বিজ্ঞানীদের কেন কবিতা পড়া উচিত
আমরা জানি, চেতন অভিজ্ঞতার ভেতরেই একটি ‘অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিকোণ’ থাকে। যেমন মোমবাতির শিখা দেখা মানে শুধু শিখা দেখা নয়; আপনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন, তাও ইঙ্গিত করে।
বিজ্ঞানীরা পৃথিবীকে অনেক সময় মায়াহীন, জাদুহীন, একরকম খসখসে বলে মনে করেন। যেন সব রহস্য মেপে ফেলা হয়েছে ক্যালকুলেটরের বোতামে। তবু অদ্ভুতভাবে, এই সব হিসাবের মাঝখানেই হঠাৎ প্রশ্ন ওঠে; আমরা যা অনুভব করি, সেটাই বা কম কী? এই অনুভবের ঘটনাটাই কি সবচেয়ে বড় রহস্য নয়? একটি নতুন বই সেই প্রলোভনটাকে আলতো করে বাড়িয়ে দেয়। আর তার ফল এমনও হতে পারে; কদিন দিন পর আপনি দাঁড়িয়ে আছেন মোমবাতির নীল শিখার দিকে তাকিয়ে, নিজের অজান্তে রবীন্দ্রনাথের পংক্তি আবৃত্তি করছেন, এমনকি ডার্ক ওয়েবে সাইকেডেলিক্সের সন্ধান করছেন, যেন চেতনার দরজা আরেকটু খোলা যায়।
বইটির নাম A World Appears। লেখক Michael Pollan— বিজ্ঞানের সাংবাদিক, খাদ্য ও চেতনা-অন্বেষণের এক কৌতূহলী পর্যটক। বইটি কী নিয়ে, তার ছোট্ট সারাংশ দেওয়া কঠিন। কারণ ‘চেতনা’ শব্দটিই অস্পষ্টতার এক গহ্বর। কেউ এটিকে সাধারণ সচেতনতা বা অভিজ্ঞতা বলে ব্যবহার করেন; কেউ বলেন, না, চেতনা মানে সেই ব্যক্তিগত, অন্তর্মুখী দিক; যা শুধু আমার জন্য ‘আমার মতো’ করে ঘটে। পোলান একটি রূপক ব্যবহার করেন; জানালার কাচ। এই কাচ ভেদ করে আমরা শুধু জানালার বাইরের দৃশ্য দেখি না; কখনো কাচটির দিকেও মন ফেরাই। সেই কাচের দিকে মন ফেরানোই চেতনার সূক্ষ্ম স্তর।
আমরা জানি, চেতন অভিজ্ঞতার ভেতরেই একটি ‘অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিকোণ’ থাকে। যেমন মোমবাতির শিখা দেখা মানে শুধু শিখা দেখা নয়; আপনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন, তাও ইঙ্গিত করে। দার্শনিক Thomas Nagel তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ What Is It Like to Be a Bat?-এ লিখেছিলেন; কোনো জীবের চেতন মানসিক অবস্থা হয় তখনই, যখন ‘সেই জীব হওয়া কেমন’; তার একটি অনুভব থাকে। এই বাক্য বোঝা কঠিন হলে, পাঠক নিজেই পরীক্ষা করে দেখতে পারেন; এই মুহূর্তে নেগেলের বাক্য বুঝতে না পারার অনুভব কেমন।
