ভাষা বদলায় বলেই বেঁচে থাকে
ভাষা কোনো কাচের আলমারিতে রাখা স্মারক নয়। ভাষা মানুষের ব্যবহারের ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকে। মানুষ বদলায়, তার কাজ বদলায়, বসবাসের ধরন বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, ক্ষমতার সম্পর্ক বদলায়, প্রেম করার পদ্ধতি বদ
কয়েক বছর আগে কলকাতার এক বইয়ের দোকানে দাঁড়িয়ে পুরোনো একটি বাংলা অভিধান উল্টেপাল্টে দেখছিলাম। অভিধানটি সম্ভবত আমার বাবার বয়সী। মলাটের কোণ উঠে গেছে, পাতায় পাতায় হলদে দাগ, কোথাও পেন্সিলের টান। দোকানদার ভদ্রলোক বইটি হাতে দিয়ে বললেন, “এখনকার ছেলেপুলে এসব নেয় না। ওরা শব্দ গুগল করে।”
কথাটি শুনে প্রথমে একটু দুঃখ হয়েছিল। তারপর মনে হল, অভিধানটি নিজেই যদি কথা বলতে পারত, সম্ভবত এত মন খারাপ করত না। সে জানে, শব্দের বাসা কেবল কাগজে নয়। মানুষের মুখেও। মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিলে অভিধানের পাতায় যত সুন্দর করেই শব্দ সাজানো থাকুক, তাদের অবস্থা পুরোনো বাড়ির বন্ধ ঘরের মতো। আসবাব আছে, ধুলো আছে, মানুষের পায়ের শব্দ নেই।
ভাষা নিয়ে আমাদের আবেগ প্রবল। মাতৃভাষা বলেই আবেগটি স্বাভাবিক। কিন্তু ভালোবাসার সঙ্গে একধরনের মালিকানাবোধও এসে পড়ে। আমরা ভাবতে শুরু করি, ভাষাটি যেন আমাদের পারিবারিক সম্পত্তি। পূর্বপুরুষেরা একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় রেখে গেছেন, পরবর্তী প্রজন্মের কর্তব্য সেটিকে সেভাবেই সংরক্ষণ করা। একটি শব্দের উচ্চারণ বদলালে আমরা বিচলিত হই। নতুন কোনো বাক্যরীতি শুনলে মনে হয় ভাষার সর্বনাশ হয়ে গেল। ইংরেজি শব্দ ঢুকলে সভ্যতার পতন দেখি। পুরোনো বানান বদলালে মনে হয় কেউ যেন বংশের পদবি কেটে দিয়েছে।
অথচ ভাষা কোনো কাচের আলমারিতে রাখা স্মারক নয়। ভাষা মানুষের ব্যবহারের ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকে। মানুষ বদলায়, তার কাজ বদলায়, বসবাসের ধরন বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, ক্ষমতার সম্পর্ক বদলায়, প্রেম করার পদ্ধতি বদলায়, এমনকি গাল দেওয়ার ধরনও বদলায়। ভাষা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে চলতে বাধ্য।
এই বাধ্যবাধকতা বাইরের চাপমাত্র নয়। পরিবর্তনের ক্ষমতা ভাষার নিজস্ব ব্যবস্থার মধ্যেই থাকে।
একটি শিশু ভাষা শেখে ব্যাকরণের বই পড়ে নয়। সে চারপাশের মানুষের মুখে শব্দ শোনে, সুর শোনে, কোন কথার পরে কোন কথা আসে তা আন্দাজ করে। তারপর নিজের ভেতরে একধরনের নিয়ম তৈরি করে। নিয়মটি তাকে কেউ লিখে দেয় না। সে শোনে, অনুমান করে, প্রয়োগ করে, ভুল করে, আবার নিয়ম সংশোধন করে।
