I wish good essays could pay rent on their own. Until they learn how, paid subscriptions keep this publication alive.
বাঙালি জাতটা রসের ব্যাপারে বরাবরই একটু বেশি উৎসাহী। সকালে চায়ের রস, দুপুরে মাছের ঝোলের রস, বিকেলে রসগোল্লার রস, সন্ধ্যায় পরনিন্দার রস, আর রাত্রিবেলা সুযোগ পেলে আদিরস। এত রসের মধ্যে দিন কাটিয়েও অধিকাংশ বাঙালির রসবোধের অবস্থা এমন যে, কেউ একটু রসিকতা করলেই প্রথমে জানতে চায়, ‘আপনি কথাটা ঠিক কাকে উদ্দেশ্য করে বললেন?’ তারপর শুরু হয় বিচারসভা।
আমার ছোটবেলার একটা ঘটনা মনে পড়ছে। ঢাকার সদরঘাটে এক রিকশাচালকের সঙ্গে আমার বেশ ভাব ছিল। তাদের মুখে এমন সব কথা শুনেছি, যা আজকালকার অনেক শিক্ষিত মানুষের পক্ষেও বলা সম্ভব হবে না। লেখাপড়া বিশেষ জানত না, কিন্তু প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ছিল সাংঘাতিক।
একবার এক ভদ্রলোক সদরঘাটে নেমে রিকশাচালকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই নদীর নাম কী?’
রিকশাচালক বলল, ‘বুড়িগঙ্গা।’
ভদ্রলোক আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘বুড়িগঙ্গা কেন?’
রিকশাচালক নির্বিকার মুখে বলল, ‘গোমুখ থিইক্যা আইতে আইতে বুড়াইয়া গ্যাসে, হের লিগা বুড়িগঙ্গা।’
এখন এই কথার মধ্যে ভূগোল খুঁজতে গেলে সর্বনাশ। আপনি যদি সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করেন, গঙ্গা আর বুড়িগঙ্গার ভৌগোলিক সম্পর্ক কী, তাহলে বুঝব আপনার ভূগোলের জ্ঞান যথেষ্ট আছে। কিন্তু ওই রিকশাচালকের কথার মধ্যে যে আনন্দটুকু ছিল, সেটি আপনার নাগালের বাইরে রয়ে গেল।
ওই রিকশাচালক নদীর ইতিহাস জানত কি না জানি না। কিন্তু মানুষের মন বুঝত। একটা সাধারণ প্রশ্নের মধ্যে সে এমন একটা অপ্রত্যাশিত উত্তর বসিয়ে দিল যে, প্রশ্নকর্তার সমস্ত গাম্ভীর্য মুহূর্তের মধ্যে উবে গেল।
এই যে সাধারণ ঘটনার মধ্যে অসাধারণ একটা অর্থ আবিষ্কার করার ক্ষমতা, এখানেই রসবোধের গোড়ার কথা।
আমার মনে হয়, মানুষের রসবোধের সঙ্গে তার বুদ্ধির একটা সম্পর্ক আছে, কিন্তু তার চেয়েও গভীর সম্পর্ক আছে তার জীবনদৃষ্টির। একজন মানুষ পৃথিবীটাকে কীভাবে দেখছে, নিজের অবস্থানকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, অন্যের দুর্বলতাকে কীভাবে গ্রহণ করছে, এসবের ওপর তার রসবোধ অনেকখানি নির্ভর করে।
দেখবেন, কিছু লোক আছে যাদের সামনে পৃথিবীর সমস্ত কৌতুকাভিনেতাকে একসঙ্গে হাজির করলেও হাসানো যাবে না। লোকটি এমন মুখ করে বসে থাকবে, যেন হাসতে গিয়ে তার পৈতৃক সম্পত্তির খানিকটা হাতছাড়া হয়ে যাবে।
আবার এমন মানুষও দেখেছি, সামান্য একটা কথায় হেসে গড়িয়ে পড়ে। তার হাসি দেখে পাশের লোকটাও হাসতে আরম্ভ করে। শেষে কী নিয়ে হাসাহাসি হচ্ছে, সেটাই কেউ আর মনে করতে পারে না।
এদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হয়তো দ্বিতীয়জনের চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষিত। কিন্তু জীবনের আনন্দ গ্রহণ করার ব্যাপারে দ্বিতীয়জনের একটা স্বাভাবিক দক্ষতা আছে।
আমাদের দেশে শিক্ষার সঙ্গে গাম্ভীর্যের একটা অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যত বেশি শিক্ষিত, তত বেশি গম্ভীর হতে হবে। হাসলে বুঝি বিদ্যেবুদ্ধির খানিকটা ক্ষয় হয়!
