আমার লেখাটেখা পড়েন এমন একজন শ্রদ্ধেয় পাঠক সেদিন বললেন, “আপনি জীবিনী লেখেন।”
আমি বললাম, “জীবিনী?”
তিনি বললেন, জীবনী। মানুষের জীবনী, পশুপাখির জীবনী, গাছপালার জীবনী, কখনো কোনো শহরের, কখনো কোনো নদীর, কখনো একটি পুরোনো বাড়ির। আপনি যাকে নিয়ে লিখুন না কেন, শেষ পর্যন্ত তার জীবনটাই সামনে এসে দাঁড়ায়।
কথাটা শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। কারণ লেখককে নিয়ে পাঠকের ধারণা অনেক সময় লেখকের নিজের ধারণার চেয়েও নির্ভুল হয়। আমরা নিজেদের সম্পর্কে যে কথাটি বহুদিনে বুঝে উঠতে পারি না, কোনো পাঠক কখনো কখনো এক বাক্যে তা বলে ফেলেন। তারপর সেই বাক্যটি আমাদের মনের মধ্যে বসে থাকে। ঘুমের মধ্যে, বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়িয়ে, দুপুরের একাকিত্বে, কিংবা লেখার টেবিলে কাগজের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হয়, কথাটা কি সত্যিই এমন?
আমি কি জীবনী লিখি?
জীবনী বলতে আমরা সাধারণত একজন মানুষের জন্ম, বংশপরিচয়, শিক্ষা, কর্মজীবন, প্রেম, বিবাহ, সাফল্য, ব্যর্থতা, খ্যাতি, মৃত্যু এবং মৃত্যুর পরের স্মৃতিকে বুঝি। কোনো মানুষ কোথায় জন্মেছিলেন, কার সন্তান ছিলেন, কোন বিদ্যালয়ে পড়েছিলেন, কী কাজ করেছিলেন, কোন বই লিখেছিলেন, কী পুরস্কার পেয়েছিলেন, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল, কার সঙ্গে বিরোধ ছিল, কীভাবে পৃথিবী তাঁকে মনে রেখেছে—এইসব তথ্য জড়ো করে আমরা তাঁর জীবনের একটি ক্রম নির্মাণ করি। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একটি সরল রেখা টেনে বলি, এই হলো অমুক মানুষের জীবন।
কিন্তু জীবন কি সত্যিই এত সরল?
একজন মানুষের জীবন কি কেবল তার নিজের শরীরের ভিতর সীমাবদ্ধ? তার শৈশব কি কেবল তার ব্যক্তিগত শৈশব? তার দুঃখ কি শুধু তার নিজের? তার ভাষা, খাদ্য, পোশাক, ভয়, আকাঙ্ক্ষা, লজ্জা, উচ্চাশা, প্রেম, ঈর্ষা, ধর্ম, রাজনীতি, এমনকি তার একাকিত্বও কি নিছক ব্যক্তিগত?
একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু তার জন্মের আগে থেকেই তাকে ঘিরে বহু মানুষের প্রত্যাশা, ভয়, অর্থনৈতিক হিসাব, সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক স্মৃতি এবং অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষা কাজ করতে থাকে। সে যে ভাষায় প্রথম কথা বলে, সেই ভাষা তার নিজের তৈরি নয়। যে মাটিতে প্রথম হাঁটে, যে জল পান করে, যে ঘরে ঘুমায়, যে পাখির ডাক শুনে সকাল চিনতে শেখে, যে মানুষের মুখ দেখে ভালোবাসা ও ভয় আলাদা করতে শেখে, তার জীবনের মধ্যে সেই সব মানুষ ও বস্তু নিঃশব্দে প্রবেশ করে থাকে।
তাহলে একটি মানুষের জীবনী কোথা থেকে শুরু করব?
জন্মের দিন থেকে?
তারও আগে থেকে?