এই ভুলগুলোর দিকে একটু তাকালে ভাষা পরিবর্তনের প্রকৃতি বোঝা যায়। ইংরেজি শেখা শিশু কখনো “went”-এর বদলে “goed” বলে। সে নির্বোধ বলে এমন করে না। বরং তার মাথা যথেষ্ট সুশৃঙ্খল বলেই করে। সে “walk-walked”, “play-played”, “jump-jumped” শুনে একটি নিয়ম আবিষ্কার করেছে। সেই নিয়ম “go”-এর ওপর প্রয়োগ করেছে। বড়োরা তাকে সংশোধন করে। কিন্তু ভাষার ইতিহাসে অনেক সময় কোনো ভুলকে সংশোধন করার লোক থাকে না, কিংবা ভুলটি এত মানুষ করতে শুরু করে যে সেটিই নতুন নিয়মে পরিণত হয়।
আজকের ব্যাকরণে যা শুদ্ধ, অতীতের কোনো এক মুহূর্তে তা হয়তো ছিল অনিয়ম, আঞ্চলিকতা, অলস উচ্চারণ বা শিক্ষিতজনের বিরক্তির কারণ।
মানুষ কথা বলার সময় কম শ্রমে বেশি অর্থ পৌঁছে দিতে চায়। আমরা ধ্বনি গিলে ফেলি, দুটি শব্দ জুড়ে দিই, কঠিন উচ্চারণকে সহজ করি। প্রথমে এই পরিবর্তন কানে খারাপ লাগতে পারে। পরে সেটাই স্বাভাবিক হয়ে যায়।
“করিতেছি” থেকে “করছি”, “যাইতেছি” থেকে “যাচ্ছি”, “হইয়াছে” থেকে “হয়েছে” এসেছে কোনো ভাষা সংস্কার কমিটির সভায় বসে নয়। মুখের ব্যবহার, দ্রুত উচ্চারণ, ধ্বনির ঘর্ষণ, প্রজন্মের অভ্যাস এবং কথ্য ভাষার প্রবাহ মিলিয়ে এগুলো তৈরি হয়েছে। একসময় যে রূপকে অসম্পূর্ণ বা হালকা মনে হয়েছে, পরে সেটিই প্রমিত রূপের অংশ হয়েছে।
ভাষার মধ্যে এই সংক্ষেপণের প্রবণতা প্রায় সর্বত্র দেখা যায়। বহু ব্যবহৃত শব্দ দ্রুত ক্ষয় হয়। মানুষের মুখ যেন নদীর জল। ধারালো পাথরকেও ঘষে গোল করে ফেলে।
বাংলায় “তাহার” হয়েছে “তার”, “আমাদেরকে” অনেক ক্ষেত্রে হয়েছে “আমাদের”, “করিবার” হয়েছে “করতে”। ইংরেজিতে “going to” কথ্য উচ্চারণে “gonna”-র দিকে গেছে। ফরাসি, স্প্যানিশ, আরবি, হিন্দি, বাংলা সব ভাষাতেই দ্রুত কথনের চাপ ধ্বনিকে পাল্টায়।
এ নিয়ে বিরক্ত হওয়া যায়। পরিবর্তন থামানো যায় না।
তবে সব সংক্ষেপণ ভাষার স্থায়ী সম্পদ হয় না। কিছু রূপ আসে, কিছুদিন জনপ্রিয় থাকে, পরে হারিয়ে যায়। ভাষা এক বিশাল বাজারের মতো। প্রতিদিন নতুন শব্দ দোকান খোলে। অধিকাংশের ব্যবসা টেকে না। কয়েকটি শব্দ রয়ে যায়, কারণ মানুষের সত্যিকারের প্রয়োজন মেটায়।
শব্দের কোনো পাসপোর্ট নেই। মানুষের যাতায়াত যেখানে, শব্দের চলাচলও সেখানে।
বাংলা ভাষা সংস্কৃত, প্রাকৃত, অপভ্রংশ, আরবি, ফারসি, পর্তুগিজ, ইংরেজি এবং নানা দেশজ ভাষা থেকে শব্দ নিয়েছে। আমরা প্রতিদিন “দরজা”, “কাগজ”, “হিসাব”, “খবর”, “সাবান”, “আলমারি”, “চাবি”, “স্কুল”, “কলেজ”, “অফিস”, “টেবিল” বলি। কথাগুলো উচ্চারণের সময় খুব কম মানুষই বিদেশি আগ্রাসনের যন্ত্রণা অনুভব করেন। শব্দগুলো এতদিন আমাদের সঙ্গে আছে যে তাদের বিদেশি পরিচয় প্রায় মুছে গেছে।
