I wish good essays could pay rent on their own. Until they learn how, paid subscriptions keep this publication alive.
কল কাটার পরেও হ্যান্ডসেটটা কানে চেপে ধরে বসে রইলাম।
হঠাৎ করেই একগাল হেসে ফেললাম—ঠিক বোকাদের মতো।
নিঃসঙ্গ রান্নাঘরে কেউ নেই জেনেও এই হাসি ভাগ করে নেওয়ার তীব্র ইচ্ছে হলো। যে স্বপ্নের পেছনে এতদিন গোপনে ছুটেছি, ব্যর্থতার আশঙ্কায় যা কাউকে মুখ ফুটে বলতে পারিনি, তা শেষমেশ সফল হয়েছে। কারণ জানাজানি হলে যদি না হয়, আর ব্যর্থ হলে লোকে হাসবে—সেই ভয়টা তো ছিলই।
সাফল্যের এই মুহূর্তে প্রথমেই বাবা-মায়ের মুখটা ভেসে উঠল।
পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসেও শৈশবের অভ্যাস বদলায়নি; ভালো কিছু ঘটলেই দেশের বাড়িতে জানানোর তাগিদ অনুভব করি। পরীক্ষার রেজাল্ট, প্রথম চাকরি কিংবা ছেলের জন্মের দিনে হাত কাঁপা সেই অনুভূতির মতো আজও মনটা চঞ্চল হলো।
ফোনবুক খুলে বাবার নামের ওপর আঙুল রাখতেই আনন্দের আবেগটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে এলো।
বাবার কণ্ঠস্বর না শুনলেও উনার পরিচিত সতর্কবাণীগুলো কানে বাজতে লাগল:
“সব দিক ভালো করে যাচাই করেছ তো?”
“অহেতুক তাড়াহুড়ো করছ না তো?”
“আর্থিক লেনদেনগুলো ঠিকঠাক বুঝেছ তো, নাকি পরে ঝামেলায় পড়বে?”
“আরেকটু ভেবেচিন্তে সময় নিলে ভালো হতো না?”
মাকে খবরটা আলাদাভাবেই বলতে হবে। শুনে উনি প্রথমে আনন্দিত হবেন। এরপরই প্রশ্ন করবেন, “তোমার বাবা এ নিয়ে কী বললেন?” তারপর বাবার তোলা আপত্তির সুরটাই একটু কোমল করে আমাকে শোনাবেন।
রান্নাঘরের মাঝখানে একাই দাঁড়িয়ে আমি যেন সেই কাল্পনিক কথোপকথনের উত্তর জোগাতে শুরু করলাম:
হ্যাঁ, খুব ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
হ্যাঁ, সব হিসাব-নিকাশ করেই পা ফেলেছি।
না, হুট করে ঝোঁকের মাথায় কিছু করিনি।
হ্যাঁ, এতে কিছুটা ঝুঁকি নিশ্চয়ই রয়েছে।
না, বোকামির বশবর্তী হয়ে তো আর সিদ্ধান্ত নিইনি!