তার মায়ের শৈশব থেকে? তার পিতার দারিদ্র্য থেকে? তার পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারানোর ইতিহাস থেকে? যে নদী ভেঙে তাদের গ্রাম সরিয়ে দিয়েছিল, সেই নদী থেকে? যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তার পরিবার শহরে এসে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছিল, সেই সিদ্ধান্ত থেকে? যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে তার বাবা সারাজীবন অনিশ্চিত চাকরি করেছেন, সেই ব্যবস্থা থেকে?
প্রশ্নটি সহজ নয়।
আমার শ্রদ্ধেয় পাঠক আরও বললেন, পৃথিবীর ঘাস, মাটি, মানুষ, পশু ও পাখি—সবার জীবনী লেখা হলে আপনার একার আলাদা জীবনী লেখা না হলেও চলে যেত বেশ। আপনার সকল ব্যথা, প্রস্তাব, প্রয়াস তবু সবই লিপিবদ্ধ থেকে যেত।
এই কথার মধ্যে একদিকে স্নেহ আছে, অন্যদিকে একটি গভীর দার্শনিক ধারণা। তিনি হয়তো বলতে চেয়েছেন, মানুষের ব্যক্তিগত জীবন বলে আমরা যে জিনিসটি কল্পনা করি, তার ভিতর অন্য সব জীবনের ছায়া মিশে থাকে। আমি যে দুঃখের কথা লিখি, তার মধ্যে কেবল আমার দুঃখ থাকে না। সেখানে আমার আগে যারা দুঃখ পেয়েছে তাদেরও কিছু অংশ থাকে। আমি যে ভালোবাসার কথা লিখি, তার মধ্যে আমার ব্যক্তিগত প্রেমের পাশাপাশি মানুষের দীর্ঘ প্রেমের ইতিহাস, বিচ্ছেদের ভয়, আকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতা, অপেক্ষার ক্লান্তি এবং শরীরের নিজস্ব স্মৃতি কাজ করে।
আমার ব্যথা কি কেবল আমার?
একজন মানুষ যখন প্রিয় কাউকে হারিয়ে কাঁদেন, তাঁর কান্না ব্যক্তিগত। কিন্তু মৃত্যুর অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত নয়। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনো সময়ে কাউকে হারিয়েছে, হারানোর আশঙ্কায় থেকেছে, অথবা নিজের মৃত্যুর কথা ভেবেছে। একটি কণ্ঠের কান্না থেকে আমরা অন্য কণ্ঠের কান্না চিনতে পারি। একটি মুখের শূন্যতা দেখে বহু মুখের শূন্যতা মনে পড়ে। এই মিল কোথা থেকে আসে? মানুষের শরীর কি এমন কোনো প্রাচীন স্মৃতি বহন করে, যার কারণে অন্যের দুঃখ আমাদের ভিতরে এসে আঘাত করে?
আবার, সব দুঃখ কি সমান?
একজন রাজপুত্রের নির্বাসন এবং একজন ভূমিহীন কৃষকের উচ্ছেদকে একই শব্দে “দুঃখ” বলা যায়, কিন্তু তাদের সামাজিক বাস্তবতা এক নয়। একজনের দুঃখে কবিতা লেখা হয়, অন্যজনের দুঃখ প্রশাসনিক নথিতে একটি সংখ্যা হয়ে থাকে। একজনের চোখের জল ইতিহাসে সংরক্ষিত হয়, অন্যজনের কান্না তার ঘরের দেওয়ালও শুনতে পায় না। অতএব মানুষের যৌথ জীবনের কথা বলতে গেলে ক্ষমতার কথাও বলতে হবে। কার জীবন লেখা হচ্ছে, কার জীবন বাদ যাচ্ছে, কে নিজের গল্প বলার অধিকার পাচ্ছে, আর কার হয়ে অন্য কেউ কথা বলছে—এই প্রশ্নগুলো ছাড়া কোনো জীবনী সম্পূর্ণ হয় না।
আমরা ইতিহাসে রাজাদের জীবনী পড়ি। তাঁদের জন্ম, যুদ্ধ, জয়, পরাজয়, বিবাহ, উত্তরাধিকার, রাজনীতি সব লিপিবদ্ধ থাকে। কিন্তু সেই রাজপ্রাসাদ নির্মাণে যে শ্রমিক পাথর কেটেছিল, তার নাম কোথায়? রাজ্যের খাদ্য উৎপাদনকারী কৃষকের জীবন কোথায়? রাজদরবারের রান্নাঘরে যে নারী প্রতিদিন আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন, তাঁর দেহের ক্লান্তি কোথায়? যে সৈনিক যুদ্ধে গিয়ে আর ফিরে এল না, তার মায়ের অপেক্ষা কে লিখল? যে ঘোড়া রাজাকে যুদ্ধে বহন করল, তার শরীরের ক্ষত কোনো ইতিহাসে জায়গা পেল কি?
