I wish good essays could pay rent on their own. Until they learn how, paid subscriptions keep this publication alive.
রবীন্দ্রনাথ ‘ছুটি’ গল্পে ফটিককে দেখে রায় দিয়েছিলেন, তেরো-চোদ্দো বছরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নেই। শোভাও নেই, কাজেও লাগে না, স্নেহও উদ্রেক করে না। বাঙালি বাবা-মা সেই রায় আজও ফ্রেমে বাঁধিয়ে রেখেছেন, কারণ বয়ঃসন্ধির সন্তানকে বালাই বলে দেগে দিলে তাকে বোঝার খাটুনিটা বেঁচে যায়। কিন্তু প্রায় একই বয়সের একপাল মার্কিন ছেলেমেয়ের দিকে এক মাস্টারমশাই যখন ক্যামেরা তাক করলেন, দেখা গেল বালাইয়ের গায়ে একটা আশ্চর্য রাজকীয় দ্যুতি আছে, যা বড়রা দেখতে পায় না, কারণ বড়রা সব সময় ওদের দিকে তাকায় হাতে একটা মার্কশিট আর মুখে একটা ধমক নিয়ে।
মাস্টারমশাইয়ের নাম জোসেফ সাবো। তাঁর তোলা ছবি নিয়ে সদ্য বেরিয়েছে বই, ‘আমেরিকান টিন’। ছবিগুলো সাদা-কালো, টানটান, ফ্রেমিং এমন গম্ভীর যেন রাজদরবারের পোর্ট্রেট আঁকা হচ্ছে, অথচ তার মধ্যে বসে আছে কিছু ঢ্যাঙা, উশকোখুশকো, ঠোঁটে সিগারেট ঝোলানো কিশোর-কিশোরী, যাদের দেখলে আমাদের পাড়ার জেঠু সটান বলতেন, ‘এরা গোল্লায় গেছে।’ তারা একে অন্যের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে, মাথায় মাথা ঠেকিয়ে বসে, এত ঘেঁষাঘেঁষি যে পাশেরজনের চুলে কোন কোম্পানির শ্যাম্পু, নাক বলে দেবে। ইস্কুলের বিশাল চত্বরে কোনও একটা বেওয়ারিশ কোণ তারা দখল করে নিয়েছে, যেন উপনিবেশ। সমুদ্রতীরে তোয়ালের তাপ্পি-মারা কাঁথা বিছিয়ে ঊরুতে ঊরু ঠেকিয়ে শুয়ে। কানে কানে ফিসফিস, যেন রাষ্ট্রদ্রোহের ষড়যন্ত্র চলছে। এরা একে অন্যের প্রতি চুম্বকের মতো টানে সাঁটা, আর পৃথিবীর বাকি কোনও বস্তুর প্রতি সেই টান নেই: বাবা-মা, ইতিহাস বই, দেশের ভবিষ্যৎ, কিচ্ছুর প্রতি না।
এই ছবিগুলোর গায়ে একটা চিরকালীনতা আছে, আবার একটা স্পষ্ট তারিখের ছাপও আছে। বেশির ভাগ ছবি তোলা সত্তর আর আশির দশকে। জামাকাপড় দেখলেই বোঝা যায়: পালকের মতো ফুলিয়ে আঁচড়ানো চুল, কোমর অবধি উঁচু ঢোলা জিনস, গলা আর হাতার কিনারে আলাদা রঙের পাড়-বসানো টি-শার্ট, প্ল্যাটফর্ম জুতো, ঝিনুকের দানা গাঁথা মালা। মজার কথা, তার কয়েকটা আজ ফের কেতাদুরস্ত বলে চলবে, কারণ ফ্যাশন হল সেই পাগল যে গোল করে ঘুরতে ঘুরতে আবার নিজের জন্মদিনে এসে দাঁড়ায়। সেই একই সময়ে কলকাতার