শব্দ ধার করা ভাষার দারিদ্র্যের লক্ষণ নয়। বরং জীবিত ভাষার স্বাভাবিক কাজ। যে সমাজ নতুন বস্তু, নতুন প্রতিষ্ঠান, নতুন অভিজ্ঞতা এবং নতুন মানুষের সংস্পর্শে আসে, সে ভাষা নতুন শব্দ গ্রহণ করে। গ্রহণের পরে শব্দটিকে নিজের ধ্বনি, ব্যাকরণ ও ব্যবহার অনুযায়ী বদলে নেয়।
আমরা “স্কুলে যাই”, “ফাইলটা পাঠাও”, “মিটিং ছিল”, “ফোন করেছি” বলি। বিদেশি শব্দকে বাংলা বিভক্তি, বাংলা ক্রিয়া, বাংলা বাক্যের ভেতরে বসিয়ে দিই। “ফোন” ইংরেজি থেকে এসেছে, কিন্তু “ফোনটা”, “ফোনে”, “ফোন করা”, “ফোন করেছিলাম” পুরোপুরি বাংলা ব্যাকরণের অধীনে চলে। অতিথি এসে বাড়ির নিয়ম শিখে নিয়েছে।
ভাষার শক্তি এখানেই। সে কেবল নেয় না, আত্মসাৎ করে।
অবশ্য ঋণগ্রহণের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্কও থাকে। উপনিবেশ, প্রশাসন, বাজার, প্রযুক্তি এবং শিক্ষাব্যবস্থা কোন ভাষা থেকে শব্দ বেশি আসবে তা নির্ধারণ করে। ইংরেজির বর্তমান প্রভাব কেবল তার শব্দভাণ্ডারের আকর্ষণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বিজ্ঞান, সফটওয়্যার, আন্তর্জাতিক ব্যবসা, উচ্চশিক্ষা, বিনোদন এবং চাকরির বাজারে ইংরেজির ক্ষমতা আছে। ক্ষমতা যেখানে, ভাষার প্রভাবও সেখানে।
এই প্রভাব নিয়ে ভাবা দরকার। আতঙ্কে কাঁপা দরকার নেই।
আমরা প্রায়ই মনে করি ব্যাকরণ ভাষার সংবিধান। ব্যাকরণ বইয়ের নিয়ম ভাঙলে ভাষা ভেঙে পড়বে। বাস্তবে ব্যাকরণবিদেরা ভাষা সৃষ্টি করেন না। মানুষ যে ভাষা ব্যবহার করে, তারা সেই ব্যবহারের নিয়ম শনাক্ত করে লিখে রাখেন।
অর্থাৎ ভাষা আগে, ব্যাকরণ পরে।
প্রমিত ব্যাকরণ বিশেষ একটি সময়ের, অঞ্চলের এবং সামাজিক গোষ্ঠীর ভাষাকে আদর্শ হিসেবে স্থির করে। প্রশাসন, শিক্ষা, ছাপাখানা, সংবাদপত্র এবং সাহিত্য সেই রূপকে শক্তি দেয়। অন্য উপভাষাগুলো তখন “ভুল”, “অশুদ্ধ”, “গ্রাম্য” বা “অশিক্ষিত” বলে চিহ্নিত হতে পারে।
এই বিচার সবসময় ভাষাতাত্ত্বিক নয়। এর মধ্যে শ্রেণি, অঞ্চল ও ক্ষমতার রাজনীতি থাকে।
ঢাকার বাংলা, সিলেটের বাংলা, নোয়াখালীর বাংলা, চট্টগ্রামের বাংলা, নদীয়ার বাংলা, কলকাতার বাংলা, বরিশালের বাংলা, পুরুলিয়ার বাংলা একই রকম নয়। প্রতিটি রূপের নিজস্ব ধ্বনি, শব্দ ও বাক্যগঠন আছে। কোনো অঞ্চলের মানুষ “আমি যামু” বললে তিনি ব্যাকরণহীনভাবে কথা বলেন না। তিনি একটি ভিন্ন ব্যাকরণ অনুসরণ করেন। সেই ব্যাকরণের নিয়ম প্রমিত বাংলার নিয়ম থেকে আলাদা।
আমরা অনেক সময় ভাষার বৈচিত্র্যকে অশিক্ষা বলে ভুল করি। এখানে শিক্ষিত মানুষের কাণ্ডজ্ঞান বেশ শিক্ষণীয়। একই ব্যক্তি ইউরোপের ভাষাগত বৈচিত্র্য নিয়ে বক্তৃতা দিতে পারেন, কিন্তু নিজের বাড়ির কাজের মানুষের উচ্চারণ শুনে হাসেন। বিদেশের উপভাষা সংস্কৃতি, নিজের দেশের উপভাষা ত্রুটি। আত্মগরিমারও ব্যাকরণ আছে।
শুধু শব্দের উচ্চারণ ও গঠন বদলায় না। শব্দের অর্থও বদলায়।
