চিকিৎসার খাতায় AI-র সূক্ষ্ম ক্যালকুলেটর
AI শুধু কাজ দ্রুত করতে পারে, এই কথাটা অর্ধেক গল্প। বাকি অর্ধেক হলো, সে খাতার ভেতর এমন সূক্ষ্ম ফাঁক খুঁজে বের করতে পারে, যেখানে একটি শিল্প তার মুনাফার দাঁত আরও একটু ধারালো করতে পারে।
স্বাস্থ্যখাতে আমি প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছি প্রায় ১৬ বছর হলো। আমি ভেবেছিলেন AI স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমাবে। কাগজপত্র কমাবে, ডাক্তারদের নোট নিজে লিখে দেবে, হাসপাতালের প্রশাসনিক ভুঁড়ি কিছুটা কমাবে, আর হয়তো সেই সুবাদে রোগীর বিলও একটু ভদ্রলোকসুলভ আচরণ করবে। কিন্তু PwC-র নতুন ৬০ পৃষ্ঠার রিপোর্ট বলছে, আপাতত দৃশ্যটা উল্টো। স্বাস্থ্যখাতে AI-র সবচেয়ে বেশি ব্যবহারগুলোর একটি খরচ কমানো নয়, বরং চিকিৎসার বিলকে আরও মোটা করে তোলা। যেন হাসপাতালের পুরনো হিসাবরক্ষক হঠাৎ চাণক্যের টিউশন নিয়ে এসেছে। AI শুধু কাজ দ্রুত করতে পারে, এই কথাটা অর্ধেক গল্প। বাকি অর্ধেক হলো, সে খাতার ভেতর এমন সূক্ষ্ম ফাঁক খুঁজে বের করতে পারে, যেখানে একটি শিল্প তার মুনাফার দাঁত আরও একটু ধারালো করতে পারে।
ঘটনাটা এমন: PwC বলছে, ২০২৭ সালে স্বাস্থ্যসেবার খরচ ৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এই হার চলতি বছরের সঙ্গেও মিলে যাচ্ছে, এবং ২০১০-১১ সালের পর এটিই সবচেয়ে বেশি। এই খরচ বাড়ার সম্ভাব্য পাঁচটি কারণের মধ্যে AI একটি। কারণটি বেশ চমৎকার, আবার বেশ কপটও। AI-চালিত নোট নেওয়ার টুল ডাক্তারদের রোগনির্ণয়, জটিলতা, উপসর্গ, ঝুঁকি, সহগামী সমস্যা, এসব আরও বেশি বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত করছে। একজন ব্যস্ত চিকিৎসক হয়তো আগে একই বিষয়কে একটি বড়, সাধারণ “কোড”-এর মধ্যে ফেলে দিতেন। এই কোড হচ্ছে স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থার সেই সরকারি-দপ্তরের সিলমোহর, যা বলে দেয়, ইনস্যুরার কত টাকা দেবে। AI এসে বলছে, “না না, এখানে আরও সূক্ষ্মতা আছে।” তারপর সেই সূক্ষ্মতা বিলিংয়ের ভাষায় রূপ নেয়। রোগীর চিকিৎসা আগের মতোই থাকতে পারে, কিন্তু নথির ভাঁজে ভাঁজে রোগের গুরুত্ব একটু বেশি দেখালে কোডও বদলায়, আর কোড বদলালে পেমেন্টও বদলায়। চিকিৎসার বিছানা একই, কিন্তু বিলের বালিশে নতুন তুলো ঢুকে যায়।
বিলিংয়ের শয়তান থাকে খুঁটিনাটির মধ্যে। Blue Cross Blue Shield-এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু হাসপাতালে নতুন মায়েদের maternity admission-এর মধ্যে acute posthemorrhagic anemia, অর্থাৎ প্রসব-পরবর্তী তীব্র রক্তক্ষরণজনিত রক্তস্বল্পতার বিলিং কোড ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৪ শতাংশ থেকে ১২.