মা, টাইপরাইটার, আইফোন
পৃথিবীর সব প্রযুক্তি কি শেষ পর্যন্ত মানুষের একাকীত্ব একটু কমানোর জন্যই নয়? তবু যন্ত্র একা কিছু পারে না; তাকে স্নেহ শেখাতে হয়।
আমার মা খুব সুন্দর বাংলা লিখতে পারতেন। সুন্দর মানে শুধু বানানশুদ্ধ, পরিপাটি, বা শুদ্ধ ভাষা নয়; তাঁর লেখার মধ্যে এমন এক শৃঙ্খলা ছিল, যেন প্রতিটি অক্ষর নিজের জায়গাটা জানে, প্রতিটি বাক্য আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে কোথায় থামবে। বাবার ব্যবসার কাগজপত্র, চিঠিপত্র, দরখাস্ত, হিসাব; সবই মা টাইপ করে দিতেন। তখন টাইপরাইটার ছিল ঘরের ভিতর বসে থাকা এক অদ্ভুত লোহার প্রাণী, যার নিজের মেজাজ ছিল, নিজের আওয়াজ ছিল, আর ছিল একধরনের কর্তৃত্ব। মা যখন সেটার সামনে বসতেন, আমার মনে হত তিনি আর শুধু আমার মা নন, তিনি যেন কোনও গোপন দপ্তরের প্রধান কর্মচারী, অদৃশ্য এক শাসনের ভাষ্যকার, যিনি শব্দকে শৃঙ্খলায় বাঁধতে জানেন।
দুপুরে ভাতঘুম থেকে জেগে উঠতাম সেই শব্দে। বাইরে রোদের তাপ, ঘরের ভিতর পাখার ধীর ঘূর্ণি, আর তার মাঝখানে টাইপরাইটারের টুসটাস টুসটাস ধ্বনি। বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থেকে আমি সেকেন্ড গুনতাম; মা এক লাইন লিখতে কতক্ষণ নেন, কখন লাইন শেষ হবে, আর কখন সেই লিভারটা টকাস করে বাঁদিকে সরাবেন। এই টকাস শব্দটির জন্যই আমি অপেক্ষা করতাম। এখন মনে হয়, সেটাই ছিল আমার প্রথম তালবোধ, প্রথম প্রযুক্তিবোধ, লেখার শ্রম সম্পর্কে প্রথম অচেতন শিক্ষা। কেউ তখন বলেনি যে একটি বাক্য তৈরি করতেও শরীর লাগে, মন লাগে, সময় লাগে; মায়ের আঙুলের চাপ আর লাইনের শেষে পৌঁছোনোর ভঙ্গি আমাকে নীরবে সেটাই শিখিয়ে দিত।
মা প্রতিটি পাতার মাঝে কার্বন পেপার রাখতেন। একসঙ্গে একাধিক কপি তোলার জন্য কাগজের মধ্যে সেই কালো বা নীলচে কার্বন রাখতে হত; আঙুলের ভুলে অক্ষর বেঁকে গেলে শুধু একখানা পাতা নয়, নিচের কপিটাও নষ্ট। অসাবধানতার খুব জায়গা ছিল না। লেখা শেষ হলে মা মূল কপিটা আমার হাতে দিয়ে বলতেন, বাবাকে দিয়ে আসতে। এই ছোট কাজটাকেই আমি বড় এক দায়িত্ব মনে করতাম; বাড়ির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেন আমি ভাষা বয়ে নিয়ে যাচ্ছি। বাবার ব্যবসা, মায়ের শ্রম, ঘরের শৃঙ্খলা, সন্তানের ছোট্ট পদশব্দ; সব মিলে এক পারিবারিক অর্থনীতি, যার ভিত দাঁড়িয়ে ছিল নারীর নীরব দক্ষতার উপর। আমাদের সমাজে বাবাদের কাজ চোখে পড়ে, মায়েদের কাজ ঘরের বাতাসে মিশে অদৃশ্য হয়ে যায়। তখন বুঝিনি, এখন বুঝি।
