁড়িয়ে গেল,” আঠারো শতকের ব্রিটেনে ভারতে যাওয়া অনেক পরিবারের কাছে তেমনই ভাগ্য ফেরানোর রাস্তা ছিল। পার্থক্য হলো, আজকের প্রবাসী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অফিস থেকে ল্যাপটপ পায়। কোম্পানির কর্মচারী সুযোগমতো একটা জেলার রাজস্ব পেয়ে যেত।
পলাশীর পরে যে অর্থলোভ তৈরি হয়েছিল, তা ব্রিটিশ প্রশাসনের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। কোম্পানির কর্মচারীদের আচরণ নিয়ে তদন্ত হয়েছে, ক্লাইভকে পার্লামেন্টে নিজের সম্পদের ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। তাঁর বিখ্যাত আত্মপক্ষসমর্থনের সারকথা ছিল, এত সুযোগের মধ্যেও তিনি নাকি আশ্চর্য সংযম দেখিয়েছেন। একজন মানুষ যদি রাজকোষের দরজায় দাঁড়িয়ে দুই হাতে যতটা বহন করতে পারে নিয়ে এসে বলেন, “আরও নিতে পারতাম, নিইনি,” তখন তার সততার সংজ্ঞা একটু আলাদা বুঝতে হয়।
আমাদের ঢাকায় এক চোর ধরা পড়ে বলেছিল,
“আমি তো কেবল ঘড়িটা নিছি, রেডিওটা তো রাইখা আইছি।”
পাড়ার লোকেরা তাকে ছেড়ে দেয়নি। তবে লোকটি যদি ইংরেজিতে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারত, হয়তো ইতিহাসে তার নাম হতো লর্ড।
এরপর এলো বাংলার দুর্ভিক্ষ। ১৭৬৯ থেকে ১৭৭৩ সালের মধ্যে বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যায়। মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে, কিন্তু বিপর্যয়ের ব্যাপ্তি নিয়ে সন্দেহ নেই। ফসলের সংকট, অনাবৃষ্টি ও বাজারের বিপর্যয়ের সঙ্গে কোম্পানির রাজস্বনীতি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা দুর্ভোগকে আরও গভীর করেছিল। মানুষ মারা যাচ্ছিল, অথচ রাজস্ব আদায়ের যন্ত্র থামেনি।
এই দৃশ্যের মধ্যে ‘লুট’ শব্দটির ইংরেজি হয়ে ওঠার ইতিহাস শুনলে ব্যাপারটা কেমন নিষ্ঠুর ঠাট্টার মতো লাগে। বাংলার মানুষ সম্পদ হারাচ্ছে, ব্রিটেন সেই সম্পদের নাম শিখছে।
শব্দটা যখন ভারতে ছিল, তখন তার অর্থ ছিল ডাকাতি, ছিনতাই, যুদ্ধের পরে সম্পদ দখল। ইংল্যান্ডে গিয়ে শব্দটি ক্রমে সৈন্যের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, দাঙ্গার সুযোগে দোকান থেকে চুরি, অপরাধীর চোরাই মাল, এমনকি প্রচুর টাকার কথ্য প্রতিশব্দ হয়ে উঠল। পরে কম্পিউটার গেমে শত্রুকে হারিয়ে যে অস্ত্র বা ধন পাওয়া যায়, সেটাও ‘লুট’। সাম্রাজ্যের রক্তাক্ত মাঠ থেকে শব্দটি আজ ভিডিও গেমের রঙিন বাক্সে এসে বসেছে। ইতিহাসেরও রসবোধ আছে, তবে সে রসবোধ প্রায়ই নিষ্ঠুর।
আজ কোনও কিশোর গেম খেলতে খেলতে বলে, “আই গট সাম গ্রেট লুট,” সে হয়তো জানে না তার মুখের এই শব্দটি একদিন উত্তর ভারতের ধুলো মাড়িয়ে কোম্পানির জাহাজে উঠেছিল। শব্দের সঙ্গে যে কান্না, দুর্ভিক্ষ, বিশ্বাসঘাতকতা, কামান, রাজস্বের খাতা এবং মুর্শিদাবাদের কোষাগারের অন্ধকার জড়িয়ে আছে, সেগুলো গেমের স্ক্রিনে দেখা যায় না।
ভাষা সাধারণত বিজয়ীর ইতিহাস বহন করে। কিন্তু কখনও কখনও পরাজিত মানুষের শব্দও বিজয়ীর মুখে ঢুকে তাকে ধরিয়ে দেয়।
‘লুট’ তেমনই একটি শব্দ।
ইংরেজ সাম্রাজ্য ভারতবর্ষ থেকে কী নিয়েছে, তার পূর্ণ তালিকা তৈরি করা কঠিন। টাকা গেছে, কাঁচামাল গেছে, শিল্পের বাজার গেছে, অসংখ্য শিল্পবস্তু গেছে, মানুষের শ্রম গেছে। অনেক কিছুর হিসাব আছে, অনেক কিছুর নেই। তবে ইংরেজি অভিধানে ‘loot’ শব্দটির উপস্থিতি ছোট একটি ভাষাতাত্ত্বিক রসিদ হয়ে রয়ে গেছে।
চুরি করা মাল নিয়ে চোর পালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু অসাবধান চোর কখনও কখনও ঘটনাস্থল থেকে এমন একটা শব্দ সঙ্গে নিয়ে যায়, যেটা পরে সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়।
ব্রিটিশরা ভারত থেকে কোহিনূর নিয়ে গেছে। তার মালিকানা নিয়ে আজও বিতর্ক হয়। মসলিনের কারিগরি ধ্বংস হয়েছে, তার সম্পূর্ণ হিসাব পাওয়া কঠিন। বাংলার রাজস্ব কোথায় কতখানি গেছে, ইতিহাসবিদেরা খাতা খুলে হিসাব করেন। কিন্তু ‘লুট’ শব্দটির ক্ষেত্রে প্রমাণ লন্ডনের অভিধানেই বসে আছে।
শব্দটি যেন দুই হাত কোমরে দিয়ে বলছে,
“আমারে চিনেন নাই? আমি হইলাম লুট। আমারে লইয়া গেছেন, কিন্তু আমার নাম পালটাইতে পারেন নাই।”
সাম্রাজ্য অনেক কিছু নিজের নামে লিখে ফেলতে পারে। বিজয়কে সভ্যতা বলে, দখলকে শাসন বলে, সম্পদ পাচারকে বাণিজ্য বলে, অনুগত বিশ্বাসঘাতককে মিত্র বলে। তবু কখনও একটি ছোট শব্দ সমস্ত সাজসজ্জার মধ্যে ঢুকে পড়ে আসল কাজের নামটি বলে দেয়।
সেই শব্দটি লুট।
এবং এই একটি ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষা ভয়ানক সৎ।



