একটা কথা বলতে মন চাইছে। কিছু মনে করবেন না।
সেদিন একটা রিল দেখলাম। একজন ভদ্রলোক বেশ গম্ভীর মুখে, চোখে এমন দৃষ্টি যেন তিনি সদ্য এআইয়ের ময়নাতদন্ত করে উঠেছেন, বোঝাচ্ছেন এআই ধরবেন কী করে।
উনি বললেন, নিখুঁত ছবি? এআই।
নির্ভুল লেখা? এআই।
আমি শুনে ভাবলাম, এতদিন তাহলে আমরা মানুষ বলে যাদের সঙ্গে মিশেছি, তাদের কেউই মানুষ ছিল না। আমাদের পাড়ার রমেনবাবু যে প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ে অফিসে যেতেন, তাঁর চুল কখনও এদিক-ওদিক হয়নি। নিশ্চয়ই এআই। আমাদের স্কুলের হেডমাস্টারমশাই যে বানান ভুল করতেন না, তিনিও এআই। আর আমার মা যে একবার রান্না করলে পঁচিশজন মানুষ খেয়ে প্রশংসা করত, তাঁর রান্নাঘরে নিশ্চয়ই কোনো গোপন সার্ভার বসানো ছিল।
রিলের ভদ্রলোকের যুক্তি শুনে মনে হল, পৃথিবীতে মানুষের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হচ্ছে সে একটু বেশি ভালো কিছু করে ফেলেছে।
ছবিটা সুন্দর? সন্দেহ করুন।
লেখাটা গোছানো? আরও বেশি সন্দেহ করুন।
কথাবার্তায় যুক্তি আছে? সাবধান, এই লোকটি মানুষ নাও হতে পারে।
মানুষের প্রতি আমাদের আস্থা এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, কেউ যদি নিজের নাম ঠিকঠাক লিখতে পারে, আমরা তার দিকে তাকিয়ে বলি, “ভাই, তোমার প্রসেসরটা কোন কোম্পানির?”
আমি অমিত কুমারকে কথাটা বললাম। সে শুনে বলল, “আরে বুঝলি না? এইগুলাকে বলে টুপাইস কামানোর ধান্ধা।”
আমি বললাম, “কীভাবে?”
সে বলল, “অরে artificial intelligence বানান করতে বল, সে এআইয়ের কাছে ছুটবে।”
অমিতবাবু আমার চেয়ে কম পড়াশোনা করেছে, কিন্তু মানুষের চরিত্র বোঝে বেশি। ওর এই কথাটি শুনে আমার মনে হল, বাংলা ভাষায় কিছু প্রবাদ নতুন করে লেখা দরকার। যেমন, আগে বলা হত, “চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে।” এখন বলা যায়, “এআই এলে কোর্স বিক্রি বাড়ে।”
কেউ একটা রিল বানাবে, “মাত্র তিন দিনে এআই চিনুন।”
আরেকজন বলবে, “এআই আপনার চাকরি খেয়ে ফেলবে, আজই আমার ওয়েবিনারে যোগ দিন।”
তৃতীয়জন বলবে, “এআই আপনাকে ধ্বংস করার আগে আমার প্রিমিয়াম কমিউনিটিতে ঢুকে পড়ুন।”
মানুষ ভয় পেলে তার পকেটের তালা খুলে যায়। এই সত্যটি বিজ্ঞাপনবিদরা বহুদিন ধরেই জানেন। আগে ভূতের ভয় দেখিয়ে তাবিজ বিক্রি হত। এখন এআইয়ের ভয় দেখিয়ে প্রম্পট কোর্স, ডিটেকশন সফটওয়্যার, অনলাইন সার্টিফিকেট, মাস্টারক্লাস, বুটক্যাম্প, কমিউনিটি এবং মাসিক সাবস্ক্রিপশন বিক্রি হচ্ছে। ভূত বদলেছে, ব্যবসার পদ্ধতি বদলায়নি।
ভদ্রলোক বলছেন, ছবি নিখুঁত হলে এআই।
এখানে আমার সামান্য আপত্তি আছে। পৃথিবীর সব নিখুঁত ছবিই এআই দিয়ে তৈরি হয় না। বহু বছর ধরে মানুষ আলো, ক্যামেরা, লেন্স, মেকআপ, সেট ডিজাইন, সম্পাদনা এবং অনুশীলনের সাহায্যে সুন্দর ছবি বানাচ্ছে। একজন ফটোগ্রাফার কোনো মুখে সঠিক আলো ফেলতে পারেন, একজন শিল্পী কোনো দৃশ্যকে এমনভাবে আঁকতে পারেন যাতে সেখানে বাস্তবের চেয়েও বেশি বাস্তবতা দেখা যায়। একটা ছবিতে ভুল নেই বলে ছবিটা এআইয়ের সন্তান হয়ে যাবে, এমন নিয়ম কে বানালেন?
