ভালো ছেলে
রিটন খানের ছোট গল্প
রাশেদকে সবাই ভালো ছেলে বলে।
কথাটা সত্যি।
রাশেদ কারও সঙ্গে ঝগড়া করে না। কেউ তার ওপর রাগ করলে সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর শান্ত গলায় বলে, আচ্ছা, ভুল হয়ে গেছে।
ভুলটা তার না হলেও বলে।
অফিসে সবাই জানে, কোনো কাজ আটকে গেলে রাশেদকে দিতে হবে। সে রাত জেগে কাজ শেষ করবে। কাজ শেষ করার পর কাউকে বলবে না যে সে রাত জেগেছে। পরদিন সকাল নয়টায় আবার অফিসে আসবে। চোখ লাল থাকবে। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে, কাল রাতে একটা সিনেমা দেখছিলাম।
রাশেদ সিনেমা দেখে না।
তার একমাত্র বিনোদন ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা। রাত এগারোটার দিকে সে ছাদে ওঠে। পাঁচতলা বাড়ির ছাদ। চারদিকে অসংখ্য জানালা। কোনো জানালায় নীল আলো, কোনো জানালায় হলুদ। দূরের একটা বাড়িতে একজন মানুষ প্রতিদিন রাত এগারোটায় বাঁশি বাজায়। একই সুর। সুরটা খুব বিষণ্ন। রাশেদ জানে না কে বাজায়।
তার জানতেও ইচ্ছা করে না।
কিছু জিনিস দূরে থাকাই ভালো। কাছে গেলে রহস্য নষ্ট হয়।
রাশেদের স্ত্রী নীরা একদিন বলল, তুমি ছাদে গিয়ে কী করো?
রাশেদ বলল, কিছু করি না।
কিছু না করে কেউ এক ঘণ্টা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকে?
আমি থাকি।
আমার সঙ্গে কথা বলতে তোমার ভালো লাগে না?
লাগে তো।
তাহলে ছাদে যাও কেন?
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আকাশ দেখি।
ঢাকা শহরে আকাশ আছে?
অল্প আছে।
নীরা বিরক্ত হয়ে বলল, তোমার সঙ্গে কথা বলা যায় না। তুমি কোনো প্রশ্নের সোজা উত্তর দাও না।
রাশেদ হাসল।
তার এই হাসি নীরার আরও বিরক্তির কারণ। ঝগড়ার সময় মানুষ হাসবে কেন? ঝগড়ার নিয়ম হচ্ছে একজন রাগ করবে, অন্যজনও রাগ করবে। তারপর দুজন দুই দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে থাকবে। রাশেদ রাগ করে না। সে হাসে। নীরা তখন নিজেকেই খারাপ মানুষ মনে করে।
একদিন নীরা বলল, তুমি আমাকে খুব অপরাধী বানিয়ে রাখো।
রাশেদ অবাক হয়ে বলল, আমি?
হ্যাঁ, তুমি। তুমি কোনোদিন রাগ করো না। কোনোদিন বলো না যে আমার দোষ হয়েছে। সব দোষ নিজের ওপর নাও। তখন মনে হয় আমি খুব খারাপ।
তুমি খারাপ না।
এই কথাটাও বলবে না।
আচ্ছা।
আচ্ছা বলবে না।
ঠিক আছে।
নীরা কাঁদতে শুরু করল।
রাশেদ কাছে গিয়ে তার মাথায় হাত রাখল। নীরা মাথা সরিয়ে বলল, আমাকে আদর করবে না। আমি এখন তোমার ওপর রেগে আছি।
রাশেদ হাত সরিয়ে নিল।
কিছুক্ষণ পর নীরা আরও জোরে কাঁদতে লাগল।
রাশেদ বুঝতে পারল না এখন তার কী করা উচিত।
মানুষের মন বোঝার ব্যাপারে তার খুব সুনাম। অফিসের শারমিন আপা প্রায়ই বলেন, রাশেদ, তুমি মানুষের মন পড়তে পারো। আমি মুখ খোলার আগেই বুঝে যাও আমার কী হয়েছে।
রাশেদ আসলে মানুষের মন পড়তে পারে না।
সে মানুষের মুখ পড়ে।
ঠোঁট শক্ত হয়ে আছে কি না। চোখের পাতা দ্রুত পড়ছে কি না। কথা বলার সময় শ্বাস আটকে যাচ্ছে কি না। কেউ চায়ের কাপ নামানোর সময় একটু বেশি শব্দ করছে কি না। এসব সে খুব দ্রুত বুঝতে পারে।
এই অভ্যাস তার ছোটবেলায় হয়েছে।
তখন তার বয়স সাত।
তারা থাকত রেললাইনের পাশের একটা টিনের বাড়িতে। বাড়ির চালের ওপর বৃষ্টি পড়লে এমন শব্দ হতো যে একজনের কথা আরেকজন শুনতে পেত না। রাশেদের বৃষ্টি ভালো লাগত। বৃষ্টির দিনে বাড়িতে ঝগড়া হলেও শব্দ বাইরে যেত না।
তার বাবা আজিজুল হক ছিলেন দলিল লেখক। মানুষ হিসেবে তিনি ভালো ছিলেন। ভালো মানুষদের মধ্যেও সমস্যা থাকে। তাঁর সমস্যা ছিল মেজাজ।
কোন দিন তাঁর মেজাজ ভালো থাকবে, কোন দিন খারাপ থাকবে, বোঝা যেত না।
তবে রাশেদ বুঝত।
গেট খোলার শব্দ শুনে বুঝত।
বাবা যদি গেট ধীরে খুলতেন, তাহলে বিপদ নেই। যদি লাথি দিয়ে গেট খুলতেন, তাহলে মাকে খবর দিতে হতো।
সে দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে বলত, মা, বাবা আসছে।
মা বলতেন, আসুক।
আজকে বাবার মন খারাপ।
তুই বুঝলি কী করে?
