লাইব্রেরি কার্ড ও আমার দাদিমা
ভাষা মৃত্যু বোঝাতে অনেক শব্দ তৈরি করেছে, একটিও যথেষ্ট নয়
মানিব্যাগ পরিষ্কার করার মতো বিরক্তিকর কাজ আমি খুব কমই করি। পুরোনো রসিদ, অচল হয়ে যাওয়া ক্রেডিট কার্ড, চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্টের ছোট কাগজ, বহু আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনও দোকানের মেম্বারশিপ কার্ড, আর এমন কিছু কুপন সেখানে বহুদিন ধরে আশ্রয় নিয়ে থাকে, যাদের মেয়াদ শেষ হয়েছে সভ্যতার অন্তত দুই যুগ আগে। মানুষ যে তার অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের প্রতিও একধরনের পারিবারিক দায়িত্ব অনুভব করে, আমার মানিব্যাগ খুললেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তবু এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটি জিনিস আমি কখনও ফেলে দিতে পারিনি। আমার পুরোনো লাইব্রেরি কার্ড।
কার্ডটির চেহারায় এখন আর কোনও সম্ভ্রম নেই। প্রান্তগুলি ঘষে সাদা হয়ে গেছে, প্লাস্টিকের আবরণের নীচে সূক্ষ্ম ফাটল, নামের কয়েকটি অক্ষর মলিন, বহু ব্যবহারে এমন ক্লান্ত দেখায় যেন পৃথিবীর যাবতীয় বই ধার দেওয়ার দায়িত্ব একাই পালন করেছে। আধুনিক লাইব্রেরিতে এখন ফোনের স্ক্রিন দেখালেই চলে, অ্যাপ খুলে ডিজিটাল কার্ড বার করা যায়, বই ধার নেওয়া যায় স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে। মানুষের সঙ্গে কথাবার্তার প্রয়োজনও ক্রমশ কমে এসেছে। যন্ত্রটি বইয়ের নাম জানে, ধার নেওয়ার তারিখ জানে, ফেরত দেওয়ার শেষ দিনও জানে। শুধু আমার দাদিমাকে জানে না।
আমি যখনই কার্ডটি হাতে নিই, প্রথমে কোনও বইয়ের কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে তাঁর আঙুলের কথা। বয়সের দাগে ছোপ ছোপ, শিরা-ওঠা, গাঁটগুলো সামান্য ফুলে থাকা সেই হাত, যে হাত আমার মাথায় তেল মেখেছে, জ্বরের সময় কপালে ভেজা কাপড় রেখেছে, খাবারের থালা থেকে মাছের কাঁটা বেছে দিয়েছে, আবার শহরের পুরোনো লাইব্রেরির অন্ধকার তাকের সামনে দাঁড়িয়ে এমন সব বইয়ের দিকে ইশারা করেছে, যাদের নাম তখন উচ্চারণ করাই আমার পক্ষে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যসাধনা ছিল।
শহরের সেই লাইব্রেরিটি এখন ঠিক কেমন আছে জানি না। স্মৃতি কোনও নির্ভরযোগ্য স্থপতি নয়। সে ঘরের মাপ বাড়িয়ে দেয়, সিঁড়িকে আরও উঁচু করে, গন্ধকে আরও গাঢ় করে এবং শৈশবের বিকেলকে এমন দীর্ঘ করে তোলে যে, মনে হয় সূর্য তখন আমাদের সুবিধার জন্যই একটু ধীরে অস্ত যেত। আমার মনে আছে, লাইব্রেরির বাইরে কয়েকটি বড় গাছ ছিল। বর্ষার দিনে তাদের পাতায় জমে থাকা জল হঠাৎ বাতাসে ঝরে পড়ত। সামনের সিঁড়ি বেয়ে উঠলে কাঠের ভারী দরজা। দরজাটি খুললেই পুরোনো কাগজ, কাঠের আলমারি, ধুলো, আর্দ্রতা এবং কোনও এক অজ্ঞাতকালের আসবাব পালিশের মিশ্র গন্ধ। এখন বইয়ের দোকানে কফির গন্ধ পাওয়া যায়, লাইব্রেরিতে কম্পিউটারের উষ্ণ বাতাস। আমাদের সেই লাইব্রেরিতে বইয়েরই গন্ধ ছিল। বই তখন নিজের উপস্থিতি জানান দিতে লজ্জা পেত না।