আমার ছোটবেলায় আমাদের পাড়ায় এক ফটোগ্রাফার ছিলেন, নাম ছিল নিতাই। তাঁর স্টুডিওর নাম ছিল “নিউ মডার্ন আর্ট ফটো স্টুডিও”। স্টুডিওর ভেতরে ঢুকলেই পেছনে তিনটি ব্যাকড্রপ দেখা যেত। একটিতে পাহাড়, একটিতে কাশফুল, আর একটিতে এমন একটি প্রাসাদ যার বারান্দায় দাঁড়িয়ে মানুষ বুঝতেই পারত না, সে কলকাতায় আছে, না লন্ডনে।
নিতাইবাবু ছবি তুলতেন এমন ভঙ্গিতে, যেন প্রতিটি মানুষই সিনেমার নায়ক। পাড়ার কেরানিবাবু এসে বসলে তিনি বলতেন, “চিবুকটা একটু ওপরে করুন। চোখে দূরের স্বপ্ন রাখুন।”
কেরানিবাবু বলতেন, “দূরের স্বপ্ন রাখব কেন? বাড়িতে চাল নেই।”
নিতাইবাবু বলতেন, “ছবিতে অভাব দেখা যায় না।”
সেই সময় নিতাইবাবুর তোলা ছবিতে কারও মুখে দাগ থাকত না, চোখের নিচে কালি থাকত না, গালের ভাঁজ থাকত না। তাঁর কাছে গেলে সবাই নিজের চেয়ে একটু বেশি সুন্দর হয়ে ফিরত। তাহলে কি নিতাইবাবু এআই ছিলেন? না, তাঁর হাতে ছিল রিটাচিং পেনসিল, ধৈর্য এবং পাড়ার মানুষের আত্মসম্মান রক্ষার দায়।
এখন সেই কাজটি সফটওয়্যার করে। ছবির আলো ঠিক করে, মুখের দাগ মুছে, পটভূমি বদলে, পোশাক পালটে, চোখের দৃষ্টি সামান্য ঘুরিয়ে দেয়। প্রযুক্তি কাজটাকে দ্রুত করেছে। মানুষকে অদৃশ্য করেনি।
আর “নির্ভুল লেখা” কথাটিও বেশ মজার।
যে লেখায় বানান ঠিক, বাক্য সম্পূর্ণ, কমা-দাড়ি যথাস্থানে, অনুচ্ছেদ পরিপাটি, সেই লেখা এআইয়ের লেখা হতে পারে। আবার কোনো মানুষও লিখতে পারেন। তবে মানুষ যখন লেখেন, তখন তাঁর লেখার মধ্যে অনেক সময় ভুল থাকে, অসমাপ্তি থাকে, পুনরুক্তি থাকে, নিজের সঙ্গে নিজের তর্ক থাকে। সেইখানে মানুষের উপস্থিতি বোঝা যায়।
কিন্তু মানুষের লেখাতেও যদি ভাষা পরিষ্কার থাকে, যুক্তি ধারালো থাকে, স্মৃতি সুসংবদ্ধ থাকে, তখন আমরা বলি, “এটা নিশ্চয়ই এআই লিখেছে।”
আমাদের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আগে লেখককে প্রমাণ করতে হত তিনি লিখেছেন। এখন লেখককে প্রমাণ করতে হয় তিনি লেখেননি।
একজন ছাত্র ভালো রচনা লিখলে শিক্ষক সন্দেহ করেন, “তুই নিজে লিখেছিস?”
