মানুষের অস্তিত্বে বোধ হয় এক বিশাল রূপান্তর ঘটে সেই ক্ষণে, যখন সে চারপাশের জগতকে কৈফিয়ত দেওয়ার অন্তহীন চেষ্টাটুকু থামিয়ে দেয়।
এই পরিপক্কতা যে খুব দ্রুত আয়ত্ত করতে পেরেছিলাম, তা কিন্তু নয়। বরং জীবনের অনেকটা পথ আমি বিপরীত স্রোতেই হেঁটেছি। কোনও একটি পথ বেছে নেওয়ার পর সেই পথের সার্থকতা নিয়ে যতটা না উদগ্রীব থাকতাম, তার চেয়ে ঢের বেশি দুশ্চিন্তা কাজ করত অন্যদের অভিমত নিয়ে। কে আমাকে ভুল বুঝল, কার মনের জানালায় কীভাবে ব্যাখ্যা সাজালে আমার পদক্ষেপটি প্রশংসিত হবে—এই ভাবনাতেই সময় কেটে যেত। জীবন যেন ছিল এক অদৃশ্য কাঠগড়া, যেখানে অনাহূত আত্মীয়, সতীর্থ কিংবা এমন সব মানুষেরা বিচারক সেজে বসে থাকতেন, যাঁদের জীবনদর্শনে আমার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা বা আগ্রহ থাকার কথা ছিল না।
তবু তাঁদের জন্যও যুক্তি প্রস্তুত রাখতাম।
কেন এই কাজটি করলাম।
কেন ওই সম্পর্ক থেকে সরে এলাম।
কেন একটি সুযোগ গ্রহণ করলাম না।
কেন একটি চাকরি ছাড়তে চাই।
কেন কারও সঙ্গে দূরত্ব বাড়ালাম।
কেন এমনভাবে জীবন কাটাতে চাই, যা অন্য কারও কাছে খুব বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত বলে মনে নাও হতে পারে।
মানবিক অস্তিত্বের এক বিচিত্র সন্ধিক্ষণে আমরা হয়তো এমন এক স্তরে উপনীত হই, যেখানে কৃতকর্মের চেয়ে তার সপক্ষে সাজানো যুক্তি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই লগ্নে জীবনের সহজ প্রবাহ যেন রুদ্ধ হয়ে যায়, আর আমরা যাপনের পরিবর্তে ব্যস্ত হয়ে পড়ি এক নিরন্তর আত্মপক্ষ সমর্থনের সংবাদ সম্মেলনে।
সমস্যা হল, সবাইকে বোঝানো প্রায় অসম্ভব।
মানুষ আমাদের সিদ্ধান্তকে আমাদের জীবন দিয়ে বিচার করে না। তারা বিচার করে নিজেদের অভিজ্ঞতা, ভয়, মূল্যবোধ, স্বার্থ এবং অপূর্ণতার ভিতর দিয়ে। যে মানুষ সারাজীবন নিরাপত্তাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে জেনেছে, সে আপনার ঝুঁকি নেওয়াকে বোকামি ভাবতেই পারে। যে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাকে যে কোনও মূল্যে নৈতিক কর্তব্য মনে করে, সে একটি অসুস্থ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসাকে নিষ্ঠুরতা বলতে পারে। যে মানুষের কাছে সাফল্যের একমাত্র মাপ টাকা, পদমর্যাদা অথবা সামাজিক স্বীকৃতি, তার কাছে শান্তির জন্য কিছু ত্যাগ করা প্রায় অপরাধের মতো মনে হতে পারে।
এর মধ্যে কাউকেই বিশেষ দোষ দেওয়ার আছে বলে আমি মনে করি না। আমিও তো অন্যের জীবন দেখি আমার নিজের জানালার কাচ দিয়েই। কাচটি পরিষ্কার বলে আমার বেশ বিশ্বাস থাকে, যদিও সময়ে সময়ে দেখা যায় তাতে বেশ কিছু পুরনো ধুলো জমে ছিল।
যাপনের পথে সময় যত গড়িয়েছে, অন্তত একটি সত্য বড় নির্মল হয়ে ধরা দিয়েছে। আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করেছি যে, জগতের প্রতিটি মানুষের কাছে নিজের জীবনের কৈফিয়ত পৌঁছে দেওয়া আমার জীবনধর্ম হতে পারে না।
