যে লেখক নিজের সৃষ্ট চরিত্রের কাছে হেরে গিয়েছিলেন
দিনগুলো কীভাবে যেন চলে যায়। যাওয়ার সময় তারা কোনো শব্দ করে না। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে যায়, আমরা টেরও পাই না। এই মাসে স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের মৃত্যুর ছিয়ানব্বই বছর পূর্ণ হলো। কথাটা আমার মনেই ছিল না।
কোনান ডয়েল ছিলেন অদ্ভুত মানুষ। তিনি শার্লক হোমসকে সৃষ্টি করেছিলেন, কিন্তু নিজের এই সৃষ্টিকে খুব একটা পছন্দ করতেন না। সম্ভবত তাঁর ধারণা ছিল, হোমসের গোয়েন্দা কাহিনিগুলো তাঁর প্রতিভার পুরো পরিচয় দেয় না। তিনি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন। সেগুলোকে তিনি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। গোয়েন্দা গল্পকে হয়তো ভাবতেন পাঠকের ক্ষণিক আনন্দের জিনিস। ট্রেনের কামরায় পড়া যায়, চায়ের সঙ্গে পড়া যায়, পড়ে শেষ করে রেখে দেওয়া যায়।
সমস্যা হলো, পাঠকেরা লেখকের এই মতামতের সঙ্গে একমত হলো না।
পাঠকের কাছে শার্লক হোমস কোনো কাগজে লেখা চরিত্র ছিল না। সে জীবন্ত মানুষ। লন্ডনের বেকার স্ট্রিটে থাকে। পাইপ টানে। বেহালা বাজায়। মানুষের জুতার কাদা, জামার ছাই কিংবা হাতের আঙুলের সামান্য দাগ দেখে তার সমস্ত ইতিহাস বলে দেয়। তার পাশে থাকেন ডাক্তার ওয়াটসন। তিনি বিস্মিত হন। পাঠকেরাও তাঁর সঙ্গে বিস্মিত হয়।
কোনান ডয়েল একসময় ঠিক করলেন, এই লোকটিকে আর সহ্য করা যাচ্ছে না। ১৮৯৩ সালে তিনি হোমসকে মেরে ফেললেন। সাধারণভাবে মারলেন না। অধ্যাপক মরিয়ার্টির সঙ্গে লড়াই করতে করতে সুইজারল্যান্ডের রাইখেনবাখ জলপ্রপাতের অতল গহ্বরে ফেলে দিলেন।
তিনি নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন, কাজ শেষ।
কাজ শেষ হলো না। বরং আসল বিপদ শুরু হলো।
হাজার হাজার পাঠক প্রতিবাদী চিঠি লিখতে লাগল। ডাকঘরগুলো চিঠির চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। তরুণেরা হাতে কালো ফিতা বাঁধল। দ্য স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিন, যে পত্রিকায় হোমসের কাহিনি প্রকাশিত হতো, এক দিনের মধ্যে বিশ হাজার গ্রাহক হারাল। শোনা যায়, স্বয়ং রানি ভিক্টোরিয়াও শার্লক হোমসের প্রত্যাবর্তন চেয়েছিলেন।
একজন লেখকের জন্য পরিস্থিতিটা নিশ্চয়ই বিব্রতকর।
তিনি একটি চরিত্র তৈরি করেছেন। এখন সেই চরিত্র তাঁর কথা শুনছে না। জলপ্রপাত থেকে পড়ে মারা গেছে, তারপরেও পাঠকেরা তাকে মৃত বলে মানতে রাজি নয়। লেখক বলছেন, লোকটি মারা গেছে। পাঠক বলছে, না, মারা যায়নি। তাকে ফিরিয়ে আনুন।
পাঠকের সঙ্গে তর্ক করে কোনো লেখক জিততে পারেন না।
তারপরেও কোনান ডয়েল সহজে আত্মসমর্পণ করলেন না। তিনি তাঁর অপছন্দের চরিত্রকে সরাসরি জীবিত না করে পাঠককে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। ১৯০১ সালে প্রকাশ করলেন দ্য হাউন্ড অব দ্য বাস্কারভিলস বা বাস্কারভিল পরিবারের শিকারি কুকুর। কাহিনির সময় স্থাপন করলেন হোমসের কথিত মৃত্যুর আগে। অর্থাৎ হোমস গল্পে আছে, কিন্তু রাইখেনবাখ জলপ্রপাত থেকে এখনো ফিরে আসেনি।
