‘বিকেলের অনেক রং' আমাদের ক্ষুদ্র জীবনের পরতে পরতে প্রবেশ করে
রিটন খান
পিওনা আফরোজের ছোটগল্পের সংকলন ‘বিকেলের অনেক রং’ পড়ে শেষ করার পর এক ধরণের আলো-ছায়া ঘেরা বিষণ্ণতা গ্রাস করে। বইটির নামেই যেন মিশে আছে দিনের শেষ ভাগের সেই ক্লান্তি, যেখানে রোদ ফিকে হয়ে এলেও জীবনের রূঢ় হিসাব-নিকাশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা আর সম্পর্কের টানাপোড়েনগুলো অনেক বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। লেখিকা ঠিক সেই মুহূর্তগুলোকেই বেছে নিয়েছেন যেখানে মানুষ অসম্পূর্ণ আলো আর অন্ধকারের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরের অব্যক্ত কথাগুলো শুনতে পায়, যা একইসাথে সত্য এবং ভীতিপ্রদ।
এই সংকলনের প্রতিটি গল্প স্বতন্ত্র হলেও তারা যেন এক অদৃশ্য সুতোয় গেঁথে আছে। পিয়া, ঘুঙুর, রায়ান, রাহাত, দাদাভাই—চরিত্রের নাম আর প্রেক্ষাপট বদলে গেলেও তাদের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনগুলো একই সূত্রে বাঁধা। মধ্যবিত্ত জীবনের পরিচিত সংকটগুলো যেমন; আর্থিক টান, সামাজিক মর্যাদার ভয় কিংবা ‘লোকে কী বলবে’ এমন দুশ্চিন্তা; গল্পগুলোতে আলাদা করে বলতে হয় না; বরং চরিত্রদের প্রাত্যহিক আচরণের মাধ্যমেই তা মূর্ত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে পিয়ার পরিবারের আর্থিক দুরবস্থা, রান্নাঘরের খালি বয়াম, বাবার নিরবতা আর মায়ের অকারণ ক্ষোভের মতো সূক্ষ্ম মুহূর্তগুলোর মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা পাঠককে কোনো বাড়তি ব্যাখ্যা ছাড়াই ভাবাবে।
‘ঘুঙুরের বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যাগুলি’ গল্পে নাগরিক দাম্পত্যের এক অতি পরিচিত অবয়ব ফুটে উঠেছে। চাকরি হারানো রায়ানের মূল সংকট আসলে তার মানসিক অস্থিরতা; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্তহীন স্ক্রলিং আর অন্যদের জৌলুসপূর্ণ জীবন দেখার নেশায় তার ব্যক্তিগত শূন্যতা ক্রমশ আরও প্রকট হয়।
অন্যদিকে, পাশে থাকা ঘুঙুরের কথা বলার আকুলতা আর তার সঙ্গী হওয়া নীরবতা; এই দুইয়ের টানাপোড়েনই গল্পের মূল উপজীব্য হয়ে ওঠে। এখানে কথোপকথনের অভাবই এক গভীর সংকটের রূপ নেয়। লেখিকা অত্যন্ত নিপুণ ও সংযত ভঙ্গিতে এই নৈশব্দের ভাষাটিকে পাঠকসমক্ষে তুলে ধরেছেন।
‘রূপ এক বেদনার রং’ গল্পে প্রতারণার ধরনটি সিনেমার মতো নাটকীয় নয়, বরং অত্যন্ত শীতল, সুপরিকল্পিত এবং নিরাসক্ত। রায়হানকে ছেড়ে রিয়ার চলে যাওয়া একটি পরিবারের লালিত স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের বিনাশ। প্রবাসে থাকা ছেলের বিবাহকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আত্মীয়স্বজনের গর্ব আর মায়ের আকুল আকাঙ্ক্ষা; সবই অতর্কিতে ভেঙে পড়ে। এই ধসের আওয়াজ হয়তো গল্পে তীব্রভাবে ফুটে ওঠেনি, তবে তা পাঠকের হৃদয়ে এক গভীর বেদনার ছাপ রেখে যায়।