জীবনী যদি জীবনের পূর্ণ বিবরণ হয়, তাহলে সেই জীবনী কখনো এক ব্যক্তির মধ্যে শেষ হতে পারে না।
একজন রাজাকে বুঝতে হলে তার রাজ্য বুঝতে হয়। রাজ্যকে বুঝতে হলে তার প্রজাদের জীবন বুঝতে হয়। প্রজাদের জীবন বুঝতে হলে তাদের জমি, খাদ্য, ঋতু, রোগ, নদী, বাজার, যুদ্ধ, কর এবং ভয়ের ইতিহাস জানতে হয়। সেই ইতিহাসে পশুপাখিরও স্থান আছে। যুদ্ধের সময় ঘোড়া মারা যায়, হাতি মারা যায়, গবাদি পশু লুট হয়, বন পুড়ে যায়, নদী দূষিত হয়। মানুষ নিজের সভ্যতার কাহিনি লিখতে গিয়ে প্রকৃতির ধ্বংসকে অনেক সময় পাদটীকা করে রাখে। অথচ সেই ধ্বংস ছাড়া মানুষের জয় অসম্ভব ছিল।
কোনো নগরীর জীবনী লিখতে গেলে তার রাস্তা, সেতু, বাড়ি, বাজার, বিদ্যালয় এবং স্মৃতিস্তম্ভের পাশাপাশি নর্দমা, বস্তি, গাছ, ভাঙা ফুটপাত, পথকুকুর, রাতের প্রহরী এবং ভোরের সংবাদপত্র বিক্রেতাকেও লিখতে হয়। শহর কেবল স্থাপত্যের সমষ্টি নয়। শহর মানুষের শরীরের উপরও নির্মিত হয়। কারও শ্রমে, কারও নিঃসঙ্গতায়, কারও অদৃশ্য পরিচর্যায়, কারও স্থানচ্যুতিতে।
একটি বাড়িরও কি জীবনী থাকে?
