নারী কি আসলেই নিজের জন্য বাঁচতে পারে?
দিলারা হাশেমের আমলকীর মৌ উপন্যাসটি পড়ার সময় আমার এলিজাবেথের কথাই মনে পড়ছিল বারবার। সারা চেয়েছিল সমাজকে অস্বীকার করতে। যে সমাজ বলে, "নারী মানে দায়িত্ব, নারী মানে সংসার, নারী মানে শৃঙ্খল।"
রাত গভীর। সারার ঘরে কেবল সিগারেটের ধোঁয়া। বাইরের আলো জানালার পর্দায় পড়েছে, ছায়াগুলোও অস্থির। একাকীত্ব কি মুক্তির আরেক নাম? সারা জানে না। সে জানে কেবল, বেঁচে থাকা মানেই নিজের পথ খুঁজে নেওয়া, আর এই সমাজে নারীর জন্য সেই পথটা সবসময় রক্তাক্ত।
দূর ইংল্যান্ডে, অন্য এক সমাজে, এলিজাবেথেরও হয়তো এমনই এক গভীর রাত ছিল। যেখানে সে নিজের মনকে প্রশ্ন করেছিল; একজন নারী কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে? প্রেমের জন্য আপস করবে, না নিজের আত্মসম্মান ধরে রাখবে?
দুজনের গল্প যেন একই সূত্রে গাঁথা।
দিলারা হাশেমের আমলকীর মৌ উপন্যাসের চরিত্র সারা এবং জেন অস্টিনের প্রাইড এন্ড প্রেজুডিস-এর এলিজাবেথ। আমার কল্পনাপ্রবণ মন এই দুজনকে একটি ক্যাফতে আটকে ফেলে।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। লন্ডনের এক ক্যাফের কোণে বসে আছে দুই নারী; একজন ইংরেজ, একজন বাঙালি। এলিজাবেথের সামনে এক কাপ চা, সারার হাতে সিগারেটের ধোঁয়া। দুজনই যেন একে অপরের মধ্যে নিজেদের খুঁজে পেতে চাইছে।
এলিজাবেথ: (হালকা হাসি দিয়ে) তুমি সত্যিই সাহসী, সারা। সংসার, সন্তান, সমাজ; সব ছেড়ে বেরিয়ে এসেছ। কেমন লাগছে?
সারা: (গভীর চোখে তাকিয়ে) কখনো মনে হয় মুক্ত, কখনো মনে হয় একা। তুমি কীভাবে করেছ, এলিজাবেথ? সমাজের ভেতর থেকে লড়াই করে জিতেছ।
এলিজাবেথ: আমি সমাজ পাল্টানোর চেষ্টা করিনি, শুধু নিজের জায়গাটা খুঁজে নিয়েছি। তুমি কি মনে করো, একেবারে বেরিয়ে আসাটাই একমাত্র উপায়?
সারা: আমার কাছে সমাজটা একটা খাঁচার মতো। আমি বেছে নিয়েছি খাঁচার বাইরে আসতে। তুমি খাঁচার ভেতর থেকেও নিজেকে স্বাধীন রেখেছ। তোমার কৌশল কি বেশি বাস্তববাদী ছিল?
এলিজাবেথ: (চায়ের কাপ ঘুরিয়ে ধরে) হয়তো। কিন্তু তুমি কি আসলেই মুক্ত হয়েছ, নাকি সমাজকে উপেক্ষা করতে গিয়েও তাকে তোমার জীবন থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারোনি?
সারা: (একটু হেসে) এই প্রশ্নটা আমি নিজেও করি। সমাজ থেকে বেরিয়ে এসেছি, কিন্তু সমাজ আমাকে ভুলে যায়নি। তারা এখনো আমাকে ‘অন্যরকম’ তকমা দিয়ে রেখেছে। তোমার সমাজ কি তোমাকে মেনে নিয়েছে?
এলিজাবেথ: হ্যাঁ, কিন্তু কেবল তখনই যখন আমি প্রমাণ করেছি যে আমি কারও অধীনে নই। তুমি কি চেয়েছিলে, সমাজ তোমাকে গ্রহণ করুক?
সারা: (এক মুহূর্ত চুপ থেকে) না। আমি চেয়েছিলাম, আমি যা; তেমনই সবাই মেনে নিক, শর্ত ছাড়াই। কিন্তু এই সমাজ কোনো নারীকে শর্ত ছাড়া মেনে নেয় না, তাই না?