৩ শতাংশে উঠে গেছে। এই রোগের সাধারণ চিকিৎসার মধ্যে রক্ত সঞ্চালন থাকে। কিন্তু সেই একই সময়ে রক্ত সঞ্চালনের সংখ্যা প্রায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। শরীরের রক্তক্ষরণ যদি সত্যিই এত বেড়ে থাকে, চিকিৎসার রক্তসঞ্চালনও তার সঙ্গে নাচবে, অন্তত একটু তাল ধরবে। কিন্তু এখানে রোগের কোড নাচছে, চিকিৎসা প্রায় বসে আছে। আরও মজার কথা, যে হাসপাতাল ব্যবস্থায় এই কোডের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি বেড়েছিল, সেখানে অডিট করে দেখা গেছে, ২০ শতাংশেরও কম ক্ষেত্রে রোগনির্ণয়ের আসল ক্লিনিক্যাল শর্ত পূরণ হয়েছিল। অর্থাৎ নথির রাজ্যে রোগী গুরুতর, চিকিৎসার বাস্তবে তেমন নয়। BCBS বলছে, এই “coding intensity” তিন বছরে গবেষণাধীন হাসপাতালগুলোতে মাতৃত্ব-সংক্রান্ত ব্যয়ে ২২ মিলিয়ন ডলার যোগ করেছে। একে হয়তো আধুনিক চিকিৎসা-অর্থনীতির কবিতা বলা যায়: শিশুর জন্ম, মায়ের শরীর, বিমা কোম্পানি, আর কোডের মধ্যবর্তী এক মহাভারত।
তবে ব্যাপারটা একতরফা নয়। PwC রিপোর্টে AI নতুন চাপ হিসেবে উপরে উঠে এসেছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যসেবার খরচ বাড়ানোর সবচেয়ে বড় কারণ সে এখনো নয়। পুরনো দৈত্যরা বেঁচে আছে, শ্রম ব্যয়, সাপ্লাই খরচ, ওষুধ, সরঞ্জাম, হাসপাতালের দৈনন্দিন পরিচালনার খরচ। Healthcare Dive-কে রিপোর্টের একজন লেখক বলেছেন, এসব পুরনো কারণ এখনো বড় অংশের বৃদ্ধি তৈরি করছে। আর AI ভবিষ্যতে উল্টো দিকেও কাজ করতে পারে। হাসপাতালের প্রশাসনিক কাজ কমিয়ে, দাবি যাচাই সহজ করে, রোগ নির্ণয় আগে ধরতে সাহায্য করে, অযথা ভর্তি বা বিলম্বিত চিকিৎসার খরচ কমিয়ে দিতে পারে। কিন্তু ভবিষ্যতের সেই সম্ভাবনা আর বর্তমানের বিলিং-টেবিল এক বস্তু নয়। ভবিষ্যৎ অনেক সময় মসজিদের মাইক, দূর থেকে ভালো শোনা যায়।
AI-কে প্রায়ই বিক্রি করা হয় অপ্টিমাইজেশনের দেবদূত হিসেবে। সে নাকি যেখানে যায়, অপচয় কমায়, কাজ দ্রুত করে, সিস্টেমকে সস্তা করে, মানুষের শ্রম বাঁচায়। স্বাস্থ্যসেবায় প্রথম দিকের বাস্তবতা একটু অন্যরকম ছবি দেখাচ্ছে। এখানে AI শুরুতেই যে জিনিসটি সুন্দর করে অপ্টিমাইজ করেছে, তা হলো আপনার ওপর আরও বেশি চার্জ বসানোর পদ্ধতি। যেন স্টেথোস্কোপের পাশে বসে আছে এক নিখুঁত হিসাবরক্ষক, যার চোখে ঘুম নেই, হাতে ক্যালকুলেটর, আর মাথায় শ্লোক: রোগীর যত্ন পবিত্র কাজ, কিন্তু কোডিংয়েরও তো সংসার আছে। এক স্বাস্থ্যবিমা নির্বাহীর কথাটা তাই কানে বাজে: কোম্পানিগুলো AI হাতে পেলে প্রথম প্রশ্ন করবে, “এটা দিয়ে আমার স্বার্থ আরও কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়?” আহা, মানবসভ্যতা। আগুন আবিষ্কার করে রান্নাও করেছে, যুদ্ধও করেছে। AI-ও সেই আগুনের নতুন সংস্করণ, শুধু এখন শিখার রং একটু বেশি নীল, আর বিলের অঙ্ক একটু বেশি সূক্ষ্ম।