থাকে। বাড়ির দেওয়ালে হাতের ছাপ থাকে, রান্নাঘরে পুরোনো গন্ধ থাকে, জানালার কাচে মৃত মানুষের আঙুলের রেখা থাকে, আলমারির ভিতর এমন জামা থাকে যা আর কেউ পরবে না। ঘরের টেবিলে বসে কেউ একদিন চাকরির চিঠি পেয়েছিল, কেউ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিল, কেউ প্রেমপত্র লিখেছিল, কেউ অসুস্থ হয়ে শুয়ে ছিল, কেউ নিজের মৃত্যুর খবর শুনেছিল। বাড়ি এসব ঘটনা মনে রাখে না মানুষের মতো করে, তবু তার কাঠ, চুন, ধুলো এবং আলোতে ঘটনাগুলোর চিহ্ন থেকে যায়।
তাহলে কোনো বাড়ির জীবন লিখতে গেলে তার বাসিন্দাদের জীবন লিখতে হবে। বাসিন্দাদের জীবন লিখতে গেলে তাদের বাইরে থাকা মানুষদেরও লিখতে হবে—দুধওয়ালা, মিস্ত্রি, ধোপা, কাজের মানুষ, ডাকপিয়ন, পাশের বাড়ির বৃদ্ধা, সেই ছেলেটি যে প্রতিদিন গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত। প্রত্যেকেই বাড়িটির অস্তিত্বে সামান্য করে অংশ নিয়েছে।
আমরা সাধারণত সম্পর্ককে আলাদা আলাদা করে দেখি। এই মানুষটি আমার বাবা, ওই মানুষটি আমার বন্ধু, সে আমার সহকর্মী, ওটি আমার পোষা প্রাণী, ওই গাছটি আমার উঠোনের গাছ। কিন্তু জীবন এই আলাদা পরিচয়গুলোকে এত সুশৃঙ্খলভাবে মানে না। একটি গাছের ছায়ায় যে শিশু খেলা করে, সে গাছটির জীবনের অংশ হয়ে যায়। যে কুকুরটি প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট দরজার সামনে অপেক্ষা করে, তার অপেক্ষা সেই পরিবারের ইতিহাসের বাইরে থাকে না। যে পাখিটি জানালার কার্নিশে এসে বসে, তার ডাক কোনো একাকী মানুষের দিনের ভিতর সামান্য পরিবর্তন ঘটায়। পরিবর্তনটি হয়তো এত ক্ষুদ্র যে কেউ তাকে ঘটনা বলে গণ্য করবে না। কিন্তু জীবনের অধিকাংশ পরিবর্তনই তো প্রথমে এমন ক্ষুদ্র থাকে।
আমার লেখা যদি মানুষের জীবন থেকে পশুপাখির জীবন, পশুপাখির জীবন থেকে গাছপালা, গাছপালা থেকে মাটি, মাটি থেকে ঋতু এবং ঋতু থেকে ইতিহাসের দিকে যেতে থাকে, তাহলে তার কারণ আমার কোনো বিশেষ মহত্ত্ব নয়। কারণ জীবন নিজেই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। আমরা একে অন্যের ভিতর প্রবেশ করে থাকি, যদিও সে প্রবেশের কথা সচরাচর মনে রাখি না।
যে মানুষটি সারাজীবন নিজেকে একা ভেবেছেন, তাঁর একাকিত্বের মধ্যেও কত মানুষ উপস্থিত থাকে। মায়ের বলা একটি বাক্য, বাবার নীরবতা, বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতা, শিক্ষকের প্রশংসা, কোনো নারীর চলে যাওয়া, সন্তানের মুখ, মৃত বন্ধুর চিঠি—সব মিলিয়ে তাঁর একাকিত্ব তৈরি হয়েছে। মানুষের ভিড় থেকে দূরে সরে গেলেই মানুষ নিজের কাছে পৌঁছে যায় না। বরং অনেক সময় তখনই বোঝা যায়, আমরা নিজেদের ভিতর কত মানুষের কণ্ঠ বহন করছি।
একজন লেখক যখন নিজের কথা লেখেন, তখনও তিনি একা লেখেন না। তাঁর শব্দের মধ্যে ভাষার পূর্বপুরুষেরা বসে থাকেন। তিনি যে বাক্য গঠন করেন, তার অনেক অংশ বহু শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত। তিনি যে উপমা দেন, তার ভিতর অন্য লেখকদের স্মৃতি থাকে। তিনি যে অভিজ্ঞতাকে ব্যক্তিগত বলে মনে করেন, তা হয়তো বহু মানুষের জীবনে অন্য রূপে পুনরাবৃত্ত হয়েছে। এমনকি তাঁর নীরবতাও সামাজিক ইতিহাসের ফল। কোন কথা তিনি সহজে বলতে পারেন, কোন কথা বলতে লজ্জা পান, কোন ব্যথা গোপন রাখেন, কোন অপরাধকে অপরাধ বলে চিনতে পারেন না—এসবও তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বাইরে বৃহত্তর সমাজের দ্বারা গঠিত।
তাহলে লেখকের “নিজস্ব” জীবন কোথায়?
