ভূতের গল্প বলে কি কিছু আছে?
বিকেলের আলো যখন একটু নরম হয়ে আসে, মাঠের ঘাসের ডগায় সূর্যের শেষ সোনালি দাগ পড়ে থাকে, তখন পৃথিবীকে খুব নির্দোষ মনে হয়। সেই বয়সে, ক্লাস থ্রির ছোট্ট আমিও পৃথিবীকে তেমনই নির্দোষ ভেবেছিলাম—যেখানে ফুটবল মানেই চিৎকার, দৌড়, ধুলো উড়ে ওঠা, আর হেরে গেলে মন খারাপ। মৃত্যুর কোনো জায়গা সেখানে ছিল না।
রাসেল ছিল আমার ঠিক উল্টো। আমি একটু ভীরু, ও একটু দুঃসাহসী। আমি বল পায়ে নিয়ে বেশি ভাবতাম, ও ভাবত না—সোজা শট মারত। আমাদের বাড়ির সামনে যে ফাঁকা জমি, সেটাই ছিল আমাদের বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম। দু’পাশে আমগাছ, মাঝখানে ইঁট পুঁতে গোলপোস্ট, আর দর্শক বলতে দুই-একটা পথচলতি কাক।
সেদিনও বিকেলে আমরা খেলছিলাম। অনেকক্ষণ। ঘাম জামা ভিজিয়ে দিয়েছে, হাঁটুতে কাদা লেগেছে। রাসেল বলল, “চল, আজকে পুকুরে ঝাঁপ দেই।”
ওর গলায় সেই চেনা উচ্ছ্বাস।
আমি একটু ইতস্তত করেছিলাম। কিন্তু ওর সঙ্গে থাকলে ভয়টয় থাকে না।
আমরা পুকুরঘাটে গেলাম। দুপুরের রোদ তখন কিছুটা নেমে এসেছে, জল সবুজ, একটু নড়লেই গোল গোল তরঙ্গ উঠছে। পুকুরটার একধারে বাঁধানো সিঁড়ি, শেওলা জমে পিচ্ছিল। আমরা জামা খুলে একসাথে ঝাঁপ দিলাম। ঠান্ডা জলে প্রথম ধাক্কাটা লেগে শরীর কেঁপে উঠল, তারপর অভ্যেস হয়ে গেল।
রাসেল সাঁতার জানত আমার চেয়ে ভালো। ও জলের তলায় ডুব দিয়ে অনেকক্ষণ থাকত, তারপর হঠাৎ আমার পেছন থেকে উঠে এসে চমকে দিত। আমি গাল দিতাম, ও হেসে উঠত।
সেদিনও ও ডুব দিল। আমি জলের ওপর ভেসে ছিলাম। কয়েক সেকেন্ড। তারপর ও উঠে এল, চোখে সেই দুষ্টু ঝিলিক।
আমরা অনেকক্ষণ ছিলাম। তারপর ভিজে গায়ে, কাঁধে জামা নিয়ে, দু’জনেই হাঁটতে হাঁটতে ফিরছিলাম। আমাদের বাড়ির আগে রাসেলদের বাড়ি। ও বলল, “কাল আবার খেলবি তো?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, তবে আজ আর মারিস না এত জোরে।”
ও হেসেছিল। খুব স্বাভাবিক হাসি।
সন্ধের আলো তখন গাঢ় হচ্ছিল।
রাসেলদের বাড়ির কাছাকাছি আসতেই কেমন যেন অস্বাভাবিক শব্দ পেলাম। কান্না। অনেকগুলো গলা।
প্রথমে ভেবেছিলাম কারো অসুখ হয়েছে।
আমি ওর দিকে তাকাতে গিয়েছিলাম—কিন্তু পাশে কেউ নেই।
আমি ঠিক কখন থেকে একা হাঁটছি, সেটা মনে নেই।
বাড়ির উঠোনে ঢুকতেই দেখি অনেক মানুষ। রাসেলের মা মাটিতে বসে কাঁদছেন, মাথায় হাত দিয়ে। পাশের বাড়ির কাকিমারা তাঁকে ধরে রেখেছেন। একজন বলছেন, “দুপুরে পুকুরে ডুবে গেছে… কত খুঁজে তারপর তুলল…”
আমি ভেতরে ঢুকে দাঁড়িয়ে রইলাম।
কারো নজরে পড়িনি।
আমার কানে শুধু একটা কথাই বাজছিল—দুপুরে পুকুরে ডুবে গেছে।
দুপুরে?
আমরা তো বিকেলে খেললাম। পুকুরে নামলাম। ও ডুব দিল। উঠে এল। কথা বলল। হেসে উঠল।
কাল আবার খেলব বলল।
আমি ঠান্ডা হয়ে গেলাম। শরীর কাঁপছিল, কিন্তু সেটা ভয়ে না ঠান্ডায় বুঝতে পারছিলাম না। আমার পায়ের নিচে মাটি যেন একটু নরম হয়ে গেছে।
আমি কি স্বপ্ন দেখেছি?
আমি কি একাই খেলেছি, আর ভেবেছি রাসেল আছে?
না কি…
সেদিন রাতে ঘুমাতে পারিনি। চোখ বন্ধ করলেই সেই ডুব দেওয়া মুখটা দেখি। জলের তলা থেকে উঠে আসা চোখ।
হয়তো সে আর উঠেইনি।
হয়তো আমি যে উঠে আসতে দেখেছি, সেটা কেবল আমার বিশ্বাস।
বছর কেটে গেছে। এখন বুঝি, শৈশবের স্মৃতি সরল রেখায় চলে না। তারা কুয়াশার মতো। তবু কিছু কিছু মুহূর্ত এত স্পষ্ট যে সেগুলোকে অস্বীকার করা যায় না।
আমি আজও পুকুরের দিকে তাকালে মনে মনে গুনে দেখি—ডুব দিল, এক, দুই, তিন…
কত সেকেন্ড পরে ওঠে?
আর মাঝে মাঝে ভাবি, হয়তো মৃত্যুরও একটা দেরি আছে। হয়তো সে দুপুরে এসে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু বিকেলের শেষ খেলাটা শেষ না করে তাকে নিতে পারেনি।
তখন আমি ছোট। ক্লাস থ্রি।
সেই প্রথম বুঝলাম, পৃথিবী সবসময় নির্দোষ নয়।
কখনও কখনও, সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে—আর আমাদের সঙ্গে এমন কাউকে খেলতে দেয়, যে ইতিমধ্যেই চলে গেছে।