এই সংকলনের সামাজিক প্রসঙ্গের উপস্থাপনা অত্যন্ত সোজাসাপ্টা, যা মাঝেমধ্যে প্রায় রিপোর্টাজের রূপ পরিগ্রহ করে। বিশেষ করে ‘অস্তিত্বের সঙ্কট’ গল্পে সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে ছবি আঁকা হয়েছে, তা কোনো উচ্চকিত রাজনৈতিক বার্তার মাধ্যমে নয়; বরং একটি সাধারণ গাছের ওপর নোবেল নামের এক ব্যক্তির অধিকার দাবি এবং তার বিপরীতে একটি পরিবারের অসহায়ত্বের মধ্য দিয়েই ক্ষমতার নিষ্ঠুর বিন্যাসটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র, আইন বা ন্যায়বিচারের মতো শব্দগুলো সেখানে অনুপস্থিত থাকলেও তাদের অকার্যকারিতা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। দেশত্যাগের সিদ্ধান্তটি হঠাৎ করে আসে না; বরং ক্রমাগত জবরদখল, ভীতি আর অসম্মান পুঞ্জীভূত হতে হতেই একদিন তা অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।
শহরের এক ভিন্ন রূপ উন্মোচিত হয় ‘আঁধারে হারানো রাত’ ও ‘ফেরা’ গল্প দুটিতে। রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে এখানে উঠে আসে রাতের আঁধার, হেলিকপ্টারের গর্জন, টিয়ারশেল আর আতঙ্কিত মানুষের আর্তনাদ; তবে লেখিকা কেবল বাহ্যিক ঘটনার বর্ণনায় সীমাবদ্ধ থাকেননি। বিশেষ করে ‘ফেরা’ গল্পে যখন মর্গের শীতল পরিবেশে বাবা-মা তাদের প্রিয় সন্তানের লাশ খুঁজে ফেরেন, তখন তা কেবল কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব হয়ে থাকে না। এটি তখন এক একান্ত ব্যক্তিগত ও গভীর শারীরিক শোকের রূপ নেয়, যা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব; আর ঠিক এই বিন্দুতেই গল্পটি পাঠকের হৃদয়ে তীব্রতম আঘাত হানে।
‘ছায়ার অমাবস্যা’ গল্পটা একজন অবিবাহিত নারীর জীবনকে ঘিরে সমাজের অবিরাম কৌতূহল, প্রশ্ন আর শারীরিক গঠন নিয়ে কাটাছেঁড়া যেন এক প্রাত্যহিক ও স্বাভাবিক চিত্র। কিন্তু এই তথাকথিত স্বাভাবিকতার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে এক গভীর নির্মমতা। আত্মীয়-স্বজনের বিয়ের তাড়া কিংবা কাপড়ের দোকানে শরীর নিয়ে তুচ্ছ মন্তব্য; এগুলো আপাতদৃষ্টিতে খুব বড় কোনো নিষ্ঠুরতা মনে না হলেও, প্রতিনিয়ত শুনতে শুনতে তা মানুষের ভেতরের আত্মবিশ্বাসকে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দেয়। লেখিকা কোনো রকম চড়া স্লোগান ছাড়াই এই মানসিক ক্ষয়ের বাস্তব রূপটি নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন।
‘সায়াহ্নের আলো’ গল্পে এসে সময়ের গতি যেন কিছুটা থমকে যায়। দাদাভায়ের নাগরিক জীবনে এখন নেই কোনো উন্মুক্ত প্রান্তর বা চেনা মুখ; তার জগৎ এখন চার দেয়াল আর ওষুধের রুটিনে বন্দি। এখানে বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা এক নীরব ও মন্থর রূপ পায়; সরাসরি কোনো আঘাত না থাকলেও এক অদৃশ্য বিচ্ছিন্নতা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। গ্রাম ছেড়ে শহরে আসা শিকড় ও একটি সম্পূর্ণ জীবন থেকে বিচ্যুত হওয়া; সেই গভীর উপলব্ধিটিই গল্পে অতি সন্তর্পণে ফুটে উঠেছে।
'বিকেলের অনেক রং' কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আড়ম্বরপূর্ণ ঘোষণা চাপিয়ে দেয় না বরং এটি অত্যন্ত নিপুণভাবে একে একে অনেকগুলো ক্ষুদ্র জীবনের পরতে পরতে প্রবেশ করে। যেখানে কখনো ফুটে ওঠে আর্থিক অনটন বা হৃদয়ের ভুল বোঝাবুঝি, আবার কখনো ধরা পড়ে রাষ্ট্রীয় পীড়ন, শারীরিক কুণ্ঠা কিংবা বার্ধক্যের একাকীত্ব। এই বিচিত্র অনুষঙ্গগুলোকে মলাটবদ্ধ করে বইটিকে একটি দীর্ঘ বিকেলের মতোই বিস্তৃত মনে হয়। পাঠ শেষে উপলব্ধি হয় যে, এই ছোটগল্পগুলো আসলে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়; এগুলো আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সেই সব নামহীন এবং অদেখা বিচিত্র রঙেরই সমষ্টি।



