হারুকি মুরাকামির উপন্যাসে মানুষ সাধারণত কোথাও না কোথাও হারিয়ে যায়। কেউ কুয়োর তলায় নামে, কেউ হঠাৎ বাড়ি ছেড়ে উধাও হয়, কেউ সমান্তরাল এক জগতে ঢুকে পড়ে, কেউ এমন নারীর প্রেমে পড়ে যার বাস্তব অস্তিত্ব নিয়ে পাঠক, লেখক এবং সম্ভবত সেই নারী নিজেও পুরোপুরি নিশ্চিত নন। মাঝরাতে জ্যাজ বাজে, স্প্যাগেটি সেদ্ধ হয়, বিড়াল নিখোঁজ হয়, টেলিফোন বেজে ওঠে, আর নায়ক ভাবতে থাকে জীবনের কোথায় কোন অদৃশ্য দরজাটি খোলা রয়ে গেল।
এ বার মুরাকামি সেই সব গোপন দরজার একটি খুলছেন নিজের বাড়ির ভেতরে। দরজার ওপারে আছেন তাঁর বাবা। সঙ্গে একটি বেড়ালও আছে। কারণ মুরাকামির জীবনে কোনও আবেগ যদি নিছক মানুষে-মানুষে সীমাবদ্ধ থাকে, তা হলে ব্যাপারটা তাঁর পক্ষে বোধহয় সামান্য অস্বাভাবিক হয়ে যায়।
নফ প্রকাশনা সংস্থা ঘোষণা করেছে, এ বছরের অক্টোবরে তারা প্রকাশ করবে মুরাকামির স্মৃতিকথামূলক সংক্ষিপ্ত বই Abandoning a Cat: A Personal Story। জাপানি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ফিলিপ গ্যাব্রিয়েল, যিনি বহু বছর ধরে মুরাকামির ভাষার স্বপ্ন, নিঃসঙ্গতা, বিড়াল, অন্ধকার করিডর এবং অকারণ রান্নাবান্নাকে ইংরেজিতে পার করিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। বইটির প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ ২০ অক্টোবর।
প্রকাশকের ভাষায়, বইটি মুরাকামির বাবাকে নিয়ে “একটি মর্মস্পর্শী আত্মঅনুসন্ধান, সঙ্গে একটি বেড়াল।” বিজ্ঞাপনের বাক্য হিসেবে এর জুড়ি নেই। ভারতীয় প্রকাশক হলে হয়তো লিখতেন, “বাবা, দেশভাগ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পারিবারিক ক্ষত ও এক হৃদয়বিদারক মার্জারকাহিনি।” নফ সংযম দেখিয়েছে। বাবা এবং বেড়াল। মানবসভ্যতার আবেগীয় ইতিহাস মোটামুটি এই দুই স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়েই বহুদিন চলছে।
বইটি একেবারে নতুন লেখা নয়। ২০১৯ সালে দ্য নিউ ইয়র্কার-এ মুরাকামি এই বিষয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। আসন্ন বইটি সেই রচনার পূর্ণাঙ্গ, অবিকৃত সংস্করণ। অর্থাৎ পত্রিকার পৃষ্ঠায় যে স্মৃতির দরজাটি তিনি সামান্য ফাঁক করেছিলেন, এ বার সেটি একটু বেশি খুলবেন। পাঠক দেখতে পাবেন একটি জাপানি পরিবার, একজন নীরব বা আংশিক শান্ত বাবা, একজন বিখ্যাত হয়ে ওঠা ছেলে, যুদ্ধের ছায়া, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অপরাধবোধ এবং এমন কিছু কথা, যা পরিবারের লোকেরা সাধারণত মুখে বলে না। পরিবারে সব কথা বলা হলে সাহিত্য নামের শিল্পটির বাজার অনেক আগেই পড়ে যেত।
শিরোনামটির পেছনে রয়েছে মুরাকামির শৈশবের একটি ঘটনা। তিনি ও তাঁর বাবা একদিন একটি বেড়ালকে বাড়ি থেকে দূরে নিয়ে গিয়ে ফেলে আসেন। সিদ্ধান্তটি সম্ভবত গৃহস্থালির স্বাভাবিক যুক্তি মেনেই নেওয়া হয়েছিল। বিড়াল বেশি হয়ে গেছে, রাখা যাচ্ছে না, দূরে ছেড়ে এলে আর ফিরবে না। মানুষ নিজের নিষ্ঠুরতার জন্য যখন যুক্তি তৈরি করে, তখন সে বিশেষ দক্ষ হয়ে ওঠে। যুদ্ধ, বিবাহবিচ্ছেদ, চাকরি থেকে ছাঁটাই এবং বেড়াল পরিত্যাগ, সবকিছুর পাশেই একটি করে ব্যাখ্যা রাখা থাকে।