রাস্তা বেলবটমের ঘের দিয়ে ঝাঁট দেওয়া হচ্ছিল, আর রকে রকে জুলপি বাড়ছিল রাগী যুবক অমিতাভের অনুকরণে। পৃথিবী জুড়ে যৌবন তখন ঢিলে প্যান্ট আর ঘন চুলের এক অলিখিত আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করেছিল। আর সিগারেট। এত কিশোরের ঠোঁটে এত নিশ্চিন্ত ধোঁয়া দেখে আজকের দর্শকের চোখ কপালে উঠবেই, কেউ কেউ হয়তো শিশু সুরক্ষা দফতরে চিঠি লিখতে বসবেন।









কিন্তু এ সব গৌণ। ছবিগুলোর আসল রহস্য লুকিয়ে আছে ছেলেমেয়েগুলোর দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে, তাকানোর ধরনে। লাজুক, আনাড়ি, দলের ধারে কোণঠাসা হয়ে থাকা ছেলেটা বা মেয়েটাও ফ্রেমের মধ্যে একটা আলগা, অবলীলাময় উপস্থিতি নিয়ে হাজির। হাত-পা ঢিলে, কাঁধে একটা বেপরোয়া দোলা, চোখে একটা ‘আমায় কী ভাবলে বয়েই গেল’ মার্কা মেজাজ। কেন? কারণ এরা জন্ম থেকে নিজের ছবি বানাতে বানাতে, বাছতে বাছতে, ঘষেমেজে সাজাতে সাজাতে বড় হয়নি। সার্ত্র বলেছিলেন, নরক হল অন্য লোক, অর্থাৎ অন্যের চাহনি। যে মুহূর্তে মানুষ টের পায় কেউ তাকে দেখছে, সে ভেতরে ভেতরে মেরুদণ্ড সোজা করে, চিবুক তোলে, নিজের জীবনের দর্শক হয়ে যায়। সাবোর ছেলেমেয়েরা সেই নরকের প্রবেশপত্র তখনও হাতে পায়নি। তাই তারা নিজের জীবনের অভিনেতা হয়নি, নিছক বাসিন্দা থেকে গেছে। বইয়ের ছোট্ট ভূমিকায় গায়িকা ও শিল্পী কিম গর্ডন ঠিক এই কথাটাই ধরেছেন: সাবো শুধু ওই গোলমেলে বয়সের চেহারা ধরেননি, ধরেছেন সেই বয়সের অনুভূতিটা, ফিল্টারের পালিশ পড়ার আগের পৃথিবীতে, যখন ইনস্টাগ্রাম, এআই আর টিকটকের আয়নারা প্রতিটি চাহনিতে অ্যালগরিদম দিয়ে তোমায় সংজ্ঞায়িত করে দিত না। আয়না বেড়েছে, মুখ কমেছে। এর বেশি বলার দরকার নেই।
এ বার মাস্টারমশাইয়ের কথা। তিরিশের কোঠার গোড়ায়, সদ্য প্র্যাট ইনস্টিটিউট থেকে ফোটোগ্রাফিতে এমএফএ পাশ করে সাবো এসে উঠলেন লং আইল্যান্ডে। ১৯৭৩ সালে মালভার্ন হাই স্কুলে ডার্করুম ফোটোগ্রাফি পড়ানো শুরু। গিয়ে দেখলেন, ছাত্রছাত্রীরা ইস্কুলের প্রতি এমন বিরক্ত, এমন নির্লিপ্ত, যে তাঁর নিজের ছাত্রজীবনের কোনও কুঁড়েমিও তার ধারেকাছে আসে না। এদের পড়াশোনায় টানা আর ছাদ থেকে ঘুড়ি নামিয়ে আনা সমান কঠিন। অথচ একটা জিনিস ম্যাজিকের মতো কাজ করল: ডার্করুম। লাল আলোর নীচে একটা সাদা কাগজ ডেভেলপারের রাসায়নিক জলে ডোবানো হয়, আর চোখের সামনে আস্তে আস্তে