পরকে প্রতারিত করা বেশ শক্ত কাজ। তবে আত্মপ্রবঞ্চনা সেই তুলনায় জলভাত। শৈশবে ভাবতাম, অসৎ ব্যক্তি মানেই বুঝি যে দৃষ্টি এড়িয়ে কথা বলবে, যার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে, আর হাতেনাতে ধরা পড়ে বলবে, “ঈশ্বরের দোহাই, আমি কিছুই জানি না।” বয়স বাড়তেই বুঝলাম হিসাবটা অত সরল নয়।
যিনি নিখুঁত প্রবঞ্চক, তিনি অপরকে বিশ্বাস করানোর বহু পূর্বেই নিজে সেই গল্পে সায় দিয়ে বসে থাকেন। ফলে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো অপরাধবোধ থাকে না। রক্তচাপ বাড়ে না। স্বর কাঁপে না। বরং আপনারই অনুশোচনা হবে যে এমন একজন নিষ্পাপ মানুষকে অহেতুক সন্দেহ করলেন।
আসলে অসত্যের প্রধান সংকট হল, তাকে নিখুঁতভাবে মনে রাখতে হয়।
আজ যদি বলি মঙ্গলবার ধর্মতলায় ছিলাম, তবে কাল প্রশ্ন উঠলে মনে রাখতে হবে হাওড়ার কথা বলা যাবে না। কার সঙ্গে দেখা হল, কোন সময়ে গেলাম, কী খেলাম, আবহাওয়া কেমন ছিল—সব তথ্যের খাতা বজায় রাখতে হয়। ঠিক যেন হাইকোর্টের নথি। একবার ভুল নথি পেশ করলে, ছ মাস পর সেই নথি আপনার সামনে এলে নিজের ফাঁদ দেখে নিজেরই পিলে চমকে যাবে।
কিন্তু নিজের বানানো কল্পকাহিনী বিশ্বাসের আরামই আলাদা। মনকে যদি একবার সেই গল্পে রাজী করিয়ে ফেলা যায়, তখন আর হিসাব মেলাতে হয় না। স্মৃতির মহাফেজখানার দরকার পড়ে না। তখন কেবল অনুভূতিটাই সত্য হয়ে ওঠে। মানব মস্তিষ্কের এই খেয়ালখানা ভারী চমৎকার।
ধরা যাক, একজন কর্মী সহকর্মীর কাজের কৃতিত্ব নিয়মিত নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছেন। প্রথমবার মনের কোণে একটু অস্বস্তি হল। দ্বিতীয়বার মনকে সান্ত্বনা দিলেন, “আমার নির্দেশ না থাকলে কাজটা অসম্পূর্ণ থাকত।” তৃতীয় দিনে ভাবলেন, “আমিই তো নেতৃত্ব দিচ্ছি।” এক বছর পর তাঁকে প্রশ্ন করে দেখুন, কাজটির নেপথ্যে কে ছিল?
তিনি সোজা হয়ে বলবেন, “আমাদের যৌথ প্রচেষ্টা।” দু বছর পর বলবেন, “ভাবনাটা তো আমার মাথা থেকেই এসেছিল।” এক দশক পর তাঁর স্মৃতিকথা প্রকাশ পেলে দেখা যাবে পুরো প্রজেক্টের একমাত্র কাণ্ডারী তিনি, আর বাকিরা হয়তো কেবল ফাইল বইছিল। এই মানুষকে আপনি কী করে প্রবঞ্চক বলবেন? তিনি তো নিজের বানানো উপন্যাসের সবচেয়ে মুগ্ধ পাঠিক বা পাঠক।
মানুষ আগে মনের ভেতরের নাটকের চিত্রনাট্য লেখে। তারপর সেই চরিত্রে বাস করতে শুরু করে। পরবর্তীতে সমাজের সামনে সেই চিত্রনাট্য পেশ করার সময় যে গভীর আত্মপ্রত্যয় দেখা যায়, তার কারণ তিনি ভালো অভিনেতা বলে নয়। অভিনেতা নিজেই ভুলে গিয়েছেন যে তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন।
অনেক কুশীলবকে দেখেছি, মুখস্থ বয়ান আওড়াতে গেলেই ভেতরে কেমন যেন কৃত্রিম আড়ষ্টতা কাজ করে। মাথার ভেতর অদৃশ্য এক প্রম্পটার যেন অনবরত তাগাদা দেয়, “পরের ডায়ালগটা এই। এবার একটু বামে তাকাও। অত তাড়াহুড়ো না করে খানিক থামো।” কিন্তু বাস্তব জীবনের আত্মপ্রবঞ্চনার ক্ষেত্রে সেই প্রম্পটারও ছুটি নিয়ে বসে থাকে।