হঠাৎ ডাল পুড়ে যাওয়ার তীব্র গন্ধ নাকে আসতেই আমার হুশ ফিরল। হাতের ফোনটা পাশে নামিয়ে রেখে চুলার আগুন কমিয়ে দিলাম।
যেকোনো ভালো খবর অন্যকে শোনানোর আগেই আমার এই অদ্ভুত অভ্যাস—নিজের হয়ে যুক্তি সাজাই, নিজের স্বপক্ষে উকিল দাঁড় করাই, সাক্ষী হাজির করি আর সমস্ত নথিপত্র গুছিয়ে রাখি। সম্ভাব্য প্রতিটি প্রশ্নের কী জবাব দেওয়া যায়, তা মনে মনে ভেবে প্রস্তুত করে নিই। যেন একটা কাঁচা আনন্দকে কাপড় পরিয়ে, পরিপাটি করে সাজিয়ে, মুখ ধুইয়ে তবেই বাইরের মানুষের সামনে পেশ করতে হয়।
অবশেষে যখন সত্যিই ফোনটা হাতে নিই, ততক্ষণে আমার গলার স্বর একেবারেই ধীরস্থির। খবরটার উত্তাপও তখন শান্ত হয়ে গেছে। ঠিক পাঁচ মিনিট আগে যে মানুষটা রান্নাঘরে একা দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে হেসেছিল, তার অস্তিত্বের আর বিন্দুমাত্র চিহ্নও তখন অবশিষ্ট থাকে না।
ছোটবেলায় একবার অঙ্কে খুব খারাপ নম্বর পেয়েছিলাম।
কত নম্বর পেয়েছিলাম তা আজ আর মনে নেই, তবে মনে আছে সেই পাতলা হলুদচে কাগজটির কথা। লাল কালির অঙ্ক, উপরে আমার নাম আর নিচে শিক্ষকের স্বাক্ষর। স্কুল থেকে ফেরার পথে ব্যাগে রাখা ওইটুকু কাগজের ভারী চাপ যেন সারাপথ স্পষ্ট অনুভব করছিলাম। কাগজের নিজস্ব কোনো ওজন থাকার কথা নয়, তবু তা সেদিন অনস্বীকার্যভাবে ভারী ছিল।
বাড়িতে ফিরে জুতো খুলে জল খেলাম। মা তখন রান্নাঘরে পেঁয়াজ ভাজছিল, আর বাবার ফিরতে তখনও অন্তত এক ঘণ্টার মতো দেরি। চাইলে এই একটা ঘণ্টা নির্ভাবনায় কাটিয়ে দিতে পারতাম, কিন্তু মাকে কিছুই জানালাম না। সোজা ঘরে গিয়ে বই খুলে অঙ্কের খাতাটা বের করলাম। পরীক্ষায় যেগুলো পারিনি, সেগুলো আবার কষার চেষ্টা করলাম। কিন্তু মাথায় কিছুই ঢুকছিল না। কারণ অঙ্ক তখন আর কেবল একটি বিষয় ছিল না; অঙ্ক রূপ নিয়েছিল সন্ধ্যা সাতটায়, দরজার চাবিকাঠির শব্দে, রাতের খাবারে এবং অবশেষে সেই নম্বরপত্রে।
সেদিন ঠিক কী ঘটনা ঘটেছিল তা আজ আর স্পষ্ট নয়। বাবা হয়তো তেমন কঠোর কিছুই বলেননি। আসলে মানুষের স্মৃতি কোনো আদালতের বিশ্বস্ত সাক্ষী নয়—সে প্রয়োজনমতো সত্যকে কিছুটা ছেঁটে ফেলে, কিছুটা বাড়িয়ে নেয়, আবার কিছু অংশ একবারে মুছেও দেয়। তবু বাবার মুখে বলা কয়েকটি কথা আজও স্মৃতিতে রয়ে গেছে:
“তোমার ভাই তো পেরেছিল।”
“আমরা এই বয়সে কত কষ্ট করেছি, তা কি জানো?”
“আরেকটু মন দিয়ে চেষ্টা করলে কি হতো না?”
“তোমার এত অসুবিধা কিসের?”