কোনান ডয়েল হয়তো ভেবেছিলেন, পাঠকেরা এতে খুশি হবে।
পাঠকেরা খুশি হলো না।
স্যার হেনরি বাস্কারভিলকে খুঁজে বের করার জন্য দুষ্ট স্ট্যাপলটন যেমন ভয়ংকর কুকুরটিকে তার জুতার গন্ধ শুঁকতে দিয়েছিল, এই নতুন উপন্যাসটিও পাঠকদের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিল। তারা হোমসকে গল্পের অতীতে দেখতে চায় না। তারা তাকে বর্তমান সময়ে জীবিত দেখতে চায়। বেকার স্ট্রিটের ঘরে বসে পাইপ ধরাতে দেখতে চায়।
শেষ পর্যন্ত ১৯০৩ সালে কোনান ডয়েলকে পরাজয় স্বীকার করতে হলো।
দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য এম্পটি হাউস বা শূন্য বাড়ির অভিযান গল্পে শার্লক হোমস ফিরে এল। জানা গেল, সে আসলে রাইখেনবাখ জলপ্রপাতে মারা যায়নি। মরিয়ার্টির সঙ্গে লড়াইয়ের পর বেঁচে গিয়েছিল এবং নিজের শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মৃত্যুর অভিনয় করেছিল।
ব্যাখ্যাটি পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য কি না, তাতে পাঠকের কিছু যায় আসে না। মৃত মানুষ ফিরে এসেছে, এই যথেষ্ট।
এই গল্প ছিল পরবর্তীকালে দ্য রিটার্ন অব শার্লক হোমস নামে প্রকাশিত বারোটি গল্পের প্রথমটি। এরপর এল দ্য ভ্যালি অব ফিয়ার, যা ১৯১৪ থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ১৯১৭ সালে প্রকাশিত হলো হিজ লাস্ট বো। ১৯২৭ সালে এল দ্য কেস-বুক অব শার্লক হোমস, যেখানে ১৯২১ থেকে ১৯২৭ সালের মধ্যে লেখা শেষ দিকের গল্পগুলো সংকলিত হয়।
শেষ পর্যন্ত হোমসই জিতল।
জেতারই কথা ছিল।
প্রথম আবির্ভাবের একশ ঊনচল্লিশ বছর পরেও শার্লক হোমস এবং ডাক্তার ওয়াটসন জীবিত। যে চরিত্রগুলোকে কয়েক ঘণ্টা পাঠককে আনন্দ দেওয়ার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছিল, তারা লেখকের জীবনকাল অতিক্রম করেছে। পৃথিবীর বহু বাস্তব মানুষের নাম হারিয়ে গেছে। হোমসের ঠিকানা এখনো সবাই জানে। ২২১বি বেকার স্ট্রিট।
স্যার আর্থার মনে করেছিলেন, শার্লক হোমসের গল্প তাঁর প্রতিভার প্রতি সুবিচার করছে না। এই জায়গায় তিনি ভুল করেছিলেন। আবার যাঁরা তাঁকে শুধু শার্লক হোমসের স্রষ্টা বলে মনে করেন, তাঁরাও ভুল করেন।
কোনান ডয়েলের সাহিত্যজগৎ অনেক বড়।
অধ্যাপক চ্যালেঞ্জারকে নিয়ে লেখা তাঁর উপন্যাসগুলো অসাধারণ। এই অধ্যাপক মেজাজি, একগুঁয়ে এবং নিজের জ্ঞান সম্পর্কে ভয়ংকর রকম নিশ্চিত। তিনি ঘরে ঢুকলে মনে হয়, আসবাবপত্রেরও সাবধান হয়ে বসা উচিত। চ্যালেঞ্জার সিরিজের প্রথম উপন্যাস দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড প্রকাশিত হয় ১৯১২ সালে। সেখানে একদল অভিযাত্রী এমন এক বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডে পৌঁছায়, যেখানে প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীরা এখনো বেঁচে আছে।