কোনো শব্দের অর্থ প্রসারিত হয়, কোনোটি সংকুচিত হয়, কোনোটি ইতিবাচক থেকে নেতিবাচক হয়, আবার কোনো অপমানসূচক শব্দ পরে গর্বের পরিচয়ে ব্যবহৃত হতে পারে। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে শব্দের অর্থও বদলায়।
“ভদ্রলোক” একসময় সামাজিক শ্রেণির নির্দিষ্ট পরিচয় বহন করত। এখন কথাটি আচরণ, শিক্ষিত চেহারা, কখনো বিদ্রূপ, কখনো সন্দেহ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। “আধুনিক” শব্দটি কারও কাছে মুক্তচিন্তার প্রশংসা, কারও কাছে পারিবারিক অবক্ষয়ের অভিযোগ। “ভাইরাল” আগে মূলত রোগসংক্রান্ত শব্দ ছিল। এখন একটি ভিডিও, রসিকতা, গুজব বা মানুষের অপমান কয়েক ঘণ্টায় ছড়িয়ে পড়লে তাকে ভাইরাল বলা হয়।
প্রযুক্তি পুরোনো শব্দে নতুন অর্থ বসায়। “মাউস”, “উইন্ডো”, “ক্লাউড”, “ফিড”, “ফলো”, “স্টোরি” শব্দগুলোর আগের অর্থ হারায়নি, কিন্তু ডিজিটাল জীবনে নতুন অর্থ পেয়েছে।
বাংলাতেও “পোস্ট”, “ইনবক্স”, “ব্লক”, “রিঅ্যাক্ট”, “শেয়ার” নতুন সামাজিক আচরণের নাম হয়ে উঠেছে। আমরা বলি, “সে আমাকে ব্লক করেছে।” বাক্যটি বিশ বছর আগে শুনলে কেউ হয়তো রাস্তা আটকানোর কথা ভাবত। এখন এর ভেতরে সম্পর্ক ভাঙা, অপমান, আত্মরক্ষা, রাগ এবং ডিজিটাল নির্বাসন একসঙ্গে থাকে।
ভাষা নতুন জীবনকে ধারণ করতে পুরোনো পাত্রে নতুন অর্থ ঢালে।
প্রতিটি প্রজন্মের মনে হয় পরবর্তী প্রজন্ম ভাষা নষ্ট করছে। সম্ভবত মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে কানের সহনশীলতা কমে এবং স্মৃতির ভাষা পবিত্র হয়ে ওঠে।
বয়োজ্যেষ্ঠরা বলেন, তরুণেরা পুরো বাক্য লেখে না। তরুণেরা বলে, এত বড়ো বাক্য লেখার সময় কার আছে। একজন লেখেন “ধন্যবাদ”, অন্যজন লেখে “থ্যাংকস”, আরেকজন কেবল একটি ইমোজি পাঠায়। প্রথমজন ভাবেন ভাষা শেষ। তৃতীয়জন মনে করে তার কাজ শেষ।
ইমোজি ভাষাকে ধ্বংস করেছে, এমন অভিযোগও শোনা যায়। কিন্তু মুখোমুখি কথোপকথনে আমরা শুধু শব্দ ব্যবহার করি না। মুখের ভঙ্গি, চোখ, কণ্ঠের ওঠানামা, বিরতি, হাসি, হাতের নড়াচড়া অর্থ তৈরি করে। লিখিত ডিজিটাল কথোপকথনে এসব অনুপস্থিত। ইমোজি সেই শূন্যতার কিছু অংশ পূরণ করে। একটি বাক্যের শেষে হাসিমুখ কখনো জানায় কথাটি রসিকতা, রাগ নয়।
সমস্যা অবশ্য আছে। সংক্ষিপ্ত যোগাযোগ গভীর চিন্তার বিকল্প হয়ে উঠলে ভাষার ক্ষমতা সংকুচিত হতে পারে। সব আবেগ যদি পাঁচটি ইমোজি দিয়ে মেটানো হয়, অভিজ্ঞতার সূক্ষ্মতা প্রকাশের অভ্যাস দুর্বল হয়। কিন্তু এর দায় ইমোজির একার নয়। মানুষের সময়, মনোযোগ, শিক্ষা, পাঠাভ্যাস এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত।