একজন ভদ্রলোক হয়তো রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপিয়ার, বার্নার্ড শ, ব্রেখট, স্ট্যানিস্লাভস্কি সকলকে পড়ে ফেলেছেন। কিন্তু নিজের স্ত্রী তাঁকে একটু ঠাট্টা করে কিছু বললেই তিন দিন কথা বন্ধ। এদিকে তিনি আবার সভাসমিতিতে মানবতাবাদ নিয়ে বক্তৃতা করেন।
আমি বলি, মশাই, মানবতাবাদটা আগে নিজের বাড়িতে চালু করুন। তারপর ব্রেখটের আলোচনা হবে।
অবশ্য আমাদের বাঙালি সমাজে স্ত্রীলোকের সঙ্গে রসিকতা করার ব্যাপারে পুরুষদের খুব সাবধান থাকা উচিত। স্বামীর রসিকতা স্ত্রী পছন্দ করলেন কি না, সেটা বোঝার জন্য যে পরিমাণ বুদ্ধির প্রয়োজন, সেই বুদ্ধি থাকলে লোকটির আর রসিকতা করার প্রয়োজনই পড়ত না।
যাই হোক, যা বলছিলাম।
রসবোধের একটা বড় গুণ হচ্ছে, সে মানুষকে নিজের অহংকার থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়। আমরা প্রত্যেকেই নিজের সম্পর্কে একটা বিরাট ধারণা নিয়ে ঘুরে বেড়াই। কেউ নিজেকে মহাপণ্ডিত মনে করি, কেউ অসাধারণ শিল্পী, কেউ সমাজসংস্কারক। আবার কেউ কোনও গুণ না পেয়েও নিজেকে বিরাট গুরুত্বপূর্ণ লোক মনে করি।
একদিন যদি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কাণ্ডকারখানাগুলো একটু মন দিয়ে দেখি, তাহলে নিজের ওপরই হাসি পাবে।
কিন্তু সেটাই সবচেয়ে কঠিন।
অন্যের বোকামি দেখে হাসা খুব সহজ। নিজের বোকামিটাকে চিনতে পারা এবং সেটা নিয়ে হাসতে পারা বেশ কঠিন ব্যাপার।
আমি জীবনে বহু লোকের সঙ্গে মিশেছি। বড় বড় কর্পোরেট সিইও, পরিচালক, পণ্ডিত, বিজ্ঞানী, রাজনৈতিক নেতা। এঁদের মধ্যে যাঁদের সত্যিকার অর্থে জ্ঞানী বলে মনে হয়েছে, তাঁদের অধিকাংশের মধ্যেই একটা সুন্দর রসবোধ লক্ষ করেছি।
অথচ আমাদের সমাজে এমন অনেক লোক আছেন, যাঁরা দুটো বিদেশি বই পড়ে এতটাই গম্ভীর হয়ে গেছেন যে তাঁদের সামনে রসগোল্লা রাখলেও প্রথমে তার দার্শনিক তাৎপর্য আলোচনা করবেন। তারপর হয়তো বলবেন, ‘রসগোল্লার মধ্যে একটা এক্সিস্টেনশিয়াল ক্রাইসিস আছে।’
আমি বলি, আগে খেয়ে দেখুন মশাই। ক্রাইসিসটা তারপর আলোচনা করা যাবে।
তবে রসবোধের সঙ্গে আরেকটা জিনিসের সম্পর্ক আছে, সেটা হচ্ছে সংবেদনশীলতা।
এই জায়গাটায় আমাদের একটু গোলমাল হয়।
আমরা অনেক সময় মনে করি, যে লোক সবাইকে হাসাতে পারে তার রসবোধ খুব বেশি। অথচ হাসানোর জন্য মানুষ কী ধরনের কথা বলছে, কাকে নিয়ে বলছে, কখন বলছে, এই ব্যাপারগুলোও বিচার করা দরকার।
