লেখার টেবিলে বসে আপনি ভাবছেন—বাক্যটা লিখলাম, কিন্তু এখন প্রশ্ন: মানুষ ভাববে, না কি মেশিন? যেন সাহিত্য আর টুরিং টেস্টের মধ্যে অদ্ভুত এক সহবাস শুরু হয়েছে। আগে বাক্য ঠিক কিনা সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল, এখন লেখকের পরিচয়টাই সন্দেহজনক। ইদানিং একটা চিহ্ন (এম ড্যাশ) হঠাৎ চরিত্র বদলে ফেলেছে। যতিচিহ্ন থেকে সে এখন চরিত্রহত্যার অস্ত্র। একটা ছোট্ট দাগ—একটা লাইন—একটা হাইফেনের বড় ভাই—এইটুকুই তার শরীর। অথচ তাকে ঘিরে যে পরিমাণ তর্ক, তাতে মনে হয় সে যেন সংসদে বিল পাস করাতে নামছে।
যেমন লেখায় যদি থাকেঃ
অতিরিক্ত দাগ ব্যবহার? সন্দেহজনক
বাক্যে হঠাৎ বাঁক? সন্দেহজনক
ভাবনার মধ্যে হেঁচকি? নিশ্চিত এআই
অথচ একটু ইতিহাস খুলে দেখলেই বোঝা যায়, এই দাগের বংশপরিচয় বেশ সম্মানজনক। Emily Dickinson তো প্রায় এই দাগ দিয়ে নিজের মানসিক আবহাওয়ার মানচিত্র এঁকেছেন। তাঁর কবিতায় যত দাগ, ততটা হয়তো নিউ ইংল্যান্ডে বরফও পড়ে না। অন্যদিকে The New York Times-এর এক সম্পাদক বিরক্ত হয়ে বলছেন, এই জিনিস নাকি লেখকদের আলস্যের চিহ্ন—বাক্য গুছিয়ে বলতে পারেন না, তাই দাগ দিয়ে পাশ কাটান। অর্থাৎ, দাগটি simultaneously বিদ্রোহী, অলস, অতিনাটকীয়, আবার আধুনিকতার চিহ্ন। একে ঠিক কী বলা হবে, তা নির্ভর করছে আপনি কোন দলে।
সত্যি কথা বলতে কী, দাগটার একটা শারীরিক দাপট আছে। কমা বিনয়ী, ফুলস্টপ শৃঙ্খলাবদ্ধ, কোলন একটু শিক্ষকসুলভ—কিন্তু এই দাগ? সে একটু যেন উঁকি দিয়ে বলে, “আমার কথা শোনো।” পৃষ্ঠার মধ্যে সে নিজের জন্য জায়গা দাবি করে। যেন বাক্যের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক অল্পবয়সী কবি, যে জানে সে নিয়ম মানতে আসেনি। এখানে লেখকের ব্যক্তিগত ইতিহাস ঢুকে পড়ে। স্কুলে কালো ফিতে বাধ্যতামূলক হলে যে মেয়েটি রঙিন ফিতে পরে আসে, সে আসলে এই দাগেরই আত্মীয়। নিয়ম মানতে পারে, কিন্তু মানতেই হবে—এই ধারণাটা তার পছন্দ নয়।
মানুষের চিন্তা সরলরৈখিক নয়। A থেকে B—এইভাবে কেউ ভাবে না। আমরা ভাবি:
A → হঠাৎ স্মৃতি → অপ্রাসঙ্গিক তুলনা → আবার A → তারপর B-এর কাছাকাছি কিছু। কিন্তু লেখালিখি এই বিশৃঙ্খলাকে লুকিয়ে রাখে। কারণ আমরা জানি, “সুশৃঙ্খল লেখা = বুদ্ধিমান মানুষ।” এইখানেই দাগের ভূমিকা। সে আপনাকে একটা ছাড়পত্র দেয়: আপনি পথভ্রষ্ট হতে পারেন—কিন্তু দেখতে পথভ্রষ্ট লাগবে না। সে বলছে, একটু ঘুরে আসুন, একটা কথা ঢুকিয়ে দিন, মাঝপথে মত পাল্টান। কিন্তু পাঠক ভাববে, এ সবই পরিকল্পিত। এই যে নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা—এটাই দাগের আসল কাজ।
একটা উদাহরণ দেই:
“ভালোবাসা, কামনা, একাকীত্ব—এবার প্রযুক্তি এগুলোকে বাজারজাত করবে।”
এই “—” না থাকলে বাক্যটা খবর।
এই “—” থাকলে বাক্যটা ঘোষণা।
দাগ এখানে আলোকসজ্জা। সমস্যা শুরু হল যখন ইন্টারনেট ঠিক করল, এই দাগ আর মানুষের নয়। একটা অদ্ভুত গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত—কেউ নেয়নি, সবাই মেনে নিয়েছে। যেন হঠাৎ ঘোষণা হল:
“যে বেশি দাগ ব্যবহার করবে, সে মানুষ নয়।” এখানে হাস্যকর ব্যাপারটা হলো—এআই তো এই দাগ শিখেছে মানুষের কাছ থেকেই। বই, প্রবন্ধ, নিবন্ধ—সব জায়গায় এই দাগ ছিল। অর্থাৎ, ছাত্র শিক্ষককে নকল করছে—আর এখন শিক্ষককে বলা হচ্ছে, তুমি ছাত্রের মতো লিখছ।
এই অবস্থায় লেখকের সামনে দুটো রাস্তা:
১. দাগ ছেড়ে দাও, নিরাপদ হও
২. দাগ রেখেই লেখো, সন্দেহের ঝুঁকি নাও
প্রথমটা বুদ্ধিমানের পথ। দ্বিতীয়টা লেখকের পথ। কারণ লেখালিখি শেষ পর্যন্ত আত্মরক্ষার শিল্প নয়, আত্মপ্রকাশের শিল্প। দাগ যদি আপনার চিন্তার অংশ হয়, তাকে বাদ দেওয়া মানে নিজের চিন্তার একটা অঙ্গ কেটে ফেলা। শেষমেশ এই দাগটা কী দাঁড়াল? সে সেই বন্ধুটি, যাকে নিয়ে পার্টিতে গেলে সবাই একটু অস্বস্তিতে পড়ে। কিন্তু আপনি জানেন—ও ছাড়া আপনার গল্পটা বলা হবে না। সে একটু বাড়াবাড়ি করে। সে মাঝেমধ্যে বাড়তি কথা বলে। সে ভদ্র সমাজে পুরো মানানসই নয়। কিন্তু সে সত্যি কথা বলে। এবং খুব নিচু গলায় ফিসফিস করে বলে—“এই তো, তুমি আসলে এটুকুই বলতে চেয়েছিলে।”