টেলিগ্রাম মানুষকে ছোট বাক্য শিখিয়েছিল। সংবাদপত্র শিরোনামের ভাষা তৈরি করেছে। রেডিও উচ্চারণ বদলেছে। সিনেমা সংলাপ ছড়িয়েছে। টেলিভিশন আঞ্চলিক ভাষাকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যম গতি বাড়িয়েছে, লেখক-পাঠকের ব্যবধান কমিয়েছে, একই সঙ্গে গুজব, অশ্রাব্যতা এবং তড়িঘড়ি মতামতের কারখানাও খুলেছে।
প্রযুক্তি ভাষাকে ব্যবহার করে। ভাষাও প্রযুক্তিকে নিজের মতো করে নেয়।
এখানে একটি জরুরি পার্থক্য আছে। সব পরিবর্তন ভাষার ক্ষতি নয়। আবার সব পরিবর্তন নিরীহও নয়।
কোনো ভাষায় নতুন শব্দ ঢোকা, উচ্চারণ বদলানো, বাক্য ছোট হওয়া, নতুন উপভাষার মর্যাদা পাওয়া স্বাভাবিক পরিবর্তন। কিন্তু একটি ভাষার বক্তারা যদি শিক্ষা, চাকরি, আদালত, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং প্রশাসনে নিজেদের ভাষা ব্যবহার করতে না পারেন, তখন ভাষাটি ধীরে ধীরে ক্ষেত্র হারায়। ঘরের ভাষা হয়ে থাকে, জ্ঞানের ভাষা থাকে না। পরে ঘরও তাকে ছাড়তে শুরু করে।
ভাষার মৃত্যু সাধারণত শেষ বক্তার মৃত্যুর দিন শুরু হয় না। তার অনেক আগে শিশুদের মুখ থেকে ভাষাটি সরে যায়।
মা-বাবা ভাবেন, মাতৃভাষা শিখলে সন্তানের ইংরেজি দুর্বল হবে। তাই বাড়িতেও ইংরেজিতে কথা বলেন। শিশুটি ইংরেজি শেখে, কিন্তু দাদি বা নানির সঙ্গে গভীর কথোপকথনের ভাষা হারায়। পারিবারিক স্মৃতি অনুবাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। পুরোনো গান, কৌতুক, লোককথা, আত্মীয়তার সূক্ষ্ম সম্বোধন, রাগের ভঙ্গি, স্নেহের শব্দ ধীরে ধীরে অচেনা হয়।
এখানে ক্ষতি কেবল শব্দের নয়। একটি পৃথিবীর।
ভাষার সঙ্গে মানুষ তার শ্রেণিবিন্যাস, প্রকৃতির জ্ঞান, খাদ্যের নাম, আত্মীয়তার সম্পর্ক, হাস্যরস, লজ্জা, শোক এবং সময়ের স্মৃতি বহন করে। ভাষা হারালে এই জ্ঞানের বড়ো অংশও হারায়।
তাই ভাষা পরিবর্তনকে স্বাগত জানানো এবং ভাষা বিলুপ্তির বিরুদ্ধে কাজ করা পরস্পরবিরোধী নয়। জীবন্ত ভাষাকে বদলাতে দিতে হয়। একই সঙ্গে তাকে শিক্ষা, জ্ঞান, প্রযুক্তি ও দৈনন্দিন মর্যাদার জায়গা দিতে হয়।
শুদ্ধ ভাষা দরকার। কিন্তু শুদ্ধতার অর্থ কী, তা নিয়ে সতর্ক থাকা দরকার।
বিদ্যালয়ের উত্তরপত্র, আদালতের রায়, চিকিৎসার নির্দেশ, বিজ্ঞানবিষয়ক লেখা, সরকারি নথি এবং সংবাদে স্পষ্ট, স্থিতিশীল ও সম্মত ভাষার প্রয়োজন। একটি শব্দের অর্থ সবাই ভিন্নভাবে নিলে বিপদ হতে পারে। ভাষার মানরূপ এই যোগাযোগ সহজ করে।
কিন্তু মানরূপকে ভাষার একমাত্র বৈধ রূপ ধরে নিলে সমস্যা শুরু হয়। বাড়ির আড্ডা, উপন্যাসের সংলাপ, লোকগান, নাটক, প্রেমপত্র এবং পাড়ার চায়ের দোকানে আদালতের ভাষা চলবে না। সেখানে মানুষের মুখের স্বাভাবিকতা দরকার।
একজন লেখক চরিত্রের মুখে তার সামাজিক অবস্থান, অঞ্চল, বয়স ও মানসিকতার সঙ্গে অসংগত ভাষা বসালে চরিত্রটি কাগজে থাকে, জীবনে আসে না। প্রকৃত অভিজ্ঞতা এবং মানুষের চলতি ভাষা ছাড়া সাহিত্য কৃত্রিম হয়ে ওঠে।