ডাইনোসরের সঙ্গে আধুনিক মানুষের এই সাক্ষাৎ পরবর্তী জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। মাইকেল ক্রাইটনের জুরাসিক পার্ক এবং স্টিভেন স্পিলবার্গের চলচ্চিত্রে সেই পুরোনো কল্পনার নতুন রূপ দেখা যায়। সদ্যপ্রয়াত স্যাম নীলকে স্মরণ করেও কথাটি বলা যায়। পর্দায় তাঁর বিস্মিত মুখে আমরা যেন অধ্যাপক চ্যালেঞ্জারের হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীরই আরেক দরজা খুলতে দেখেছি।
কোনান ডয়েলের প্রিয় ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলোও অবহেলা করার মতো নয়। রডনি স্টোন ইংল্যান্ডে আধুনিক বক্সিং গড়ে ওঠার আগের সময়ের এক জীবন্ত ছবি। সেখানে রিং আছে, ঘুষি আছে, বাজি আছে, সম্মান আছে এবং মানুষের সেই পুরোনো আকাঙ্ক্ষা আছে, অন্য একজন মানুষকে হারিয়ে নিজেকে প্রমাণ করা।
স্যার নাইজেল মধ্যযুগীয় বীরত্ব, যুদ্ধ এবং অভিযানের কাহিনি। দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অব ব্রিগেডিয়ার জেরার্ড-এ আছে নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর এক ফরাসি অফিসার, যিনি একই সঙ্গে সাহসী, আত্মবিশ্বাসী এবং নিজের সম্পর্কে সামান্য বেশি উচ্চ ধারণা পোষণ করেন। এই ধরনের মানুষ বাস্তব জীবনে বিরক্তিকর হতে পারে। গল্পে তাদের বেশ লাগে।
এর বাইরে কোনান ডয়েল লিখেছেন ভয়ের গল্প, চিকিৎসকদের জীবন নিয়ে গল্প, বক্সিংয়ের রিংয়ের গল্প, সৈনিকদের গল্প এবং অতিপ্রাকৃত ঘটনাকে কেন্দ্র করে নানা কাহিনি। তাঁর চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান, সামরিক ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ এবং মানুষের আচরণের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ এই গল্পগুলোতে ছড়িয়ে আছে।
এগুলোকে জনপ্রিয় বিনোদনমূলক সাহিত্য বলা যায়।
বললে ক্ষতি কী?
সব সাহিত্যকে গম্ভীর মুখে বসে মানুষের আত্মার মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। কিছু বই মানুষের চিন্তা বদলায়। কিছু বই দুঃসময়ে পাশে বসে। কিছু বই গভীর রাতে পাঠককে বলে, আরেকটি অধ্যায় পড়ে তারপর ঘুমান। পাঠক সেই কথা বিশ্বাস করে। ভোর হয়ে যায়।
কোনান ডয়েলের সময়ে বহু লেখক ছিলেন, যাঁদের সাহিত্যিক মর্যাদা তাঁর চেয়ে অনেক বেশি বলে ধরা হতো। তাঁদের বই নিয়ে বড় বড় আলোচনা হয়েছে। সমালোচকেরা কঠিন কঠিন বাক্য লিখেছেন। এখন সেই লেখকদের অনেকের নাম কেউ মনে রাখে না।
স্যার আর্থার কোনান ডয়েলকে মানুষ এখনো মনে রেখেছে।
তিনি যে চরিত্রটিকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন, সেই চরিত্রই তাঁকে অমর করে রেখেছে।
মানুষ তার সন্তানকে পৃথিবীতে আনে। তারপর সন্তান নিজের মতো করে বাঁচে। লেখকের চরিত্রের ক্ষেত্রেও সম্ভবত একই নিয়ম। একবার সত্যিকার অর্থে জন্ম হয়ে গেলে তাকে আর মেরে ফেলা যায় না।