তাতে ফুটে ওঠে একটা মুখ, একটা গাছ, একটা বিকেল, যেন প্ল্যানচেটে ডাকা আত্মা শরীর ধারণ করছে। এই দৃশ্যের জাদু কোনও দিন নিভে যায় না। যে ছেলে অঙ্ক ক্লাসে জানলা দিয়ে কাক গোনে, সে-ও এই জলের ট্রের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁ। সাবো, যাঁর বয়স এখন বিরাশি, মনে করেছেন, ছেলেমেয়েরা বলত, এই ক্লাস ছাড়ছি না, ক্যামেরা দিয়ে এই কাণ্ডটা আমাকে শিখতেই হবে। শিক্ষাবিজ্ঞানের মোটা মোটা বই যা পারেনি, একটা রাসায়নিকের গামলা তা পেরে গেল। কারণ মানুষ শেখে তখনই, যখন শেখার জিনিসটা তাকে বিস্মিত করে।
আর ছাত্রছাত্রীরাও হয়ে উঠল সাবোর আদর্শ মডেল। হাতের কাছে সারাক্ষণ মজুত, আর নিজেদের জীবনটা কেমন দেখায় তা জানার জন্য ছটফট। সাদা-কালো ফিল্ম তাদের সাধারণ দুপুরগুলোকে একটা শান্ত, অনুচ্চ মহিমায় মুড়ে ফিরিয়ে দিত, যেন ইস্কুলের করিডর হঠাৎ কোনও ইতালীয় ছবির সেট। সাবো ইয়ারবুকের জন্য ছবি তুলতে শুরু করলেন, তারপর ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে সারা ইস্কুল ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। ধীরে ধীরে ছেলেমেয়েরা তাঁকে দলের লোক বলে মেনে নিল। তাদের ভাষায়, ও তো সাবো, ওকে নিয়ে মাথা ঘামাস না, লোকটা ভাল, ইস্কুলের বাইরে, বা ভেতরে, সিগারেট টানতে দেখলেও কান ধরে হেডমাস্টারের ঘরে নিয়ে যাবে না। কিশোরদের রাজ্যে এর চেয়ে বড় খেতাব হয় না। পদ্মশ্রী, ভারতরত্ন, নোবেল, সব এই এক লাইনের কাছে নস্যি। একজন বড় মানুষ, যে তোমার দিকে তাকায় কিন্তু তোমায় শুধরোতে চায় না, বয়ঃসন্ধির কাছে সে দেবদূতের চেয়েও দুর্লভ প্রাণী।
তারপর সাবো ইস্কুলের পাঁচিল টপকালেন। পৌঁছে গেলেন সেই ডেলিকাটেসেন দোকানে, যেখানে মালভার্নের ছেলেমেয়েরা জটলা পাকাত। জোনস বিচে, যেখানে সমুদ্রের হাওয়া চুল এলোমেলো করে। ফিলাডেলফিয়ায় রোলিং স্টোনসের কনসার্টে, যেখানে কিশোর-হৃদয় মিক জ্যাগারের কোমরের তালে দোলে। শহরের এমন এক পানশালায়, যার অংশীদার ছিলেন প্রাক্তন বক্সার ও অভিনেতা টোনি ড্যানজ়া। এমনকি বাবা-মায়ের অনুমতি নিয়ে কয়েক জন ছাত্রছাত্রীর বাড়িতেও, যখন তারা শনিবার রাতে বেরোনোর আগে আয়নার সামনে যুদ্ধপ্রস্তুতি নিচ্ছে। অর্থাৎ এক জন মাস্টারমশাই তাঁর ছাত্রদের গোটা বাস্তুতন্ত্রে ঢুকে পড়লেন, অনুপ্রবেশকারীর মতো নয়, অতিথির মতো। নৃতত্ত্ববিদরা আমাজনের জঙ্গলে গিয়ে উপজাতিদের যে ধৈর্যে দেখেন, সাবো সেই ধৈর্যে দেখলেন লং আইল্যান্ডের কিশোর নামক উপজাতিকে, যাদের নিজস্ব ভাষা, পোশাক, আচার, ঈশ্বর (রক গায়ক), আর শয়তান (প্রিন্সিপাল) আছে।
