আমি একসময় ভাবতাম, ভালোবাসাকে চিনে ফেলা খুব সহজ ব্যাপার। বয়স তখন খুব বেশি নয়। পৃথিবী সম্পর্কে আমার জ্ঞান ছিল অল্প, কিন্তু আত্মবিশ্বাস ছিল প্রায় দার্শনিকদের মতো। সেই বয়সের একটা সুবিধা আছে, আমরা কিছুই জানি না, কিন্তু মনে করি সবকিছু বুঝে ফেলেছি। জীবন তখনো আমাদের ভুল প্রমাণ করার যথেষ্ট সময় পায়নি।
আমি মনে মনে ভালোবাসার একটা ছবি বানিয়ে রেখেছিলাম। ভালোবাসার একটা নির্দিষ্ট চেহারা থাকবে, নির্দিষ্ট কিছু অভ্যাস থাকবে, নির্দিষ্ট কিছু পছন্দ থাকবে। সে নিশ্চয়ই আমার পছন্দের বই পড়বে, আমার পছন্দের গান শুনবে, আমার মতো করেই পৃথিবীকে দেখবে। যেন ভালোবাসা কোনো মানুষ নয়, বরং আমার নিজেরই আরেকটি সংস্করণ, শুধু একটু সুন্দর করে প্যাকেট করা।
এখন ভাবলে হাসি পায়। আমরা ছোটবেলায় আসলে ভালোবাসা খুঁজি না, আমরা খুঁজি একজন সাক্ষী, যে এসে প্রমাণ করবে আমাদের পছন্দগুলো ঠিক। যে বলবে, “হ্যাঁ, তোমার পৃথিবী দেখার পদ্ধতিই সঠিক।”
আমরা ভালোবাসার মানুষ চাই না, চাই নিজের প্রতিধ্বনি।
তারপর একদিন সত্যিকারের ভালোবাসা এলো।
আর এসে প্রথমেই আনাদের সব হিসাব নষ্ট করে দেয়।
ভালোবাসা হয়তো সেই গান জানে না, যেটা শুনে তুমি রাতের পর রাত কাটিয়েছ। ভালোবাসা হয়তো সেই বই পড়েনি, যেটা তোমার জীবন বদলে দিয়েছে। ভালোবাসা হয়তো এমনভাবে চা বানায়, যা তোমার কাছে অপরাধের কাছাকাছি মনে হয়। কিংবা এমন কোনো সিনেমা দেখে কাঁদে, যেটাকে তুমি সারাজীবন সাধারণ ভেবেছ।
প্রথমে একটু হতাশ লাগে।
কারণ বাস্তব মানুষ কখনো আমাদের কল্পনার চরিত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় জিততে পারে না।
কল্পনার মানুষ কখনো ভুল কথা বলে না। কখনো দেরি করে না। কখনো ক্লান্ত হয়ে বিরক্ত হয় না। কখনো একই গল্প তিনবার বলে না। কখনো টুথপেস্টের ঢাকনা খুলে রেখে দেয় না।
বাস্তব মানুষ এসবই করে।
আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেখান থেকেই ভালোবাসা শুরু হয়।
আমি ধীরে ধীরে বুঝেছি, ভালোবাসা আসলে মিল খোঁজার ব্যাপার নয়, বরং অমিলের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করার ক্ষমতা।
কাউকে আপন করে নেওয়া মানে কেবল তার উজ্জ্বল দিনগুলোর সঙ্গী হওয়া নয়। কেননা জীবনের ঝলমলে সময়কে পছন্দ করাটা আসলে বড্ড মামুলি কাজ। পরিপাটি অবয়ব, নির্মল হাসি কিংবা মার্জিত আচরণের প্রেমে পড়া তো অতি সাধারণ একটি ব্যাপার; এর জন্য হৃদয়ের কোনো বিশেষ গভীরতা বা সক্ষমার প্রয়োজন হয় না।
কঠিন হলো একজন মানুষের সাধারণতাকে ভালোবাসা।
যে মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে সিনেমার নায়কের মতো লাগে না।
যে মানুষ ভুলে যায়।
যে মানুষ রেগে যায়।
যে মানুষ নিজের ভয় আর অনিশ্চয়তা লুকানোর চেষ্টা করে।
যে মানুষ মাঝেমধ্যে নিজেকেই বুঝতে পারে না।
আমরা প্রায়ই বলি, “মানুষ বদলে গেছে।”
কথাটা এমনভাবে বলি, যেন বদলে যাওয়া একটা অপরাধ।
কিন্তু মানুষ বদলাবে না কেন?
আমরা কি নিজেরাই একই রকম আছি?