ওই শেষ প্রশ্নটির উত্তর আমার জানা ছিল না, কিংবা তা ব্যক্ত করার ভাষাও সেদিন আমার ছিল না। সম্ভবত নিজের সমস্যাটা আমি নিজেও তখন বুঝতে পারিনি। কেবল টের পেতাম, অঙ্কের বই খুললেই বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় শক্ত হয়ে ওঠে। একটা ভুল হলে তার পেছনে সারবেঁধে আরও ভুল হতে থাকে। পাশের সহপাঠী দ্রুত লিখে চললে আমার হাত আরও শ্লথ হয়ে পড়ে। শিক্ষক যখন ব্ল্যাকবোর্ড মুছে ফেলেন, আমি তখনও আগের লাইনেই আটকে থাকি।
আমাকে কেউ কখনো এই অনুভূতির কথা জিজ্ঞেস করেনি। বদলে আমি নিজের মনে এক কঠিন শিক্ষা বানিয়ে নিলাম—চেষ্টার অভাবই ব্যর্থতার একমাত্র কারণ, ব্যর্থ হওয়া মানেই প্রিয়জনদের হতাশ করা, আর নিজের কষ্টকে সত্য প্রমাণের আগে তার পক্ষে নানা যুক্তি উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই মানসিকতা আমার স্বভাবের অংশ হয়ে উঠেছে:
কষ্ট পাওয়ার আগেই আমি নিজের বিরুদ্ধে নানা অপরাধবোধ জোগাড় করে রাখি।
ক্লান্ত হয়ে পড়লে মনে করিয়ে দিই, অন্যেরা তো আমার চেয়েও বেশি পরিশ্রম করছে।
কোনো কাজ না পারলে ধরে নিই, আমার অযোগ্যতাই এর একমাত্র কারণ।
কেউ আঘাত দিলে নিজের ভেতরই ভুল খুঁজতে শুরু করি।
শৈশবে মানুষ কেবল পড়াশোনা বা বর্ণমালাই শেখে না, নিজের কোনো আবেগ প্রকাশ করলে চারপাশের চেনা পরিবেশটা ঠিক কীভাবে বদলে যেতে পারে—তাও নীরবে শিখে নেয়।
স্কুলের সেই ঘটনাগুলো আমি কখনোই পরিবারকে জানাইনি।
প্রতি রাতে মনে মনে সংকল্প করতাম, পরদিন সকালে সব বলে দেব।
কিন্তু পরদিন মায়ের বিষণ্ণ মুখ কিংবা কাজ থেকে ফেরা বাবার শ্রান্ত চেহারা দেখে মনে হতো—আজ থাক, অন্য কোনোদিন বলব।
এমনি করে একদিন সেই কঠিন সময় কেটে গেল, আর বাড়ির মানুষগুলোও কখনো কিছু জানতে পারল না।
অনেক পরে বুঝেছি, ঘরের নিরাপদ পরিবেশটাকে বাঁচিয়ে রাখতেই আমি মুখ ফুটে কিছু বলিনি।
বাইরের জগতে আঘাত পেয়ে আশ্রয়স্থলেও যদি প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হতে হয়—”তুমি কী করেছ?” বা “এত গুরুত্ব দাও কেন?”—তবে আশ্রয় নেওয়ার জায়গাটাই তো হারিয়ে যায়।
এভাবেই নীরবতার চর্চা শুরু হয়েছিল।
একাকীত্ব কেউ এক লহমায় বেছে নেয় না; মানুষ ধাপে ধাপে নিজের ভেতরের কথা গোপন করতে শেখে।
প্রথমে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা চেপে যায়, তারপর অনুভূতিটা আড়াল করে।
কখনো কেবল ঘটনাই প্রকাশ করে কিন্তু আবেগ প্রকাশ করে না, কিংবা শুধু শেষ পরিণতিটুকু জানায় কিন্তু পেছনের যন্ত্রণাময় পথটার কথা এড়িয়ে যায়।
আজ যখন বাবা-মা আক্ষেপ করে বলেন, “তুই তো কিছুই বলিস না,” তখন বলতে ইচ্ছে করে—এই চুপ থাকার অভ্যাসটা আমার একার সৃষ্টি নয়।
কিন্তু তাও বলা হয় না, কারণ ওইটুকু বোঝাতে গেলেও আবার অনেক লম্বা কৈফিয়ত দিতে হবে।
অনেক সময় সন্তান শান্ত হয়ে গেলে বাবা-মা ভাবেন সে বোধহয় সব বুঝতে শিখেছে।