ধরুন, একজন মানুষ খুব বিপদে পড়েছেন। তাঁর সংসারে অশান্তি চলছে। চাকরি চলে গেছে। পকেটে পয়সা নেই। এমন অবস্থায় তাঁকে নিয়ে রসিকতা করার আগে দেখতে হবে তিনি সেই রসিকতা গ্রহণ করার মতো মানসিক অবস্থায় আছেন কি না।
মানুষের দুর্দশা থেকে হাসির উপাদান সংগ্রহ করা খুব সহজ। কিন্তু সেই দুর্দশার মধ্যে মানুষের আত্মসম্মানটুকু অক্ষত রেখে হাসির অবকাশ তৈরি করতে বেশ খানিকটা হৃদয় লাগে।
চ্যাপলিনের সিনেমাগুলো আমার এই কারণেই এত ভালো লাগে।
একটা লোকের পেটে খাবার নেই, পায়ে ঠিকমতো জুতো নেই, মাথার ওপর ছাদ নেই। অথচ সেই লোকটাই এমন সব কাণ্ড করছে যে দর্শক হেসে কুটিকুটি। আবার একটু পরেই সেই লোকটার জন্য মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
হাসতে হাসতে মানুষ হঠাৎ নিজের জীবনের কথাও ভাবছে।
এখানেই শিল্পীর ক্ষমতা।
আমার নিজের জীবনেও দেখেছি, হাসতে হাসতে লিখি বিধায় অনেকে সিরিয়াসলি নেন না। তারা হয়তো জানেন না যে মানুষ অন্যের কষ্ট বুঝতে পারে, সে হাসির সীমাটাও বুঝতে পারে। সে জানে কখন একটু ঠাট্টা করলে মানুষের মন হালকা হবে, আর কখন চুপ করে পাশে বসে থাকাটাই উপযুক্ত।
আমার মনে হয়, কোনও কোনও সময়ে নীরবতার মধ্যেও সাংঘাতিক রসবোধ থাকতে পারে।
ধরুন, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া চলছে। স্ত্রী প্রচণ্ড রেগে স্বামীকে বললেন, ‘তোমার মতো নির্বোধ লোক আমি জীবনে দেখিনি।’
স্বামী যদি সঙ্গে সঙ্গে বলেন, ‘তোমার দেখার অভিজ্ঞতা তাহলে খুবই সীমিত’, তাহলে হাসির একটা সম্ভাবনা আছে বটে। কিন্তু তার পরবর্তী পরিণতি সম্বন্ধে আমি কোনও দায়িত্ব নিতে রাজি নই।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, রসিকতা করার ক্ষমতার পাশাপাশি বেঁচে থাকার ইচ্ছাটাও থাকা দরকার।
এবার অমৃতের কথায় ফিরে আসি।
মানুষ অমৃত খুঁজেছে বহুদিন ধরে। পুরাণে দেবতা-অসুর মিলে সমুদ্র মন্থন করেছে। রাজারা অমর হওয়ার ওষুধ খুঁজেছেন। কত সাধু, কত বৈদ্য, কত পণ্ডিত মানুষের আয়ু বাড়াবার চেষ্টা করেছেন। ওপেন ে আইয়ের সিইও শ্যাম ওল্টম্যান অমরত্বের গবেষণায় বিনিয়োগ করেছেন।
কিন্তু মানুষ চিরকাল বেঁচে থাকলে কী করত, সেটা নিয়ে বিশেষ আলোচনা দেখি না।
ধরুন, একজন লোক পাঁচশো বছর বেঁচে রইলেন। অথচ সারাজীবন মুখ গোমড়া করে কাটালেন, প্রতিবেশীর উন্নতিতে হিংসে করলেন, ছেলের সঙ্গে ঝগড়া করলেন, বউয়ের রান্নায় নুন কম হয়েছে বলে অশান্তি করলেন।
তাহলে পাঁচশো বছর বেঁচে থেকে ভদ্রলোকের লাভটা কী হল?