ভেতরে ঢুকেই দাদিমার চলন বদলে যেত। ঘরে তিনি দ্রুত হাঁটতেন, রান্নাঘরে তো আরও দ্রুত। একটি কাজ শেষ করার আগেই পরের তিনটি কাজ তাঁর মাথায় প্রস্তুত থাকত। কিন্তু লাইব্রেরিতে ঢুকলে তাঁর হাঁটার মধ্যে একধরনের ধীরতা আসত। ধর্মস্থানে প্রবেশ করা মানুষের মতো গম্ভীর কোনও ভাব নয়, কারণ দাদিমা বইকে দেবতা বানিয়ে দূরে রাখতেন না। তিনি বই হাতে নিতেন, পাতা উল্টাতেন, কখনও নাকের কাছে এনে গন্ধ নিতেন, কখনও দু-এক লাইন পড়ে মৃদু হাসতেন। বই তাঁর কাছে ব্যবহার্য জিনিস ছিল, অনেকটা রান্নাঘরের শিলপাটা, সেলাইয়ের কৌটা বা শীতের কাঁথার মতো। যত্ন করতে হয়, কাজে লাগাতে হয়, প্রয়োজনে অন্যকে দিতে হয়, ফেরত না দিলে বকাও দিতে হয়।
শৈশবে আমার কৌতূহলের কোনও স্বাস্থ্যসম্মত সীমা ছিল না। বাড়ির একটি বন্ধ বাক্স আমার কাছে আলিবাবার গুহা, পাড়ার শেষ মাথার গলি আফ্রিকার অজানা পথ, আর একটি বইয়ের প্রচ্ছদ দেখলেই ধারণা হত তার ভিতরে এমন কিছু আছে যা বড়রা বিশেষ উদ্দেশ্যে আমার কাছ থেকে গোপন রেখেছেন। বড়রা অবশ্য শিশুদের কাছ থেকে পৃথিবীর অর্ধেক সত্যিই গোপন রাখেন, বাকি অর্ধেক নিজেরাই জানেন না। ফলে আমার সন্দেহ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ছিল না।
আমি গল্প চাইতাম। একই গল্প দ্বিতীয়বার শুনতেও আমার আপত্তি ছিল না, তবে দাদিমা যেন আগের বারের মতো হুবহু বলেন, এই ছিল দাবি। কোথাও একটি বাক্য বাদ পড়লে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করতাম। তিনি অবাক হয়ে বলতেন, “তুমি তো সবই জানো, আবার শুনবে কেন?” এর কোনও যুক্তিসঙ্গত উত্তর আমার ছিল না। এখন বুঝি, শিশুরা গল্পের পরিণতি জানার জন্য বারবার গল্প শোনে না। পরিচিত বিপদ আবার এসে পরিচিতভাবেই কেটে যাবে, হারিয়ে যাওয়া মানুষটি ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরবে, রাক্ষস পরাজিত হবে, ছোট পাখিটি বাসা পাবে, এই নিশ্চয়তার জন্য তারা পুরোনো গল্পে ফিরে যায়। পৃথিবী তখনও তাদের কাছে পুরোপুরি নিরাপদ নয়। গল্প সেই নিরাপত্তার একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা।
দাদিমা আমার এই গল্পক্ষুধা চিনতে পেরেছিলেন। তিনি নিজের জীবনে কত দূর পড়াশোনা করেছিলেন, কোন শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে আমার স্মৃতি অস্পষ্ট। আমাদের পরিবারের নারীদের শিক্ষার ইতিহাসে সার্টিফিকেটের চেয়ে বাধাই বেশি ছিল। সংসার তাঁদের জন্য দীর্ঘ এক অনানুষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয় খুলে রেখেছিল, যেখানে পরীক্ষা প্রতিদিন, ছুটি অপ্রতুল, আর ডিগ্রি দেওয়ার রীতি ছিল না। দাদিমা সেই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রী ও শিক্ষক দুই-ই ছিলেন। মানুষ চিনতেন, অভাব চিনতেন, খাবারের স্বাদ বুঝতেন, কাপড়ের গুণ বুঝতেন, কার মুখের কোন কথাটি সত্য আর কোনটি সামাজিক সৌজন্যের মোড়কে পরিবেশিত নিরেট মিথ্যা, তা-ও বেশ বুঝতেন। বইয়ের প্রতি তাঁর টান এই জীবনজ্ঞানেরই আরেকটি দিক ছিল।
একদিন একটি বই তাক থেকে নামিয়ে তিনি আমাকে বলেছিলেন, “তুমি যে গল্প পড়ো, তা অন্য একটা জীবনের জানালা। নিজের ঘরে বসে অন্য মানুষের চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখা যায়। এর চেয়ে বড় জাদু আর কী আছে?”