কিন্তু ‘ব্যক্তিগত’ দিকটি বহু চিন্তাবিদকে বিভ্রান্ত করেছে। Galileo Galilei জগৎকে দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন; পরিমাপযোগ্য, বস্তুনিষ্ঠ গুণাবলি একদিকে; রং, স্বাদ, অনুভূতি; অন্যদিকে। পরে এই পদ্ধতিই ধীরে ধীরে এক প্রকার দর্শনে পরিণত হয়। যেন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কম বাস্তব, বা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের অযোগ্য। পোলান মন্তব্য করেন, পদ্ধতি থেকে মেটাফিজিক্স হয়ে ওঠার এই যাত্রাতেই চেতনার অনুভবকে আমরা সন্দেহের চোখে দেখতে শিখেছি।
অন্যদিকে, কিছু সাধক ও দার্শনিক বলেন; ব্যক্তিগত সত্তাকেই ফেলে দেওয়া যায়; ‘অপ্রাসঙ্গিক’ চেতনা সম্ভব। জার্মান দার্শনিক Thomas Metzinger পোলানকে বলেন, গবেষকরা যদি ধ্যান করতেন, কিংবা সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতেন, তবে ধারণাটি স্পষ্ট হতো। তাঁর অভিযোগ; যারা আলোচনায় প্রভাবশালী, তাঁদের নিজস্ব মানসিক জীবন প্রায় অনুর্বর। এ মন্তব্যে খানিক বিদ্রূপ আছে, খানিক সত্যও।
এই আত্ম-পর্যবেক্ষণের ঝুঁকি কম নয়। পোলান উল্লেখ করেন মনোবিজ্ঞানী Alison Gopnik-এর কথিত “প্রফেসর চেতনা”; সামাজিকভাবে অদক্ষ, স্ক্রিনে ডুবে থাকা মেধাবীরা চেতনার সারমর্ম খুঁজে পান তথ্য প্রক্রিয়াকরণে। শরীর, অনুভূতি, স্পর্শ; সব যেন গৌণ। যদি শুরুতেই চেতনাকে তথ্য প্রক্রিয়াকরণে সীমাবদ্ধ করেন, তবে পরের প্রশ্ন; কম্পিউটার কি চেতন? তার উত্তরও সুবিধামতো পাওয়া যায়। হঠাৎ দেখা গেল, তথ্য প্রক্রিয়াকরণই চেতনা, আর কম্পিউটারও তাই সচেতন। যেন জাদুমন্ত্র।
অথবা যদি চেতনাকে পরিবেশের প্রতি ইতিবাচক বা নেতিবাচক সাড়া হিসেবে ধরেন, তবে উদ্ভিদও চেতন। তখন রবীন্দ্রনাথের ফুলের পংক্তি বৈজ্ঞানিক সত্যে রূপ নেয়। ফলাফল আকর্ষণীয় শোনায়, কিন্তু মূল ঘটনার জায়গা বদলে গেছে।
পোলান এই সরলীকরণ এড়িয়ে চলেন। তিনি পুরো মানসিক প্রবাহে আগ্রহী; অনুভব, ভাষা, স্বপ্ন, দিবাস্বপ্ন, মতামত, অন্তর্দৃষ্টি, এমনকি তুচ্ছ মানসিক ভাসমান জঞ্জালও। এক পরীক্ষায় তিনি কানে একটি বীপ-যন্ত্র পরেন; যখনই শব্দ হয়, তিনি তখনকার মানসিক অবস্থা সব লিখে রাখেন। ভেবেছিলেন অসাধারণ কিছু পাবেন। পেয়েছেন একঘেয়ে জগৎ। মানসিক জীবন প্রায়শই নিরানন্দ।
তবু তিনি ‘অপ্রাসঙ্গিক’ অভিজ্ঞতার কথাও বলেন; একদিন একটি মাশরুমকে নীল রঙের পুকুরে গলে যেতে দেখেছিলেন, এমন এক দৃষ্টিকোণ থেকে যা নির্লিপ্ত, আবেগহীন। সন্দেহ জাগে; দৃষ্টিকোণ ছাড়া দেখা সম্ভব? কিন্তু প্রশ্নটি ঝুলেই থাকে। এই বিস্তৃত ধারণা বিশ্লেষণকে জটিল করে। বইটির কেন্দ্রে আছে তথাকথিত ‘হার্ড প্রবলেম’; চেতনার কঠিন সমস্যা। কীভাবে মস্তিষ্কের ধূসর-সাদা ভাঁজ থেকে শীতের কালের অনুভব জন্মায়? দার্শনিক David Chalmers কল্পনা করেন এক ‘জম্বি’; শারীরিকভাবে মানুষ, কিন্তু চেতনাহীন। কল্পনার শক্তি এখানে যুক্তি হিসেবে হাজির। তবে কল্পনা বাস্তবতার সীমা জানে না; তাই তার ওপর নির্ভরতা প্রশ্নসাপেক্ষ।
