আঠা, আর্কাইভ ও গণহত্যা: নাৎসিদের গোপন ডেটাবেসের কারিগররা
নাৎসি শাসন সংরক্ষণবিদ্যাকে কীভাবে ব্যবহার করেছিল? উত্তর ছিল ভয়াবহ। কাগজ সংরক্ষণকারী আর বই বাঁধাইকারীরা চার্চ, সিনাগগ, সিভিল রেজিস্টারের পুরোনো নথি মেরামত করে লক্ষ লক্ষ মানুষের পারিবারিক বংশতালিকা উদ্
ইতিহাস আমরা সাধারণত বড় বড় নামের আড়ালে রেখে দিই। Adolf Hitler, Joseph Goebbels, এসএস, গেস্টাপো, ট্রেন, গ্যাসচেম্বার। আমরা ভাবতে ভালোবাসি, গণহত্যা সবসময় ইউনিফর্ম পরে আসে। কাঁধে রাইফেল, হাতে সিগনেচার, ঠোঁটে বিদ্বেষ। কিন্তু ইতিহাস মাঝে মাঝে লাইব্রেরির গন্ধ নিয়ে হাজির হয়। পুরোনো কাগজ, চামড়ার বাঁধাই, সেলাই করা মলাট, ধুলোমাখা চার্চ রেজিস্টার। আর সেখানেই লুকিয়ে থাকে অন্যরকম সহযোগিতা। অফিসঘরের, কর্মশালার, আঠা আর সুতোয় মোড়া সহযোগিতা।
১৯৩০ আর ৪০-এর দশকে জার্মানির বই-বাঁধাইকারী এবং নথি পুনর্গঠনকারীরা তাদের পেশাগত দক্ষতা দিয়ে যে কাজটি করছিলেন, সেটি নিছক সংরক্ষণ ছিল না। সেটি ছিল তথ্য উদ্ধার। তথ্য উদ্ধার মানে মানুষের শিরায় শিরায় ঢুকে পড়া। নাজিরা ক্ষমতায় আসার পর ১৯৩৩ সালে তাদের সামনে এক অদ্ভুত সমস্যা দেখা দিল। তারা “রক্তের বিশুদ্ধতা” যাচাই করবে কীভাবে? জন্ম, বাপ্তিস্ম, বিবাহ, মৃত্যু; এই সমস্ত তথ্য ছড়িয়ে আছে চার্চ, সিনাগগ আর সিভিল রেজিস্টারের পুরোনো বইয়ে। শত শত বছরের পুরোনো দলিল, যেগুলোর কালি মুছে গেছে, পাতা ছিঁড়ে গেছে, জল পড়েছে, ছাঁচ ধরেছে। এই দলিলগুলোকে পড়ার উপযোগী না করলে জাতিগত শুদ্ধতার পরীক্ষা চালানো সম্ভব নয়। সুতরাং ডাক পড়ল পেশাদারদের। পরিষ্কার করো। মেরামত করো। লেখা ফুটিয়ে তোলো। কেউ বলল না, “এতে কী হবে?” সবাই জানত।
এই ইতিহাসের সুতো ধরেছেন ব্রিটিশ গবেষক মরওয়েনা ব্লুয়েট। তাঁর দুই দশকেরও বেশি সময়ের গবেষণার ফল এই বই Art Restoration Under the Nazi Regime: Revelation and Concealment। ২০০৪ সালে তিনি ম্যাসাচুসেটসের Worcester Art Museum-এ কাজ করছিলেন। মিউজিয়ামের বেসমেন্টে পুরোনো ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে: যারা নাৎসি জার্মানি থেকে পালাতে পারলো না, সেই শিল্প-সংরক্ষণকারীরা কী করছিলেন? বইয়ের বর্ণনায় সেই বেসমেন্টের “উষ্ণ, অন্ধকার বাতাসে সিগারেট, কফি আর ইঞ্জিন অয়েলের গন্ধ”। এই প্রায় সিনেমাটিক মুহূর্ত থেকেই এক ভয়ঙ্কর আবিষ্কারের শুরু।
প্রশ্নটি দ্রুত বড় হলো: নাৎসি শাসন সংরক্ষণবিদ্যাকে কীভাবে ব্যবহার করেছিল? উত্তর ছিল ভয়াবহ। কাগজ সংরক্ষণকারী আর বই বাঁধাইকারীরা চার্চ, সিনাগগ, সিভিল রেজিস্টারের পুরোনো নথি মেরামত করে লক্ষ লক্ষ মানুষের পারিবারিক বংশতালিকা উদ্ধার করেছিলেন। সেই তথ্য ব্যবহার করে ইহুদি পূর্বসূরি শনাক্ত করা হয়েছে। তারপর? আমরা জানি “তারপর” মানে কী।