কথাগুলি তিনি ঠিক এই ভাষায় বলেছিলেন কি না, আমি এখন আর হলফ করে বলতে পারব না। স্মৃতি মানুষের কথাকে সম্পাদনা করে, ব্যাকরণ শোধরায়, কখনও নিজের বোধ যোগ করে মৃত মানুষের মুখে বসিয়ে দেয়। তবু ভাবটি তাঁরই ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ একটি জীবন নিয়ে জন্মালেও বইয়ের সাহায্যে অনেক জীবন ছুঁয়ে যেতে পারে। যে মেয়েটি কোনওদিন নিজের শহরের বাইরে যেতে পারেনি, সে সমুদ্রযাত্রার গল্প পড়ে ঝড়ের মধ্যে জাহাজের ডেকে দাঁড়াতে পারে। যে ছেলেটি নিজের পাড়ার বাইরে একা যাওয়ার অনুমতি পায় না, সে মরুভূমি পার হতে পারে, চাঁদে যেতে পারে, ভবিষ্যতের শহরে ঘুরে আসতে পারে। সামাজিক বিধিনিষেধ, অর্থের অভাব, পাসপোর্ট, ভিসা, রেলভাড়া, এমনকি জন্মের শতাব্দীও পাঠকের বিরুদ্ধে শেষ কথা বলতে পারে না। বইয়ের এই সীমান্তলঙ্ঘন দাদিমার বিশেষ পছন্দ ছিল।
প্রতি সপ্তাহে তিনি আমাকে লাইব্রেরিতে নিয়ে যেতেন। সপ্তাহের কোন দিন ছিল, এখন ঠিক মনে নেই। সম্ভবত বিকেলের দিকে, কারণ ফেরার পথে আলো কমে আসত এবং দোকানগুলিতে একে একে বাতি জ্বলত। তাঁর হাতে থাকত কাপড়ের একটি ব্যাগ। বাজারের ব্যাগের সঙ্গে তার বিশেষ তফাত ছিল না, শুধু সেদিন তাতে বেগুন, আলু বা কাঁচামরিচের বদলে বই উঠত। বইকে অতিরিক্ত পবিত্র বস্তু ভাবলে হয়তো আলাদা কোনও থলে প্রয়োজন হত। দাদিমার বাস্তববুদ্ধি এসব আচার মানত না। ব্যাগ পরিষ্কার থাকলেই হল। বইয়ের মর্যাদা তার ভিতরে কী লেখা আছে, থলেটি কতখানি আধ্যাত্মিক, তার উপর নির্ভর করে না।
লাইব্রেরিতে পৌঁছে তিনি প্রথমে ফেরত দেওয়ার বইগুলো কাউন্টারে রাখতেন। গ্রন্থাগারিক কার্ডে সিল মারতেন, বইয়ের পেছনের খোপ থেকে ছোট কাগজ বের করতেন, তারিখ মিলিয়ে দেখতেন। এই ক্ষুদ্র প্রশাসনিক অনুষ্ঠানটি আমি গভীর মনোযোগে দেখতাম। বই ধার নেওয়ার সঙ্গে এমন গুরুগম্ভীর তারিখ, সিল, স্বাক্ষর ও কার্ড জড়িত দেখে মনে হত রাষ্ট্রের কোনও গোপন দায়িত্ব আমাদের হাতে অর্পিত হচ্ছে। বই ফেরত দিতে দেরি হলে জরিমানা দিতে হবে, এই সংবাদে আমার উদ্বেগের সীমা থাকত না। কয়েক পয়সা জরিমানা যেন সরাসরি চরিত্রহীনতার প্রমাণ। দাদিমা অবশ্য এতটা বিচলিত হতেন না। বলতেন, “দেরি করলে টাকা দিতে হবে, তাই সময়ে ফেরত দাও। বই পড়ে শেষ না হলে আবার নেবে।” জীবন সম্পর্কে তাঁর অধিকাংশ পরামর্শের মতো এটিও সহজ এবং কার্যকর ছিল। আমি পরবর্তী জীবনে অনেক জটিল তত্ত্ব পড়েছি, কিন্তু সময়মতো ধার করা জিনিস ফেরত দেওয়ার এই নীতির চেয়ে সভ্যতার পক্ষে অধিক জরুরি তত্ত্ব খুব বেশি পাইনি।
তারপর শুরু হত তাক পরিদর্শন। তিনি আমার হাত ধরে নিয়ে যেতেন শিশু-কিশোর বিভাগের দিকে। তাঁর কুঁচকানো তর্জনী একেকটি বইয়ের পিঠ স্পর্শ করত। “এটা পড়ে দেখো।” “এই লেখকের আরেকটা বই তোমার ভাল লেগেছিল।” “এটাতে শুরুটা একটু ধীর, পরে জমবে।” “প্রচ্ছদ দেখে বই নিও না।” শেষ উপদেশটি আমি এখনও পুরোপুরি মানতে পারিনি। সুন্দর প্রচ্ছদের প্রতি দুর্বলতা মানুষের নৈতিক ব্যর্থতার মধ্যে বোধ হয় অপেক্ষাকৃত নিরীহ।
