একটা তেলচিটচিটে কড়াই শুধু পানি দিয়ে ধোয়ার চেষ্টা করেছেন?
আমি করেছি।
ফলাফল খুবই হতাশাজনক। পানি কড়াইয়ের ওপর দিয়ে গড়িয়ে চলে যায়। তেলের গায়ে সামান্য ধাক্কাও লাগে না। তেল কড়াই আঁকড়ে পড়ে থাকে। তাকে দেখে মনে হয়, এই কড়াই সে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। এখান থেকে তাকে সরানোর অধিকার কারও নেই।
এর কারণ আছে।
তেল পানিকে পছন্দ করে না। বিজ্ঞানের ভাষায় তেল হাইড্রোফোবিক। ‘হাইড্রো’ অর্থ পানি, ‘ফোবিক’ অর্থ ভয় বা বিরাগ। অর্থাৎ পানির সঙ্গে তেলের সম্পর্ক ভালো নয়। একজন আরেকজনকে এড়িয়ে চলে। পানি তেলের গায়ে হাত রাখতে চায় না। তেলও পানির সঙ্গে মিশতে রাজি নয়।
এই দুই পক্ষের মাঝখানে এসে উপস্থিত হয় সাবান।
সাবান অদ্ভুত জিনিস। তার স্বভাবের মধ্যে দুই রকম ব্যাপার আছে। সাবানের অণুর এক দিক পানি পছন্দ করে। অন্য দিক পানি সহ্য করতে পারে না, তেলের দিকে ছুটে যায়। একই অণুর মধ্যে দুই বিপরীত স্বভাব।
বিষয়টা শুনে প্রথমে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। যে জিনিসের অর্ধেক পানি ভালোবাসে, আর অর্ধেক পানি থেকে পালাতে চায়, সেই জিনিসের ওপর ভরসা করা যায় কীভাবে?
যায়।
কারণ সাবানের এই দ্বৈত স্বভাবই তার শক্তি। তার এক প্রান্ত তেলকে ধরে। অন্য প্রান্ত পানিকে ধরে। তারপর তেল আর পানির মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলে, তোমরা সরাসরি কথা বলতে পারছ না, ঠিক আছে। আমার হাত ধরো।
পানি সাবানের এক হাত ধরে। তেল ধরে অন্য হাত।
তারপর পানি যখন কড়াই থেকে গড়িয়ে নেমে যায়, সাবান তেলকেও সঙ্গে নিয়ে যায়। এতক্ষণ যে তেল কড়াই আঁকড়ে বসেছিল, সে ছোট ছোট বিন্দু হয়ে পানির সঙ্গে চলে যায়। কড়াই পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞানের ক্লাসে শেখা অসংখ্য তথ্যের মধ্যে এই তথ্যটি আমার খুব প্রিয়।
কারণ কথাটা শুধু কড়াই, তেল, পানি এবং সাবানের মধ্যে আটকে নেই। মানুষের জীবনেও এরকম ঘটনা ঘটে।
আমরা প্রায়ই ভাবি, নিজের সমস্যার সমাধান নিজেকেই করতে হবে। নিজের কষ্ট নিজেকেই সামলাতে হবে। সাহায্য চাইলে মানুষ দুর্বল ভাববে। কেউ হাত বাড়িয়ে দিলে মনে হয়, আমি কি তবে একা পারলাম না?
সব কাজ একা পারা যায় না।
পানি শক্তিশালী। নদী তৈরি করে। পাহাড় ভাঙে। পাথর ক্ষয় করে। ভয়ংকর বন্যা ঘটায়। অথচ কড়াইয়ের সামান্য তেল সরাতে পারে না।
পানির শক্তি কম বলে এমন হয় না। তেলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার যে ক্ষমতা দরকার, সেই ক্ষমতা পানির নেই।
সাবানের আছে।
মানুষের জীবনেও এমন কিছু জায়গা থাকে, যেখানে আমাদের মেধা, সাহস, অভিজ্ঞতা, ইচ্ছাশক্তি কিছুই ঠিকমতো কাজ করে না। আমরা চেষ্টা করি। আবার চেষ্টা করি। সমস্যার ওপর দিয়ে আমাদের চেষ্টা পানির মতো গড়িয়ে যায়। সমস্যাটি একই জায়গায় লেগে থাকে।
তখন একজন মানুষের দরকার হয়।
সে হয়তো সমস্যাটি আমাদের হয়ে সমাধান করে না। শুধু আমাদের সঙ্গে সমস্যাটির একটা যোগসূত্র তৈরি করে দেয়। আমরা যে কথাটি বলতে পারছিলাম না, সে কথাটি শুনে নেয়। যে ভয়টিকে আমরা ধরতে পারছিলাম না, সে ভয়টির নাম বলে দেয়। বন্ধুর কাজ অনেক সময় এটাই।