ছাত্র বলে, “জি স্যার।”
শিক্ষক বলেন, “তাহলে এত সুন্দর কেন?”
এই প্রশ্নের মধ্যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বহু বছরের ইতিহাস লুকিয়ে আছে। আমরা ছাত্রদের শেখাই, ভালো লিখতে। তারপর তারা ভালো লিখলে জিজ্ঞেস করি, “কে লিখে দিয়েছে?”
একদিন এক ছেলেকে দেখলাম, সে পরীক্ষার খাতায় লিখেছে, “বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ।” শিক্ষক লাল কালি দিয়ে পাশে লিখেছেন, “এটা মুখস্থ?”
ছেলেটি বলেছে, “জি।”
শিক্ষক লিখেছেন, “নিজের ভাষায় লেখো।”
পরেরবার সে লিখেছে, “বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে নদী আছে এবং সেই নদীগুলোর কারণে দেশটি মাতৃসুলভ।”
শিক্ষক এবার লিখেছেন, “এআই ব্যবহার করেছ?”
ছেলেটি বলেছে, “স্যার, আমি তো এখনও ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে শিখিনি।”
লেখা নিখুঁত হলেই এআই, এমন ধারণা আসলে প্রযুক্তির ব্যাখ্যা নয়, মানুষের প্রতি দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস। আমরা ধরে নিচ্ছি মানুষ মূলত অগোছালো, ভুলপ্রবণ, অক্ষম। ফলে কেউ দক্ষতার সঙ্গে কিছু করলে মনে হয়, নিশ্চয়ই যন্ত্রের সাহায্য নিয়েছে।
এই ধারণার সঙ্গে আরেকটি বিপজ্জনক ব্যাপার জড়িয়ে আছে। মানুষ ভুল করে বলে আমরা ভুলকে মানবিকতার প্রমাণ ধরে নিচ্ছি। যেন ভুল বানান, দুর্বল বাক্য, এলোমেলো যুক্তি, অপ্রয়োজনীয় বিশেষণ এবং দীর্ঘশ্বাসে ভরা অনুচ্ছেদ ছাড়া কোনো লেখা মানুষের লেখা হতে পারে না।
আমার এক আত্মীয় ছিলেন। চিঠি লিখতেন দারুণ। কিন্তু প্রতিটি চিঠিতে অন্তত তিনটি বানান ভুল, চারটি বাক্য অসমাপ্ত এবং এমন একটি ঘটনা থাকত যার সঙ্গে চিঠির বিষয়টির কোনো সম্পর্ক নেই।
একবার তিনি লিখলেন, “তোমার চিঠি পেয়েছি। তোমার খবর জেনে আনন্দিত হলাম। এখানে সবাই ভালো আছে। গতকাল আমাদের পাড়ার হরিপদর ছাগল হারিয়ে গেছে। ছাগলটি সাদা, কানের কাছে কালো দাগ। তোমার মাকে বলো আমার প্রণাম নিও।”
চিঠির শেষে ছাগলের সন্ধান চাওয়া হয়নি, তবু মনে হত ছাগলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে লেখকের গভীর উদ্বেগ আছে।
এই আত্মীয়কে যদি আজকের দিনে চিঠি লিখতে দেওয়া হত, কেউ বলত, “আপনি কি ChatGPT দিয়ে লিখেছেন?”