এলিজাবেথ: তুমি প্রেমে বিশ্বাস করো?
সারা: (সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ে) করি, তবে শর্তহীন প্রেমে।
এলিজাবেথ: তাহলে তুমি হাসিবকে কেন ফিরিয়ে দিলে? সে তো তোমার স্বাধীনতাকে সম্মান করেছিল।
সারা: ভালোবাসা আর স্বাধীনতা সবসময় একসঙ্গে যায় না, এলিজাবেথ। আমি ওর ভালোবাসার মধ্যে একটা ছায়া দেখেছি; একটা অনিবার্য দাবি। আমি জানি, কোনো না কোনোদিন, হয়তো কোনো ছোট মুহূর্তে, সে আমায় বলবে, “এত রাতে বাইরে যেও না,” বা “কেন এভাবে থাকতে চাও?” তখন বুঝবে, স্বাধীনতা কি সত্যিই আছে?
এলিজাবেথ: (নরম কণ্ঠে) কিন্তু তুমি জানো, ডার্সি আমার প্রতি এমনটা কখনো করেনি। আমি ওর কাছে মাথা নত করিনি, তাই সে আমাকে সমানভাবে গ্রহণ করেছে। তুমি কি মনে করো, তুমি কখনো কারও সঙ্গে সমান অবস্থানে দাঁড়াতে পারবে না?
সারা: (গভীরভাবে হাসে) তোমার ডার্সির জন্য তুমি ভাগ্যবান। কিন্তু আমি কখনো এমন কাউকে পাইনি যে আমাকে ভালোবাসার পাশাপাশি আমার অস্থিরতাকেও গ্রহণ করতে পারে।
এলিজাবেথ: (সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে) তুমি কি মনে করো, পুরুষরা ভয় পায় এমন নারীদের, যারা নিজেদের স্বাধীনতা নিজেরাই নির্ধারণ করে?
সারা: (একটু হেসে) ভয়? না, তারা বিরক্ত হয়। তারা বুঝতে পারে না। তারা মনে করে, আমাদের সমস্যাটা ঠিক কী? আমরা কেন ‘স্বাভাবিক’ হতে পারি না?
এলিজাবেথ: (একটু ভেবে) তাহলে কি মুক্তি মানে একাকীত্ব?
সারা: হতে পারে। অথবা একাকীত্বই হয়তো প্রকৃত স্বাধীনতার মূল্য।
এলিজাবেথ: সমাজ আমাকে শিখিয়েছে, একজন নারীকে আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে হলে ধৈর্য ধরতে হয়। তুমি কি মনে করো, তুমি তাড়াহুড়ো করেছ?
সারা: (হালকা হাসি) না, বরং আমি দেরি করেছি। অনেক দেরি। সমাজের নিয়ম মানার ভান করে, নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে অনেক সময় নষ্ট করেছি। তুমি কি মনে করো, একজন নারী কেবল ধৈর্যের মাধ্যমে সব পেয়ে যেতে পারে?
এলিজাবেথ: (শান্তভাবে) ধৈর্য মানে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা নয়। আমি কখনো সমাজের সঙ্গে আপস করিনি। শুধু তাদের সময় দিয়েছি, যাতে তারা আমাকে মেনে নিতে শেখে।
সারা: (একটু চুপ থেকে) তুমি কি মনে করো, আমি যদি তোমার মতো করতাম, তবে আমার জীবনটা অন্যরকম হতো?
এলিজাবেথ: (একটু মুচকি হেসে) হয়তো। কিন্তু তুমি কি তাতে খুশি থাকতে?
সারা: (চোখ মুদে এক মুহূর্ত ভাবল, তারপর মৃদু হাসল) না।
এলিজাবেথ: তুমি কি মনে করো, নারীরা একদিন সত্যিই মুক্ত হবে?
সারা: (অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে) মুক্তির সংজ্ঞাটা কি? যদি আমরা স্বাধীনতার জন্য সবকিছু ছাড়তে বাধ্য হই, তবে সেটাও কি একপ্রকার শৃঙ্খল নয়?
এলিজাবেথ: তাহলে কি মুক্তি বলে কিছু নেই?
