মেসির কৌশলী হাঁটা
মাঠে লিওনেল মেসির হাঁটাকে টেলিভিশনের দর্শকেরা প্রায়শই আলসেমি ভেবে বসেন, যেন ফুটবল মানেই কেবল অবিরাম দৌড়ানো এবং শারীরিক পরিশ্রম। কিন্তু মেসির এই ধীরস্থির হাঁটার পেছনে লুকিয়ে থাকা রহস্য বুঝতে এক অনন্য দৃষ্টির প্রয়োজন। যে চোখ শুধু বল আর স্প্রিন্ট খোঁজে, তা মেসির মনের গতি ও নিখুঁত টাইমিং ধরতে পারে না। তিনি যখন হাঁটেন, তখন মাঠের সবুজ ঘাস, ডিফেন্ডারদের অবস্থান আর খালি জায়গাগুলো মিলে তার মাথায় খেলার এক অদৃশ্য মানচিত্র তৈরি হয়। কোনো পাস আসার আগেই বা গোল হওয়ার বহু পূর্বে, প্রতিপক্ষ যখন ভাবছে সব নিয়ন্ত্রণে, তখনই মেসির মস্তিস্কে নীরবে রচিত হতে থাকে ম্যাচের ভবিষ্যৎ।
ফুটবল মাঠে যেখানে অন্য খেলোয়াড়েরা অনবরত দৌড়ায়, প্রেস করে আর রেফারির শেষ বাঁশির আগেই ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ে, মেসি সেখানে ব্যতিক্রম। তিনি সবসময় সেই অন্ধ দৌড়ে শামিল হন না; বরং থামেন, হাঁটেন, কিংবা কখনো প্রায় স্থির দাঁড়িয়ে থেকে দূর থেকে খেলাটাকে পর্যবেক্ষণ করেন। মাঠে তাঁর এই ধীর পায়ে হাঁটা কোনো অলসতা নয়, বরং এটি এমন এক বিচক্ষণ মানুষের কৌশল, যিনি জানেন নিজের ভেতরের আগুনকে কখন জ্বালতে হবে আর কখন তা লুকিয়ে রাখতে হবে। মূলত তাঁর ওই শান্ত হাঁটার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে পরবর্তী বিধ্বংসী বিস্ফোরণ। যে পেশীর কল্যাণে তিনি তিন গজের মধ্যে দিক বদলান, পাঁচ গজে ডিফেন্ডারকে বোকা বানান এবং দশ গজে গোলকিপারের মনে ভয় ধরিয়ে দেন, তা একটানা দৌড়ানোর জন্য তৈরি নয়। মেসি জানেন, ম্যাচের শুরুতেই খুচরো খরচে সব শক্তি উবে গেলে শেষ মুহূর্তের বড় জাদুটুকু দেখানোর সামর্থ্য আর থাকবে না।
খেলার মাঠে বল যখন পায়ে থাকে না, তখন মেসি মূলত নিজের শক্তি সঞ্চয় করেন। ফুসফুসকে অবান্তর খাটুনি থেকে রেহাই দিয়ে এবং শরীরের গ্লাইকোজেন ও পায়ের ভেতরের সুপ্ত তেজ ধরে রেখে তিনি নিজেকে প্রস্তুত রাখেন। ম্যাচের পঁচাত্তর মিনিট পেরিয়ে গেলে যখন অন্যান্য খেলোয়াড়দের পা ক্লান্তিতে ভারী হয়ে আসে, ঠিক তখনই মেসির পায়ের সেই জমানো ধারালো রূপটি প্রকাশ পায়। এতক্ষণ মাঝমাঠে তাঁকে অলস হেঁটে বেড়াতে দেখে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা হয়তো মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছিল; কেউ ভেবেছিল তিনি আর দৌড়াবেন না, কেউ পজিশন ছেড়ে ভেতরে ঢুকেছিল, আবার কেউ কেবল নিজের লাইন আগলে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু হঠাৎই বল পায়ে পেয়ে শরীর বাঁকিয়ে যখন তিনি চাতুর্যের সাথে বাঁ দিকে তাকিয়ে ডান দিক দিয়ে বল বের করে নেন, তখন প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের মন ও হাঁটু একযোগে কেঁপে ওঠে। মাঠের যে মানুষটিকে এতক্ষণ নিষ্ক্রিয় মনে হচ্ছিল, পলকেই তিনি পুরো ম্যাচের মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠেন।