এই বইটা বের করেছে ইমপর্ট্যান্ট ফ্লাওয়ার্স, শিল্প-বইয়ের প্রকাশনা সংস্থা ম্যাক-এর একটি শাখা, যার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার সোফিয়া কপোলা। কপোলা নিজেও কিশোরদের আত্ম-প্রদর্শনের এক নাছোড় পর্যবেক্ষক। ‘দ্য ভার্জিন সুইসাইডস’ যিনি দেখেছেন, তিনি জানেন, কিশোরীর জানলার পর্দার ফাঁক দিয়ে পৃথিবী কেমন দেখায়, কপোলা তা মুখস্থ করে রেখেছেন। সাবোর সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা একটা অ্যালবামের মলাটে। ১৯৯১ সালে প্রোটো-গ্রাঞ্জ ব্যান্ড ডাইনোসর জুনিয়র বের করেছিল ‘গ্রিন মাইন্ড’, আর তার প্রচ্ছদে সাবোর তোলা এক ছবি: সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে একটা বছর বারোর মেয়ে, লম্বা কালো চুল, চোখ দুটো তুরপুনের মতো ধারালো, ঠোঁটে আধপোড়া সিগারেট। মেয়েটাকে একসঙ্গে ভীষণ ভঙ্গুর আর আশ্চর্য আত্মস্থ দেখায়, যেন সে এখনই কেঁদে ফেলবে, আবার এখনই তোমায় একটা ধমক দিয়ে সরিয়ে দেবে। তার নাম প্রিসিলা। সাবো তাকে আর কোনও দিন দেখেননি। বনলতা সেনের মতো সে এক পলক মুখোমুখি বসে মিলিয়ে গেছে, রেখে গেছে শুধু একটা মুখ, যা তিরিশ বছর ধরে অচেনা মানুষের দেওয়ালে, রেকর্ডের তাকে, স্মৃতির খুপরিতে বেঁচে আছে। প্রিসিলা নিজে জানেও কি না, তার বারো বছরের এক বিকেল একটা প্রজন্মের গ্রাঞ্জ-কৈশোরের মুখ হয়ে গেছে, কে বলবে?
কপোলা, যিনি ফোটোগ্রাফ সংগ্রহ করেন, ছবিটা দেখেই কাত। বহু বছর পর নিজের প্রকাশনা শাখা খোলার সময় প্রথমেই তাঁর মনে পড়ল সাবোর নাম। বিশেষ করে যখন দেখলেন, সাবোর আগের কয়েকটা বই ছাপা বন্ধ, আর ইন্টারনেটের পুরনো বইয়ের বাজারে তা বিকোচ্ছে পাঁচশো ডলার বা তার বেশি দামে। এও এক মজার অর্থনীতি: কৈশোর যত দূরে সরে যায়, তার দাম তত চড়ে। যে বিকেলটা বিনা পয়সায় সমুদ্রের ধারে গড়াগড়ি খাচ্ছিল, পঞ্চাশ বছর পর তার একটা ছবি কিনতে মাসের মাইনে খসে। নস্টালজিয়া পৃথিবীর একমাত্র শিল্প, যার কাঁচামাল মুফতে জোটে আর ফিনিশড প্রোডাক্ট বিকোয় সোনার দরে।