সারা: (একটু হাসে) আছে, কিন্তু সেটা কেবল কাগজের পাতায়। বাস্তব জীবনে আমরা শুধু আপস করতে শিখি; কেউ সমাজের সঙ্গে, কেউ নিজের একাকীত্বের সঙ্গে।
এলিজাবেথ: (হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে) সত্যি বলতে, আমি নিশ্চিত নই, আমরা দুজনের মধ্যে কে বেশি স্বাধীন।
সারা: (একটু চুপ থেকে) আমিও না, এলিজাবেথ। আমিও না।
ক্যাফের বাইরে হালকা বৃষ্টি নামছে। সারা শেষ সিগারেটটায় টান দিয়ে আয়নার মতো জানালার দিকে তাকায়। এলিজাবেথ তার চায়ের কাপ নামিয়ে রাখে। দুজনের চোখে একই প্রশ্ন; স্বাধীনতার পথ কি একটাই, নাকি পথ যত বেশি, শৃঙ্খল তত গভীর?
দিলারা হাশেমের আমলকীর মৌ উপন্যাসটি পড়ার সময় আমার এলিজাবেথের কথাই মনে পড়ছিল বারবার। সারা চেয়েছিল সমাজকে অস্বীকার করতে। যে সমাজ বলে, “নারী মানে দায়িত্ব, নারী মানে সংসার, নারী মানে শৃঙ্খল।” সে এই চিরাচরিত সংজ্ঞাগুলো ছুড়ে ফেলেছিল। স্বামী, সন্তান, সংসার; সব ছেড়ে নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিল। রাত-বিরেতে রিকশায় ঘুরেছে, ইচ্ছে হলে পান করেছে, বন্ধুদের বাড়িতে থেকেছে, কিন্তু নিজের জীবন নিয়ে কারও কাছে জবাবদিহি করেনি।
কিন্তু সমাজ কি তাকে ছেড়েছে?
“মেয়েটার লজ্জা নেই!”; শুনতে হয় তাকে।
“তোমার মতো মেয়ের বাবা বলে পরিচয় দিতে লজ্জা করে!”; বাবার কণ্ঠস্বর তীব্র হয়ে ওঠে।
কিন্তু তবুও, সে নিজের পথে দাঁড়িয়ে থাকে।
এদিকে এলিজাবেথের সমাজও কি কম শাসন করেছিল?
“একটা ভালো বিয়ে করাই তোমার জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত!”; মা প্রতিদিন বলে গেছে।
“নারীর কাজ সংসার সাজানো, বুদ্ধি দিয়ে সমাজ পাল্টানোর চেষ্টা করা নয়!”; সমাজের মানুষ চোখ পাকিয়ে তাকায়।
কিন্তু এলিজাবেথ? সে কি মাথা নিচু করেছে?
না।
সে ভালোবাসাকে গ্রহণ করেছে, তবে আত্মসম্মানের শর্তে। সমাজের কাঠামোর মধ্যে থেকেই সে নিজের স্বাধীনতা কুড়িয়ে নিয়েছে, এমন একজন জীবনসঙ্গীকে বেছে নিয়েছে যে তাকে সম্মান করবে, নিয়ন্ত্রণ নয়।
সারা জানে, পুরুষরা তাকে চায়।
কিন্তু সে কি পুরুষদের প্রয়োজনীয় মনে করে?
হাসিব তাকে ভালোবাসে। অথচ সারার পাশে থেকেও কখনো তার স্বাধীনতাকে অস্বীকার করেনি। ফিরোজ তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, কিন্তু সুযোগ পেয়েও কখনো তাকে স্পর্শ করতে যায়নি।
তাহলে?
যে সমাজ সারাকে বলে, “তুমি বেশি স্বাধীন,” সেই সমাজই আবার তখন অবাক হয়ে যায়, যখন সে কারও প্রেমে নিজেকে ভাসিয়ে দেয় না।
এলিজাবেথও কি তাই করেনি?
সে জানত, মিস্টার কলিন্সের মতো কাউকে বিয়ে করলে জীবনটা নিরাপদ হয়ে যাবে। কিন্তু সে কি রাজি হয়েছিল?