মেসির মাঠের হাঁটা মূলত তার চোখের ও মস্তিকের এক গভীর খেলা, তিনি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন; প্রতিপক্ষের সেন্টার ব্যাক কতটা ওপরে উঠে আসছে, ফুলব্যাকের পেছনে ফাঁকা জায়গা তৈরি হচ্ছে কি না, কিংবা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার পেছনে নজর রাখছে কি না। একই সাথে তিনি দেখে নেন গোলরক্ষক পজিশন ছেড়ে কতটা বেরোলেন, নিজের দলের ডান উইঙ্গার কখন ভেতরে ঢুকে আসছেন, অথবা বক্সের প্রান্তে কে সম্পূর্ণ অরক্ষিত দাঁড়িয়ে আছেন। কোনো ডিফেন্ডার কেবল বলের দিকে চেয়ে থাকে আর কে খেলোয়াড়কে নজরে রাখে, কার শরীর ভারী হয়ে এসেছে, কে দ্রুত মেজাজ হারাচ্ছে, কার শরীর আগে প্রতিক্রিয়া দেখায় কিংবা কার চোখ সবার আগে বিভ্রান্ত করে; সবকিছুই ধরা পড়ে তার জহুরি চোখে। ম্যাচের শুরুর প্রথম দশ-পনেরো মিনিট মেসির কাছে এক নিখুঁত অনুসন্ধান পর্বের মতো, যেন মাঠে নেমে তিনি সবার আগে প্রতিপক্ষের দুর্গের আলগা জানালা, ভাঙা ছিটকিনি আর দুর্বল দরজাগুলো চিনে নিচ্ছেন, যাতে ঠিক সময়ে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই ভেতরে ঢুকে পড়া যায়।
মেসির এই স্ক্যানিং চোখের পলকে ঘটলেও এর কার্যকারিতা অত্যন্ত গভীর। বল পায়ে আসার অনেক আগেই তিনি ছকে ফেলেন পরবর্তী পদক্ষেপ। টেলিভিশনের রিপ্লেতে স্রেফ বল পাওয়া আর পাস দেওয়ার দৃশ্য দেখা গেলেও, মূলত পাসের প্রক্রিয়া শুরু হয় অনেক আগেই। মেসির মস্তিস্কে প্রতিনিয়ত মাঠের একটি জীবন্ত মানচিত্র তৈরি হতে থাকে। ঘাসের বুকে খেলোয়াড়দের নড়াচড়ার সাথে সাথে সেই মানচিত্রও রূপ বদলায়; কোনো ডিফেন্ডার এক পা এগোলেই সেখানে তৈরি হয় নতুন ফাঁক, আবার কোনো মিডফিল্ডার পেছনে খেয়াল না করলেই খুলে যায় অচেনা এক পথ। হাঁটতে হাঁটতেই মেসি অবলীলায় এই অদৃশ্য পথগুলো চিনে নেন। সামান্য ঘাড় ঘোরানো বা চোখের ইশারায় তাকে আপাতদৃষ্টিতে অন্যমনস্ক মনে হলেও, এই উদাসীনতা আসলে এক নিখুঁত ছদ্মবেশ। নিঃশব্দে, অলক্ষ্যে চোরের মতো সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তিনি শুধু পর্যবেক্ষণ করেন মাঠের কোথায় কী ঘটছে।
মেসি যখন মাঠে হাঁটেন, সেটিই ডিফেন্ডারদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ খেলোয়াড়দের মতো দৌড়ানো, উইং ধরে এগিয়ে যাওয়া বা বক্সে শরীর দিয়ে আটকানোর যে চেনা অভ্যাসে ডিফেন্ডাররা অভ্যস্ত, মেসি তাঁর এই হাঁটার মাধ্যমে তা সম্পূর্ণ ভেঙে দেন। তাঁকে দেখে মনে হয় তিনি যেন খেলার বাইরে আছেন এবং বলের প্রতি তাঁর কোনো তাৎক্ষণিক দাবি নেই। এই বিভ্রান্তিতে পড়ে ডিফেন্ডাররা তখন তাদের মনোযোগ অন্য খেলোয়াড় বা বলধারীর দিকে সরিয়ে নেয়। আর ঠিক এই এক সেকেন্ডের অসতর্কতা, সামান্য দূরত্ব বা একবার চোখ সরানোর সুযোগেই মেসি সেই অগোচর ফাঁকা জায়গায় নিখুঁতভাবে ঢুকে পড়েন। মাঠের সবাই যখন ভাবেন তিনি হারিয়ে গেছেন, তিনি আসলে তখন তৈরি থাকেন এমন এক জায়গায়, যেখানে বল পৌঁছানো মাত্রই গোলের তীব্র সম্ভাবনা জেগে ওঠে।