বন্ধু সবসময় শক্তিশালী মানুষ হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। তার কাছে সব সমস্যার উত্তরও থাকবে না। সে শুধু আমাদের এমন কিছু দিতে পারে, যা সেই মুহূর্তে আমাদের কাছে নেই।
কারও কাছে ধৈর্য আছে।
কারও কাছে হাসি আছে।
কারও কাছে যুক্তি আছে।
কারও কাছে চুপ করে পাশে বসে থাকার ক্ষমতা আছে।
কারও কাছে একটি টেলিফোন কল করার সাহস আছে, যে কলটি আমরা তিন দিন ধরে করতে পারছি না।
কারও কাছে একটি বাক্য আছে। সে বলে, ভয় পেয়ো না, আমি আছি।
বাক্যটি খুব সাধারণ। কিন্তু বিপদের সময় সাধারণ বাক্যও অসাধারণ হয়ে ওঠে।
আমরা অনেক সময় মানুষের সাহায্য নিতে লজ্জা পাই। মনে করি, নিজের পায়ে দাঁড়ানো মানুষ অন্যের কাঁধে হাত রাখে না। এই ধারণা ঠিক নয়। মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়ায় বলেই প্রয়োজনে অন্যের কাঁধে হাত রাখতে পারে। পড়ে যাওয়ার আগে হাত বাড়ানো লজ্জার বিষয় না।
যে সাহায্য চায়, সে নিজের সীমা বুঝতে পেরেছে। নিজের সীমা বোঝা বুদ্ধির লক্ষণ।
সব মানুষ সবকিছু বহন করার জন্যে তৈরি নয়। কারও মন শক্ত, শরীর দুর্বল। কারও শরীর শক্ত, মন অল্পতেই ভেঙে যায়। কেউ বিপদের মধ্যে খুব শান্ত থাকে, কিন্তু সাধারণ দিনের নিঃসঙ্গতা সহ্য করতে পারে না। কেউ সবার সমস্যা শুনতে পারে, নিজের সমস্যা মুখ ফুটে বলতে পারে না।
এই অসম্পূর্ণতাগুলোই মানুষকে মানুষের দিকে নিয়ে যায়।
আমরা যদি সম্পূর্ণ হতাম, বন্ধুর প্রয়োজন হতো না। পরিবার লাগত না। ভালোবাসারও দরকার পড়ত না। প্রত্যেকে নিজের ভেতর সম্পূর্ণ একটা দ্বীপ হয়ে বসে থাকতাম।
মানুষ দ্বীপ হয়ে জন্মায় না।
মানুষের ভেতরে অনেকগুলো খালি জায়গা থাকে। একেকজন মানুষ এসে একেকটি জায়গায় হাত রাখে। কেউ সাহস দেয়। কেউ ভাষা দেয়। কেউ স্মৃতি দেয়। কেউ আমাদের নিজেদের কাছে ফিরিয়ে দেয়।
এই মানুষগুলো আমাদের জীবনের সাবান।
উপমাটি খুব মহৎ না। প্রিয় বন্ধুকে কেউ সাধারণত বলে না, তুমি আমার জীবনের সাবান। বললে বন্ধু রাগও করতে পারে। বিশেষ করে জন্মদিনের কার্ডে কথাটি লেখা ঠিক হবে না।
তবু সত্যটি থেকে যায়।
কিছু মানুষ আমাদের এমন জায়গা থেকে তুলে আনে, যেখান থেকে আমরা নিজে উঠতে পারছিলাম না। তারা আমাদের কষ্টের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়, যেন কষ্টটি আর শুধু আমাদের একার থাকে না। ভাগ হয়ে যায়। ছোট হয়ে আসে। ধুয়ে যায়।
তখন প্রশ্ন করা যায়, আপনার জীবনে সেই মানুষটি কে?
আপনি যখন নিজের কোনো উপায় খুঁজে পান না, তখন কাকে ফোন করেন?
কার সামনে নিজের শক্ত থাকার অভিনয় বন্ধ করতে পারেন?
কার কাছে বলতে পারেন, আমার আজ খুব খারাপ লাগছে?
আরও একটি প্রশ্ন আছে।
আপনি কার জীবনে সেই মানুষ?
কে আপনার কাছে এসে নির্ভয়ে দুর্বল হতে পারে?
কার দুঃখের পাশে আপনি চুপ করে বসে থাকেন?
কার সমস্যার সঙ্গে আপনি তার নিজের শক্তিকে যুক্ত করে দেন?
জীবনে সাহায্য পাওয়া বড় ঘটনা। সাহায্য করতে পারাও বড় ঘটনা।
পৃথিবীর অনেক সম্পর্ক এই দুই ঘটনার মাঝখানে তৈরি হয়। একজনের যা নেই, অন্যজন তার সামান্য অংশ নিয়ে আসে। তারপর দুজন মিলে এমন একটি কাজ করে, যা একজনের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
একটা কড়াই পরিষ্কার হয়।
একটা মন হালকা হয়।
একজন মানুষ আবার বেঁচে থাকার মতো করে শ্বাস নেয়।