এই বোধটুকু কোনো আকস্মিক দৈববাণীর মতো অন্তরে প্রবেশ করেনি। বরং অসংখ্য ছোট ছোট অবসাদ আর ব্যর্থ চেষ্টার স্তূপ থেকেই এর জন্ম। অতীতে কত সিদ্ধান্তের সপক্ষে কত সহস্র যুক্তির জাল বুনেছি, অথচ দেখেছি যার হৃদয়ে গ্রহণের সদিচ্ছা নেই, সে সেই ব্যাখ্যার অরণ্য থেকেই নতুন কোনো বিরোধের পথ খুঁজে নিয়েছে। আবার কখনো নিঃশব্দে থেকেছি, কোনো উত্তর সাজাইনি। মাস কয়েক পর বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেছি, মহাজাগতিক নিয়মে পৃথিবী আপন কক্ষপথেই আবর্তিত হচ্ছে, চেনা হাটে চেনা মানুষের কোলাহল বিন্দুমাত্র কমেনি। আমার না দেওয়া কোনো ব্যাখ্যার অভাবে এই চরাচরের কোনো কিছুই থমকে যায়নি।
এই পরম সত্যের উন্মেষ যে কী অসীম মুক্তির স্বাদ এনে দেয়, তা কেবল ভুক্তভোগীই জানেন।
এখন কোনও বড় সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়ালে আমি অন্য একটি প্রশ্ন করার চেষ্টা করি।
আমি কি এই সিদ্ধান্ত নিয়ে শান্তিতে থাকতে পারব?
প্রশ্নটি সহজ হলেও উত্তর দেওয়া মোটেই সহজ নয়।
কারণ শান্তিতে থাকা মানে সব সময় সুখী থাকা নয়। কোনও সঠিক সিদ্ধান্তও কষ্ট দিতে পারে। কাউকে ছেড়ে আসার পরে তাকে মনে পড়তে পারে। একটি পরিচিত জীবন ছেড়ে অন্য পথে গেলে ভয় হতে পারে। কোনও সম্পর্কের সীমা টেনে দিলে অপরাধবোধ হতে পারে। এমনকি নিজের ভালোর জন্য নেওয়া সিদ্ধান্তও মাঝরাতে সন্দেহ তৈরি করতে পারে।
শান্তি সম্ভবত অন্য জায়গায়।
দিনের শেষে নিজের কাছে সিদ্ধান্তটিকে মিথ্যা বলে মনে না হওয়া।
নিজের বিবেকের সঙ্গে দীর্ঘ তর্কে না জড়ানো।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অন্তত এইটুকু বলতে পারা যে, যা করেছি, আমার জানা এবং বোঝার সীমার মধ্যে সৎভাবেই করেছি।
এই জায়গায় পৌঁছতে আমার অনেক সময় লেগেছে।
বাস্তবিকই আমাদের এই সামাজিক আবহে একান্ত ব্যক্তিগত বলে কিছু থাকা প্রায় অসম্ভব। বৈবাহিক বন্ধন হোক কিংবা বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত, জীবিকার বিন্যাস অথবা সন্তানের ইস্কুল—প্রতিটি পদক্ষেপে এক অদৃশ্য সামাজিক বিচারসভা বিনা আহবানেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। কার অট্টালিকা কোথায় নির্মিত হলো কিংবা কার প্রত্যাবর্তনের কারণ কী, এমনকি কার কতটুকু সুখী হওয়া সঙ্গত, তা নিয়েও চলে অন্তহীন কৌতূহলী ব্যবচ্ছেদ।
এই বিচারসভার সবচেয়ে কৌতুককর দিক হলো এর অনিয়মিত সদস্যপদ। কোনো বিশেষ যোগ্যতার প্রয়োজন পড়ে না, কেবল কৌতূহলের টানেই সদস্যরা আপন তাগিদে সেখানে সমবেত হন।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমরাও অন্যের জীবনের মানচিত্র আঁকতে সমান আগ্রহ বোধ করি। তাই অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজের ফেলে আসা অভ্যাসের দর্পণটুকু দেখা হয়তো অধিকতর সমীচীন।
যাহোক, অনেকটা পথ অতিক্রম করে আজ এই সত্য নির্মল হয়ে ধরা দিয়েছে যে, অন্যের সম্মতির সিলমোহর দিয়ে নিজের সিদ্ধান্তকে বৈধ করার অর্থ হলো জীবনের রাশটি নীরবে অন্যের হাতেই তুলে দেওয়া।
আমার জীবনের পরিণতি আমাকেই বহন করতে হবে।
ভুল সিদ্ধান্তের রাতের ঘুম আমার যাবে।