যে মানুষকে দশ বছর আগে ভালোবেসেছিলাম, সে মানুষটা আজ একই থাকবে, এই প্রত্যাশার মধ্যে একধরনের নিষ্ঠুরতা আছে কিন্তু। আমরা চাই মানুষ বাঁচুক, অভিজ্ঞতা অর্জন করুক, পৃথিবী দেখুক, কিন্তু আবার চাই সেই অভিজ্ঞতা যেন তাকে একটুও পরিবর্তন না করে।
এটা অনেকটা নদীকে বলার মতো, তুমি বহতা, কিন্তু তোমার গতিপথ বদলাবে না।
ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা সম্ভবত এখানেই।
একজন মানুষকে ভালোবাসা নয়, একজন পরিবর্তনশীল মানুষকে ভালোবাসা।
কারণ আমরা কাউকে একবার ভালোবেসে সারাজীবন একই মানুষকে ভালোবাসি না। আমরা একই মানুষের অনেকগুলো সংস্করণের সঙ্গে পরিচিত হই।
একদিন যার স্বপ্ন ছিল একরকম, দশ বছর পর তার স্বপ্ন বদলে যায়।
একদিন যে মানুষটি কোনো কিছুকে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ মনে করত, একদিন সেটাই তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়।
একদিন যে মানুষটি তোমার সামনে বসে হাসত, একদিন সে হয়তো চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।
তখন প্রশ্ন আসে, তুমি কি শুধু তার পুরোনো সংস্করণকে ভালোবেসেছিলে?
নাকি মানুষটাকে?
আমার মনে হয়, পরিণত ভালোবাসার মধ্যে একটা গোপন শোক থাকে। কারণ সেখানে আমরা বারবার সেই মানুষটাকে বিদায় দিই, যাকে একসময় চিনতাম, এবং নতুন মানুষটাকে স্বাগত জানাতে শিখি।
এটা সহজ নয়।
আমরা সবাই একটু স্বার্থপর। আমরা চাই প্রিয় মানুষ আমাদের স্মৃতির মতো থাকুক। যেন পুরোনো বাড়ির মতো, যেখানে ফিরে গেলে সব আসবাব একই জায়গায় পাওয়া যাবে।
কিন্তু মানুষ বাড়ি নয়।
মানুষ ঋতুর মতো।
বদলায়।
কখনো উষ্ণ হয়।
কখনো দূরে সরে যায়।
কখনো ফিরে আসে।
ভালোবাসাও সবসময় থাকার গল্প নয়।
এটা মেনে নেওয়া সবচেয়ে কঠিন।
আমরা ভাবতে ভালোবাসি, সত্যিকারের ভালোবাসা মানেই চিরকাল। যেন সময়ের দৈর্ঘ্যই অনুভূতির সত্যতা প্রমাণ করে।
কিন্তু কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে মাত্র কয়েক মাসের জন্য, অথচ আমাদের ভেতরে এমন একটি দরজা খুলে দিয়ে যায়, যেটা আমরা জানতামই না আছে।
আবার কেউ কেউ থাকে সারাজীবন। জন্মদিনে, হাসপাতালে, সাধারণ মঙ্গলবারের বিকেলে, বাজারের ব্যাগ হাতে, বিদ্যুতের বিল নিয়ে আলোচনার মাঝেও।
দুটোই ভালোবাসা হতে পারে।
ভালোবাসার মূল্য সবসময় তার স্থায়িত্ব দিয়ে মাপা যায় না।
কিছু গান ছোট হয়, তাই বলে কি সেগুলো কম সুন্দর?
আজ এতদিন পর মনে হয়, ছোটবেলার আমি ভুল ছিলাম।
ভালোবাসাকে প্রথম দেখায় চিনে ফেলা যায় না।
বরং অনেক সময় ভালোবাসাকে চিনতে আমাদের বহু বছর লাগে।
কারণ ভালোবাসা কোনো প্রস্তুত ছবি তো না।
ভালোবাসা আসে একজন অসম্পূর্ণ মানুষের রূপে।
যে মানুষ হাসবে।
ভুল করবে।
তোমাকে বিরক্ত করবে।
তোমার ধারণা ভাঙবে।
আবার কোনো এক সাধারণ দিনে, কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই, এমনভাবে পাশে বসে থাকবে যে তুমি হঠাৎ বুঝতে পারবে, এই অসম্পূর্ণ মানুষটার মধ্যেই আমি এতদিন সেই অসম্পূর্ণ ভালোবাসাটাকে খুঁজছিলাম। যাকে আমি চিনতে পারিনি, কারণ আমি তখনো ভালোবাসাকে নয়, নিজের কল্পনাকে খুঁজছিলাম।
রিটন খান