আজ মা আইফোনে লেখেন। পৃথিবীর যন্ত্রপাতি কী দ্রুত বদলে যায়; যে হাত এক সময় ধাতব কী চাপত, রিবনের কালিতে অক্ষর তুলত, লিভার সরাত, সেই হাত এখন কাঁচের পর্দায় আঙুল রাখে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হাতের গতি বদলায়, চোখের অভ্যাস বদলায়, মনোযোগেরও স্বরূপ বদলে যায়। মাঝে মাঝে মা আমাকে মেসেজ করেন। তখন দেখি, পর্দায় তিনটা ডট ভেসে উঠছে; একবার আসে, আবার মিলিয়ে যায়, আবার আসে। আমি অপেক্ষা করি। কিছুক্ষণ পরে মেসেজ না এলে কেমন একটা অকারণ কষ্ট হয়। জানি, মানুষ ব্যস্ত থাকতে পারে, লিখে মুছে দিতে পারে, কথাটা আর পাঠাতে মন নাও চায়; তবু ওই তিনটি ডটের মধ্যে এক ধরনের আবেগীয় টান থাকে। মনে হয়, মা আমার দিকে এগিয়ে আসছেন, তারপর থেমে যাচ্ছেন; আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে কিছু বলবেন ভেবেছিলেন, তারপর না বলে ফিরে গেলেন।
একদিন আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এক সময় এত দ্রুত টাইপ করতে, এখন একটা মেসেজ পাঠাতে এত সময় নাও কেন? প্রশ্নটা অর্ধেক রসিকতা, অর্ধেক অভিযোগ। ভাবছিলাম তিনি বলবেন, চোখে কম দেখে, আঙুল ধীরে চলে, ফোনের কী-বোর্ড ছোট, বাংলা টাইপ করা কঠিন; এইসব যুক্তিসঙ্গত উত্তর। কিন্তু মা মুচকি হেসে বললেন, আমি ইচ্ছে করেই মেসেজটা খুলে পাঠানোর অভিনয় করি, যেন তুই ওই তিন ডটের অপেক্ষায় আমার পাশে কিছুক্ষণ থাকিস।
এই একটি বাক্য শুনে আমার ভিতরটা কেমন ভেঙে পড়ল। হঠাৎ বুঝলাম, আমি যাকে প্রযুক্তির বিলম্ব ভাবছিলাম, সেটা আসলে স্নেহের নতুন ব্যাকরণ। মা আর আমাকে কোলে নিতে পারেন না, দুপুরবেলা মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ান না, টাইপরাইটারের টকাস শব্দ শুনিয়ে জানানও না যে তিনি ঘরেই আছেন। এখন তাঁর কাছে আছে ফোনের পর্দা, কয়েকটি ভেসে ওঠা ডট, আর অপেক্ষা নামের এক সূক্ষ্ম কৌশল। তিনি জানেন, আমি দূরে, ব্যস্ত, প্রাপ্তবয়স্ক, নিজের জীবনে ডুবে আছি; সরাসরি ডেকে বসিয়ে রাখার উপায় নেই। তাই প্রযুক্তির এই সামান্য চিহ্নটাকেই ব্যবহার করেন উপস্থিতির অনুকরণ হিসেবে; যেন বলছেন, আমি আছি, আমি লিখছি, আমি তোমাকে ভাবছি, তুমি একটু থেমে থাকো।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মা-বাবার স্নেহের ধরন বদলে যায়; এই সাধারণ সত্যটা আমরা প্রায়ই বুঝি না। ছোটবেলায় মা আমাদের খাইয়ে দেন, জামা গুছিয়ে দেন, স্কুলে পাঠান, জ্বর হলে সারা রাত জেগে থাকেন; তখন স্নেহ দৃশ্যমান, প্রায় কর্তৃত্বপূর্ণ। বড় হয়ে গেলে সেই স্নেহ ঢুকে পড়ে প্রশ্নের মধ্যে, নীরবতার মধ্যে, হঠাৎ পাঠানো একটি লিঙ্কের মধ্যে, অথবা ফোনের পর্দায় কয়েক মুহূর্ত ধরে জ্বলে ওঠা তিনটি ডটের মধ্যে। মায়েরা খুব তাড়াতাড়ি শিখে যান, বড় হয়ে যাওয়া সন্তানের জীবনে জোর করে ঢোকা যায় না, কিন্তু অল্প একটু অপেক্ষা তৈরি করা যায়; সেই অপেক্ষাই নতুন যুগের কোলে টেনে নেওয়া।