হতে পারে, নিজস্বতা কোনো বিচ্ছিন্ন সম্পত্তি নয়। একজন মানুষ নিজের জীবনকে যেভাবে গ্রহণ করেন, সাজান, প্রত্যাখ্যান করেন এবং অর্থ দেন, সেই কাজের মধ্যেই তাঁর স্বাতন্ত্র্য। আমরা সবাই একই পৃথিবীর মাটি, জল, ভাষা ও ইতিহাসের সন্তান, কিন্তু প্রত্যেকে সেই উপাদানগুলোকে ভিন্নভাবে বহন করি। একই বৃষ্টিতে একজনের শৈশব জেগে ওঠে, অন্যজনের মনে পড়ে হাসপাতালের করিডর। একই গান কারও কাছে প্রেম, কারও কাছে বিচ্ছেদ, কারও কাছে মৃত ভাইয়ের মুখ। পৃথিবী একই, কিন্তু স্মৃতির বিন্যাস আলাদা।
এই আলাদা বিন্যাসই হয়তো জীবনী।
জীবনী তখন আর কেবল ঘটনার তালিকা নয়। কে কখন জন্মালেন, কোথায় চাকরি করলেন, কত বই লিখলেন, কত পুরস্কার পেলেন—এসব তথ্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু যথেষ্ট নয়। জীবনীকে জানতে হয় মানুষটি কীভাবে পৃথিবীকে অনুভব করতেন, কোন জিনিসে তিনি ভয় পেতেন, কাকে আঘাত করেছিলেন, কার কাছে ক্ষমা চাননি, কোন অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছিলেন, কোন সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে চুপ করেছিলেন, কোন ছোট্ট আনন্দকে শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।
একজন মানুষের জীবনের ভিতর তার কাজ যেমন থাকে, তেমনই থাকে তার না-করা কাজ। যে চিঠি লেখা হয়নি, যে প্রতিবাদ করা হয়নি, যে ভালোবাসা স্বীকার করা হয়নি, যে ক্ষমা চাওয়া হয়নি, যে দরজা খোলা হয়নি, যে পথ নেওয়া হয়নি—এসবও জীবনের অংশ। জীবনীকার যদি কেবল দৃশ্যমান ঘটনাগুলো লেখেন, তাহলে জীবনের অর্ধেক অন্ধকারে পড়ে থাকে।
আমি যখন কোনো মানুষের কথা লিখি, তখন তাঁর চারপাশের নীরবতাও শুনতে চাই। তাঁর কথার সঙ্গে কার কথা মেলেনি, তাঁর সাফল্যের মূল্য কে দিয়েছে, তাঁর সিদ্ধান্তে কার জীবন বদলেছে, তাঁর গৌরবের ভিতর কার অপমান চাপা আছে, তাঁর দুঃখের কথা সবাই জানলেও তাঁর দ্বারা সৃষ্ট দুঃখের কথা কেউ কেন জানে না—এই প্রশ্নগুলোও আমার কাছে জরুরি।
কারণ মানুষ একই সঙ্গে ভুক্তভোগী এবং অপরাধী, প্রেমিক এবং অত্যাচারী, উদার এবং স্বার্থপর, ভীত এবং নিষ্ঠুর। কোনো মানুষকে একটি বিশেষণে আটকে ফেললে তাঁর জীবনের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আমরা কাউকে “মহান” বলি, কাউকে “খারাপ” বলি, কাউকে “ত্যাগী”, কাউকে “বিশ্বাসঘাতক”। তারপর সেই পরিচয়ের সঙ্গে না-মেলা ঘটনাগুলোকে ভুলে যাই। জীবনী তখন অনুসন্ধান থাকে না, স্মৃতির পক্ষে লেখা একটি প্রশংসাপত্র হয়ে দাঁড়ায়।