ড. ব্লুয়েটের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো; এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ঐতিহ্য সংরক্ষণের নৈতিক নীতিকে অমান্য করেছিল। সংরক্ষণবিদ্যার মূলনীতি কী? বস্তুটির অখণ্ডতা রক্ষা করা। কিন্তু এখানে লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দলিল রক্ষা করা নয়। লক্ষ্য ছিল তথ্য উদ্ধার। প্রয়োজনে দলিল ক্ষতিগ্রস্ত হোক। জন্ম, বাপ্তিস্ম, বিবাহ, মৃত্যুর তালিকা; এই দলিলগুলোকে কর্তৃপক্ষ “জাতিগত বিশ্লেষণ”-এর অস্ত্র বানিয়েছিল। নথিগুলো পড়ার উপযোগী হলেই সেগুলোর ছবি তোলা হতো। কোথাও কোথাও তথ্য পাঠানো হতো নাৎসি দপ্তরে। ড. ব্লুয়েট সরাসরি বলেছেন: “তারা জানত তারা কী করছে। তারা জানত এই তথ্য মানুষ হত্যার জন্য জড়ো করা হচ্ছে।”
লন্ডনের Wiener Holocaust Library-এর ইতিহাসবিদ ক্রিস্টিন শ্মিড্ট বলেছেন, এই গবেষণা “সহযোগিতার লেন্সকে আরও বিস্তৃত” করেছে। আমরা সাধারণত হলোকাস্ট ব্যাখ্যা করি দুইভাবে। এক, আদর্শগত ঘৃণা ও ইহুদিবিদ্বেষ। দুই, সামাজিক মনোবিজ্ঞান; অনুকরণ, ভয়, সুযোগসন্ধান। কিন্তু গণহত্যা কেবল মতাদর্শীদের হাতে সম্পন্ন হয়নি। এটি আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রের মাধ্যমে চালিত হয়েছে। ১২ বছরের নাৎসি শাসনে জার্মান সমাজের বিভিন্ন পেশাজীবী নিজেদের ক্যারিয়ার এগিয়ে নিতে শাসকের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন । বই-বাঁধাইকারীরা হয়তো বলেছিলেন; আমরা তো কেবল কাগজ পরিষ্কার করছি।
পুলিশ বলেছিল; আমরা কেবল আদেশ পালন করছি। রেলকর্মী বলেছিল; আমরা কেবল ট্রেন চালাচ্ছি। এভাবেই “কেবল” শব্দটি ইতিহাসে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে ভয়ংকর অংশটি হলো; এ কাজ গোপন ছিল না। মানুষ জানত পরিষ্কার করা নথি দিয়ে “আর্য পাস” প্রমাণ করা হচ্ছে। অনেকে নিজেরাই চার্চে ছুটে যেতেন প্রমাণ সংগ্রহ করতে যে তারা ইহুদি নন। সংরক্ষণকারীদেরও নিজেদের জাতিগত শুদ্ধতা প্রমাণ করতে হতো। অর্থাৎ, তারা জানতেন ব্যবস্থার প্রকৃতি।
তারা ছিলেন একই যন্ত্রের দাঁত। ড. ব্লুয়েট বলেছেন, এই সংরক্ষণ অভিযান ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৪ পর্যন্ত চলেছিল; নাৎসি শাসনের দীর্ঘতম প্রকল্পগুলোর একটি।
গণহত্যা। এটি খণ্ড খণ্ড। টুকরো টুকরো। ধীরে ধীরে তথ্য জোগাড়। ধীরে ধীরে শ্রেণিবিন্যাস। ধীরে ধীরে অমানবিকীকরণ। তারপর একদিন ট্রেন। আমরা কল্পনা করি বিচারক, সৈন্য, প্রোপাগান্ডা মন্ত্রী। আমরা কল্পনা করি না; একজন বই বাঁধাইকারী, যিনি সযত্নে ছেঁড়া পাতায় আঠা লাগাচ্ছেন। আমরা ভাবি না; স্টুডিওতে বসে কেউ একটি চার্চ রেজিস্টার পরিষ্কার করছেন, আর সেই পরিষ্কার করা অক্ষর কারও মৃত্যুদণ্ডের কাগজ হয়ে উঠবে। হলোকাস্টের ইতিহাসে ছয় মিলিয়ন ইহুদি নিহত হয়েছেন। সিঁতি, রোমা, সমকামী, প্রতিবন্ধী, রাজনৈতিক বন্দি; অসংখ্য মানুষ। কিন্তু প্রতিটি গণহত্যার নেপথ্যে থাকে তথ্য। আর তথ্যের পেছনে থাকে কেউ, যে সেটিকে পাঠযোগ্য করে তোলে। সেই মানুষটির মুখে ইউনিফর্ম নেই। কিন্তু তার হাতেও ইতিহাসের দাগ লেগে থাকে।
একটি স্বৈরশাসন যখন তার প্রকল্প চালায়, তখন শুধু বড় নেতারা নয়; কোনো এক বেসমেন্টে বসে থাকা, কাগজে আঠা লাগানো মানুষটিও তার অংশ হয়ে যায়। আর আমরা যদি কেবল শিরোনামের দিকে তাকাই, তাহলে হয়তো আবারও সেই বেসমেন্টের গন্ধ মিস করে যাব।