তিনি নিজের পছন্দের লেখকদের নাম বলতেন। কখনও এমন একজনের বই এগিয়ে দিতেন, যাঁর নাম শুনেই আমার মনে হত বইটি নিশ্চয়ই বয়স্ক মানুষের উপযোগী এবং অতএব নিতান্ত বিরক্তিকর। দাদিমার বিচার মেনে নিয়ে অনিচ্ছায় বইটি নিতাম, পরে দেখা যেত তিনিই ঠিক। আবার কোনও বইয়ে আমার আগ্রহ দেখে তিনি ভ্রু কুঁচকে বলতেন, “এটা এখন বুঝবে না।” এই বাক্যটি আমার আত্মসম্মানে প্রবল আঘাত করত। সঙ্গে সঙ্গে বইটি পড়ার সংকল্প আরও দৃঢ় হত। শিশুদের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার একটি কার্যকর পদ্ধতি সম্ভবত তাদের বলা যে, কোনও বই তাদের বোধের অতীত। নিষিদ্ধ জ্ঞানের আকর্ষণ ধর্মগ্রন্থের যুগ থেকে চলে আসছে।
আমার প্রথম লাইব্রেরি কার্ড পাওয়ার দিনটি অন্য দিনের তুলনায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। ঘটনা যতটা বড় ছিল, তার চেয়ে আমার অনুভূতি বড় ছিল। দাদিমা কাউন্টার থেকে কার্ডটি নিয়ে আমার হাতে দিলেন। ছোট একটি আয়তাকার কার্ড, তাতে আমার নাম, সদস্যসংখ্যা, লাইব্রেরির সিল। আজকের কোনও শিশুকে দেখালে সে হয়তো জিজ্ঞেস করবে, “এ দিয়ে কী হয়?” তখন আমার কাছে সেটি ছিল স্বাধীনতার সরকারি দলিল।
আমি কার্ডটি দুই হাতে ধরেছিলাম। হারিয়ে ফেললে কী হবে, ভিজে গেলে কী হবে, কেউ চুরি করলে কী হবে, এসব দুশ্চিন্তা সঙ্গে সঙ্গে মাথায় এল। স্বাধীনতা পেয়েই মানুষ প্রথমে তার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়, আমারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। দাদিমা বললেন, “সাবধানে রাখবে। এই কার্ড দিয়ে বই নিতে পারবে। কিন্তু বই তোমার নিজের না। পড়ে আবার ফেরত দিতে হবে।”
মালিকানা ও ব্যবহারের পার্থক্য সম্ভবত সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম। কোনও জিনিস আমার ঘরে থাকবে, আমি তাকে ইচ্ছেমতো পড়ব, তবু সেটি আমার সম্পত্তি নয়। অন্য পাঠকও তার অপেক্ষায় আছে। একটি বই বহু মানুষের হাতে যাবে, বহু ঘরে কয়েক সপ্তাহ থাকবে, বিভিন্ন জীবনের পাশে নীরবে বসে থাকবে। লাইব্রেরি আমাকে ব্যক্তিগত আনন্দের সঙ্গে সামাজিক দায়িত্বের প্রথম পাঠ দিয়েছিল। বইটিতে দাগ দেওয়া যাবে না, পাতা ভাঁজ করা যাবে না, খাবারের পাশে রেখে তরকারির ঝোল ফেললে ক্ষমার সম্ভাবনা সীমিত। আমরা বই ধার নিই, কিছুদিনের জন্য নিজেদের জীবনে জায়গা দিই, তারপর অন্যের জন্য ছেড়ে দিই। পরে বুঝেছি, জীবনের আরও অনেক মূল্যবান জিনিসই এই নিয়মে আসে।
সেদিন কোন বই প্রথম ধার নিয়েছিলাম, তা নিয়ে আমার স্মৃতিতে দ্বন্দ্ব আছে। মনে হয় রূপকথার কোনও সংকলন, আবার মনে হয় অভিযানের গল্প। স্মৃতি মাঝে মাঝে দুই-তিনটি বিকেলকে একসঙ্গে সেলাই করে একটি গ্রহণযোগ্য দৃশ্য বানায়। নিশ্চিতভাবে যা মনে আছে, তা হল বই হাতে নিয়ে ফেরার পথ। কার্ডটি বারবার পকেট থেকে বের করে দেখছিলাম। নামটি সত্যিই আমার কি না, সিলটি অদৃশ্য হয়ে গেল কি না, নিশ্চিত হচ্ছিলাম। দাদিমা বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, “এত বার বের কোরো না, হারিয়ে ফেলবে।” তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী অমূলক ছিল না। ছোটবেলায় মূল্যবান জিনিস সাবধানে রাখার আমার পদ্ধতি ছিল প্রতি তিন মিনিটে একবার তার অবস্থান পরীক্ষা করা, ফলে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণ হত।