তাঁর নিজের যন্ত্রণা তো আছেই, সঙ্গে আশপাশের লোকেদেরও পাঁচশো বছরের দুর্ভোগ।
অমৃতের সন্ধান করতে গিয়ে মানুষ এই সহজ কথাটা ভুলে যায় যে, জীবনকে উপভোগ করার ক্ষমতা না থাকলে দীর্ঘ জীবন একটা বিরাট বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
একটা শিশু যখন প্রথম বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দ পায়, সে বৃষ্টির রাসায়নিক গঠন জানে না। একজন বৃদ্ধ যখন নাতির ভুল উচ্চারণ শুনে হেসে ওঠেন, তখন তাঁর সেই আনন্দের জন্য কোনও দার্শনিক ব্যাখ্যার দরকার পড়ে না।
আনন্দের সঙ্গে মানুষের এই সহজ যোগাযোগটাই আমার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
অথচ আমরা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ক্ষমতা হারাতে থাকি।
ছোটবেলায় একটা ভাঙা খেলনা নিয়েও কত আনন্দ করেছি। বড় হয়ে বিরাট বাড়ি, গাড়ি, টাকা-পয়সা হওয়ার পরেও সেই আনন্দ অনেক সময় পাওয়া যায় না।
কারণ তখন আমাদের আনন্দের সঙ্গে হিসাব ঢুকে পড়ে।
কে কত বড় বাড়ি করল, কার ছেলে কোন দেশে গেল, কে কত টাকা রোজগার করল, কার নাম কাগজে বেরোল, কে পুরস্কার পেল, এসব হিসাব করতে করতে জীবনের আসল আনন্দগুলো চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যায়।
এর কারণ বোধহয় এই যে, স্মৃতির মধ্যে আমরা শুধু ঘটনাগুলো জমিয়ে রাখি না। ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের মুখ, কণ্ঠস্বর, ভালোবাসা, অভিমান, সবকিছুই থেকে যায়।
রসবোধ সেই স্মৃতিগুলোকে নতুন করে জীবন্ত করে তোলে।
আমাদের সমাজে আরেকটা ব্যাপার খুব লক্ষ করি। ক্ষমতাবান মানুষদের মধ্যে রসবোধের অভাব অনেক সময় ভয়ংকর চেহারা নেয়।
একজন সাধারণ মানুষকে নিয়ে ঠাট্টা করলে তিনি হয়তো হেসে উড়িয়ে দেবেন। কিন্তু কোনও নেতা, মন্ত্রী কিংবা বড় অফিসারকে নিয়ে একটু রসিকতা করলেই তাঁর অনুগামীরা এমনভাবে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন, যেন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
এতে আমার বরাবরই আশ্চর্য লাগে।
যাঁর হাতে এত ক্ষমতা, এত লোকবল, এত সম্মান, একটা সামান্য রসিকতা সহ্য করার মতো মানসিক শক্তিটুকু তাঁর থাকবে না কেন?
আমার ধারণা, যে মানুষ নিজের গুরুত্ব সম্বন্ধে অতিরিক্ত সচেতন, রসিকতার কাছে তার একটা স্বাভাবিক ভয় থাকে। কারণ রসিকতা মুহূর্তের মধ্যে সেই গুরুত্বের বেলুনে একটা ছোট্ট ফুটো করে দিতে পারে।
আর সেই ফুটো দিয়েই বেরিয়ে আসে অহংকারের সমস্ত বাতাস।
এজন্যই ক্ষমতার সঙ্গে রসবোধের সম্পর্ক খুব জরুরি।
যে রাজা নিজের ভুল নিয়ে হাসতে পারেন, তাঁর সভাসদদের সত্যি কথা বলার সাহস কিছুটা বাড়ে। যে শিক্ষক নিজের অজ্ঞতার কথা স্বীকার করতে পারেন, তাঁর ছাত্ররা প্রশ্ন করতে শেখে। যে বাবা নিজের বোকামি নিয়ে ছেলের সঙ্গে হাসতে পারেন, সেই সংসারে ভয় অনেকটা কমে যায়।
মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব কমানোর একটা আশ্চর্য ক্ষমতা আছে হাসির।
তবে এই হাসির সঙ্গে বিদ্রুপের একটা সীমারেখাও আছে।
বিদ্রুপ অনেক সময় প্রয়োজনীয়। সমাজের ভণ্ডামি, অন্যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার, কুসংস্কার, এসব নিয়ে ব্যঙ্গ করা একজন শিল্পীর দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