মানুষ তখন চরিত্রের পেটে এতটাই সেঁধিয়ে যায় যে ডিরেক্টর “কাট” হাঁকলেও আর বেরোতে পারে না। এই খানেই আন্তরিকতার খেলটা ভারী চমৎকার। মন থেকে আসা অনুভূতির এই আন্তরিকতাকে মানুষ নাকি খাঁটি সত্যের প্রমাণ জ্ঞান করে। কেউ চোখ মেলে তাকাচ্ছে, চোখের জল ফেলছে, গলার স্বর ধরে আসছে—অমনি ধরে নিলাম লোকটা ধোয়া তুলসী পাতা।
অথচ মানুষ ষোলো আনা আন্তরিক হয়েও নির্জলা অসত্য বলতে পারে। নিখাদ মনে পাপ কাজ করতে পারে। এমনকি নিজেকে নিষ্পাপ ধরে নিয়ে দিব্যি শান্তিতে ঘুমাতেও পারে। তার লোভকে সে দায়িত্ব মনে করে, হিংসাকে ভাবে ন্যায়বিচার, বদলা নেওয়ার স্পৃহাকে সাজায় স্বাভিমান, আর আখের গোছানোকে ভেবে নেয় দূরদর্শিতা।
এই জায়গায় মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি এমন মোক্ষম উকিল যে, তার নিজস্ব যুক্তিজালে হেভিওয়েট ব্যারিস্টারও পিছু হটবে।
ধরুন, স্বজনের সাফল্য দেখে আপনার বুকটা খচখচ করে উঠল। নিজের আয়নায় দাঁড়িয়ে কি স্বীকার করবেন, “আমার হিংসা হচ্ছে”?
আরে দূর!
মস্তিষ্ক সাথে সাথে সাফাই গাইবে, “লটারিটা ওর পাওয়া উচিত হয়নি।”
তার পরেই শুরু হবে প্রমাণের মহড়া। “ও তো অমুক বসের কাছের লোক।” “ওর ভাগ্যটা মেলা ভার।” “কাজের আসল দৌড় তো শূন্য।” “আজকাল এগুলোই চলতাছে।”
মাত্র পাঁচ মিনিটেই আপনার হিংসা পাল্টে হয়ে গেল নিরপেক্ষ শিল্পসমালোচনা।
ভালোবাসার ক্ষেত্রেও তো একই নাটক। একজন পুরুষ সঙ্গিনীকে পদে পদে বাঁধার শিকলে বাঁধছে। কোথায় যাওয়া হলো, কার সাথে মেলামেশা, কল রিসিভ করতে কেন দেরি, সোশাল মিডিয়ায় লাইকটা কে দিল।
তাকে প্রশ্ন করুন, “আপনি একটু বেশিই দখলদারি দেখাচ্ছেন না?”
সে আকাশ থেকে পড়ে বলবে, “শাসন? এতো স্রেফ ভালোবাসার টান।”
এই “ভালোবাসার টান” শব্দబంధটি কত অনাচারের জামিনদার তা ঈশ্বরই জানেন।
অভিভাবক সন্তানের ওপর ইচ্ছার বোঝা চাপিয়ে বলেন, “তোর ভবিষ্যতের জন্য।”
স্বামী স্ত্রীর স্বাধীনতায় দেওয়াল তুলে বলেন, “আমার উদ্বেগের শেষ নেই।”
মালিক কর্মচারীকে গভীর রাতেও নির্দ্বিধায় কাজের গুঁতো দিয়ে বলেন, “আমরা এক পরিবার।”
যেদিন কোনো সংস্থা আপনাকে পরিবার বলে বুকে জড়াবে, সেদিন সাবধান হবেন। কারণ আপন পরিবার অন্তত ওভারটাইমের পাওনা আটকে ডেডলাইন চায় না।
নিজের কারসাজিকে আমরা যে সমস্ত মিষ্টি কথায় সাজাই, সেই শব্দাবলিই আত্মপ্রবঞ্চনার আসল হাতিয়ার।
“আমি অন্যায় করেছি” মানতে গায়ে লাগে। তাই বলি, “পরিস্থিতি বড্ড বিষম ছিল।”
“কাউকে ছোট করেছি” ভাবলে অস্বস্তি হয়। তাই বলি, “আমি আবার মুখের ওপর সত্যি বলি।”
অন্যের মতামতকে গ্রাহ্য করি না। ঢাক পেটাই, “আমি আপসহীন ব্যক্তি।”