গেটের শব্দ।
মা তখন দ্রুত চুলার কাছে যেতেন। তরকারিতে লবণ ঠিক আছে কি না দেখতেন। ভাত গরম করতেন। ছোট বোন রুমাকে বলতেন, আজ বাবার সামনে যাস না।
রাশেদ বাবার সামনে যেত।
তার কাজ ছিল বাবাকে শান্ত করা।
বাবা চেয়ারে বসলে সে পাখা নিয়ে বাতাস করত। বলত, বাবা, আজ স্কুলে আমি অঙ্কে দশে দশ পেয়েছি।
কোনো কোনো দিন এতে কাজ হতো।
কোনো কোনো দিন হতো না।
একদিন বাবা বললেন, বাতাস বন্ধ কর। বিরক্ত লাগছে।
রাশেদ বাতাস বন্ধ করল।
এক মিনিট পর বাবা বললেন, গরমে মারা যাচ্ছি, বাতাস করছিস না কেন?
রাশেদ আবার পাখা চালাল।
বাবা তার হাত থেকে পাখা কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেললেন।
সেদিন রাতে রাশেদের মা তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, তুই আমার লক্ষ্মী ছেলে। তুই না থাকলে এই সংসার এক দিনে শেষ হয়ে যেত।
কথাটা রাশেদের খুব ভালো লেগেছিল।
সাত বছরের একটা ছেলে জানতে পারল, একটা সংসার তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
সে আরও ভালো ছেলে হয়ে গেল।
রুমা দুষ্টুমি করলে সে তাকে থামাত। মা কাঁদলে সে মায়ের পাশে বসে থাকত। বাবা রেগে গেলে সে বাবার মন ভালো করার চেষ্টা করত।
একবার তার নিজের খুব জ্বর হলো। শরীরের তাপমাত্রা একশ চার। মা তার মাথায় পানি ঢালছেন। পাশের ঘরে বাবা চিৎকার করছেন, তাঁর শার্ট ইস্ত্রি করা হয়নি কেন।
রাশেদ বিছানা থেকে উঠে বসেছিল।
মা বলেছিলেন, তুই উঠছিস কেন?
বাবার শার্টটা দিয়ে আসি।
তোর জ্বর।
বাবা রাগ করছে।
মা রাশেদের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন। তারপর তাকে বুকে জড়িয়ে বলেছিলেন, তুই মানুষ না, তুই ফেরেশতা।
রাশেদ ফেরেশতা হতে চায়নি।
সে শুধু চাইত ঘরটা শান্ত থাকুক।
এই ইচ্ছা বড় হওয়ার পরও গেল না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে সে এমন বন্ধুদের সঙ্গে মিশত যাদের নানা সমস্যা। কারও প্রেম ভেঙেছে। কারও টাকা নেই। কারও বাবার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ। সবাই রাত দুইটায় রাশেদকে ফোন করত।
রাশেদ ফোন ধরত।
কেউ কখনও জিজ্ঞেস করত না, রাশেদের ঘুম পাচ্ছে কি না।
তাতে তার আপত্তি ছিল না। মানুষ তাকে প্রয়োজনে স্মরন করছে, এই অনুভূতি তার ভালো লাগত।
প্রয়োজন আর ভালোবাসা যে আলাদা জিনিস, তখন সে জানত না।
নীরার সঙ্গে তার পরিচয়ও হয়েছিল এক সমস্যার কারণে।
নীরার ব্যাগ ছিনতাই হয়েছিল। ব্যাগে টাকা তেমন ছিল না, কিন্তু একটা নীল ডায়েরি ছিল। সেই ডায়েরিতে সে কবিতা লিখত। ব্যাগ চলে যাওয়ায় নীরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।
রাশেদ তাকে চিনত না। তারপরও এগিয়ে গিয়ে বলেছিল, আপনি কাঁদবেন না। ব্যাগ পাওয়া যাবে।
নীরা চোখ মুছে বলেছিল, পাওয়া যাবে কীভাবে?