ফুটবলে কাউকে মার্ক করার অর্থ তার ওপর সার্বক্ষণিক মনোযোগ ধরে রাখা। মেসি মূলত ডিফেন্ডারদের সেই মনোযোগকেই ক্লান্ত করে তোলেন। একজন দৌড়াতে থাকা খেলোয়াড়কে অনুসরণ করা ডিফেন্ডারের জন্য সহজ, কিন্তু মাঠে যে হেঁটে বেড়ায় তাকে পাহারা দেওয়া বেশ অদ্ভুত। ডিফেন্ডারের মনে তখন প্রশ্ন জাগে; সে তো কোথাও যাচ্ছে না, দাঁড়িয়ে আছে; সে কি আদৌ আক্রমণে অংশ নিচ্ছে? এই ছোট ছোট প্রশ্নগুলো যখন ডিফেন্ডারের মাথায় ঘুরপাক খায়, তখনই মেসির সুবিধা হয়। কারণ ফুটবলে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে একটু দেরি হলেই বল অন্য কোথাও চলে যায়। ঠিক এই সুযোগে মেসি সেন্টার ব্যাক আর মিডফিল্ডারের মাঝখানের সেই অরক্ষিত ‘পকেট স্পেসে’ এসে দাঁড়ান, যে জায়গার দায়িত্ব কেউ পুরোপুরি নিতে চায় না। এরপর বল আসে, আর মুহূর্তের মধ্যে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা বুঝতে পারে যে তারা তাকে দেখছিল ঠিকই, কিন্তু আসলে লক্ষ্য করেনি।
মেসির মাঠে এই হেঁটে বেড়ানোর অভ্যাসের পেছনে রয়েছে তার শারীরিক ভাঙাগড়ার এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। বার্সেলোনায় ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলোতে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার এক খেলোয়াড়; লম্বা চুল আর ছোটখাটো গড়ন নিয়ে চপল পায়ে ডান প্রান্ত দিয়ে ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করে ঝড়ের গতিতে আক্রমণে উঠতেন। তবে সেই তীব্র গতির মাশুলও তাকে দিতে হয়েছিল পেশির চোট আর হ্যামস্ট্রিংয়ের সমস্যায় বারবার মাঠের বাইরে ছিটকে গিয়ে। শরীরকে অতিরিক্ত খাটালে তার চড়া মূল্য দিতেই হয়, আর পেপ গার্দিওলা বার্সেলোনার কোচ হয়ে এসে এই সত্যটি অনুধাবন করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন যে, মেসিকে সারাক্ষণ মাঠে ছুটিয়ে রাখলে তার কার্যকারিতা কমে যাবে এবং তাকে অকালেই হারিয়ে ফেলতে হতে পারে। প্রতিটা বলের পেছনে তাকে দৌড়ালে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে হয়তো তার সেই চেনা ধার আর পাওয়া যাবে না। তাই গার্দিওলা মেসির ওপর থেকে বাড়তি রক্ষণাত্মক কাজের চাপ কমিয়ে তাকে মাঠে হেঁটে বেড়ানোর এবং নিজের মতো করে খেলার স্বাধীনতা দেন। এই কৌশলের ফলেই মেসি শুধু একজন উইঙ্গার থেকে রূপান্তরিত হন ম্যাচের গতিপ্রকৃতি ও ভাষা বুঝতে পারা এক অনন্য প্লেমেকারে।
মেসির খেলায় এই পরিবর্তনের পর এক আমূল রূপান্তর এল। তিনি আর কেবল গতি দিয়ে ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করার ফুটবলার রইলেন না, বরং ম্যাচের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিলেন। গতি বাড়ানো-কমানো, পাসের দিক নির্ধারণ, নিখুঁত থ্রু বল কিংবা ডান পায়ের ছোঁয়ায় বল থামিয়ে বাঁ পায়ে শট নেওয়া; সবকিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণে চলে এল। এমনকি বক্সের বাইরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকাও তাঁর খেলার