ছোটবেলায় তর্ক করতাম, কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে তা থামিয়ে দিই। আগে যেখানে প্রশ্ন করতাম, “কেন?”, সেখানে স্রেফ বলতাম, “আচ্ছা”। আগে কেঁদে মন হালকা করতাম, পরে চুপচাপ ঘরে গিয়ে দরজা আটকে দিতাম। আগে আমার আবেগ মুখের ভাব দেখেই ধরা যেত, পরবর্তীতে তা আর বোঝার উপায় ছিল না।
তাঁরা হয়তো মনে করেছিলেন মেয়েটা বড় হচ্ছে, বুদ্ধিমান হচ্ছে এবং সংসার বুঝতে শিখছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, আমি তখন ঘরের পরিবেশ ও পরিস্থিতি বুঝে চলতে শিখছিলাম—
কোন সময়ে কোন সত্যের কতখানি প্রকাশ করা নিরাপদ;
কোন ভুল ঢাকার জন্য কী ধরনের অজুহাত বা ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে হয়;
কোন মন্তব্যটি করলে রাতের খাওয়ার টেবিল নিস্তব্ধতায় ডুবে যাবে; এবং
নিজের কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানানোর আগে কীভাবে তিনটি ভালো খবর শুনিয়ে ভূমিকা তৈরি করতে হয়।
মানুষের জীবনের কিছু শিক্ষা কখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষায় আসে না, কিন্তু সারাজীবন সেগুলোই সবচেয়ে বেশি কাজে দেয়।
আমার ভালোবাসার অভাব ছিল না, প্রমাণগুলো স্পষ্ট: পড়াশোনার খরচ চালানো, অসুস্থতায় রাত জেগে সেবা করা, কিংবা নতুন জামা আমার হাতে তুলে দিয়ে বাবার পুরনো কাপড়েই সন্তুষ্ট থাকা। আমার চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে মা নিজের প্রয়োজনকে অনায়াসে বিসর্জন দিয়েছেন, রাতে ঘরে ফিরতে দেরি হলে বারান্দার আলোটি জ্বালিয়ে রেখেছেন, এমনকি বিয়ে ভেঙে যাওয়ার মতো কঠিন বিপর্যয়েও পরিবারের দরজা আমার জন্য খোলাই ছিল।
ভালোবাসা নিশ্চিতভাবেই ছিল, তবে সমস্যা হলো—সেই ভালোবাসাকে আমি হৃদয়ে অনুভব করতে পারিনি, কেবল হিসাব-নিকাশ করেই বুঝে নিতে হয়েছে। অনুভূতি আর হিসাবের এই সূক্ষ্ম ব্যবধানটির মাঝেই আড়াল হয়ে গিয়েছিল আমার পুরো শৈশব।
আমার চাওয়াগুলো ছিল খুব সাধারণ। চেয়েছিলাম, কোনো কারণ ছাড়াই বাবা আমাকে দেখে একটু হাঁসুক, ঘরে ফিরলে তাঁর চোখে-মুখে কিছুটা স্নিগ্ধতা ফুটে উঠুক, আর যখনই কিছু বলতে যাই, তিনি যেন বারবার ঘড়ির কাঁটার দিকে নজর না দেন। চেয়েছিলাম, কোনো সমস্যার কথা বললে মা সঙ্গে সঙ্গে সমাধানের পথ না দেখিয়ে চুপচাপ পাশে এসে বসুক, পরম মমতায় জড়িয়ে ধরুক। কিংবা কোনো বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও অন্তত এটুকু বলুক—”বুঝলাম, তুই কেন এমনটা চাইছিস”।
আমাদের পরিবারে ভালোবাসাটা ছিল অত্যন্ত কর্মমুখর। তা প্রতিনিয়ত বাজার করত, স্কুলের বেতন মেটাত, সময়মতো ওষুধ কিনে আনত আর বৃষ্টিতে ছাতা হাতে বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করত। কিন্তু সেই ভালোবাসা কখনো সহজ করে মনের কথা বলতে শেখেনি, শেখেনি নিবিড়ভাবে স্পর্শ করতেও।
ভিতরে এক তীব্র ধস নেমে আসছিল; রাতে হঠাৎ ঘুম ভাঙলে উপলব্ধি করতাম, পাশে সত্যিই কেউ নেই। অথচ সেই দুঃসময়েও আমার মন অবিরত ভেবে চলছিল—বাবা-মাকে কথাটা কীভাবে জানানো যায়?