কপোলা যেটা সবচেয়ে কদর করেন, তা হল সাবোর ছবির অন্তরঙ্গতা, যা কোথাও গায়ে পড়া হয়ে ওঠে না। তাঁর মতে, ছেলেমেয়েরা সাবোর সামনে সহজ, ছবিগুলোয় কোনও আড়ষ্টতা বা সাজানো ভঙ্গি নেই, কেউ ঢাল তুলে দাঁড়িয়ে নেই, আর দর্শকের কখনও মনে হয় না যে ক্যামেরাটা চাবির ফুটো দিয়ে উঁকি মারছে। কয়েকটা ছবিতে প্রেমিক-প্রেমিকা চুমুতে মগ্ন, বা একে অন্যের চোখে ডুবে আছে, আর চারপাশে বাকি ছেলেমেয়েরা এক মজার, সূক্ষ্ম ভদ্রতা দেখাচ্ছে। তারা যুগলের চৌম্বক-বলয় ছেড়ে উঠে যায়নি, আবার হাঁ করে গিলছেও না। শুধু পাশে বসে আছে, নিজের মনে, যেন প্রেম একটা প্রাকৃতিক ঘটনা, বৃষ্টি বা সূর্যাস্তের মতো, তা নিয়ে এত হইচইয়ের কিছু নেই। ভাবুন, এই দৃশ্য যদি উত্তর কলকাতার কোনও গলিতে ঘটত। জানলায় জানলায় পিসিমাদের মাথা, রকে তিন জন জ্যাঠামশাই, মোড়ের চায়ের দোকানে সান্ধ্য আকাশবাণী, আর পরদিন সকালে দুই পরিবারে কুরুক্ষেত্র। সাবোর ছবির কিশোরদের এই যে দেখেও-না-দেখার সৌজন্য, তা আমাদের প্রাপ্তবয়স্ক সমাজ আজও রপ্ত করতে পারেনি।
বইয়ে একটা ছবি আছে, যেটা দেখলে মনে হয় কৈশোরের সংবিধানের প্রস্তাবনা। ক্লাসঘরে পাশাপাশি তিনটে মেয়ে বসে। মাঝেরজন চিউইং গাম দিয়ে একটা বেলুন ফোলাচ্ছে, আর পা দুটো লম্বা করে তুলে দিয়েছে সামনের মেয়েটার চেয়ারে। চোখ ডেস্কের কাগজের দিকে, মন দিয়ে কিছু একটা দেখছে। গভীর ধ্যানে ডুবে নেই, আবার হাই তুলে বিরক্তও নয়। ঠিক সেই মাঝামাঝি একটা আরামের অবস্থায় আছে, যে অবস্থায় মানুষ থাকে নিজের বাড়ির বৈঠকখানায়। ক্লাসঘরটা যেন তার বাড়িরই একটা উপগ্রহ, আর নিজের চামড়ার ভেতরেও সে দিব্যি আরামে আছে। বাংলা ইস্কুলে এই ভঙ্গিতে ধরা পড়লে বেঞ্চের ওপর কান ধরে দাঁড়াতে হত, সঙ্গে ডায়েরিতে লাল কালির নোট: ‘অভিভাবক দেখা করুন।’ অথচ ওই বেলুন আর ওই তুলে দেওয়া পায়ের মধ্যে একটা গভীর দার্শনিক সত্য আছে। মানুষ তখনই সবচেয়ে ভাল শেখে, যখন শেখার জায়গাটাকে সে ভয় পায় না।
সাবোর ছবিতে ছেলে আর মেয়ে দু’দলই জিনস পরে ঘুরছে, অনেক ছেলের চুল কাঁধ ছুঁয়েছে, জামাকাপড় ঢিলেঢালা আর থাকে থাকে চাপানো: মস্ত সোয়েটার, ডেনিমের জ্যাকেট, ওভারঅল, স্যান্ডো গেঞ্জির ওপর চেক শার্ট। আর কেউই নিখুঁত হওয়ার জন্য মরিয়া নয়। এই ঘরোয়া, খানিক এলোমেলো, উলের মতো উষ্ণ উভলিঙ্গতা সেই সময় পাশাপাশি বাস করত গ্ল্যাম রকের ঝলমলে, চুমকি-বসানো লিঙ্গ-ভাঙাচোরার সঙ্গে, যার পুরোহিত ছিলেন ডেভিড বোয়ি। এক দিকে পাড়ার ছেলেটার লম্বা চুল, অন্য দিকে মঞ্চে জিগি স্টারডাস্টের আইশ্যাডো। সত্তরের দশক