এরপর বহু বছর ধরে লাইব্রেরি আমাদের সাপ্তাহিক আশ্রয় হয়ে রইল। তিনি সংবাদপত্র পড়তেন। পাতাগুলি দুহাতে মেলে ধরতেন, কখনও চশমা নাকের নিচে নেমে আসত, কোনও খবর পড়ে মুখে বিরক্তির ছায়া দেখা দিত। রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে তাঁর মতামত সংক্ষিপ্ত ছিল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুদ্রণের অনুপযোগী। সংবাদপত্র শেষ হলে ম্যাগাজিন নিতেন। রান্না, স্বাস্থ্য, সংসার, সাহিত্য, সমাজ, সব বিষয়েই তাঁর আগ্রহ ছিল। কোনও একটি বিষয়ে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখার আধুনিক পেশাগত অসুখটি তাঁর ছিল না।
আমি meanwhile, অর্থাৎ বাংলায় বললে ততক্ষণে, অন্য জগতে চলে যেতাম। কখনও অ্যালিসের পেছনে খরগোশের গর্তে, কখনও মধ্য-পৃথিবীর দীর্ঘ পথে, কখনও ভবিষ্যতের যন্ত্রমানবের সমাজে। আজিমভের রোবটরা মানুষের নৈতিক সমস্যা নিয়ে চিন্তিত, আর আমি লাইব্রেরির কাঠের চেয়ারে বসে নিজের পা মেঝেতে পৌঁছাতে না পেরে দোলাচ্ছি। এক বই থেকে আরেক বইয়ে যেতে যেতে পৃথিবীর সীমানা বদলে যাচ্ছিল। দূরতম নক্ষত্রের যাত্রা এবং বাড়ি ফেরার পথে দাদিমার হাত ধরে রাস্তা পার হওয়া একই বিকেলের মধ্যে সম্ভব হচ্ছিল। শিশুমনে এতে কোনও বিরোধ ছিল না।
দাদিমা মাঝে মাঝে এসে জিজ্ঞেস করতেন, “কত দূর পড়লে?” প্রশ্নটির উত্তর পৃষ্ঠাসংখ্যায় দিলে তিনি সন্তুষ্ট হতেন না। জানতে চাইতেন, “কী হচ্ছে?” তখন আমাকে গল্পটি নিজের ভাষায় বলতে হত। এখন মনে হয়, তিনি অজান্তেই আমাকে পাঠের সঙ্গে বর্ণনার সম্পর্ক শেখাচ্ছিলেন। কোনও লেখা সত্যিই পড়েছি কি না, তা বোঝা যায় সেটি অন্যকে বলতে গেলে। মাথার মধ্যে সবকিছু বেশ স্পষ্ট মনে হয়, মুখ খুললেই দেখা যায় চরিত্রের নাম ভুলে গেছি, ঘটনার কারণ বুঝিনি, আর যে অংশটিকে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভাবছিলাম তার ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। লেখকজীবনে বহু পরে এই বিপদ আরও বড় আকারে ফিরে এসেছে। মাথায় থাকা চিন্তা সর্বদাই সুদর্শন; কাগজে নামলেই তার হাঁটুর সমস্যা ধরা পড়ে।
আমাদের পাশাপাশি বসে থাকা সেই ঘণ্টাগুলিতে কথাবার্তা খুব বেশি হত না। তাঁর হাতে সংবাদপত্র, আমার হাতে গল্পের বই। মাঝখানে কাঠের টেবিল। কখনও জানালা দিয়ে ধুলো-মেশানো আলো ঢুকছে, কখনও বাইরে বৃষ্টি। নীরবতার মধ্যেও একধরনের সঙ্গ ছিল। মানুষকে ভালবাসার অর্থ সর্বক্ষণ কথা বলা, উপদেশ দেওয়া বা আবেগ ঘোষণা করা নয়, এই শিক্ষা সম্ভবত ওই টেবিলেই পেয়েছিলাম। দুজন মানুষ পাশাপাশি বসে নিজ নিজ বই পড়ছে, মাঝেমধ্যে চোখ তুলে পরস্পরকে দেখছে, এতেও গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। এখনকার ভাষায় একে কেউ হয়তো “কোয়ালিটি টাইম” বলবেন। আমাদের সময়ে নামটি জানা ছিল না, ফলে কাজটি নির্বিঘ্নে করা যেত।