নিজের ভুল স্বীকারে অনীহা। সান্ত্বনা দিই, “নীতি থেকে একচুল নড়ব না।”
ব্যস, চারিত্রিক ত্রুটিটা রাতারাতি হয়ে গেল মহান গুণ। যেন পুরোনো ইমারতে কেবল রং পালটে নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া।
মানুষের ভেতরের এই অদ্ভুত কলকব্জা তৈরির পেছনেও কি কারণ রয়েছে, তা ভাবলে অবাক হতে হয়।
মানুষ সামাজিক প্রাণী। হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করেছে অন্য মানুষ আমাদের বিশ্বাস করছে কি না তার ওপর। কে বিশ্বস্ত, কে সাহসী, কে সৎ, কে দলের লোক, এসব বিচার জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন ছিল।
আপনি যদি অন্যকে বিশ্বাস করাতে পারেন যে আপনি বিশ্বস্ত, আপনার সুবিধা।
কিন্তু অভিনয় করতে গেলে বিপদ আছে। অভিনয়ের মধ্যে ফাঁক থাকে। চোখ, গলা, শরীর, স্মৃতি, আচরণ, কোথাও একটা অসামঞ্জস্য বেরিয়ে যেতে পারে। এখন যদি নিজের মস্তিষ্কই আপনাকে বিশ্বাস করিয়ে দেয় যে আপনি সত্যিই বিশ্বস্ত, সত্যিই ন্যায়বান, সত্যিই সৎ, তখন কাজ অনেক সহজ।
মুখে আলাদা মুখোশ পরতে হবে না। মুখটাই মুখোশ হয়ে গেল। এইজন্য আত্মপ্রবঞ্চনা হয়তো কেবল দুর্বলতা নয়, সামাজিক সুবিধাও দিয়েছে। নিজেকে বিশ্বাস করিয়ে অন্যকে বিশ্বাস করানো সহজ হয়েছে।
আমি অনেককে দেখেছি যারা নিজের সম্পর্কে এমন নিশ্চয়তার সঙ্গে কথা বলে যে শুনলে মনে হয় ভগবান নিজে character certificate লিখে পাঠিয়েছেন।
“কখনও কারও অনিষ্ট করি না”—
এমন প্রবোধ শুনলেই ছাতিটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে।
নিজের খরচের হিসেব লোকে পঙ্খানুপুঙ্খ রাখলেও, পরকে কতটা ডোবালো তার খাতা খোলবার ফুরসত কারুর নেই।
যে সুজন দাবি করছেন তিনি ধোয়া তুলসী পাতা, পেছনের সারিতে হয়তো পাঁচজন হাত তুলে বসে আছে সাক্ষ্য দেবে বলে।
নিজের মহত্ত্ব নিয়ে কি কম রূপকথা ফাঁদি আমরা?
একদা কারুর উপকার করেছিলেন, ব্যস—এক যুগ পার হলেও সেই কীর্তিগাথা মনের কোণে জ্বলজ্বল করবে।
আর দশবার যাকে ফিরিয়ে দিলেন, সেই অমার্জনীয় অবহেলার গল্প মহাফেজখানা থেকে বিলীন।
মস্তিষ্কের এই গৃহস্থালি ভারী চমৎকার। শোকেসে চকচকে শোপিসগুলো সাজিয়ে রাখে, আর ভাঙা চটকান বাসনগুলো অন্তরালে ঠেলে দেয়।
স্মৃতিকথার সম্পাদনায় আমরা প্রত্যেকেই ওস্তাদ। যে তথ্যটা সাজানো ব্যক্তিত্বের সঙ্গে খাপ খায়, তাকে রেখে বাকিটা স্রেফ কাঁচি চালিয়ে ছেঁটে ফেলা হয়। নিজেকে যদি পরাক্রান্ত বীর ভাবতে ভালোবাসেন, তবে স্মৃতির ঝুলি থেকে কেবল সেই সাহসিকতার পর্বগুলোই সামনে আনবেন।
আর নিজেকে দেবতুল্য সাজাতে চাইলে? অসভ্যতার সমস্ত দাগগুলো কায়দা করে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাবে।
“সেদিন মেজাজটাই বিগড়ে গিয়েছিল।”
“ও নিজেই গায়ে পড়ে ঝগড়া বাঁধালো।”
“পরিস্থিতিটাই কেমন বেসামাল ছিল।”
