বাংলাদেশের গুরুজনেরা ঠিক করেছেন আর কোনো শিশু রাখবেন না।
শিশু বিপজ্জনক। শিশুরা প্রশ্ন করে। প্রশ্ন রাষ্ট্রের পছন্দ না। রাষ্ট্র উত্তর ভালোবাসে। বিশেষ করে মুখস্থ উত্তর। জাতীয় সংগীতের মতো উত্তর। টেলিভিশনের স্ক্রলিং ব্রেকিং নিউজের মতো উত্তর। “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।” “দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” “আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।”
উদ্বেগ এখন এদেশে সবচেয়ে সস্তা জিনিস। চালের দামের থেকেও সস্তা। মানুষের জীবনের থেকেও সস্তা।
শিশুরা প্রথমে স্কুলে মারা যায়। তারপর নদীতে। তারপর সড়কে। তারপর হাসপাতালের সামনে। তারপর মাদ্রাসায়। তারপর ফেসবুক লাইভে। তারপর পরিসংখ্যানে।
একজন মন্ত্রী মাইক্রোফোনে কাশি দিয়ে বললেন: “এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা।”
বাংলাদেশে এখন বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোই সবচেয়ে ঐক্যবদ্ধ।
একটা শিশু দুপুরে ভাত খেতে বসেছিল। পাতে ডাল। ডালের মধ্যে আধখানা পোকা। পাশে মা বসে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছে। হঠাৎ উপরে থেকে ভবনের কংক্রিট পড়ল। খবরের কাগজ লিখল: “মর্মান্তিক মৃত্যু।”
মর্মান্তিক। চমৎকার শব্দ। শব্দটা এতবার ব্যবহার হয়েছে যে এখন তার গায়ে আর রক্ত লাগে না।
রাতে টকশো বসে। টাই-পাঞ্জাবি পরা লোকেরা আলোচনা করে: “আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ কোথায়?”
ভবিষ্যৎ তখন ড্রেনের পাশে বসে ফুচকার পানিতে হাত ধুচ্ছে। ভবিষ্যৎ তখন গার্মেন্টসের আগুনে আটকে গেছে। ভবিষ্যৎ তখন কোচিং সেন্টারের সিঁড়িতে জুতা খুলে কাঁদছে। ভবিষ্যৎ তখন মেডিকেলের বারান্দায় অক্সিজেনের জন্য হাঁপাচ্ছে।
তবু গুরুজনেরা ব্যস্ত। তারা সভা করছে। সেমিনার করছে। শিশু অধিকার দিবসে ব্যানার ছাপাচ্ছে। একজন কবি আবৃত্তি করছেন: “শিশুর হাসি স্বর্গের আলো।”
এইদিকে স্বর্গের আলো লোডশেডিংয়ে নিভে গেছে।
একটা বাচ্চা স্কুলব্যাগ নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিল। বাসটা তাকে দেখে না। রাষ্ট্রও না। শুধু তার জুতাটা পরে থাকে রাস্তায়। একপাটি। নীল। ধুলো মাখা। ক্যামেরাম্যান জুম করে। ফেসবুকে sad react পড়ে তেইশ হাজার। তারপর সবাই বিরিয়ানি খেতে যায়।
গুরুজনেরা বলেন: “নতুন প্রজন্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
অবশ্যই যাচ্ছে। আপনারাই তো হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছেন।
একজন শিশু বই পড়তে চেয়েছিল। তাকে বলা হল চাকরি কোথায়? একজন শিশু ছবি আঁকতে চেয়েছিল। তাকে কোচিংয়ে পাঠানো হল। একজন শিশু প্রেম করতে চেয়েছিল। তাকে ধর্ম শেখানো হল। একজন শিশু বাঁচতে চেয়েছিল। তাকে বলা হল ধৈর্য ধরো।
ধৈর্য এখন গরিবের জন্য সরকারি কম্বল। শীতে গায়ে দিলে ঠান্ডা কমে না, কিন্তু ছবি ভালো আসে।
রাতে কাকেরা শহরের উপর চক্কর দেয়। ডাস্টবিনের পাশে আধখাওয়া কেক। জাতীয় দিবসের পতাকা। পচা ফল। একটা শিশুর ছেঁড়া বই।
দূরে কোথাও আতশবাজি ফুটছে। কারণ উন্নয়ন হয়েছে।
একটা বাচ্চা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মাকে জিজ্ঞেস করে: “আমি কি বাড়ি যাব?”
মা উত্তর দেয় না। কারণ মায়েরা এখন মিথ্যা বলতে বলতে ক্লান্ত।
গুরুজনেরা meanwhile আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গেছেন। বিষয়: “টেকসই ভবিষ্যৎ ও শিশু নিরাপত্তা।”
তারা বিমানে চিকেন খাচ্ছেন। নীচে নদীতে একটা লঞ্চ ডুবছে।
বাংলাদেশের শিশুদের এখন আর ঘুমপাড়ানি গান শোনানো হয় না। তাদের শোনানো হয় সাইরেন। অ্যাম্বুলেন্স। হেলিকপ্টার। মিছিল। গুলির শব্দ। সংবাদ পাঠিকার গলা।
“দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।”
কোথায় যাচ্ছে কেউ জানে না। শুধু দেখা যাচ্ছে, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুগুলো একে একে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
হয়তো একদিন সত্যিই এদেশে আর কোনো শিশু থাকবে না। তখন গুরুজনেরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন। কোনো প্রশ্ন থাকবে না। কোনো কান্না থাকবে না। শুধু থাকবে বিশাল বিশাল বিলবোর্ড। হাসিমুখের। ফটোশপ করা। তাতে লেখা থাকবে:
“আগামীর বাংলাদেশ।”
২৭শে মে, ২০২৬
আটলান্টা