কিন্তু বাবা ও ছেলে বাড়ি ফিরে দেখেন, বেড়ালটি তাঁদের আগেই ফিরে এসেছে।
ঘটনাটি ছোট। এত ছোট যে কোনও বাঙালি বাড়িতে ঘটলে বাড়ির ঠাকুমা বলতেন, “বলেছিলাম না, ওকে ফেলে লাভ নেই? বেড়াল রাস্তা চেনে।” তারপর তাকে একটু ভাত-মাছ দিয়ে বিষয়টির সমাপ্তি ঘটত। মুরাকামির ক্ষেত্রে কোনও ঘটনাই এত সহজে শেষ হয় না। বেড়ালটি বাড়ি ফিরে এসেছে, কিন্তু সেই ফিরে আসার মধ্যে জমে রয়েছে পরিত্যাগ, আনুগত্য, স্মৃতি, বাড়ির ধারণা ।
আমরা যাদের ত্যাগ করি, তারা সবাই সামনের দরজা দিয়ে ফিরে আসে না। কেউ ফিরে আসে স্বপ্নে, কেউ আচরণে, কেউ রাগের ভঙ্গিতে, কেউ নিজের সন্তানের সঙ্গে কথা বলার সময়। মানুষ অনেক সময় আবিষ্কার করে, বাবার যে স্বভাবটি সারাজীবন অপছন্দ করেছে, পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে ঠিক সেই স্বরেই সে নিজের ছেলেকে ধমকাচ্ছে। উত্তরাধিকার কেবল বাড়ি, জমি, ঘড়ি বা পুরোনো বইয়ের আলমারি দিয়ে প্রবেশ করে না। একটি ভ্রুকুটি, একটি দীর্ঘ নীরবতা, একটি অকারণ কঠোরতা, খাবার টেবিলে বসে থাকা একটি অভ্যাসও রক্তের সঙ্গে অনায়াসে সীমান্ত পার হয়।
মুরাকামির এই বেড়াল তাই কেবল বেড়াল থাকার দায় থেকে আগেই অব্যাহতি পেয়েছে। সে স্মৃতির দূত। গ্রিক পুরাণে দেবতারা বার্তা পাঠাতেন ঈগল, কাক বা হার্মিসের মাধ্যমে। আধুনিক জাপানি সাহিত্যে বার্তাবাহক হিসেবে বেড়ালই সুবিধাজনক। ঈগল পোষা ঝামেলা, হার্মিসের পারিশ্রমিক বেশি, বেড়াল অন্তত নিজের খাবার নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতে জানে।
মুরাকামির বাবা চিয়াকি মুরাকামি ছিলেন জাপানি সাহিত্যের শিক্ষক এবং বৌদ্ধ পুরোহিত পরিবারের সন্তান। তিনি জাপানের সামরিক বাহিনীতেও কাজ করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে জাপানের যে প্রজন্মটি বেঁচে ছিল, তাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে রাষ্ট্রকে আলাদা করা কঠিন। রাষ্ট্র তাদের পোশাক পরিয়েছে, অস্ত্র দিয়েছে, অন্য দেশে পাঠিয়েছে, তারপর পরাজয়ের পরে মাথা নিচু করে বাড়ি ফিরতে বলেছে। ইতিহাসের বইয়ে যুদ্ধ শেষ হয় আত্মসমর্পণের তারিখে। মানুষের ভেতরে যুদ্ধের ছুটি মঞ্জুর হয় অনেক পরে, কখনও হয় না।
মুরাকামির সঙ্গে তাঁর বাবার সম্পর্ক সহজ ছিল না। দীর্ঘ সময় তাঁদের মধ্যে যোগাযোগও ছিল না। বিখ্যাত লেখকের জীবনী পড়তে গিয়ে আমরা সাধারণত একটি মনোরম সূত্র খুঁজি। বাবা ছোটবেলায় বই পড়ে শোনাতেন, মা খাতা কিনে দিতেন, বাড়িতে রবীন্দ্রসংগীত বাজত, শিশু প্রতিভা জানালার পাশে বসে প্রথম গল্প লিখেছিল। বাস্তব পরিবার এতটা প্রকাশকবান্ধব হয় না। সেখানে অভিমান থাকে, ভুল বোঝাবুঝি থাকে, প্রজন্মগত দূরত্ব থাকে, এমন বাক্য থাকে যা বলা হয়েছিল এবং এমন বাক্যও থাকে যা বলা উচিত ছিল অথচ বলা হয়নি।