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার পাঠের ধরন বদলেছে। রূপকথার পাশে ইতিহাস এসেছে, অভিযানের পাশে দর্শন, বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর পাশে রাজনীতি, উপন্যাসের পাশে স্মৃতিকথা। বইয়ের তালিকা দীর্ঘ হয়েছে, বোঝাপড়া কতটা বেড়েছে সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বেশি বই পড়লে মানুষ বেশি জ্ঞানী হয়, এমন সরল সমীকরণ দাদিমা কখনও শেখাননি। তিনি দেখেছিলেন, বই পড়েও মানুষ নির্বোধ, নিষ্ঠুর এবং আত্মমুগ্ধ থাকতে পারে। বরং শিক্ষিত নির্বুদ্ধিতা অনেক সময় সাধারণ নির্বুদ্ধিতার চেয়ে বেশি বিপজ্জনক, কারণ তার পায়ে টীকা, উদ্ধৃতি এবং গ্রন্থপঞ্জি লাগানো থাকে। তবু তিনি বিশ্বাস করতেন, মন খোলা রেখে পড়লে মানুষ নিজের জীবনের বাইরের কষ্ট ও আনন্দ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পায়। সেই ‘কিছুটা’ তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সম্পূর্ণ বোঝাপড়া দেবতাদের বিষয়, মানুষ সামান্য বুঝেও অনেক দূর যেতে পারে।
আমি বড় হচ্ছিলাম, তিনি বুড়ো হচ্ছিলেন। এই সাধারণ ঘটনাটি যখন ঘটে, তখন পরিবারের কেউ বিশেষ লক্ষ্য করে না। একদিন দেখা যায় যিনি আগে দ্রুত হাঁটতেন, তিনি সিঁড়ির সামনে একটু থামছেন। ভারী বইয়ের ব্যাগটি আর নিজে নিতে চাইছেন না। চশমার কাচ মোটা হয়েছে। সংবাদপত্রের অক্ষর ছোট বলে অভিযোগ করছেন, যদিও অক্ষরের কোনও দোষ নেই। লাইব্রেরির পথে আমার হাত ধরে রাখার প্রয়োজনও বদলে গেল। এক সময় তিনি আমাকে রাস্তা পার করতেন, পরে আমি তাঁর কনুই ধরতাম।
তবু আমাদের যাওয়া বন্ধ হয়নি। হয়তো আগের মতো প্রতি সপ্তাহে নয়, হয়তো মাঝখানে বিরতি পড়ত। সংসার, কাজ, পড়াশোনা, দূরে থাকা, অসুস্থতা, মানুষের জীবনে কারণের অভাব হয় না। কিন্তু যখনই একসঙ্গে যাওয়া সম্ভব হয়েছে, পুরোনো রীতিটি ফিরে এসেছে। তিনি তাঁর জায়গায় বসেছেন, আমি তাকের দিকে গেছি। শুধু একসময় লক্ষ করলাম, তিনি সংবাদপত্র পড়ার চেয়ে মানুষ দেখছেন বেশি। কে এসেছে, কোন বৃদ্ধ প্রতিদিন একই চেয়ারে বসেন, কোন ছাত্রী পরীক্ষার বই নিয়ে উদ্বিগ্ন, কোন শিশু মেঝেতে বসে ছবির বই দেখছে। লাইব্রেরি তাঁর কাছে বইয়ের ঘরের পাশাপাশি মানুষের ঘরও ছিল।
বৃদ্ধ বয়সে মানুষের জগৎ ক্রমে ছোট হয়ে আসে। পরিচিত মানুষ চলে যায়, চলাফেরার পরিধি কমে, শরীর প্রতিটি যাত্রার আগে দরদাম করতে বসে। তখন লাইব্রেরির মতো একটি জায়গা বিশেষ অর্থ পায়। সেখানে প্রবেশের জন্য ধনী হওয়া লাগে না, সুদর্শন হওয়া লাগে না, সামাজিক পরিচয়ের সনদ লাগে না। একটি কার্ড যথেষ্ট। কেউ আপনাকে কিছু কিনতে চাপ দেয় না, দ্রুত উঠে যেতে বলে না, এক কাপ কফির মূল্য দিয়ে বসার অধিকার অর্জন করতে হয় না। আপনি সংবাদপত্র পড়তে পারেন, উষ্ণ ঘরে কিছুক্ষণ বসে থাকতে পারেন, অন্য মানুষের নীরব উপস্থিতি অনুভব করতে পারেন। সভ্য সমাজ তার নাগরিককে যে অল্প কয়েকটি মর্যাদাপূর্ণ আশ্রয় বিনা প্রশ্নে দেয়, পাবলিক লাইব্রেরি তাদের একটি। দাদিমা হয়তো এই সামাজিক দর্শন ভাষায় প্রকাশ করেননি, কিন্তু তিনি তার ব্যবহার জানতেন।