দেখি চেষ্টা করে।
রাশেদ তিন ঘণ্টা চেষ্টা করেছিল। থানায় গিয়েছিল। আশপাশের দোকানের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছিল। শেষে ব্যাগ পাওয়া যায়নি।
তবে নীরার কান্না থেমেছিল।
পরে নীরা বলেছিল, ওই দিন তোমাকে দেখে মনে হয়েছিল পৃথিবীতে এখনও ভালো মানুষ আছে।
বিয়ের পর নীরা তার মত বদলায়নি। সবার কাছেই সে বলত, আমার স্বামী খুব ভালো মানুষ। রাগ নেই, অহংকার নেই, চাহিদা নেই।
রাশেদ কথাগুলো শুনে হাসত।
তার আসলেই চাহিদা ছিল না।
অথবা ছিল, সে জানত না।
এক বৃহস্পতিবার অফিসে ছোট একটা ঘটনা ঘটল।
রাশেদের বস তাকে ডেকে বললেন, নতুন প্রজেক্টটা তুমি নাও।
রাশেদ বলল, আমার হাতে এখন তিনটা প্রজেক্ট আছে।
বস চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালেন।
তোমার সমস্যা হবে?
রাশেদের সমস্যা হবে।
গত সাত দিন সে ঠিকমতো ঘুমায়নি। বুকের ভেতর মাঝেমধ্যে চাপ লাগে। দুপুরে খাওয়ার সময় খাবারের গন্ধে বমি আসে। সকালে অফিসের লিফটে উঠে কোনো কারণ ছাড়াই তার কান্না পায়।
তবু সে বলল, না, সমস্যা হবে না।
বস আনন্দিত হয়ে বললেন, এই জন্যই তোমাকে এত পছন্দ করি। তুমি নির্ভরযোগ্য।
নির্ভরযোগ্য শব্দটি শুনে রাশেদের হঠাৎ খুব ক্লান্ত লাগল।
সে নিজের ডেস্কে ফিরে কম্পিউটারের সামনে বসে রইল। মনিটরে কিছু লেখা আছে। সে পড়তে পারছে না। অক্ষরগুলো কিলবিল করছে।
শারমিন আপা এসে বললেন, কী হয়েছে রাশেদ? শরীর খারাপ?
না।
চেহারা এমন কেন?
ঘুম হয়নি।
আমার একটা রিপোর্ট আছে। আজকে একটু দেখে দেবে? তুমি ছাড়া কাউকে ভরসা পাই না।
রাশেদ বলল, দিয়ে যান।
শারমিন আপা রিপোর্ট রেখে চলে গেলেন।
রাশেদ রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, টেবিলের ওপর একটা ভারী পাথর রাখা হয়েছে।
অথচ পাথর না।
ছয় পৃষ্ঠার একটা রিপোর্ট।
মানুষের শরীর অদ্ভুত। ছয় পৃষ্ঠার কাগজকেও কখনও পাথর মনে হয়।
সেদিন রাশেদ অফিস থেকে বের হলো বিকেল চারটায়। কাউকে কিছু বলল না। ফোন বন্ধ করে হাঁটতে লাগল।
সে কোথায় যাচ্ছে জানে না।
হাঁটতে হাঁটতে একটা পার্কে ঢুকে পড়ল। পার্কে বিশেষ কেউ নেই। একটা বৃদ্ধ মানুষ বেঞ্চে বসে কবুতর দেখছেন। তাঁর হাতে মুড়ির ঠোঙা।
রাশেদ তাঁর পাশের বেঞ্চে বসল।
বৃদ্ধ বললেন, কবুতরকে মুড়ি দিলে খায় না। চাল দিতে হয়।
রাশেদ বলল, ও আচ্ছা।
তারপরও আমি মুড়ি দিচ্ছি।
কেন?