“তোমার মতো মেয়েদের কপালে শেষ পর্যন্ত একাকীত্বই আছে!”; সমাজ সতর্ক করেছিল।
কিন্তু সে তবু মি. ডার্সির সম্মান অর্জন না করা পর্যন্ত তাকে গ্রহণ করেনি। প্রেমকে সে ভালোবেসেছে, কিন্তু আত্মমর্যাদার শর্তে।
সারার গল্পটা সমাজকে চ্যালেঞ্জ করার গল্প।
এলিজাবেথের গল্পটা সমাজের মধ্যে নিজের স্থান খুঁজে পাওয়ার গল্প।
সারা একাই থেকেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। জীবন যখন একটার পর একটা মৃত্যু নিয়ে এসেছে; মায়ের মৃত্যু, বোনের আত্মহত্যা, প্রেমিকের মৃত্যু; তখন কি সে সত্যিই ভাবেনি, সমাজের নিয়মগুলো এত সহজে ভাঙা যায় না?
কিন্তু এলিজাবেথ?
সে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে, ধৈর্যের সঙ্গে লড়াই করেছে। সমাজকে পাল্টানোর চেষ্টা করেনি, বরং সমাজের মধ্যেই নিজের অবস্থানটা গড়ে নিয়েছে।
তাহলে কে জয়ী?
সারা? যে সমাজের বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষপর্যন্ত বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল?
নাকি এলিজাবেথ? যে সমাজের ভেতর থেকেই নিজের জন্য স্থান করে নিয়েছিল?
সারা হয়তো রাতের নির্জনতায় নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে ভাবে, “আমি ঠিক করেছিলাম তো?”
এলিজাবেথ হয়তো তার নতুন জীবনের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমি হারিনি। আমি নিজের মতো করেই জিতেছি।”
এখন আমি আমলকীর মৌ নিয়ে কিছু বলি। প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে, এক অস্থির সময়ে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার সাত বছর হয়ে গেল। কিন্তু সত্যিকার অর্থে কি সবাই মুক্তি পেল? নারীরা কি স্বাধীন হলো? সমাজের মন-মানসিকতা কি বদলেছে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই যেন এগিয়ে আসে আমলকীর মৌ। উপন্যাসের চরিত্রগুলো এক অদৃশ্য বেড়াজালে আটকে আছে; পুরুষতান্ত্রিক সমাজের তৈরি নীতি, মূল্যবোধ আর জীবনযাত্রার কাঠামোর মধ্যে। এখানে নারীরা যেমন বন্দি, পুরুষরাও তেমনি এক অনিবার্য শৃঙ্খলের মধ্যে আটকে গেছে।
যেকথা না বলে পারছি না। এটি নিছক এক সামাজিক উপন্যাস নয়। নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকও বটে। আমলকীর মৌ মূলত পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কঠিন কাঠামোর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীর গল্প। বাংলা সাহিত্যে নারী-কেন্দ্রিক উপন্যাস অনেক লেখা হয়েছে, কিন্তু সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই উপন্যাসের সাহসিকতা আলাদা করে চোখে পড়ে। সারা এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র। আত্মবিশ্বাসী, বুদ্ধিমতী, উচ্চশিক্ষিত, সাবলীল ইংরেজি বলা এক অসাধারণ নারী। সমস্যা একটাই; সে রূপসীও বটে। আর এখানেই তৈরি হয় তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ! যেন রূপের সঙ্গে মেধার সংযোগ মানেই এক অমার্জনীয় অপরাধ। সমাজ তাকে ভয় পায়, কারণ সে তৈরি সমাজের শৃঙ্খল ভেঙে দিতে চায়। পুরোটা পারেনি হয়তো, তবে অন্তত কিছু মানুষকে বুঝিয়ে দিতে পেরেছে; নারীর জীবন এমনও হতে পারে, এবং এমনটাই হওয়া উচিত।