অথচ একই কণ্ডুগতি অন্য কেউ করলে এই সমস্ত অছিলা নিমেষে উধাও।
সরাসরি রায় বেরোবে, “বান্দাটাই শয়তান।”
বিচারপদ্ধতির খেলাখানা সত্যিই বেশ উপভোগ্য।
নিজের স্খলনকে আমরা পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করি, আর অন্যের ভুলকে দাগিয়ে দিই তার দুশ্চরিত্র বলে।
আমি পে পৌঁছালে অপরাধ রাস্তার যানজটের।
আপনি ঢিলেমি করলে আপনি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন।
আমি চটে উঠলে দোষ প্রবল মানসিক চাপের।
আপনি গর্জে উঠলে আপনার মেজাজই বদ।
আমার ভুল তথ্যের জন্য দায়ী ভুল সূত্র।
আপনার স্খলনের পেছনে নিহিত জ্ঞানের অভাব।
নিজের আদালতে মানুষ নিজেই যখন কৌঁসুলি, আবার বিচারকও, তখন নির্দোষ রায় হওয়া তো কেবল সময়ের অপেক্ষা।
তবে সবচেয়ে মোক্ষম ধোঁকাবাজিটা ঘটে নৈতিকতার মঞ্চে। নিজের চোখে নিজেকে অপরাধী প্রমাণের কোনো বাসনা মানুষের থাকে না। প্রতি রাতে বালিশে মাথা রাখার পূর্বে আয়নার সামনে অন্তত নিজেকে নিষ্পাপ প্রমাণ করা চাই। ফলে কার্যের সাথে নৈতিকতার সংঘাত ঘটলেই গল্পের রূপ পাল্টে যায়।
শ্রমিককে ঠকানো মালিক সটান সাফাই গায়, “বাজারের কঠোর নিয়ম।”
গদি আঁকড়ে থাকা নেতা হাঁক ছাড়ে, “জাতির পরম কল্যাণ।”
স্বার্থান্বেষী ধর্মগুরু ফতোয়া দেয়, “ঈশ্বরের নাম রক্ষার্থে।”
দলের অপরাধে চোখ বোজা বুদ্ধিজীবী বকে, “ঐতিহাসিক লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট।”
এই “বৃহত্তর স্বার্থ” শব্দবন্ধটি এমন এক মহাবলশালী চাদর, যার তলে সব রকমের অন্যায় আড়াল করা যায়। পৈশাচিকতাও বাদ যায় না। নিজেকে সৎ দাবি করে মানুষ যুগে যুগে যেসব ভয়াবহ কাণ্ড ঘটিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই।
কোনো জালেমই তো প্রাতে চোখ মেলেই ভেবে নেয় না যে আজ কুখ্যাত কোনো শয়তানি করতে হবে।
বরং মনে মনে আত্মপ্রসাদ লাভ করে যে সে শৃঙ্খলা রক্ষা করছে।
পাপের প্রক্ষালনে ব্যস্ত আছে।
ত্রাণকর্তার ভূমিকা পালন করছে।
সভ্যতার নতুন আলো দেখাচ্ছে।
এবং পরম ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা দিচ্ছে।
অসদাচরণের সময়েও যখন চিত্তে নিজেকে নীতিবান প্রমাণের আড়া আড়াল গড়ে ওঠে, তখন বাহ্যিক উপদেশের ধার কমে আসে। বিবেকের তখন কাঠগড়ার নথিতে সই দেওয়ার ফুরসত নেই; সে আসামির মোক্ষম ব্যাকআপ। সেই নিরিখে ভাবি, লজ্জাবোধখানা নেহাত মন্দ নয়।
নিজ কৃতকর্মে মুখখানা আরক্ত হওয়া হয়তো ঝামেলার, কিন্তু সেই চঞ্চলতাই জীবনের কড়া ব্রেক।
মানুষ নিজের সুবিধাবাদকে রাতারাতি পরম নীতি বানিয়ে নিলে, বাহনের গতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। আত্মপ্রবঞ্চনায় লজ্জিত হওয়া মুখটা সমাজের রেসে পিছিয়ে পড়তে পারে বটে; তবে যে ব্যক্তি নিজের তৈরি বিজ্ঞাপনে মজে বসে আছে, তার বাজার চড়া।