কিন্তু ব্যঙ্গ করতে গিয়ে মানুষের মর্যাদা হারিয়ে ফেললে সেই শিল্পের মধ্যেও একটা নিষ্ঠুরতা ঢুকে পড়ে।
বুদ্ধিদীপ্ত ব্যঙ্গ মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়। তার মধ্যে একটা নৈতিক অবস্থান থাকে।
অথচ আজকাল এমন সব রসিকতা শুনি, যেখানে কেবল কাউকে অপমান করাটাই প্রধান উদ্দেশ্য। লোক হাসছে বলে বক্তা আরও উৎসাহিত হচ্ছেন। ভাবছেন, আরও একটু অপমান করলে নিশ্চয় আরও বেশি হাসবে।
এই জায়গায় একটা বড় ভুল হয়।
দর্শকের হাসি সবসময় শিল্পীর সাফল্যের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হতে পারে না। কখনও কখনও মানুষ নিষ্ঠুরতা দেখেও হাসে। আবার দল বেঁধে হাসতে দেখলে অনেকেই কারণ না বুঝে হাসতে থাকে।
তাই একজন কৌতুকাভিনেতার নিজের বিচারবুদ্ধি থাকা দরকার।
কোথায় থামতে হবে, সেটা জানা জরুরি।
রসিকতার মধ্যে সংযমের একটা ভূমিকা আছে। যেমন ভালো রান্নায় মশলার পরিমাণ। ঝাল বেশি হলেই রান্না ভালো হয় না। আবার একেবারে ঝাল না থাকলে আমাদের খেতে অসুবিধা হয়।
নিজের দুর্বলতা স্বীকার করার মধ্যে আনন্দ, এটাও রসবোধের একটা লক্ষণ।
আমরা সাধারণত নিজের সাফল্যের গল্প করতে ভালোবাসি। নিজের ব্যর্থতার গল্প বলার সময়ে একটু রাখঢাক করি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার মধ্যেই মজার গল্পের জন্ম হয়।
একজন মানুষ যখন নিজের ভুলকে সহজভাবে দেখতে শেখেন, তখন তাঁর জীবনের অনেক অস্বস্তিকর ঘটনাও সহনীয় হয়ে ওঠে।
সব দুঃখ অবশ্য হাসিতে মুছে যায় না। প্রিয়জনের মৃত্যু, গভীর অপমান, দীর্ঘ অভাব, এসব মানুষের মনে যে ক্ষত তৈরি করে, তার কোনও সহজ চিকিৎসা আমার জানা নেই।
কিন্তু রসবোধ মানুষকে সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের মানবিকতাটুকু ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
একজন মানুষ হয়তো জীবনে অনেকবার হেরেছেন। তবুও তিনি নিজের ব্যর্থতা নিয়ে একটু হাসতে পারছেন, অন্যের আনন্দে আনন্দিত হচ্ছেন, নিজের দুর্দশার মধ্যেও কারও পাশে দাঁড়াচ্ছেন।
আমার কাছে এই মানুষটির জীবনবোধ অনেক মূল্যবান।
কারণ রসবোধের সঙ্গে উদারতার একটা সম্পর্ক আছে।
সংকীর্ণ মানুষ সবকিছুকেই নিজের স্বার্থের মাপকাঠিতে বিচার করে। তার কাছে অন্যের সাফল্য প্রতিযোগিতা, অন্যের মতামত আক্রমণ, অন্যের রসিকতা অপমান।
উদার মানুষ অন্যের মধ্যে নিজের চেয়ে আলাদা কিছু দেখেও আনন্দ পেতে পারেন। তিনি বুঝতে পারেন, পৃথিবীটা তাঁর একার মর্জিমতো চলে না। এখানে নানা ধরনের মানুষ আছে, নানা ধরনের বুদ্ধি আছে, নানা ধরনের হাসি আছে।
এই বৈচিত্র্য গ্রহণ করার ক্ষমতা থাকলে জীবনের অনেক বিরক্তিকর ঘটনাও উপভোগ করা যায়।
একটা কথা আমার প্রায়ই মনে হয়। যে মানুষ সারাজীবন অমৃত খুঁজে বেড়ায়, সে হয়তো কোথাও একটা চূড়ান্ত সুখের সন্ধান করছে। এমন একটা সুখ, যা একবার পেলে আর কোনও দুঃখ থাকবে না, কোনও অভাব থাকবে না, কোনও অনিশ্চয়তা থাকবে না।
কিন্তু মানুষের জীবন তো এইসব নিয়েই তৈরি।
যেখানে সুখ আছে, সেখানেই তার হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। যেখানে ভালোবাসা আছে, সেখানে বিচ্ছেদের সম্ভাবনা আছে। যেখানে সাফল্য আছে, সেখানে ব্যর্থতার ভয় আছে।