আমি যে আলেখ্য আঁকি, সেখানে মানুষকে তার নিজের দাবি দিয়ে নয়, তার কাজের ভিতর দিয়ে দেখতে চাই। সে কী বলেছিল, তার চেয়ে সে কী করেছিল; সে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার চেয়ে সে কী রক্ষা করেছিল; সে কাকে ভালোবাসার কথা বলেছিল, তার চেয়ে কাকে বিপদের সময়ে পাশে পেয়েছিল—এইসব প্রশ্নের ভিতর দিয়ে চরিত্রের একটি সত্য ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়।
তবে এই সত্যও সম্পূর্ণ নয়। একজন মানুষকে কোনোদিনই সম্পূর্ণ জানা যায় না। যে মানুষটি আমাদের কাছে নিষ্ঠুর, অন্য কারও কাছে সে হয়তো আশ্রয় ছিল। যে নারীকে পরিবার অবাধ্য বলেছিল, সে হয়তো নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য একমাত্র সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যে মানুষটি কাপুরুষ বলে পরিচিত, সে হয়তো এমন কোনো ভয় বহন করছিল যার কথা কেউ জানত না। আবার, এসব সম্ভাবনা দেখিয়ে প্রত্যেক অপরাধকে ক্ষমা করে দেওয়ারও কারণ নেই। মানবিক ব্যাখ্যা অপরাধকে মুছে দেয় না; বরং অপরাধের জন্ম কীভাবে হয়, কারা তাকে স্বাভাবিক করে তোলে এবং কারা তার মূল্য দেয়, সেই জিজ্ঞাসা সামনে আনে।
এই জন্যই আমার নিজের আলাদা জীবনী না লেখা হলেও হয়তো চলে যাবে। আমি যে মানুষদের লিখি, তাদের মধ্যে আমার ভয় আছে, আমার আকাঙ্ক্ষা আছে, আমার ব্যর্থতা আছে, আমার অক্ষমতা আছে। যে গাছের কথা লিখি, তার নিচে আমি কোনোদিন দাঁড়িয়েছি। যে পাখির কথা লিখি, তার উড়ে যাওয়া দেখে কোনো এক সকালে আমার মনে কিছু বদলেছে। যে মৃত মানুষের কথা লিখি, তাঁর অনুপস্থিতি আমার নিজের কোনো অনুপস্থিতির সঙ্গে গিয়ে মিশেছে। যে ঘাসের কথা লিখি, তার উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি কোনো একদিন বুঝেছি, পৃথিবী আমাদের জন্য অপেক্ষা করে না, তবু আমাদের পায়ের নিচে নিজের কোমলতা রেখে দেয়।
আমার ব্যথা যদি কোনো মানুষের জীবনে প্রতিধ্বনি পায়, তবে সেই ব্যথা আর একার থাকে না। আমার প্রয়াস যদি কোনো পাঠকের স্মৃতিতে গিয়ে জেগে ওঠে, তবে সেই প্রয়াসের মালিকানা একা আমার থাকে না। আমার প্রস্তাব, আমার সন্দেহ, আমার অর্ধসমাপ্ত চিন্তা, আমার ভুল, আমার সংশোধন—সবই পাঠকের মনে গিয়ে অন্য জীবন পায়।
তাহলে লেখকের কাজ কী?
সম্ভবত তিনি জীবন সৃষ্টি করেন না। তিনি জীবনের বিচ্ছিন্ন চিহ্নগুলো পাশাপাশি রাখেন, যাতে আমরা তাদের মধ্যে সম্পর্ক দেখতে পারি। তিনি ঘাসের পাশে মানুষের মুখ রাখেন, মাটির পাশে মৃতের হাড়, পাখির ডানার পাশে শিশুর হাত, নদীর স্রোতের পাশে কোনো নারীর নির্বাসন, পুরোনো বাড়ির পাশে একটি পরিবারের ভাঙন। তারপর প্রশ্ন করেন, এগুলো কি সত্যিই আলাদা?