অবশেষে যখন বললাম, বাবা দীর্ঘক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপর অনুযোগের সুরেই বললেন, শুরু থেকেই নাকি তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন কিছু একটা সমস্যা ছিল। হয়তো তাঁদের ধারণাই সঠিক ছিল, তাই আমি আর কোনো প্রতিবাদ করিনি।
মা শুধালেন, “আরেকটু ধৈর্য ধরতে পারলি না?”
“ধৈর্য তো ধরেছিলাম,” উত্তর দিলাম আমি।
কিন্তু কিন্তু কতদিন? কষ্টের কি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা ক্যালেন্ডার থাকে? পুরো পাঁচ বছর সহ্য করলে তা সঠিক বিবেচিত হতো, আর চার বছর এগারো মাসে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কি ভুল হয়ে গেল?
পরবর্তীকালে তাঁরা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, সবরকম সাহায্য ও চিন্তাভাবনা করেছেন। কিন্তু নিজের ভেঙে যাওয়া সংসারের অবশিষ্টাংশ গুছিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি, গৃহটি কেন ভেঙে গেল—তার কৈফিয়তও আমাকেই অনবরত দিয়ে যেতে হয়েছে।
বয়স আমার যাই হোক না কেন, তাঁদের কাছে আমি তখনো সেই ছোট মেয়েটিই রয়ে গিয়েছিলাম।
বাবা হয়তো আজীবন মনে করেছেন, অশুভ বা বিপদ আসার পূর্বেই সন্তানকে কঠিন করে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
আর মা হয়তো বুঝে নিয়েছেন, সংসারজীবনে টিকে থাকার একমাত্র উপায় হলো সমস্ত বেদনাকে নিজের ভেতর চেপে রাখা।
এসব সত্যি আমি উপলব্ধি করি, বেশ ভালোভাবেই বুঝি।
কিন্তু এই অতিরিক্ত বোঝাপড়ার মধ্যেও এক ধরনের সুক্ষ্ম যন্ত্রণা রয়েছে।
কখনো যদি শৈশবের কোনো বেদনাদায়ক স্মৃতি বা কষ্টের কথা ব্যক্ত করতে যাই, তখনই শুনতে হয়—”সেই সময়ে আমাদের কি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, তা কি তোর জানা আছে?”