ভাষার শুদ্ধতা তাই প্রসঙ্গনির্ভর। শোকবার্তার ভাষা এবং বন্ধুর সঙ্গে ঠাট্টার ভাষা এক হবে না। গবেষণাপত্র এবং ফেসবুক পোস্টের ভাষাও এক নয়। ভাষাজ্ঞান মানে শুধু সঠিক বানান জানা নয়। কোথায় কীভাবে কথা বলতে হয়, সেটিও ভাষাজ্ঞান।
ভাষা নিয়ে সিদ্ধান্ত সাধারণত শিক্ষিত, শহুরে এবং প্রতিষ্ঠানক্ষম মানুষ নেন। অভিধান লেখেন তাঁরা, পাঠ্যবই তৈরি করেন তাঁরা, সংবাদমাধ্যমের ভাষা নির্ধারণ করেন তাঁরা। কিন্তু ভাষার আসল শ্রমিক ছড়িয়ে থাকে সর্বত্র। রিকশাচালক, দোকানি, অভিবাসী শ্রমিক, শিশু, গৃহকর্মী, নাট্যকার, গায়ক, প্রেমিক-প্রেমিকা, অনলাইন গেমার, অফিসকর্মী, গ্রাম্য বৃদ্ধা, স্কুলপড়ুয়া কিশোর সবাই প্রতিদিন ভাষা তৈরি করে।
কোন শব্দ টিকে থাকবে, তা কোনো একাডেমি একা নির্ধারণ করতে পারে না। মানুষ প্রয়োজনমতো শব্দ গ্রহণ করে, বদলায়, ফেলে দেয়।
রাষ্ট্র অবশ্য ভাষার গতিপথে বড়ো ভূমিকা রাখে। কোন ভাষায় শিক্ষা হবে, চাকরির পরীক্ষা হবে, আদালতের কাজ হবে, প্রযুক্তির সফটওয়্যার তৈরি হবে, তা ভাষার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। বাজারও একই কাজ করে। যে ভাষায় অর্থনৈতিক সুযোগ বেশি, মানুষ সেই ভাষার দিকে যায়।
তাই ভাষার “স্বাভাবিক” পরিবর্তনের পেছনে অনেক সময় অসম ক্ষমতা কাজ করে। কোনো জনগোষ্ঠী নিজের ভাষা স্বেচ্ছায় ছাড়ছে মনে হলেও, সিদ্ধান্তের পেছনে চাকরি, সামাজিক মর্যাদা, উপহাস এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলা থাকতে পারে।
ভাষার স্বাধীনতা বলতে কেবল কথা বলার স্বাধীনতা বোঝায় না। নিজের ভাষায় শিক্ষা, চিকিৎসা, বিচার, প্রযুক্তি এবং জ্ঞান পাওয়ার সুযোগও বোঝায়।
লেখক ভাষার পরিবর্তন আটকাতে পারেন না। তাঁর কাজ পুলিশি পাহারা দেওয়া নয়। তবে তিনি ভাষার সম্ভাবনাকে প্রসারিত করতে পারেন।
একজন লেখক পুরোনো শব্দ ফিরিয়ে আনতে পারেন, আঞ্চলিক শব্দকে নতুন মর্যাদা দিতে পারেন, বিদেশি ধারণার যথাযথ বাংলা খুঁজে পেতে পারেন, নতুন বাক্যরীতি তৈরি করতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি ভাষাকে অকারণে দুর্বোধ্যও করতে পারেন। অভিধান খুলে পাওয়া বিরল শব্দ দিয়ে পাঠকের ওপর পাণ্ডিত্য চাপিয়ে দেওয়া সহজ। মানুষের জটিল অভিজ্ঞতা পরিষ্কার ভাষায় বলা অনেক কঠিন।
আমার নিজেরও এই দোষ আছে। কখনো একটি সহজ কথা লিখতে গিয়ে এমন শব্দ বসিয়েছি, যা পড়ে আমাকেই পরে অভিধান দেখতে হয়েছে। লেখক তখন পাঠককে আলো দেখান না, নিজের টর্চের দাম দেখান।
ভাষার প্রতি দায়িত্ব মানে ভাষাকে পাথর করে রাখা নয়। তাকে ব্যবহারযোগ্য, সুনির্দিষ্ট, জীবন্ত এবং বহুস্বরী রাখা।