আমার কান্না পেয়েছিল, কারণ বুঝলাম, আমি সারাজীবনই হয়তো মায়ের শব্দের জন্য অপেক্ষা করে আছি; এক সময় টাইপরাইটারের লিভার সরানোর শব্দের জন্য, এখন একটি মেসেজের জন্য। তার চেয়েও বেশি, অপেক্ষা করি সেই নিশ্চিত অনুভূতির জন্য যে মা আছেন, কাছেই আছেন, কিছু বলতে যাচ্ছেন। শিশুকালে এই অনুভূতি স্বাভাবিক, বড় হয়ে গেলে সেটাই বিরল হয়ে যায়। তখন মানুষ কর্মব্যস্ত, দূরত্বে বিভক্ত, আলাদা ঘরে, আলাদা শহরে, কখনও আলাদা দেশে। কিন্তু মায়েরা আশ্চর্যভাবে নতুন নতুন সংকেত আবিষ্কার করেন; এক সময় কার্বন পেপারের নীচে কপি রেখে মূল লেখাটি সন্তানের হাতে দিতেন, এখন তিনটি ডট ভাসিয়ে রেখে ছেলেকে কয়েক মুহূর্ত ধরে নিজের কাছে আটকে রাখেন।
এই কথার মধ্যে সামান্য দুষ্টুমি আছে, কৌশলও আছে, কিন্তু ভিতরের সত্যটি একটু নির্মম। এক সময় আমরা মায়ের পাশে থাকতাম বলে মা লিখতেন; এখন মা লেখার ভান করেন, যাতে আমরা একটু তাঁর পাশে থাকি। প্রজন্মের ব্যবধান, প্রযুক্তির পরিবর্তন, পারিবারিক দূরত্ব; সব কিছুর সারকথা যেন এইটুকুই। যে নারী একদিন ব্যবসার কাগজ টাইপ করতেন নিখুঁত গতিতে, তিনি আজ ইচ্ছে করে ধীরে লিখছেন, ছেলের মনোযোগটুকু কয়েক সেকেন্ডের জন্য ধরে রাখার জন্য। এই ধীরতা অক্ষমতার নয়, ভালবাসার।
আমার মনে হয়, পারিবারিক জীবনের সবচেয়ে গভীর দৃশ্যগুলো প্রায়ই এমনই ক্ষুদ্র এবং আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ। ইতিহাস বইয়ে তারা ওঠে না, পরিবারেও কেউ আলাদা করে নথিবদ্ধ করে না। কিন্তু জীবনকে ফিরে দেখলে বোঝা যায়, বড় ঘটনা নয়, এইসব ছোট্ট সংকেতই মানুষকে ভেতর থেকে গড়ে দেয়। দুপুরের ঘুম, টাইপরাইটারের টুসটাস শব্দ, কার্বন কাগজের কালি, হাতে ধরিয়ে দেওয়া মূল কপি, ফোনের পর্দায় তিনটি ডট, আর এক মায়ের মুচকি হেসে বলা একটিমাত্র বাক্য; এইসব দিয়েই তো স্মৃতি নিজের সংসার গড়ে।
আজও যখন স্ক্রিনে তিনটি ডট ভেসে ওঠে, আমার আর অধৈর্য লাগে না। বরং মনে হয়, মা কোথাও বসে আছেন, হয়তো একটু হাসছেনও, আর আমাকে ডেকে না ডেকেই পাশে বসিয়ে রাখছেন। পৃথিবীর সব প্রযুক্তি কি শেষ পর্যন্ত মানুষের একাকীত্ব একটু কমানোর জন্যই নয়? তবু যন্ত্র একা কিছু পারে না; তাকে স্নেহ শেখাতে হয়। আমার মা বোধহয় সেটাই করেছেন। একসময়ের টাইপরাইটার-দক্ষ আঙুল আজ ডিজিটাল যুগেও অপেক্ষাকে মমতায় পরিণত করতে জানে। আর আমি, যে একদিন লিভারের টকাস শব্দের জন্য সেকেন্ড গুনতাম, এখনও সেই পুরনো কাজটাই করি; শুধু যন্ত্র বদলেছে, অপেক্ষার ভাষা বদলেছে; মা বদলাননি।