তিনি বলতেন, “না, হরিপদর ছাগলটা এখনও ফেরেনি। এই দুঃখে নিজের হাতেই লিখেছি।”
এআই নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই দুটি ভুল করি। প্রথম ভুল, এআইকে জাদু ভাবি। দ্বিতীয় ভুল, এআইকে শয়তান ভাবি। জাদু ভাবলে তার প্রতিটি ফলাফলকে নিখুঁত মনে হয়। শয়তান ভাবলে তার প্রতিটি কাজকে প্রতারণা মনে হয়। দুই অবস্থাতেই নিজের বিচারবুদ্ধিকে ছুটিতে পাঠিয়ে দিই।
এআই ছবি বানাতে পারে। সেই ছবিতে মানুষকে দেখা যেতে পারে যার অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই। এমন ঘর দেখা যেতে পারে যার কোনো স্থপতি নেই। এমন শহর দেখা যেতে পারে যেখানে কোনো মানুষ কখনও হাঁটেনি। কিন্তু ছবিটি বানানোর জন্য যে নির্দেশ দরকার, যে নির্বাচন দরকার, যে সংশোধন দরকার, যে রুচি দরকার, সেগুলোর দায়িত্ব মানুষের।
একটি যন্ত্র ছবি তৈরি করতে পারে। ছবির অর্থ নির্ধারণের কাজ এখনও মানুষের।
একটি মডেল বাক্য সাজাতে পারে। কোন বাক্য বলা দরকার, কোনটি বলা উচিত নয়, কোথায় থামতে হবে, কোন সত্যটি অসম্পূর্ণ রেখেও পাঠককে ভাবতে দেওয়া যায়, সেই সিদ্ধান্ত লেখকের।
এই জায়গাতেই রিলের ভদ্রলোকের বক্তব্যটি কুযুক্তিতে পরিণত হয়। তিনি একটি সম্ভাব্য লক্ষণকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করছেন। নিখুঁত ছবি দেখলেই এআই, নির্ভুল লেখা দেখলেই এআই। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন যুক্তি দিলে রোগী বাঁচবে না, আদালতে এমন যুক্তি দিলে নিরপরাধ মানুষ জেলে যাবে, আর পাড়ার আড্ডায় এমন যুক্তি দিলে শেষ পর্যন্ত সবাই এআই হয়ে যাবে।
আমাদের পাড়ায় একজন লোক ছিলেন, নাম ভোলা। তিনি দূর থেকে কাউকে দেখেই বলে দিতে পারতেন লোকটি কী খেয়ে এসেছে।
একদিন তিনি আমাকে দেখে বললেন, “তুই ডিম খেয়ে এসেছিস।”
আমি বললাম, “না।”
তিনি বললেন, “তাহলে ডিম খাসনি, ডিমের গন্ধে পাশ দিয়ে হেঁটে এসেছিস।”
আমি বললাম, “এটাও না।”
তিনি বললেন, “তুই মিথ্যে বলছিস।”
এই যুক্তির বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য চলে না। কারণ তুমি যা-ই বলো, তা তাঁর পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তকে শক্তিশালী করে। আজকাল এআই ধরার নামে অনেক রিলেও এই পদ্ধতি দেখা যায়। ছবিতে হাত অদ্ভুত? এআই। হাত ঠিকঠাক? আরও চালাক এআই। লেখা খারাপ? মানুষ। লেখা ভালো? এআই। যুক্তি ভুল? দর্শক বুঝতে পারেনি। যুক্তি ধরা পড়ে গেলে? ভিডিও ভাইরাল।
এখানে বন্ধুর কথাটি আবার মনে পড়ে। টুপাইস কামানোর ধান্ধা।
টুপাইস এর ভিতরে বড় অর্থনীতি লুকিয়ে আছে। আজকাল অনলাইনে যে কোনো বিষয়ে মানুষকে আগে ভয় দেখানো হয়, তারপর সেই ভয় থেকে বেরোনোর টিকিট বিক্রি করা হয়।
ভয় হলো বিজ্ঞাপনের সবচেয়ে সস্তা জ্বালানি। মানুষকে বলুন সে পিছিয়ে পড়ছে, সে অযোগ্য, সে শিগগিরই অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে। তারপর তাকে একটি লিঙ্ক দিন। সে লিঙ্কে ক্লিক করবে।
আমি একবার এমন এক অনলাইন বক্তৃতায় ঢুকেছিলাম। বক্তা বলছেন, “যারা এখনও এআই ব্যবহার করছেন না, তারা ইতিহাসের বাইরে চলে যাচ্ছেন।”
আমি ভাবলাম, আমার বাবা এআই ব্যবহার না করেই জীবন কাটিয়ে দিলেন। তিনি ইতিহাসের বাইরে চলে গিয়েছিলেন কি না জানি না, তবে তাঁর মাসের বাজারের হিসাব বেশ ভালোই চলত। আমার মা কোনো অ্যাপ ব্যবহার না করে একসঙ্গে দশজন অতিথি খাইয়েছেন। তিনি ইতিহাসের বাইরে থাকলে ইতিহাসের রান্নাঘরটা কোথায় ছিল?