হ্যাঁ, আমার সবই জানা আছে।
বাবার কর্মজীবনের সংকট, আর্থিক অনটন, দাদুর অসুস্থতা, আর মায়ের সংসারের হাজারো টানাপোড়েন—সব ইতিহাসই আমার জানা।
পরিণামে দেখা যায়, আমার নিজের জমানো কষ্টের কথাগুলো একপাশে সরিয়ে রেখে আমি উল্টো মা-বাবাকে সান্ত্বনা দিতে শুরু করি—”না, আমি তো তোমাদের অভিযুক্ত করছি না, আমি জানি তোমরা কেবল আমার ভালোই চেয়েছিলে”।
আড্ডা বা আলাপ শেষ হয়, আর ঘরে ফিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুঝতে পারি—আমার মনের আসল কথাটি আজও অধরাই থেকে গেল।
কখনো কখনো মনে হয়, পরিপক্ক বা বয়স্ক হওয়ার এটাই হয়তো সবচেয়ে নিঃশব্দ ও শ্রান্তিকর বাস্তবতা।
জীবনের এমন এক পর্যায়ে এসে আপনি নিজের শৈশবের আঘাতগুলোকে প্রকাশ করার মতো ভাষা ও সামর্থ্য খুঁজে পান, কিন্তু ততদিনে যাদের কাছে তা প্রকাশ করার কথা ছিল, তারা বার্ধক্যে উপনীত হয়েছেন।
তাদের করুণ চেহারার দিকে তাকালে হৃদয়ে কেবল অপরাধবোধ ও মমতার উদ্রেক হয়।
আপনি নিজেকে গুটিয়ে নেন, নরম হয়ে যান, আর শেষ পর্যন্ত নিজের ভেতরের গল্পটা কখনোই আর বলা হয়ে ওঠে না।
বিষয়টা এতটুকুই—যোগাযোগের ব্যবধানটা দিন দিন শুধু বেড়েই গেছে।
যেকোনো কিছু ঘটলেই একসময় সঙ্গে সঙ্গে কল দিতাম।
ধীরে ধীরে সেই সময় পিছিয়ে এক ঘণ্টা, তারপর সন্ধ্যা, আর শেষমেশ পরদিন গিয়ে ঠেকলো।
হঠাৎ একদিন খেয়াল করলাম, জীবনটা বদলে গেছে:
খারাপ কোনো খবর থাকলে প্রথমেই বন্ধুকে জানাই।
ভালো কোনো সংবাদ এলে ছেলের সাথে ভাগ করে নিই।
আর মনের ভয়গুলো একান্তই নিজের ভেতর চেপে রাখি।
অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে সরতে সরতে মা-বাবা যে কখন প্রথম তিনজনের বাইরে চলে গেলেন, তা ভেবে দেখাটা সত্যিই কষ্টের।
কেউ চলে গেলে তার অনুপস্থিতি স্পষ্ট বোঝা যায়, কিন্তু জীবদ্দশায় কাউকে তিলে তিলে হারিয়ে ফেলাটা অনুধাবন করা আরও কঠিন।
অথচ মানুষটি ওপাশেই আছে; ফোন করলে পাওয়া যাবে, বিপদে ছুটেও আসবে।
তা সত্ত্বেও, জীবনের গোপন দরজাটা তার জন্য আর সহজে খোলে না।
এই দেয়ালটা কে তৈরি করল—তিনি, আপনি, নাকি দুজনেরই অলক্ষ্যে গড়ে উঠেছে—তা বলাও কঠিন।
যখন আমি তার মুখের দিকে তাকাই, নিজের শৈশবকে খোঁজার চেষ্টা করি না; কারণ ও তো আমার কোনো পুনর্জন্ম কিংবা অতীতের ক্ষত ঢাকার উপায় নয়। সে একেবারে একজন আলাদা মানুষ।
তবুও আমি অনুধাবন করি—মুখের সামান্য একটা বিরক্তির রেখা, একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস, চোখ পাকানো, কিংবা “আবার?” বা “আমি আগেই জানতাম”—এর মতো কথাগুলো শিশুর ওপর কতখানি ভার হয়ে চেপে বসতে পারে। এগুলো তার হাতের স্কুলের কাগজের চেয়েও অনেক বেশি ভারী। তাই কথা বলার আগেই তার কথা মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করি।
অবশ্য সব সময় তা পারি না। অধৈর্য হয়ে হয়তো হুট করে বলেই ফেলি, “তুমি কাজটা কীভাবে করলে?” আর অমনি দেখতে পাই ছেলের ঘাড় শক্ত হয়ে গেছে, নজর নিচে নেমে এসেছে, এবং তার ভেতরের বাকি কথাগুলো সেখানেই থেমে গেছে। সেই নীরবতার মুহূর্তে এক অজানা ভয় এসে আমাকে ঘিরে ধরে।
একলা এত বড় সিদ্ধান্ত কেন নিল? আমি কি আগে কিছু সতর্ক করিনি? এখন পরিস্থিতি কীভাবে সামলানো যাবে?