রসবোধ আমাদের এই অনিশ্চয়তার সঙ্গে বসবাস করতে শেখায়।
আজ যে ব্যাপারে আমরা ভীষণ কষ্ট পাচ্ছি, কয়েক বছর পরে সেই ঘটনাটাই হয়তো অন্যভাবে দেখতে পারব। অনেক সময় যে মানুষটি আমাদের খুব অপমান করেছে, তার কথাও পরে মনে করে হাসি পায়।
সময় মানুষের অভিজ্ঞতার ওপর একটা অদ্ভুত কাজ করে। আর রসবোধ সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে নতুন অর্থ আবিষ্কার করতে সাহায্য করে।
আমার কাছে অমৃতের তাৎপর্য এখানেই।
ভালো একটা বই পড়ে আনন্দ পাওয়া, পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা, স্ত্রীর মুখে বহুদিন আগের কোনও ঘটনার গল্প শোনা, সন্তানের অপ্রত্যাশিত উত্তর, অচেনা মানুষের সামান্য সৌজন্য, কিংবা নিজের সমস্ত গুরুত্ব ভুলে কিছুক্ষণ প্রাণ খুলে হাসা।
এসবের মধ্যে যে আনন্দ আছে, সেটা দোকান থেকে কিনে আনা যায় না।
তবে আনন্দ পাওয়ার জন্য পৃথিবীকে একটু মন দিয়ে দেখতে হয়।
আমরা অনেক সময় এমনভাবে বেঁচে থাকি, যেন জীবনটা একটা বিরাট পরীক্ষার হল। সবাই প্রশ্নের উত্তর লিখে চলেছি। কে কত নম্বর পেল, কে প্রথম হল, কে ফেল করল, এই নিয়ে ব্যস্ত।
কিন্তু পরীক্ষাটা কবে শেষ হবে, আর পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরে আমরা কী করব, সেটা নিয়ে বিশেষ ভাবি না।
সারা জীবন অমৃতের সন্ধানে দৌড়তে দৌড়তে একদিন হয়তো দেখব, আমাদের পাশেই একটা ছোট ছেলে বৃষ্টির জলে কাগজের নৌকা ভাসিয়ে হেসে চলেছে।
তার হাতে অমৃতের কোনও পাত্র নেই।
অথচ তার আনন্দের কাছে আমাদের সমস্ত আয়োজন ম্লান হয়ে যায়।
এইজন্যই আমার মনে হয়, অমৃত খুঁজে পাওয়ার একটা বিরাট অসুবিধা আছে। আমরা সেটাকে এমন একটা দুর্লভ জিনিস বলে মনে করি যে, সে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে থাকলেও তাকে চিনতে পারি না।
জীবনকে একটু ভালোবাসতে পারা, মানুষের ভুলত্রুটি সহ্য করতে পারা, নিজের অহংকারকে মাঝে মাঝে নামিয়ে রাখতে পারা, আর সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও হাসির একটা কারণ আবিষ্কার করতে পারা, এই ক্ষমতাগুলো অর্জন করতে পারলেই অনেকখানি লাভ।
বাকি অমৃতের ব্যাপারে দেবতারা চিন্তা করুন।
আমাদের মতো সাধারণ মানুষের হাতে অত সময় নেই। সকালে বাজার করতে যেতে হবে, দুপুরে সংসারের ঝামেলা, বিকেলে কাজ, সন্ধ্যায় বন্ধুবান্ধবের আড্ডা।
তার মধ্যে যদি একটু হাসতে পারি, কাউকে হাসাতে পারি, কারও দুঃখের সময় পাশে দাঁড়াতে পারি, তাহলেই জীবনটা অনেকখানি সার্থক।
শেষে একটা কথা বলি।
একদিন যদি সত্যিই কেউ অমৃত আবিষ্কার করে, তাহলে দেখবেন সেটারও ব্যবসা শুরু হয়ে যাবে। বাজারে নানা রকম অমৃত বেরোবে। দেশি অমৃত, বিলিতি অমৃত, স্পেশাল অমৃত, প্রিমিয়াম অমৃত। বিজ্ঞাপনে লেখা থাকবে, ‘একবার খাইলেই অমর।’
আর বাঙালি প্রথমেই দোকানদারকে জিজ্ঞেস করবে, ‘দাদা, দুটো নিলে একটা ফ্রি দেবেন?’
দোকানদার যদি সত্যিকারের রসিক হন, তাহলে বলবেন, ‘মশাই, আগে একটা খেয়ে দেখুন। অমর হয়ে গেলে দ্বিতীয়টা খাবার তাড়া কোথায়?’
এই উত্তর শুনে যিনি হাসতে পারবেন, তাঁর অমৃতের প্রয়োজন বোধহয় অনেকটাই কমে গেছে।
রবীন্দ্রনাথ হয়তো একারণেই বলেছিলেন; “অমৃত জিনিষটা রসের মধ্যে নাই, রসবোধের মধ্যেই আছে। এইজন্য যাহারা সেটাকে খোঁজে তাহারা সেটাকে পায়ই না।”