পোলান অন্য পথে যান। অভিজ্ঞতাকে ধরতে গেলে, ধরার প্রক্রিয়াটিও অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে যায়। বীপ বাজলে আমি যা দেখি, তা কি নতুন কিছু তৈরি করে? আমরা যেন এক ক্ষুদ্র দর্শক কল্পনা করি, যিনি মনের লাইভস্ট্রিম দেখছেন। কিন্তু দর্শক ও দৃশ্য আলাদা নয়। অভিজ্ঞতা নিজেই স্নায়ুতন্ত্র বদলায়; হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের ভেদরেখাও অস্পষ্ট। পোলান এমনটাই মনে করেন।
বৈজ্ঞানিক ভাষা তৃতীয়-পুরুষের; চেতনা প্রথম-পুরুষের। একটি স্মরণীয় ভোজ বা দুঃস্বপ্নকে কি সম্পূর্ণরূপে নিউরনের বৈদ্যুতিক স্রোতে অনুবাদ করা সম্ভব? হয়তো নয়। এখানে কবিতা প্রবেশ করে। রবীন্দ্রনাথের পংক্তিতে ধুলো থেকে সুর হয়ে ওঠা আত্মা; এক ধরনের জবাব, যা যুক্তির চেয়ে অনুভবে কাজ করে।
এদিকে বিবর্তনবাদী ব্যাখ্যা বলছে, চেতনার উদ্দেশ্য হোমিওস্ট্যাসিস; অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষা। Karl Friston, Antonio Damasio, Mark Solms; এঁদের মতে, ক্ষুধা যেমন খাদ্যের দিকে ঠেলে দেয়, তেমনি জটিল অনুভবও টিকে থাকার কৌশল। সোল্মস বলেন, চূড়ান্ত লক্ষ্য; অনিশ্চয়তা শূন্যে নামিয়ে চেতনাকে অপ্রয়োজনীয় করা।
কিন্তু ভেতর থেকে দেখলে, চেতনাকে অপ্রয়োজনীয় করা কোনো আকাঙ্ক্ষা নয়। বরং তার ভেতরে আরও গভীরে নামার ইচ্ছে জাগে। বিজ্ঞান জিন-প্রেরণ, শক্তি-সংগ্রহ, সম্পদ-সঞ্চয় বলবে; কিন্তু এই মুহূর্তের খেয়াল, ইচ্ছে, কৌতূহল; সে ভাষায় ধরা পড়ে না। মানুষের হয়ে বিজ্ঞান দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলতে পারে না; ভাষাটি অতিরিক্ত শুষ্ক। আমরা কেন ভাবি চেতনা কম বাস্তব? আদর্শবাদী দার্শনিক Bernard Kastrup পোলানকে বলেন, পদার্থ অনুমান; মন প্রদত্ত। প্রত্যেকের ভেতরে এখনই এক বিস্তৃত, রূপান্তরময় মহাবিশ্ব খোলা। বাইরে নয়, ভেতরে যাওয়াই যথেষ্ট। এই অনুসন্ধান শেষ হয় না। বরং শুরু হয়; মোমবাতির নীল শিখার সামনে দাঁড়িয়ে, নিজের দৃষ্টিকোণটিকে লক্ষ্য করে। হয়তো রহস্য জগতের বাইরে নয়; আমাদের অনুভব করার ক্ষমতার মধ্যেই।
রিটন খান