মানুষ নিজের অজান্তেই পিতা-মাতার আচরণের ভাষা রক্তে বহন করে চলে—প্রয়োজনের মুহূর্তে যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রকাশ পায়। কিন্তু আমি সেই মুহূর্তটিতে কিছুটা সময় নিতে চাই—পাঁচ কিংবা দশ সেকেন্ড। সন্তান কিছু বলার আগেই যেন আমার ভেতরের আশঙ্কা বা উদ্বেগ কথা বলে না ওঠে।
আমি চাই সে তার মনের সব কথা নির্দ্বিধায় পুরোপুরি বলুক:
যে কথাগুলো প্রকাশ করতে তার কুন্ঠা বা লজ্জা হচ্ছে, সেটাও।
যেখানে সে নিজেকে অপ্রস্তুত বা বোকা ভাবছে, সেটাও।
এমনকি যে বিষয়ে এখনও কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা বা পরিকল্পনা নেই, সেটাও।
সব শোনার পর হয়তো আমি ক্ষোভ প্রকাশ করব, তর্ক করব, নিজের মতামত দেব, কিংবা কঠোর কোনো কথা বলব। মা হওয়া মানেই যে সর্বদা কেবল স্নেহের পরশ দেওয়া—তা তো নয়।
তবে দিনশেষে আমি চাই আমাদের মধ্যকার আশ্রয় আর নিরাপত্তার পরিবেশটা যেন অটুট থাকে। ঘর ছেড়ে যাওয়ার সময় সে যেন কখনোই মনে না করে, যে পরবর্তী সময়ে মনের কথা কেবল অর্ধেকটাই বলবে।
“কিছু না হলে ডাকলি কেন?”
“এমনিই।”
কথাটি বলেই সে চলে গেল। আমি বেশ কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলাম।
আসলে মানুষের জীবনের সব হিসাব কখনোই মেলে না। হারিয়ে যাওয়া শৈশব আর কোনোদিন ফিরবে না, আর বাবা-মায়ের বয়সও থমকে থাকবে না। যে কথাগুলো সঠিক সময়ে বলা দরকার ছিল, তা এখন শতবার বললেও আর সেই বয়সের অনুভূতির কাছে পৌঁছাবে না।
তবুও তো সামনে একজন মানুষ রয়েছে, সে তো আমার পুরনো হিসাব কিংবা ঋণ চুকানোর মাধ্যম নয়। তার প্রতি আমার কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে যায়।
একদিন হয়তো আমি আর থাকব না। ব্যস্ত এই জীবনে মৃত মানুষকে নিয়ে কেউ দিনের পর দিন ভেবে বসে থাকে না; তাই সে হয়তো কারও কাছে আমার কথা বলবে, আবার হয়তো বলবেই না। তবে কখনো যদি আমার প্রসঙ্গ উঠেই আসে, আমি চাই না সে একটু থেমে থমকে গিয়ে বলুক—
“আমার মা আমাকে ভালোবাসত ঠিকই, কিন্তু তাঁর ভালোবাসার প্রকাশটা ছিল একটু অন্যরকম।”
আমি চাই ভালোবাসাটা তার কাছে এতটাই স্পষ্ট ও সহজ হোক, যেন আলাদা কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজনই না পড়ে। সে যেন একদম দ্বিধাহীনভাবে শুধু বলে—
“আমার মা আমাকে ভালোবাসত।”
এবং সহাজেই অন্য প্রসঙ্গে চলে যেতে পারে; যেন এই ভালোবাসার সত্যতা প্রমাণে বাড়তি আর কোনো যুক্তির দরকার নেই।