বাবা ও ছেলের সম্পর্কের একটি অদ্ভুত অসুবিধা হল, দুজনেই প্রায়ই একই ভাষায় চুপ থাকে। মা ও মেয়ের দ্বন্দ্ব অনেক সময় ভাষায় বিস্ফোরিত হয়। বাবা ও ছেলে বছরের পর বছর পাশাপাশি বসে সংবাদপত্র পড়ে যেতে পারে, মাঝখানে মহাভারতের সমান ভুল বোঝাবুঝি রেখে। একজন ভাবেন, ছেলেটি তাঁকে বোঝে না। অন্যজন ভাবেন, বাবা কোনওদিন বুঝতে চাননি। দুজনের কেউ কথাটি বলেন না। তারপর একজন মারা যান, অন্যজন স্মৃতিকথা লেখেন। সাহিত্য বহুদিন ধরেই দেরিতে শুরু হওয়া পারিবারিক কথোপকথনের একটি ব্যয়বহুল ব্যবস্থা।
প্রকাশনী নফ জানিয়েছে, বইটি অনুসন্ধান করবে বাবা হওয়া এবং ছেলে হওয়ার অর্থ, ভালোবাসা পাওয়া এবং পরিত্যক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা, পারিবারিক ইতিহাসের ভেতর ব্যক্তিগত স্মৃতির স্থান এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী জাপানের পরিবর্তন। বিষয়গুলোর তালিকা শুনে বইটিকে ছোট বলা কিছুটা বিপজ্জনক মনে হয়। কয়েক ডজন পৃষ্ঠার মধ্যে বাবা, পুত্র, ভালোবাসা, পরিত্যাগ, যুদ্ধোত্তর জাপান এবং একটি বেড়ালকে সামলাতে হলে লেখকের হাতে বিশেষ কৌশল থাকা দরকার। মুরাকামির সেই কৌশল আছে। তিনি বহুবার তিনশো পৃষ্ঠার নিঃসঙ্গতাকে একটি ফোনকলের মধ্যে ঢুকিয়েছেন।
১৯৭৯ সালে Hear the Wind Sing উপন্যাস দিয়ে মুরাকামির সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশ। গল্পটি এখন প্রায় কিংবদন্তি। বেসবল খেলা দেখতে দেখতে তাঁর হঠাৎ মনে হয়েছিল, তিনি উপন্যাস লিখতে পারেন। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ খেলা দেখতে দেখতে চিনাবাদাম খায়, আম্পায়ারকে গালি দেয় বা পাশের লোকের মাথার কারণে বল দেখতে না পেয়ে বিরক্ত হয়। মুরাকামি উপন্যাস লিখতে গেলেন। প্রতিভা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য অনেক সময় এমন অদ্ভুত জায়গাতেই ধরা পড়ে।
তারপর এল একের পর এক উপন্যাস: Hard-Boiled Wonderland and the End of the World, Norwegian Wood, The Wind-Up Bird Chronicle, Kafka on the Shore, 1Q84, Colorless Tsukuru Tazaki and His Years of Pilgrimage, Killing Commendatore, The City and Its Uncertain Walls। তাঁর রচনার পৃথিবীতে পশ্চিমি সংগীত, জাপানি নিঃসঙ্গতা, যৌন আকাঙ্ক্ষা, ইতিহাসের গোপন ক্ষত, অবচেতন এবং গৃহপালিত প্রাণী এমনভাবে একসঙ্গে থাকে যেন তারা বহুদিন ধরে একই ভাড়াবাড়ির বাসিন্দা।
মুরাকামির জনপ্রিয়তা নিয়ে সাহিত্যজগতে এক বিশেষ ধরনের দ্বিধা আছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁকে পড়ে, ফলে কিছু গম্ভীর পাঠক সন্দেহ করেন, এত লোক যে বই পড়ছে সেটি ভালো হতে পারে কী করে। সাহিত্যসমালোচনার একটি পুরোনো নিয়ম হল, পাঠকসংখ্যা বেড়ে গেলে বইটির নৈতিক চরিত্র নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতে হয়। আবার মুরাকামি নোবেল পুরস্কার না পেলেই প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে একটি ক্ষুদ্র শোকসভা বসে। তিনি নিজে সম্ভবত বাড়িতে বসে রেকর্ড শোনেন এবং ভাবেন, মানুষ তাঁর পুরস্কার নিয়ে তাঁর চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন কেন।