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান, দর্শন, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান ও আইনের জটিল বিষয় লেখা প্রয়োজন। শুধু কবিতা, স্মৃতি ও আবেগ দিয়ে একটি ভাষা পূর্ণ আধুনিক জীবন বহন করতে পারে না। শিশু যেন বাংলায় ভালো গল্প পড়তে পারে, আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিনতত্ত্ব, জলবায়ু, মহাকাশ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও নৈতিকতা নিয়েও পড়তে পারে।
কোনো ধারণার উপযুক্ত বাংলা শব্দ না থাকলে বিদেশি শব্দ ব্যবহার করা অপরাধ নয়। তবে অলসতার কারণে প্রতিটি বাক্যে ইংরেজি ঢুকিয়ে দিলে ভাষার নিজস্ব চিন্তাশক্তি দুর্বল হতে পারে। অনুবাদ শুধু শব্দ বদল নয়। নতুন জ্ঞানকে নিজের ভাষার চিন্তার কাঠামোর মধ্যে আনা।
এই কাজ ধীর। অনেক শব্দ ব্যর্থ হবে। কিছু শব্দ হাস্যকর শোনাবে। কয়েকটি টিকে যাবে। ভাষার ইতিহাস এমন ব্যর্থ প্রচেষ্টায় ভর্তি।
ভবিষ্যতের বাংলা আজকের বাংলার মতো থাকবে না। উচ্চারণ বদলাবে। আরও ইংরেজি শব্দ আসবে। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং প্রবাসী বাঙালির ভাষার দূরত্ব কোথাও বাড়বে, কোথাও প্রযুক্তির কারণে কমবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কথ্য ভাষাকে লিখিত রূপ দেবে, অনুবাদ সহজ করবে, আবার একটি গড়পড়তা যান্ত্রিক ভাষাও ছড়িয়ে দিতে পারে। আঞ্চলিক উচ্চারণের ডেটা কম থাকলে প্রযুক্তি সেই ভাষাগুলোকে ভুল শুনবে। ভুল শুনতে শুনতে মানুষ হয়তো যন্ত্রের সুবিধার জন্য নিজের উচ্চারণ বদলাবে।
আগে মানুষ প্রতিষ্ঠানের ভাষা শিখত। এখন মানুষকে যন্ত্রের ভাষাও শিখতে হচ্ছে।
তবু আমি খুব হতাশ নই। বাংলা বহু রাজনৈতিক বিভাজন, উপনিবেশ, দুর্ভিক্ষ, অভিবাসন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং শিক্ষানীতির চাপের মধ্যেও টিকে আছে। টিকে থাকার কারণ তার কোনো অপরিবর্তনীয় বিশুদ্ধতা নয়। কারণ মানুষ তাকে বদলে বদলে ব্যবহার করেছে।
সেদিন বইয়ের দোকান থেকে পুরোনো অভিধানটি কিনেছিলাম। বাড়িতে এনে দেখি, আগের মালিক কয়েকটি শব্দের পাশে নিজের হাতে নতুন অর্থ লিখেছেন। কোনো শব্দের পাশে সংবাদপত্রের কাটিং, কোথাও আঞ্চলিক ব্যবহার, কোথাও প্রশ্নচিহ্ন।
অভিধানটি তখন আর মৃত শব্দের কবরখানা মনে হয়নি। মনে হল, একজন মানুষ ভাষার চলাচল ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। ছাপা অর্থের পাশে জীবনের অর্থ লিখে গেছেন।
ভাষা এভাবেই বেঁচে থাকে। একজনের মুখ থেকে আরেকজনের মুখে যায়। পথে উচ্চারণ বদলায়, অর্থ বদলায়, কিছু হারায়, কিছু পায়। আমরা তাকে উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ করি, কিছুদিন ব্যবহার করি, তারপর পরের মানুষের হাতে তুলে দিই।
হাতে তুলে দেওয়ার সময় ভাষাটি আগের মতো থাকে না।
থাকার কথাও নয়।