সারা অস্তিত্ব সচেতন এক নারী। সমাজের প্রচলিত নিয়মগুলোর দিকে সে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়; সরাসরি, দ্বিধাহীনভাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকোলজিতে মাস্টার্স, বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফেরা, এতসব অর্জন নিয়েও সে যেন এক ব্যতিক্রম। রূপের মোহে নিজেকে গুলিয়ে ফেলার সুযোগ ছিল, চাইলে এক অন্যরকম জীবন পেতে পারত; আরামদায়ক, প্রভাবশালী, সমাজের চোখে ‘সফল’; কিন্তু সারা তাতে রাজি হয়নি। রূপচর্চা, স্টাইল, বাহ্যিক চাকচিক্যে তার কোনো আগ্রহ নেই। কারণ, সে বুঝে গেছে; এ সবই এক চতুর কারসাজি, যা নারীদের আরও ‘নারী’ করে তোলে, আর পুরুষতন্ত্রের কাছে তাদের আরও সহজলভ্য করে দেয়।
এটা তার সচেতন সিদ্ধান্ত। তবে প্রয়োজনে সে উল্টোটাও করতে পারে; ব্যবহার করতে পারে নিজের সৌন্দর্য, নিজের বুদ্ধিমত্তা, এক্সপ্লয়টেডও হতে পারে, যদি তাতে তার উদ্দেশ্য সফল হয়। এই ভাবনা থেকেই সারা বন্ধুদের উপকার করে বেড়ায়, কখনো কখনো বন্ধুদের কাছে নিজেও ব্যবহৃত হয়; যেটা সে ভালো করেই বোঝে। কিন্তু এতে তার আপত্তি নেই। কারণ, তার দৃষ্টিতে উপকারই মুখ্য।
সারা গোড়া থেকেই সংসারের ছোটখাটো অনিয়মগুলোর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছে। প্রশ্নগুলো আমাদের অজানা নয়, কিন্তু সারা সেগুলো নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
ভার্জিনিয়া উলফ বলেছিলেন, নারী স্বাধীনতার জন্য তার নিজস্ব একটা কামরা দরকার। কিন্তু একবিংশ শতকে এসে শুধু একটা কামরায় আর হচ্ছে না; দরকার হচ্ছে একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্টও। অর্থনীতিই যে ক্ষমতা দেয়, সেই সত্যটাই যেন আবার নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সারার গল্প। মার্ক্স বলেছিলেন, “একটা শ্রেণি কখনোই অর্থনৈতিক ভিত্তি ছাড়া দাঁড়াতে পারে না”; এই সত্য নারীদের ক্ষেত্রেও অমোঘ হয়ে ওঠে।
শুধু অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত থাকলেই কি সমাজের সব আচার-সংস্কার ভেঙে ফেলা যায়? যায় না। সারা সেটাই টের পায় প্রতিদিন। তার স্বাধীন জীবন তাকে সমাজ ও পরিবারের কাছে এক ‘অপ্রয়োজনীয়’ মানুষ করে তুলেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়; এই সমাজই রাতের অন্ধকারে তাকে সবচেয়ে ‘প্রয়োজনীয়’ বানিয়ে ফেলে! যেসব পুরুষ ঘরের নারীকে আটকে রাখতে চায়, তারাই আবার অন্যের ঘরের নারীকে টেনে বের করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সমাজের এই দ্বিচারিতা সারার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তবে শেষপর্যন্ত সারা কি সত্যিই মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছে? সে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ, সারার যুদ্ধটা এককভাবে তার নিজের সঙ্গে নয়, বরং একটা গোটা সমাজের বিরুদ্ধে; একটা কাঠামোর বিরুদ্ধে, যেখানে নারীকে আগে মানুষ নয়, নারী হিসেবেই পরিচিত হতে হয়। পুরুষের ক্ষেত্রে পরিচয় একটা শব্দেই শেষ; সে একজন পুরুষ, সেটাই যথেষ্ট। কিন্তু নারীকে যেন প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয়, মানুষ হিসেবেও তার অস্তিত্ব আছে। সারা এই প্রশ্নটাই তুলতে চেয়েছিল। সে চেয়েছিল সমাজের এই জটিল হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিতে।
কিন্তু উপন্যাসের এক পর্যায়ে এসে দেখা যায়, সারা নিজেই যেন এক দোলাচলে পড়ে গেছে। যখন সে বলে, “I will marry again. I must get out of it.” তখন মনে হয়, আসলে কোন বৃত্তের বাইরে বেরোতে চাইছে সে? মুক্তির জন্য কি বিয়ে আবারও এক সমাধান হতে পারে? কোনো পুরুষ কি কখনো মুক্তির জন্য বিয়ের কথা ভাবে? তাহলে সারার মুক্তির সংজ্ঞাটা কি সত্যিই স্পষ্ট?
