গ্রন্থ সমালোচনা: 'অন্য মানুষে' – মানব মনস্তত্ত্ব ও অস্তিত্ববাদের এক দার্শনিক আখ্যান
সমাজ, জেন্ডার ও নারীর মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন আয়েশা অরিমা, সুদিবা এবং তমসা চরিত্রগুলোর মাধ্যমে নারীর মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও সামাজিক কাঠামোর তীব্র সমালোচনা করেছেন।
আয়েশা জাহানের রচিত ‘অন্য মানুষে’ উপন্যাসটি মানব মনের বিচিত্র অনুভূতি, নিঃসঙ্গতা এবং আত্মানুসন্ধানের এক অনবদ্য মনস্তাত্ত্বিক দলিল। উপন্যাসের মূল উপজীব্য বিষয় হলো মানুষের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব; বিশেষ করে মানুষের প্রকৃতিগত “আমি বনাম আমি” এবং “আমি বনাম অন্য যে কেউ” মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত। এই সংঘাতের কারণেই মানুষ অনেক সময় চরম নিঃসঙ্গতায় ভোগে এবং নিজের মনের মতো একজন কাঙ্ক্ষিত চরিত্রের সন্ধান করে। আয়েশা অত্যন্ত নিপুণভাবে বেশ কয়েকটি চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে জীবনের গূঢ় দর্শন, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, ভাষার সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক কাঠামোর অন্তসারশূন্যতা তুলে ধরেছেন।
অনুভূতি ও ভাষার সীমাবদ্ধতার দর্শন উপন্যাসটির একটি অন্যতম প্রধান চরিত্র হলো বিচিত্রা। বিচিত্রা ও বিভাসের আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে আয়েশা অনুভূতির এক গভীর দর্শন তুলে ধরেছেন। বিচিত্রার মতে, মানবচিত্ত অত্যন্ত বিচিত্র ও সর্বদা সঞ্চরণশীল; সে কেবল একটি নির্দিষ্ট অনুভব বা ভাবনায় আটকে থাকতে চায় না। আনন্দ এবং অকারণ বিষণ্ণতার মাঝে মন প্রতিনিয়ত দুলতে থাকে। মানুষের মনের এই বিচিত্র অনুভূতির উপর সময় এবং প্রকৃতির গভীর প্রভাব রয়েছে। সূর্যাস্তের সময় মৃত্যু ও জীবনের জটিল তত্ত্বে মন সবচেয়ে বেশি আলোড়িত হয় এবং আসন্ন প্রিয়-বিচ্ছেদের বেদনায় কেঁদে ওঠে।
বিচিত্রার মতে, অনুভূতির কোনো সুনির্দিষ্ট শ্রেণিবিভাগ হয় না। প্রেম, পূজা, প্রকৃতি, ঈশ্বর বা প্রণয়ী—এসব আসলে একই অসীম আকাঙ্ক্ষার ভিন্ন ভিন্ন রূপ, যার সন্ধানে মানুষ সারা জীবন খুঁজে হয়রান হয়। আয়েশার মতে জগত সংসারে শব্দগুলো কেবল কোনো কিছুর অস্তিত্ব (আছে) বা অভাবকে (নেই) নির্দেশ করে। জগতের সকল বিপরীত শব্দযুগল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি শব্দ কোনো অনুভূতির উপস্থিতি বোঝায় এবং অপরটি তার অভাবকে নির্দেশ করে। ভাষার এই সীমাবদ্ধতার কারণেই মানুষ তার প্রকৃত বিশুদ্ধ অনুভূতি কখনো ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। ভাষার অসারতা পার হয়ে অনুভবের প্রকৃত প্রকাশের জন্য সে শিল্পের, বিশেষ করে সুরের ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতার কথা বলেছে, কারণ রবীন্দ্রনাথের মতে বাক্য যেখানে শেষ হয়, গান সেখান থেকেই শুরু হয়।
প্রাপ্তি বনাম আকাঙ্ক্ষার মনস্তত্ত্ব উপন্যাসের অন্যতম শক্তিশালী চরিত্র অদিতি, যার বয়স চল্লিশে পদার্পণ করেছে। অদিতির জীবনদর্শন হলো, সুখ বা আনন্দ কোনো কিছু ‘পাওয়া’ বা প্রাপ্তির মাঝে নিহিত নেই, বরং তা পাওয়ার ‘আকাঙ্ক্ষা’ বা অপেক্ষার মাঝেই লুকিয়ে থাকে। কাঙ্ক্ষিত কিছুর জন্য অপেক্ষার মাঝে যে শিহরণ, স্বপ্ন দেখার যে ভালো লাগা থাকে, তা প্রাপ্তির পর আর থাকে না। অদিতির মতে, প্রথম পরিচয় বা প্রথম স্পর্শের উত্তেজনা প্রবল ও রোমাঞ্চকর, যা প্রাত্যহিক অভ্যাসে মলিন হয়ে যায়। কোনো কিছুর অভাব বা আকাঙ্ক্ষা মানুষকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য দেয় এবং সেই লক্ষ্য পূরণের অবিরাম প্রচেষ্টা জীবনে গতির সঞ্চার করে মানুষকে বেঁচে থাকার অনুভূতি দেয়।
অদিতির এই দুঃখবিলাসী কিন্তু প্রশান্ত মানসিকতার চরম পরিণতি দেখা যায় তার মৃত্যুর বর্ণনায়। সে প্রভাসকে জানিয়েছিল, তার একটি শৈল্পিক মৃত্যুর সাধ আছে; সে চেয়েছিল একটি পরিচ্ছন্ন, পাটভাঙা শুভ্র চাদরের ওপর পূর্ণিমার রাতে মৃত্যুবরণ করতে, যেখানে কোনো কান্নাকাটি বা মানুষের ভিড় থাকবে না। উপন্যাসের উপসংহারে প্রভাস ঠিক এভাবেই অদিতির প্রশান্ত মৃতদেহ আবিষ্কার করে। চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত অদিতির মুখ যেন তার সমস্ত অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার পরম প্রশান্তিকে নির্দেশ করে।