প্রযুক্তি ব্যবহার করা দরকার। নতুন জিনিস শেখা দরকার। নিজের কাজকে দ্রুত, নির্ভুল এবং সৃজনশীল করার জন্য এআই কাজে লাগানো দরকার। কিন্তু নতুন প্রযুক্তি শেখার প্রথম পাঠ হওয়া উচিত বিচারবুদ্ধি। যন্ত্রকে ভয় করে দূরে বসে থাকলে চলবে না, আবার যন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মাথাটি জামার পকেটে রেখে দিলেও চলবে না।
এআইয়ের তৈরি ছবি দেখে প্রশ্ন করুন, ছবিটির উৎস কী।
এআইয়ের লেখা পড়ে প্রশ্ন করুন, তথ্যগুলো যাচাই করা হয়েছে কি না।
এআইয়ের উত্তর শুনে প্রশ্ন করুন, এর মধ্যে অনুমান কতটা, জ্ঞান কতটা।
আর কোনো মানুষ যদি আপনাকে বলেন, “নিখুঁত হলেই এআই,” তাঁকে বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করুন, “আপনার যুক্তিটা কে লিখে দিয়েছে?”
উনি হয়তো বলবেন, “আমি নিজে।”
তখন বলবেন, “তাহলে একটু ঠিকঠাক করে বলুন।”
কারণ ভুল যুক্তির সঙ্গে মানুষের পুরোনো সম্পর্ক আছে। এআই আসার বহু আগে থেকেই মানুষ কুযুক্তি বানিয়ে, সাজিয়ে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরিবেশন করে আসছে। প্রযুক্তি শুধু সেই কুযুক্তিকে রিল বানিয়ে দিয়েছে, পেছনে একটা উত্তেজক সাউন্ড বসিয়েছে, আর শেষে লিখেছে, “শকিং truth।”
অমিতবাবু সেদিন শেষ কথাটা বলেছিল আরও পরিষ্কার করে।
“দ্যাখ, মানুষজন সত্যি জানতে চায় না। মানুষ চায় এমন কথা, যেটা শুনে সে নিজেকে বাকিদের চেয়ে একটু বুদ্ধিমান ভাবতে পারে। ওই লোকটা সেই কথাটাই বিক্রি করছে।”
আমি বললাম, “তাহলে যারা রিলটা দেখছে?”
সে বলল, “তারা ভাবছে, তারা এআই ধরে ফেলেছে।”
আমি বললাম, “আসলে কী ধরেছে?”
বন্ধু বলল, “নিজেদের পকেট।”
এই কথার পর দুজনেই চুপ করে গেলাম। চুপ করাটা অবশ্য আজকাল সন্দেহজনক ব্যাপার। কেউ চুপ করে থাকলে মনে হয় সে গভীর চিন্তা করছে, অথবা এআইয়ের উত্তর তৈরি হচ্ছে।
শেষে একটা কথা বলি। কোনো ছবি নিখুঁত হলেই তাকে এআই বলে সন্দেহ করবেন না। কোনো লেখা সুন্দর হলেই লেখককে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন না। ছবির সৌন্দর্য, লেখার শুদ্ধতা, চিন্তার পরিমিতি, বাক্যের স্বচ্ছতা, মানুষের বহুদিনের সাধনা।
এআইকে চিনতে হলে প্রথমে এআই সম্পর্কে একটু পড়াশোনা করুন। আর মানুষকে চিনতে হলে তার যুক্তি শুনুন, প্রশ্ন করুন, সে কী বিক্রি করতে চাইছে তা দেখুন।
কারণ অনেক সময় ছবিতে হাতের আঙুল ভুল থাকে, লেখায় তথ্য ভুল থাকে, আর রিলের বক্তার যুক্তিতে মানুষটাই অনুপস্থিত থাকে।
সন্দেহের বাজারে এই তিনটির মধ্যে শেষেরটিই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়।