নারীকে শুধু নারী হিসেবে নয়, এক ধরনের শ্রেণি হিসেবেও কল্পনা করেছেন দিলারা হাশেম। সেই শ্রেণির অবস্থান প্রলেতারিয়েতদের থেকে খুব একটা আলাদা নয়। নারীরা পিছিয়ে পড়েছে, কারণ পুঁজির বিকাশ যতটা ঘটেছে, নারীর বিকাশ ততটা ঘটতে পারেনি; অথবা ঘটতে দেওয়া হয়নি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বহু উপায়ে সেই পথ আটকে রেখেছে।
সাধারণ নারীবাদী উপন্যাসগুলোতে পুরুষদের বহুগামীতা নিয়ে বিস্তর আলোচনা থাকে। নারীদের শরীরের রগরগে বর্ণনা দেওয়া হয়, যেন পুরুষদের যত বেশি নীচ দেখানো যাবে, উপন্যাস তত বেশি নারীবাদী হয়ে উঠবে। কিন্তু দিলারা হাশেম এই সস্তা পথে হাঁটেননি। তাঁর উপন্যাসের বেশিরভাগ পুরুষ চরিত্রই নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
যে সারা এতদিন নিজের ইচ্ছের বাইরে কোনো নিয়ম মানতে চায়নি, সে-ই শেষের দিকে এসে কপাল কিংবা অদৃষ্টের লেখা নিয়তির মতো মেনে নিতে শুরু করে। সমাজের রীতিকে অস্বীকার করতে করতে যে লড়াই শুরু করেছিল, সেই সারা শেষপর্যন্ত কি তবে হার মানল? নাকি সে আসলে বুঝতে পারল, কিছু কিছু সত্য এমনই, যা পাল্টানো যায় না; শুধু মেনে নেওয়া যায়?
আমলকীর মৌ উপন্যাসটি অধিকার আদায়ের সংগ্রাম নয়, এটি এক গভীর আত্ম-অনুসন্ধানেরও গল্প। সমাজ নারীর জন্য যে কাঠামো তৈরি করেছে, সেই কাঠামোর ভেতরে থেকেই কি স্বাধীন হওয়া সম্ভব, নাকি মুক্তির জন্য সমাজকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে হবে? এই প্রশ্নই যেন এক ভিন্ন মাত্রায় এসে দাঁড়ায় সারা ও এলিজাবেথের চরিত্রের ভেতর দিয়ে।
সারা, যে কোনো শেকল মানতে চায়নি, কোনো বাধাকে স্বীকার করেনি। সে সংসার, সন্তান, সামাজিক প্রতিষ্ঠা; সব ছেড়ে নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার মূল্য দিতে হয়েছে একাকীত্বের রূপে। সমাজ তার বিদ্রোহকে মেনে নেয়নি, বরং তাকে “অস্বাভাবিক” তকমা দিয়েছে। পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে সে নিজের শরীর ও মনকে সম্পূর্ণ নিজের বলে ঘোষণা করেছে, কিন্তু শেষপর্যন্ত ক্লান্ত হয়েছে সমাজের নিন্দা, অবজ্ঞা আর চাপা প্রতিহিংসার কাছে।
অন্যদিকে, এলিজাবেথ বিদ্রোহ করেছে সমাজের ভেতর থেকেই। সে মাথা নত করেনি, কিন্তু সমাজকেও সম্পূর্ণ অস্বীকার করেনি। নিজের বুদ্ধিমত্তা ও আত্মসম্মান ধরে রেখে প্রেমকে গ্রহণ করেছে, কিন্তু কোনো পুরুষের ছায়ায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেনি। নারীর স্বাধীনতা যে শুধু নিয়ম ভাঙার মধ্যে নয়, নিজের অবস্থান সুসংহত করার মধ্যেও থাকতে পারে; এলিজাবেথ সেটিই প্রমাণ করেছে।
কিন্তু তাহলে কোন পথটি প্রকৃত মুক্তির? সারা কি এলিজাবেথের মতো হলে ভালো করত, নাকি এলিজাবেথই সারার মতো সাহসী হতে পারত? নারী কি আসলেই নিজের জন্য বাঁচতে পারে, নাকি সমাজ তাকে কোনো না কোনোভাবে শৃঙ্খলিত করে রাখে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো কখনোই সহজ নয়। কিন্তু এই দুই চরিত্রের ভেতর দিয়ে আমরা শিখি; মুক্তির সংজ্ঞা একরকম নয়, বরং তা প্রতিটি নারীর ব্যক্তিগত সংগ্রামের মধ্যেই ধরা দেয়।