সঠিক সিদ্ধান্তের শান্তিটুকুও আমারই হবে।
অন্যেরা পরামর্শ দিতে পারে, ভালোবাসা থেকে সতর্ক করতে পারে, অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারে। এসবের মূল্য আছে। কখনও কখনও আমাদের নিজের অন্ধ জায়গাগুলি অন্যরাই আগে দেখতে পায়। তাই কারও কথা না শোনা স্বাধীনতার লক্ষণ বলে আমি মনে করি না। সেটিও আরেক ধরনের অহংকার হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু শোনা এবং অনুমতি চাওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে।
বয়স যত বাড়ছে, এই পার্থক্যটি তত স্পষ্ট হচ্ছে।
আগে ভাবতাম, আমার সিদ্ধান্ত সবাই বুঝলে নিশ্চয় সিদ্ধান্তটি আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে। এখন মনে হয়, মানুষ বোঝার চেয়ে অনেক বেশি সময় ব্যয় করে নিজের অবস্থান রক্ষা করতে। আমিও করি। ফলে সর্বসম্মতির অপেক্ষা করা মানে এমন একটি ট্রেনের জন্য প্ল্যাটফর্মে বসে থাকা, যার সময়সূচিই নেই।
কিছু মানুষ আপনাকে বুঝবে।
কিছু মানুষ আংশিক বুঝবে।
কেউ কেউ পরে বুঝবে।
অনেকে কোনও দিনই বুঝবে না।
এর সবকটিই স্বাভাবিক।
জীবনের প্রতিটি তোরণ পার হতে গেলে সবাইকে পাশে পাওয়া সম্ভব হয় না। কিছু সীমানা থাকে যেখানে নিজের ছায়া ছাড়া আর কাউকেই সঙ্গী করা যায় না। প্রারম্ভিক লগ্নে এই একাকিত্ব হয়তো বুকজুড়ে ভারী এক নিঃসঙ্গতা বিছিয়ে দেয়। তবে সময় গড়ালে উপলব্ধি করা যায়, সেই নিবিড় নির্জনতার মাঝেই নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বরটি সবচেয়ে নির্মল ও জোরালোভাবে বেজে উঠছে।
তাই বর্তমানের এই প্রৌঢ়লগ্নে কোনো বড় পদক্ষেপ নেওয়ার পর অন্যের অভিমত জানবার ব্যাকুলতা আমাকে আর পূর্বের ন্যায় বিপর্যস্ত করে না।
পুরোপুরি এই পর্যায়ে পৌঁছে গেছি, এমন দাবি করলে মিথ্যা বলা হবে। এখনও কখনও কোনও মানুষের নীরবতা আমাকে ভাবায়, কোনও কাছের মানুষের আপত্তি কষ্ট দেয়, ভুল বোঝাবুঝি হলে ব্যাখ্যা করতে ইচ্ছে করে। মানুষের মধ্যে বাস করে মানুষের মতামতের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে যাওয়া সম্ভবও বোধ হয় নয়, কাম্যও নয়।
তবে একটি জিনিস বদলেছে।
আমি আর প্রত্যেক ভুল বোঝাবুঝিকে জরুরি অবস্থা মনে করি না।
কেউ আমাকে ভুল বুঝে কিছুদিন বেঁচে থাকলে তার বিশেষ ক্ষতি হবে না। আমারও হবে না।
এই সামান্য জ্ঞান অর্জন করতে জীবনের বেশ কয়েক দশক লেগে গেল। শিক্ষার গতি নিয়ে বিশেষ গর্ব করার কারণ নেই।
শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন নিজের হয়ে ওঠে তখনই, যখন তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের পাশে জনসমর্থনের সিলমোহর খোঁজা বন্ধ করি। আমি ভুল করব, আবার কোনও কোনও সিদ্ধান্ত পরে বদলাবও। কিছু সিদ্ধান্তের জন্য আফসোস থাকবে। জীবন বোধ হয় এই অসম্পূর্ণ হিসাব নিয়েই চলে।
তবু আজকাল একটি প্রশ্নই আমার কাছে বেশি জরুরি।
রাতে সব শব্দ থেমে গেলে, চারপাশের মানুষের মতামত মাথার ভিতর থেকে একটু সরে গেলে, আমি কি নিজের নেওয়া পথটির পাশে শান্তভাবে বসতে পারি?
যদি পারি, আপাতত সেটুকুই যথেষ্ট।