সাক্ষাৎকারে সে দুর্দান্ত। রাজনীতিতে অবিচল। কারবারে আকর্ষণীয়। অনুরাগে দৃঢ়। বিবাদে অটল। এমন প্রত্যয়ে সে আপন উপাখ্যান শোনায় যে, নিজের স্মৃতিশক্তি নিয়েই সন্দেহের দোলাচল শুরু হবে। এইজন্য দৃঢ়তা আর সত্যের ওজন এক নয়।
গলার জোর বাড়ালেই তা খাঁটি সত্যের শংসাপত্র পায় না। বরং নিখাদ অসত্যটি আসে সেই প্রবঞ্চকের কাছ থেকে, যার মগজের খাতায় তা অসত্য বলে নথিবদ্ধই নয়।
এখানে এক মনোহর সংকট লুকিয়ে রয়েছে। পরজনের আত্মপ্রবঞ্চনা চোখের সামনে দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
বান্ধবকে বলি, “নিজের চোখে ধুলো দিচ্ছিস।”
গৃহিণী স্বামীকে শোনান।
কর্তা গৃহিণীকে শোনান।
বামপন্থা দুষছে দক্ষিণকে।
দক্ষিণপন্থা দুষছে বামকে।
এক ধর্মমতের নিশানা অন্য ধর্ম।
এক বয়সের খোঁচা অন্য বয়সে।
অথচ দর্পণের সম্মুখে দাঁড়ালেই সেই অণুবীক্ষণ যন্ত্রটা উধাও।
আমাকর্তৃক বিষয়টাই স্বতন্ত্র।
সর্বদাই ব্যতিক্রমী।
নিজের খাতায় টিকা, কৈফিয়ত, পরিশিষ্ট, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সব মজুদ। পরজনের বেলাতে এক লাইনের শিরোনামই যথেষ্ট।
অতএব আত্মোপলব্ধি ভারী শক্ত ঠেকায়।
ভেতরের মিছে ধরতে গেলে মানতে হবে, যা নিয়ে আজ বুক ফোলাচ্ছি, তাও সুবিধাজনক চিত্রনাট্য ছাড়া কিছু নয়।
এই স্বীকারোক্তি অহমিকায় চোট দেয় বটে, তবে জরুরি। নিজেকে মাঝেমাঝে সুধানো দরকার:
এই কর্মকাণ্ড অন্য কেউ ঘটালে আমার মতামত কী হতো?
স্বার্থের খাতাটা দূরে সরালে চিত্রটা কেমন দাঁড়াবে?
যে অজুহাত পেশ করছি, তা বাস্তব সত্য নাকি চতুর আত্মরক্ষা?
আমার ধারণার বিপক্ষে কী তথ্য রয়েছে?
কোন যুক্তি সামনে এলে সিদ্ধান্ত পাল্টাব?
এই অন্তিম প্রশ্নটাই মহাগুরুত্বপূর্ণ।
যে ধারণা কোনো শক্ত প্রমাণে বদলায় না, তা বিশ্বাসের পরীক্ষা নয়; মগজের জং ধরা আসবাব।
কল্পকাহিনী ব্যতিরেকে মানুষ বাঁচতে অক্ষম। শতভাগ নিরপেক্ষ আত্মসমালোচনা সম্ভব কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। স্মৃতির রদবদল, ওজর, ক্ষোভ, অহংকার আর খেদ মিশিয়ে আমরা এক-একটি “আমি” খাড়া করি।
বিপদ ঘটে তখনই, যখন বানিয়ে বলা গল্পটাকে অকাট্য মহাফেজখানার রেকর্ড ভাবা শুরু হয়। নিজের ওপর ঈষৎ সংশয় থাকা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। ভাবনার অন্দরে কতটা নিখাদ, কতটুকু সুবিধাবাদ, কতটা ভয় আর কতটা অহমিকা ঢেকে রাখার কসরত, তার খতিয়ান রাখা প্রয়োজন।
পরকে ঠকাতে গেলে বিদ্যার প্রয়োজন হয়। আর নিজেকে ঠকাতে লাগে স্রেফ অভ্যন্তরীণ সম্মতি। এই নাটকে আসামি, ফরিয়াদি, আইনজীবী আর বিচারক—সবকটি চরিত্রেই আপনি বিরাজমান।
তৎসত্ত্বেও একতরফা রায় আসে:
“অভিযুক্ত শতভাগ নিষ্কলঙ্ক।”
বাকী দুনিয়া তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “হুঁ, লক্ষণ তো তেমনই দেখছি!”