সম্প্রতি জাপানে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নতুন উপন্যাস The Tale of KAHO। ইংরেজি অনুবাদের ঘোষণা এখনও আসেনি। ফলে ইংরেজিভাষী মুরাকামি-পাঠকদের আপাতত অপেক্ষা করতে হবে। মুরাকামির পাঠকের কাছে অপেক্ষা কোনও নতুন অভিজ্ঞতা নয়। তাঁর চরিত্রেরা কুয়োর পাশে, টেলিফোনের কাছে, হোটেলের ঘরে, হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকার জন্য বা কোনও অজানা দরজা খোলার জন্য অপেক্ষা করেই বহু পৃষ্ঠা কাটিয়ে দেয়। পাঠকও অনুবাদের জন্য কিছুদিন অপেক্ষা করলে সাহিত্যিক সামঞ্জস্য বজায় থাকবে।
মুরাকামি আগে স্মৃতিনির্ভর গদ্য লিখেছেন। What I Talk About When I Talk About Running-এ তিনি দৌড়, লেখালেখি, শরীর, শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘ উপন্যাস রচনার মধ্যে সম্পর্ক অনুসন্ধান করেছিলেন। সেই বই পড়ে বহু মানুষ দৌড় শুরু করেছেন, অনেকেই তিন দিন পরে হাঁটুতে ব্যথা পেয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন লেখক হওয়াই সহজ। Underground-এ তিনি টোকিও পাতালরেলে সারিন গ্যাস হামলার বেঁচে যাওয়া মানুষদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে জাপানি সমাজের দমিয়ে রাখা দিকগুলি তুলে ধরেছিলেন। তাঁর প্রবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে ব্যক্তিগত জীবন মাঝে মাঝে দেখা দিলেও বাবার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তিনি তুলনামূলকভাবে সংযত ছিলেন।
এই নতুন বই সেই কারণে গুরুত্বপূর্ণ। একজন লেখক তাঁর জীবনের প্রথম দিকে যে কল্পজগৎ নির্মাণ করেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রায়ই তার পেছনের পারিবারিক ঘরগুলি খুলতে শুরু করেন। তরুণ লেখক পৃথিবী আবিষ্কার করতে চান। প্রবীণ লেখক বুঝতে চান, তিনি পৃথিবীটিকে এই বিশেষ চোখে দেখলেন কেন। কোন নীরবতা তাঁকে নীরব চরিত্র লিখিয়েছে, কোন অনুপস্থিতি তাঁকে হারিয়ে যাওয়া মানুষে আকৃষ্ট করেছে, কোন পারিবারিক ছায়া তাঁর উপন্যাসে অন্ধকার সুড়ঙ্গ হয়ে ফিরে এসেছে।
মুরাকামির উপন্যাসে বাবারা প্রায়ই অনুপস্থিত, দূরবর্তী, ক্ষতিগ্রস্ত বা অস্বস্তিকর। ছেলেরা নিজেদের পরিচয় খুঁজতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। বিড়ালেরা নিখোঁজ হয়। অতীত চুপচাপ বর্তমানের বিছানার নিচে বসে থাকে। Abandoning a Cat হয়তো তাঁর কল্পসাহিত্যের কোনও সহজ চাবিকাঠি দেবে না। বড় লেখকের জীবন থেকে তাঁর রচনার সমাধান বের করার চেষ্টা অনেক সময় তালা দেখে চাবি বানানোর মতো। তবু এই বই তাঁর সাহিত্যের পুনরাবৃত্ত কিছু আবেগের উৎস সম্পর্কে আলো ফেলতে পারে।