তারপর একদিন তিনি চলে গেলেন।
মৃত্যুর ঘটনাটি লিখতে বসলে ভাষা হঠাৎ অদক্ষ হয়ে পড়ে। “চলে গেলেন” বলি, যেন কোথাও গেছেন এবং ঠিকানা জানা নেই। “মারা গেলেন” বলি, কথাটি সত্য কিন্তু অসম্ভব রুক্ষ। “হারালাম” বললে মনে হয় অসাবধানতায় কোথাও রেখে এসেছি। ভাষা মৃত্যু বোঝাতে অনেক শব্দ তৈরি করেছে, একটিও যথেষ্ট নয়।
তাঁর মৃত্যুর পর বাড়িতে তাঁর ব্যবহৃত জিনিসগুলি রয়ে গেল। চশমা, ওষুধের কৌটা, ভাঁজ করা শাড়ি, বিছানার পাশে জল রাখার গ্লাস, কোনও বইয়ের মধ্যে আটকে থাকা কাগজের টুকরো। মৃত মানুষের জিনিসপত্রের মধ্যে একধরনের অনুচ্চারিত অভিযোগ থাকে। মানুষটি নেই, অথচ তাঁর চশমা এমনভাবে পড়ে আছে যেন বিকেলে ফিরে এসে আবার পরবেন। কাপড়ের আলমারি তাঁর অনুপস্থিতির সংবাদ গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। ঘরের বাতাসও কিছুদিন পুরোনো অভ্যাসে চলে।
শোকের সময় আমি বইয়ের কাছেই ফিরেছিলাম। এটি কোনও সচেতন সিদ্ধান্ত ছিল না। মানুষ আহত হলে পরিচিত আশ্রয় খোঁজে। কেউ প্রার্থনার ঘরে যায়, কেউ বন্ধুর কাছে, কেউ দীর্ঘ পথে হাঁটে। আমি লাইব্রেরিতে গিয়েছিলাম। কার্ডটি স্ক্যানারের নীচে ধরেছিলাম, যন্ত্রটি একটি ক্ষীণ শব্দ করেছিল, বই ধার নেওয়ার রসিদ বেরিয়ে এসেছিল। এত স্বাভাবিকভাবে কাজটি সম্পন্ন হল যে, ক্ষণিকের জন্য রাগ হয়েছিল। পৃথিবী কী করে এমন নির্বিকার থাকে? যে মানুষটি আমাকে প্রথম কার্ডটি হাতে দিয়েছিল, তিনি আর নেই, অথচ লাইব্রেরির ঘড়ি চলছে, বই ধার দেওয়া হচ্ছে, ফেরতের তারিখ ছাপা হচ্ছে। পরে বুঝেছি, এই নির্বিকার ধারাবাহিকতার মধ্যেই কিছু সান্ত্বনা ছিল। মানুষ চলে যায়, কিন্তু যে দরজা সে আমাদের জন্য খুলে দিয়েছিল, তা খোলা থাকতে পারে।
বইয়ের তাকের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে তাঁকে পাশে অনুভব করতাম। অলৌকিক উপস্থিতির কথা বলছি না। আমার সে বিষয়ে বিশ্বাস দুর্বল। মৃতেরা রাতের অন্ধকারে এসে কানে কথা বলেন কি না জানি না; আমার দাদিমা জীবিত অবস্থাতেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলতেন না, মৃত্যুর পর হঠাৎ বাচাল হয়ে উঠবেন, এমন ধারণা তাঁর চরিত্রের সঙ্গে মেলে না। তাঁকে অনুভব করতাম আমার নিজের অভ্যাসের মধ্যে। কোনও বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে আকৃষ্ট হলে তাঁর সতর্কবাণী মনে পড়ত। কোনও কঠিন বই কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে ছেড়ে দিতে চাইলে মনে হত তিনি বলছেন, “আরেকটু পড়ে দেখো।” বই ফেরত দেওয়ার তারিখ এগিয়ে এলে অকারণ উদ্বেগ হত। তাঁর শিক্ষা তখন আমার ভিতরের কণ্ঠস্বর হয়ে গেছে।