এই দিক থেকে ছিল দিলদরিয়া, সবাইকে জায়গা দিত। বইটা ওল্টাতে ওল্টাতে আমার মাথায় বেজে উঠেছিল দ্য রিপ্লেসমেন্টস ব্যান্ডের ১৯৮৪ সালের গান ‘অ্যান্ড্রোজিনাস’, যা স্বপ্ন দেখেছিল এমন এক আগামীর, যেখানে ছেলে আর মেয়ে দেখতে একই রকম হবে, একই চুলের বিপ্লবে সামিল হবে, আর তা নিয়ে কেউ কোনও হাঙ্গামা করবে না।
ইতিহাস অবশ্য সেই গানের ভবিষ্যদ্বাণী উল্টে দিয়েছে। হাঙ্গামা কমেনি, গত কয়েক দশকে তার গলা চড়েছে আরও। লিঙ্গপরিচয় নিয়ে, কিশোরদের উদ্বেগ নিয়ে, তাদের মনের অসুখ নিয়ে এখন টিভিতে তর্ক, সংসদে বিল, খাবার টেবিলে যুদ্ধ। সাবোর ছবিগুলো এই গোটা কোলাহলের পাশে আশ্চর্য রকম শান্ত। তাতে কোনও দুশ্চিন্তার ভাঁজ নেই, কোনও রায় দেওয়ার তাড়া নেই। ছবিগুলো শুধু মনে করিয়ে দেয়, কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের দলে, নিজেদের সময়ে, নিজেদের নিয়মে কী অসম্ভব রকমের কেতাদুরস্ত, কী ঠান্ডা মাথার রাজা-রানি হতে পারে। রবীন্দ্রনাথের ফটিক যদি মালভার্ন হাই-তে পড়ত, সাবো তার একটা ছবি তুলতেন, আর সেই ছবিতে ফটিককে দেখাত মামাবাড়ির ঘরের কোণে গুটিয়ে থাকা বালাই হিসেবে নয়, নদীর ধারে গুঁড়ি-গড়ানো দলের দুর্দান্ত সর্দার হিসেবে, যা সে আসলে ছিল।
কিন্তু এইখানে একটা খচখচানি থেকে যায়। সাবোর ছেলেমেয়েরা ক্যামেরার সামনে পোজ দেয়নি, মানলাম। তাদের মুখে কোনও ফিল্টার ছিল না, তাও মানলাম। কিন্তু আজ, পঞ্চাশ বছর পর, আমরা যারা এই বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছি, তারা কী দিয়ে দেখছি? ওই ছেলেমেয়েগুলোরও তো রাতে বালিশ ভেজানো কান্না ছিল, বাড়িতে মাতাল বাবা ছিল, অঙ্কে ফেল ছিল, প্রেমে প্রত্যাখ্যান ছিল, ভিয়েতনাম-ফেরত দাদার শূন্য চোখ ছিল। সাবো সে সব ছবি তোলেননি, বা তুললেও তা এই বইয়ে ওঠেনি। আমরা দেখছি সমুদ্রতীর, সিগারেট, চুমু আর চিউইং গামের বেলুন, আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছি, আহা, কী সহজ ছিল সেই দিনগুলো। তাহলে কি ফিল্টারটা শুধু জায়গা বদলেছে? কিশোরদের মুখ থেকে সরে এসে বসেছে আমাদের চোখে, নস্টালজিয়া নামে এক রাসায়নিক জলের ট্রে হয়ে, যাতে ডোবালেই যে কোনও অতীত ফুটে ওঠে সোনালি, নিষ্পাপ, নিখুঁত? সাবো ডার্করুমে ছবি ফুটিয়েছিলেন। আমরা মনের ডার্করুমে কী ফুটিয়ে তুলছি, সত্যি না স্বপ্ন? আর যদি স্বপ্নই হয়, তাতে কারও কিছু এসে যায় কি?