বাসা থেকে মুড়ি এনেছি। চাল আনিনি।
রাশেদ হাসল।
বৃদ্ধ বললেন, আপনার মন খারাপ?
না।
চোখে পানি কেন?
রাশেদ হাত দিয়ে চোখ মুছল। সত্যিই পানি।
সে বলল, ধুলা ঢুকেছে।
বৃদ্ধ আকাশের দিকে তাকালেন। আকাশ পরিষ্কার। বাতাসও নেই।
তিনি বললেন, খুব খারাপ ধুলা। মানুষের চোখে ঢুকে, আবার বুকেও ঢুকে যায়।
রাশেদ কিছু বলল না।
বৃদ্ধ মুড়ির ঠোঙা তার দিকে বাড়িয়ে বললেন, খাবেন?
না, ধন্যবাদ।
আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আমি প্রতিদিন এখানে আসি। বাড়িতে বসে থাকলে দেয়াল কথা বলে।
কী কথা বলে?
বলে, তোমার কেউ নেই।
রাশেদ চুপ করে রইল।
বৃদ্ধ বললেন, আপনি কার জন্য কাঁদছেন?
আমি কাঁদছি না।
তাহলে আপনার চোখ কাঁদছে। চোখকে থামাবেন না। চোখেরও কিছু কাজ আছে।
রাশেদ নিচু গলায় বলল, আমি খুব ক্লান্ত।
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, ঘুমান।
ঘুমালে যাবে না।
তাহলে বোঝা নামান।
কীভাবে?
যার বোঝা, তাকে ফেরত দেন।
রাশেদ বৃদ্ধের দিকে তাকাল।
বৃদ্ধ তখন কবুতরের দিকে মুড়ি ছুড়ছেন। কবুতর মুড়ি খাচ্ছে না।
রাশেদ বলল, কোনটা কার বোঝা, বুঝব কীভাবে?
বৃদ্ধ বললেন, যেটা নামাতে গেলে আপনার ভয় লাগে, সেটাই সম্ভবত আপনার বোঝা না।
কথাটা রাশেদের পছন্দ হলো না।
অচেনা বৃদ্ধরা প্রায়ই জটিল কথা বলেন। তাদের ধারণা, বয়স হলে সব কথা রহস্যময় করে বলতে হয়।
রাশেদ উঠে দাঁড়াল।
বৃদ্ধ বললেন, চলে যাচ্ছেন?
জি।
বাড়িতে?
জি।
আজ একটা সত্য কথা বলবেন।
কাকে?
যে শুনবে তাকে।
রাশেদ বাড়িতে ফিরল রাত আটটায়।
নীরা বসার ঘরে বসে আছে। তার মুখ গম্ভীর। টেবিলের ওপর ঠান্ডা চা। রাশেদের ফোন বন্ধ ছিল বলে সে দশবার ফোন করেছে।
রাশেদকে দেখে বলল, কোথায় ছিলে?
পার্কে।
ফোন বন্ধ কেন?
বন্ধ করেছি।
আমাকে জানাবে না?
না।
নীরা অবাক হয়ে তাকাল।
রাশেদ সাধারণত এমন উত্তর দেয় না। সে ব্যাখ্যা করে। ক্ষমা চায়। নীরার উদ্বেগ বোঝার চেষ্টা করে। আজ কিছুই করছে না।
নীরা বলল, তুমি ঠিক আছ?
না।
কী হয়েছে?
জানি না।
অফিসে কিছু হয়েছে?
হয়েছে।
কী?
আমি আর পারছি না।
নীরা চুপ করে গেল।
রাশেদ জুতা না খুলেই সোফায় বসল। মাথা নিচু করে বলল, সবাই ভাবে আমি অনেক কিছু পারি। আমিও ভাবতাম। এখন মনে হচ্ছে আমি কিছুই পারি না।
নীরা তার পাশে এসে বসল।
রাশেদ বলল, আমি খুব ক্লান্ত। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠতে ভয় লাগে। ফোন বাজলে ভয় লাগে। কেউ বলবে, একটা কাজ করে দাও। কেউ বলবে, একটু কথা শোনো। কেউ বলবে, তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই। সবাই আমাকে ভালো বলে। আমি আর ভালো থাকতে পারছি না।
নীরা কিছু বলল না।
রাশেদ এবার কাঁদতে শুরু করল।
তার কান্নার কোনো শব্দ নেই। শুধু চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।
নীরা ধীরে ধীরে তার জুতার ফিতা খুলতে লাগল।
রাশেদ বলল, তুমি কী করছ?