অংশ হয়ে উঠল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাঁর দৌড় ও স্প্রিন্টের সংখ্যা কমলেও মাঠে তাঁর কার্যকারিতা বিন্দুমাত্র কমেনি। কারণ, তাঁর ফুটবল তখন কেবল শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল না, বরং তা স্থানজ্ঞান (পজিশনিং), তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, সময়জ্ঞান আর অসামান্য ফুটবল আইকিউ-এর ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়েছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে মাঠে সব জায়গায় থাকার প্রয়োজন নেই, বরং সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে থাকাই যথেষ্ট।
মাঠের গোপন পথগুলো মেসির নখদর্পণে, ঠিক যেমন পুরনো ঢাকার একজন বাসিন্দা ঘুটঘুটে অন্ধকারেও চিনে নেয় কোন গলির মাথায় চায়ের দোকান আর কোথায় ল্যাম্পপোস্ট। এই কারণেই তার পজিশনিং এতটা নিখুঁত ও কার্যকর। সে অপ্রয়োজনীয় ছোটাছুটি করে শক্তি নষ্ট করে না, বরং ঘুরে বেড়ায় পেনাল্টি বক্সের প্রান্ত, হাফ স্পেস, সেন্ট্রাল করিডর কিংবা ডিফেন্স ও মিডফিল্ডের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গায়; যেখান থেকে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ভেঙে চুরমার করা যায়। নিজেকে কেবল উইং বা স্ট্রাইকার পজিশনে আটকে না রেখে মেসি মাঠে একপ্রকার ভেসে বেড়ায়। তবে এই ভেসে থাকা মোটেও উদ্দেশ্যহীন নয়, অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। তার প্রতিটি ছোট দৌড় বা থমকে দাঁড়ানোর পেছনে সুনির্দিষ্ট হিসাব থাকে; কখনো ডিফেন্ডারকে বিভ্রান্ত করতে, কখনো পাসের সঠিক কোণ তৈরি করতে, আবার কখনো স্রেফ হেঁটে নিজের উপস্থিতিকে লুকিয়ে রেখে আচমকা আক্রমণ শানাতে সে অভ্যস্ত।
আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক সাফল্যের মূলে রয়েছে দলগত শ্রমের এক চমৎকার মেলবন্ধন, যার ওপর ভর করে টিকে থাকে মেসির বিশেষ কৌশল। মাঠে মেসির হাঁটার স্বাধীনতা তখনই তৈরি হয়, যখন তার সতীর্থরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। তিনি যখন মাঠে হেঁটে বেড়ান, তখন রদ্রিগো ডি পল অবিরাম দৌড়ান, আলভারেজ সামনে থেকে ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রাখেন, আর ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজ যথাক্রমে খেলার ভারসাম্য রক্ষা ও প্রতিপক্ষের লাইন ভাঙার কাজ করেন। একই সাথে ফুলব্যাক ও ডিফেন্ডাররা নিখুঁতভাবে সামলান পুরো রক্ষণভাগ। বিশেষ করে ডি পল যেন মেসির এক বিশ্বস্ত প্রহরী; যিনি মাঠের প্রতিটি কোণায় লড়াই করেন, বল কেড়ে নেন এবং মেসির কাছে বল পৌঁছে দেন। মূলত সতীর্থদের এই অবিরাম দৌড়, ঘাম, নিখুঁত ট্যাকল ও কঠোর পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করেই মেসির ফুটবলীয় কৌশল পূর্ণতা পায়।