সমাজ, জেন্ডার ও নারীর মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন আয়েশা অরিমা, সুদিবা এবং তমসা চরিত্রগুলোর মাধ্যমে নারীর মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও সামাজিক কাঠামোর তীব্র সমালোচনা করেছেন। অরিমা যে সমাজ ও মানুষের ভিড় থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখে, কারণ সে মনে করে মানুষের সাথে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত দায়বদ্ধতা ও উপদ্রব চলে আসে। সে তার কল্পনায় একজন আদর্শ মানুষের খোঁজ করে, কিন্তু তার মতে বাস্তবে তা পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
সুদিবা চরিত্রটি সমাজের জেন্ডার বৈষম্য নিয়ে সরব। সে মনে করে নারী-পুরুষের বিরোধটি সমাজ সৃষ্ট; ‘জেন্ডার’ বা লিঙ্গ পরিচয় মানুষের ওপর আরোপিত হওয়ায় মানুষ তার প্রকৃত রূপ ভুলে যায়। তার মতে, প্রতিটি মানুষকে ‘by sex’ এবং ‘by gender’ দুটি ভিন্ন সত্তা ধারণ করতে হয়, যা চরম সাংঘর্ষিক।
অন্যদিকে তমসা চরিত্রটি চরমভাবে আঘাতপ্রাপ্ত। সে পুরুষদের ভালোবাসার গভীরতা মাপার জন্য একটি ‘স্কেল’ তৈরির মতো মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় লিপ্ত, যেখানে সে শারীরিক অভিব্যক্তি ও আচরণের মাধ্যমে প্রেম ও যৌনতার গভীরতা মাপতে চায়। তমসার এই অস্বাভাবিক আচরণ মূলত তার জীবনের পূর্ববর্তী ব্যর্থতা ও ক্ষোভের চরম পরিণতি।
স্বাধীন স্পৃহা ও নিবৃত্তির দর্শন অণিমা চরিত্রটি অত্যন্ত স্বাধীনচেতা, চঞ্চল ও প্রথা বিরোধী। সে এক জায়গায় স্থির থাকতে পারে না এবং কোনো কিছুর পিছুটান তাকে টানে না। সে মনে করে পেছনের স্মৃতি তাকে আকর্ষণ করার বদলে বিকর্ষণ করে, ফলে তার সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া সহজ হয়। অণিমা প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বা পরীক্ষার প্রতি উদাসীন; সে মনে করে পড়াশোনার উদ্দেশ্য কেবল আত্মানুসন্ধান হওয়া উচিত, কোনো সার্টিফিকেটের জন্য নয়। শান্তিনিকেতনে অনিরুদ্ধের সাথে তার পরিচয় হলেও সে তাকে বাঁধতে চায় না, কারণ সে চায় তার অনুভূতিগুলো অমলিন থাকুক।
অন্যদিকে যূথিকা চরিত্রটি নিবৃত্তি বা বাসনা ত্যাগের চর্চা করে। সে মনে করে প্রবৃত্তির পেছনে ছুটলে মানুষের চাহিদা কেবল বাড়তেই থাকে, যেমন আগুনে ঘি ঢাললে আগুন আরও বাড়ে। তাই প্রকৃত শান্তি নিবৃত্তিতে। যূথিকা লেখালেখি করে মূলত তার মস্তিষ্কের অনুর্বরতা কাটানোর জন্য, নতুবা জীবন তার কাছে অর্থহীন মনে হয়। তার পাঠক সুশীল তাকে নিয়মিত সঙ্গ দিলেও যূথিকা একটি ভদ্রতাসূচক দূরত্ব বজায় রাখে, কারণ সে মনে করে দূরত্ব কমে গেলে মানুষের ঔদ্ধত্য প্রকাশ পায়।
আয়েশা জাহানের ‘অন্য মানুষে’ উপন্যাসটির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো রবীন্দ্র সাহিত্যের ব্যাপক প্রভাব। চরিত্রগুলো তাদের যেকোনো গভীর অনুভূতি বা দর্শন বোঝাতে রবীন্দ্রনাথের গান বা কবিতার আশ্রয় নেয়। আয়েশা প্রচলিত গল্পের কাঠামোর বাইরে গিয়ে মূলত সংলাপ ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। এখানে দৃশ্যমান কোনো অ্যাকশন বা নাটকীয় ঘটনার চেয়ে চরিত্রগুলোর ভেতরের দ্বন্দ্ব এবং তাদের চিন্তাধারাই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
পরিশেষে বলা যায়, 'অন্য মানুষে' কোনো গতানুগতিক প্রেমের বা সামাজিক উপন্যাস নয়। এটি মানুষের অস্তিত্ব, নিঃসঙ্গতা, আকাঙ্ক্ষা এবং অনুভূতির সীমানা খোঁজার একটি অত্যন্ত পরিণত দার্শনিক দলিল। অদিতির সেই প্রশান্ত মৃত্যু বা বিচিত্রার অনুভূতির বিশুদ্ধতার ব্যাখ্যা পাঠককে দীর্ঘক্ষণ ভাবাতে বাধ্য করে। যারা মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক কথাসাহিত্য ভালোবাসেন, তাদের জন্য আয়েশা জাহানের এই সৃষ্টি একটি অবশ্য পাঠ্য ও চিন্তার খোরাক জোগানো বই।