ক্রমে বুঝেছি, উত্তরাধিকার সবসময় জমি, গয়না, অর্থ বা আসবাবের আকারে আসে না। কখনও একটি মানুষ অন্য মানুষের মধ্যে কোনও কাজের প্রতি স্থায়ী ঝোঁক রেখে যায়। দাদিমা আমাকে বিপুল সম্পত্তি দিয়ে যাননি। তিনি আমাকে বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়ানোর অভ্যাস দিয়েছেন, অচেনা লেখকের দিকে হাত বাড়ানোর সাহস দিয়েছেন, পড়ে শেষ করা বই অন্যের জন্য ছেড়ে দেওয়ার শিষ্টাচার দিয়েছেন। একটি লাইব্রেরি কার্ডের মাধ্যমে তিনি আমাকে এমন এক সম্পদের অংশীদার করেছিলেন, যার পরিমাণ ব্যবহার করলে কমে না।
আজ যখন আমার পুরোনো কার্ডটির দিকে তাকাই, সেখানে শুধু বই ধার নেওয়ার অধিকার দেখি না। দেখি একটি বয়স্ক নারী একটি শিশুর হাত ধরে শহরের রাস্তা পার হচ্ছেন। তাঁর কাপড়ের ব্যাগে ফেরত দেওয়ার বই, শিশুটির মাথায় নতুন বইয়ের উত্তেজনা। দেখি কাঠের দরজা, ধুলো-মেশানো আলো, পাতা ওল্টানোর ক্ষীণ শব্দ, কাউন্টারে তারিখের সিল পড়ার ঠক্ঠক্ আওয়াজ। দেখি তিনি সংবাদপত্রের উপর দিয়ে চোখ তুলে আমার দিকে তাকাচ্ছেন, আমি গল্পের মধ্যে এত দূর চলে গেছি যে তাঁর ডাক শুনতে পাচ্ছি না। তিনি বিরক্ত নন। একটু হাসছেন।
একটি পুরোনো লাইব্রেরি কার্ড কত স্মৃতি বহন করতে পারে, তার কোনও সরকারি হিসাব নেই। তার গায়ে বইয়ের তথ্য থাকে, মানুষের সম্পর্কের ইতিহাস থাকে না। কিন্তু আমার কাছে কার্ডটির ক্ষয়ে যাওয়া প্রান্তে দাদিমার হাতের স্পর্শ জমে আছে। এর প্লাস্টিকের আবরণের নীচে আমাদের একসঙ্গে কাটানো বিকেলগুলি চাপা পড়ে আছে। আমি জানি, বস্তু নিজে স্মৃতি ধরে রাখে না; স্মৃতি আমরাই তার উপর রাখি। তবু কিছু জিনিস সেই ভার অদ্ভুত বিশ্বস্ততায় বহন করে।
১৪ জুলাই ছিল আমার দাদিমার মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁকে স্মরণ করার জন্য কোনও আনুষ্ঠানিক আয়োজন করিনি। তাঁর স্মৃতির সঙ্গে অতিরিক্ত জাঁকজমক মানায়ও না। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম, পুরোনো লাইব্রেরি কার্ডটি হাতে নিয়েছিলাম, তারপর একটি বই খুলে পড়তে শুরু করেছিলাম। এর চেয়ে উপযুক্ত স্মরণ আমার জানা নেই।
বই পড়ার সময় এক জায়গায় এসে অজান্তেই থেমে গিয়েছিলাম। মনে হল, তিনি পাশে বসে আছেন। তাঁর কোলে ভাঁজ করা সংবাদপত্র, চশমা নাকের সামান্য নিচে, মুখে সেই চেনা ধৈর্য। যেন অপেক্ষা করছেন আমি পৃষ্ঠাটি শেষ করি, তারপর জিজ্ঞেস করবেন, “কী হচ্ছে গল্পে?”
আমি মনে মনে তাঁকে গল্পটি বলেছি।
আপনারা যাঁরা এই স্মৃতিচারণ পড়লেন, তাঁরাও এখন সেই পুরোনো লাইব্রেরির পাঠককক্ষে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। আমার দাদিমাকে দেখলেন, যদিও তিনি আপনাদের কাউকে চিনতেন না। গল্পের এই এক আশ্চর্য ক্ষমতা, মৃত মানুষের সঙ্গে অপরিচিত পাঠকের পরিচয় করিয়ে দেয়, দূরের জীবনকে সামান্য সময়ের জন্য কাছাকাছি বসায়। দাদিমা একদিন আমাকে যে জানালার কথা বলেছিলেন, এত বছর পরে মনে হয় সেই জানালাটি এখনও খোলা।
আমি বলি কি বইয়ের মধ্যে থাকুন। সেখানে হয়তো আপনার নিজের কোনও প্রিয় মানুষও অপেক্ষা করে আছেন, একটি পুরোনো বাক্যের পাশে, আঙুল দিয়ে একটি নাম দেখিয়ে বলছেন, “এই লেখকটাকে পড়ে দেখো। তোমার ভাল লাগতে পারে।”
---------------
ছবিটি আমার প্রথম জন্মদিনের, বামে চশমা পরা আমার দাদীমা।