দলের কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই মেসির এই মাঠ জুড়ে হেঁটে বেড়ানো। দলের মূল উদ্দেশ্য তাকে প্রতিপক্ষের প্রেসিং ট্র্যাপ থেকে মুক্ত রাখা, যাতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার পা সতেজ থাকে এবং সে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা দিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে ফেলতে পারে। মেসি যদি নিচে নেমে বল কেড়ে নেওয়ার পেছনেই শক্তি ক্ষয় করে, তবে আক্রমণভাগে সেই ম্যাচ জেতানো পাসটি দেওয়ার কিংবা গোলবক্সের সামনে দাঁড়িয়ে গোলরক্ষককে পরাস্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত তৈরি করার কেউ থাকবে না। এই কারণেই সতীর্থরা মাঠ জুড়ে মেসির হয়ে নিরলস দৌড়ে যায়, আর মেসি তাদের সেই পরিশ্রমকে সার্থকতা দান করে। তার এই অবদান সবসময় স্কোরশিটে প্রতিফলিত হয় না; কখনো কখনো শুধু দুজন ডিফেন্ডারকে নিজের দিকে ব্যস্ত রেখে সে অন্য সতীর্থের জন্য ফাঁকা জায়গা তৈরি করে দেয় কিংবা বল স্পর্শ না করেও একটি নিখুঁত আক্রমণের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
মেসির হাঁটার ভঙ্গির মাঝে এক অসাধারণ বৈপরীত্য লুকিয়ে আছে। দৃশ্যত সে শান্ত ও মন্থর হলেও, তার অন্তরে রয়েছে তীব্র ক্ষিপ্রতা। শরীর হয়তো ধীরগতির, কিন্তু মস্তিস্ক চলে ঝড়ের বেগে। শান্ত চোখের আড়ালে চলে সূক্ষ্ম ও ধারালো হিসাব-নিকাশ। বাহ্যিকভাবে সে কেবলই হাঁটছে, অথচ তার মনের ভেতরে খেলাটা অবিরাম গতিতে দৌড়ে চলেছে। তাকে মাঠের কোথাও অনুপস্থিত মনে হতে পারে, কিন্তু বলের আগামী গন্তব্য যেন আগে থেকেই তার চেনা।
মাঠে যে খেলোয়াড় নিজেকে অহেতুক ক্লান্ত করে না, চূড়ান্ত ও সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্তে তার উপস্থিতিই সবচেয়ে জোরালো হয়ে ওঠে। মেসির হাঁটার আসল রহস্যও এখানেই লুকিয়ে। এই ধীর হাঁটার মাধ্যমেই সে মূল্যবান সময় আদায় করে নেয়, নিজের শক্তি ধরে রাখে এবং প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের অসতর্ক করে তোলে। একই সাথে সে মাঠের প্রতিটি কোণের অবস্থান বিশ্লেষণ করে নিজের দলের খেলার মাঝে নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখে। এরপর, ঠিক যখন সবাই মনে করে আপাতত বিপদের আশঙ্কা নেই, তখনই সে সবার অলক্ষ্যে এমন এক সংকীর্ণ পথ তৈরি করে বক্সে ঢুকে পড়ে, যা কল্পনা করাও অন্য কারও পক্ষে অসম্ভব ছিল।
মেসি যখন মাঠে হাঁটেন, তখন তাকে নিষ্ক্রিয় মনে করা এক মস্ত ভুল। আসলে তিনি তখন ম্যাচের এক ভিন্ন মাত্রায় বিচরণ করেন; বলের বর্তমান অবস্থানে নয়, বরং বলের পরবর্তী গন্তব্যে। কোলাহলের মাঝে তিনি মগ্ন থাকেন এক নীরব প্রস্তুতিতে। গ্যালারির চিৎকার, ধারাভাষ্যকারের মন্তব্য কিংবা ডিফেন্ডারদের হাপিত্যেশ; সবকিছুর আড়ালে মেসি এঁকে চলেন অদৃশ্য কিছু রেখা, যা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এরপর এক অলৌকিক মুহূর্তে বল আসে তার পায়ে; সামান্য ছোঁয়া, সামান্য বাঁক আর গতির সূক্ষ্ম হেরফেরে উন্মোচিত হয় এক পরম সত্য; তার ওই ধীর হাঁটার মাঝেই লুকিয়ে ছিল গোলের অমোঘ বীজ।
রিটন খান