যদি খেয়াল করেন তাহলে দেখবেন শিরোনামের ভেতরে একটি কঠিন দ্বৈততা আছে। মানুষ একটি বেড়ালকে পরিত্যাগ করে। আবার মানুষ নিজেও পরিত্যক্ত হয়। বাবা সন্তানকে আবেগে ফেলে রাখতে পারেন, সন্তান বড় হয়ে বাবাকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে, একটি প্রজন্ম পরের প্রজন্মকে এমন ইতিহাস দিয়ে যায় যার দায় কেউ নিতে চায় না। যুদ্ধশেষে রাষ্ট্র সৈনিকদের পরিত্যাগ করে, পরিবার পুরোনো আঘাতকে নীরবতার মধ্যে ফেলে রাখে, সন্তান ভাবে সে অতীত থেকে মুক্ত হয়ে গেছে। তারপর সেই অতীত একদিন বেড়ালের মতো বাড়ির সামনে বসে থাকে। মুখে কোনও অভিযোগ নেই, কেবল ফিরে এসেছে।
ভালোবাসা ও পরিত্যাগের সম্পর্কও সরল নয়। যাকে ভালোবাসি তাকেই কখনও ছেড়ে আসি। যাকে ছেড়ে এসেছি, তাকে ভুলতে না পারার মধ্যেও ভালোবাসা থাকে। বাবা তাঁর সন্তানকে ভালোবাসতে পারেন, কিন্তু সেই ভালোবাসার ভাষা জানেন না। ছেলে বাবার কাছ থেকে দূরে থাকতে পারে, তবু বাবার মৃত্যুর পরে তাঁর স্মৃতি নিয়ে লিখতে বসে। মানুষের আবেগ আদালতের সাক্ষ্যপ্রমাণের মতো পরিপাটি নয়। সেখানে দোষী ব্যক্তি একই সঙ্গে আহত, নিষ্ঠুর মানুষ একই সঙ্গে স্নেহশীল, পরিত্যাগকারীও কোনও এক স্তরে পরিত্যক্ত।
এই জটিলতাই মুরাকামির জন্য উপযুক্ত ভূমি। তাঁর গল্পে মানুষ নিজেদের অনুভূতির নির্ভুল নাম জানে না। তারা রান্না করে, হাঁটে, গান শোনে, যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে, অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে এবং ধীরে ধীরে বুঝতে পারে তাদের জীবনের প্রধান ঘটনাটি বহু বছর আগে ঘটে গেছে। তারা শুধু এতদিন পরে তার শব্দ শুনছে।
আমার মনে হয় Abandoning a Cat শেষ পর্যন্ত সম্ভবত একটি বাবার পূর্ণাঙ্গ জীবনী নাও হতে পারে। এটি স্মৃতির একটি সংক্ষিপ্ত টুকরো, আর টুকরো স্মৃতিই অনেক সময় পুরো পরিবারের চেয়ে বেশি সত্য বলে। একটি বেড়ালকে দূরে ফেলে আসা এবং তার আগেই বাড়ি ফিরে আসার দৃশ্যের মধ্যে একটি যুগের পারিবারিক নৈতিকতা, শিশুমনের বিস্ময়, বাবার উপস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ বিচ্ছেদের বীজ একসঙ্গে থাকতে পারে।
স্মৃতি কখনও আর্কাইভ নয়। সেখানে তারিখ ভুল হয়, দৃশ্য বদলে যায়, মৃত মানুষ নতুন সংলাপ পায়। তবু মানুষ স্মৃতির কাছেই ফিরে যায়, কারণ অতীতের আর কোনও ঠিকানা নেই। ইতিহাস রাষ্ট্রের নথিতে থাকে, পারিবারিক ইতিহাস থাকে ভাঙা বাক্যে, পুরোনো ছবিতে, রান্নাঘরের গল্পে, একটি নির্দিষ্ট গন্ধে এবং এমন কোনও প্রাণীর স্মৃতিতে, যাকে একদিন ফেলে আসা হয়েছিল।
মুরাকামি এতদিন ধরে পাঠকদের শিখিয়েছেন, হারিয়ে যাওয়া জিনিসের খোঁজ করতে গেলে বাস্তবতার নিচে আরেকটি বাস্তবতা পাওয়া যায়। এ বার তিনি নিজেই ফিরে যাচ্ছেন সেই পুরোনো বাড়িতে, বাবার পাশে বসছেন এবং বহু বছর আগের সেই বেড়ালটির দিকে তাকাচ্ছেন।
বেড়ালটি বাড়ি ফিরেছিল।
বাবা আর ফিরবেন না।
তাই ছেলেকে লিখতে হয়।
রিটন খান