জুতা খুলছি।
আমি নিজেই খুলব।
আজ খুলতে হবে না।
নীরা জুতা খুলে পাশে রাখল। তারপর বলল, তুমি আমার দিকে তাকাও।
রাশেদ তাকাল।
নীরা বলল, তুমি আমাকে কখনও বলোনি যে তোমার কষ্ট হয়।
বললে কী হতো?
আমি জানতাম।
জানলে কী করতে?
জানি না। কিছু একটা করতাম। পাশে বসে থাকতাম।
রাশেদ বলল, পাশে তো বসে আছ।
হ্যাঁ।
দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
রান্নাঘর থেকে পানির কল পড়ার শব্দ আসছে। টুপ। টুপ। টুপ।
রাশেদ সাধারণত সঙ্গে সঙ্গে উঠে কল বন্ধ করে। আজ উঠল না।
নীরা বলল, কল থেকে পানি পড়ছে।
পড়ুক।
পানির বিল উঠবে।
উঠুক।
নীরা হেসে ফেলল।
রাশেদ বলল, হাসছ কেন?
তুমি আজ খুব ভয়ংকর মানুষ হয়ে গেছ। পানির বিল উঠলেও তোমার কিছু যায় আসে না।
রাশেদও হাসল।
নীরা তার হাত ধরল। বলল, কাল অফিসে যাবে?
না।
ছুটি নেবে?
হ্যাঁ।
তোমার বস রাগ করবে।
করুক।
শারমিন আপার রিপোর্ট?
তিনি নিজে করবেন।
নীরা বলল, বাহ্।
কী বাহ্?
কিছু না। তোমার সঙ্গে নতুন করে পরিচয় হচ্ছে।
রাশেদ সেদিন রাতে ছাদে গেল না।
ঘুমাতেও গেল না। নীরার সঙ্গে বসার ঘরের মেঝেতে বসে রইল। নীরা চা বানিয়ে আনল। চায়ে চিনি বেশি হয়েছে। রাশেদ বলল না।
তারপর মনে হলো, বলা দরকার।
সে বলল, চায়ে চিনি বেশি হয়েছে।
নীরা কাপ হাতে থেমে গেল।
রাশেদের বুক ধক করে উঠল। পুরোনো ভয় বলল, এখনই ক্ষমা চাও। বলো, তবু চা ভালো হয়েছে। নীরার মন খারাপ হতে দিও না।
সে কিছু বলল না।
নীরা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, সত্যিই তো। ভয়াবহ মিষ্টি হয়েছে।
রাশেদ বিস্মিত হয়ে তাকাল।
এত ছোট একটা সত্য বলেও ঘরে কোনো ঝড় উঠল না।
দেয়াল ভাঙল না।
কেউ তাকে ছেড়ে চলে গেল না।
নীরা বলল, নতুন চা করে আনি?
না। এটিই খাই।
এত মিষ্টি চা খাবে কেন?
নষ্ট করতে ইচ্ছা করছে না।
এই বদভ্যাসটা এখনো আছে।
কোনটা?
সবকিছু বাঁচানোর চেষ্টা।
রাশেদ কাপ নামিয়ে রাখল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল, তাহলে চা-টা ফেলে দাও।
নীরা বারান্দায় গিয়ে চা ফেলে দিল। ফিরে এসে বলল, এখন?
এখন নতুন করে বানাও। চিনি কম দিও।
নীরা রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলল, হুকুম করার অভ্যাসও শুরু হয়েছে দেখি।
রাশেদ বলল, অসুবিধা হচ্ছে?
নীরা পেছন ফিরে তাকাল।
তার মুখে হাসি।
সে বলল, না। ভালোই লাগছে।
রাত বারোটার দিকে বৃষ্টি শুরু হলো। হালকা বৃষ্টি। বারান্দার গ্রিলে ফোঁটা জমছে। দূরের বাড়ির মানুষটি বাঁশি বাজাতে শুরু করেছে।
আজ সুরটা বিষণ্ন মনে হচ্ছে না।
রাশেদ বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখল। তার মনে হলো, বুকের ভেতর বহু বছর ধরে একটা ছোট ছেলে বসে ছিল। ছেলেটা সারাক্ষণ দরজার দিকে কান পেতে রাখত। কার পায়ের শব্দ, কে রাগ করেছে, কোথায় ঝগড়া শুরু হবে।
আজ ছেলেটা প্রথমবারের মতো দরজা থেকে সরে এসেছে।
সে এখন জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখছে।
রাশেদ মনে মনে তাকে বলল, তোমাকে আর সংসার সামলাতে হবে না।
ছেলেটা কথাটা বিশ্বাস করল কি না বোঝা গেল না।