আমরা বলি, এ হলো একটি মানুষের জীবন।
কিন্তু মানুষটি যে মাটিতে জন্মেছে, সেই মাটি কোথা থেকে এল? যে খাদ্য খেয়ে বড় হলো, সেই খাদ্য কে ফলাল? যে ভাষায় নিজের দুঃখ বলল, সেই ভাষা কে তৈরি করল? যে ঘরে বসে লিখল, সেই ঘর কে বানাল? যে বই পড়ে নিজের চিন্তা গড়ে তুলল, সেই বইয়ের আগে কত মানুষের জীবন ও শ্রম ছিল? যে পাঠক তার লেখা পড়লেন, তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা ছাড়া সেই লেখা কি সম্পূর্ণ অর্থ পেত?
এবার ছবিটা কী দাঁড়ায়?
মানুষের জীবন পৃথক, কিন্তু বিচ্ছিন্ন নয়। প্রত্যেক জীবন নিজের মতো, অথচ একা নয়। একটি পিঁপড়ের পথ, একটি শিশুর কান্না, একটি মায়ের অপেক্ষা, একটি বৃদ্ধ গাছের ছাল, একটি শহরের ধুলো, একটি নির্বাসিত মানুষের স্মৃতি—সব মিলিয়ে পৃথিবীর দীর্ঘ জীবনী রচিত হচ্ছে। কেউ তার সম্পূর্ণ লেখক নয়। প্রত্যেকে সামান্য করে লিখছে, নিজের শরীর দিয়ে, শ্রম দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, ক্ষতি দিয়ে, ভুল দিয়ে, প্রতিরোধ দিয়ে।
আমি যে আলেখ্য আঁকি, তার রং আমার হাতে থাকলেও রংগুলো আমার তৈরি নয়। মাটি দিয়েছে বাদামি, রক্ত দিয়েছে লাল, আকাশ দিয়েছে নীল, পাতা দিয়েছে সবুজ, অন্ধকার দিয়েছে কালো, আর মানুষ দিয়েছে স্মৃতি। আমি কেবল তাদের পাশাপাশি বসাই। কখনো ভুল বসাই, কখনো কোনো মুখ বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কোনো মুখ ছায়ায় ঢাকা পড়ে। পরে আবার ফিরে এসে দেখি, যাকে কেন্দ্র ভেবেছিলাম সে প্রান্তে সরে গেছে, আর যে ঘাসটুকুকে তুচ্ছ ভেবেছিলাম, তার উপরেই পুরো দৃশ্যটি দাঁড়িয়ে আছে।
এই কারণেই আমার নিজের জীবনী আলাদা করে লেখা না হলেও হয়তো চলে যাবে। আমার সকল ব্যথা, প্রস্তাব, প্রয়াস কোনো না কোনোভাবে অন্যদের জীবনের মধ্যে ছড়িয়ে থাকবে। আমার লেখা কোনো এক মানুষের ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি হয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা বহু জীবনের সম্মিলিত ছবি হয়ে উঠবে।
শুধু একটি প্রশ্ন থেকে যায়।
যদি আমাদের প্রত্যেকের জীবন সত্যিই অন্য সকলের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িত থাকে, তাহলে আমরা কাকে আঘাত করছি ভেবে কোনো মানুষ অন্যকে আঘাত করে? কাকে অবহেলা করছি ভেবে কোনো সমাজ কোনো জীবনকে ইতিহাসের বাইরে সরিয়ে রাখে? আর কাকে ভালোবাসছি ভেবে আমরা ভালোবাসি, যদি সেই ভালোবাসার ভিতর পৃথিবীর অগণিত প্রাণের উপস্থিতি এতদিন ধরেও চিনতে না পারি?


