অ্যামাজনের বইপোড়া কারখানা
বছরের গোড়ার দিকেই অ্যানথ্রপিক নামের আরেকটি এআই প্রতিষ্ঠান প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়েছিল, কারণ তারা লাখ লাখ ছাপা বইয়ের বাঁধাই কেটে ফেলেছিল।
পুরনো বইয়ের বাজারে সম্প্রতি এক আজব কাণ্ড ঘটতে শুরু করেছিল। বিক্রেতারা খেয়াল করছিলেন, কোনো কারণ ছাড়াই অখ্যাত ও অচেনা বইয়ের অজস্র অর্ডার আসছে। কোনো রোমাঞ্চকর থ্রিলার, জনপ্রিয় প্রেমের গল্প কিংবা জেমস জয়েসের বিরল প্রথম সংস্করণের জন্য এই হিড়িক নয়; বরং লোকে যে বইয়ের স্বপ্নও দেখে না, বিক্রি হচ্ছিল সেসবই। দৃষ্টান্ত হিসেবে ‘হাউ টু ইউজ় কোরেল ওয়ার্ডপারফেক্ট, ১৯৯১’ বইটির কথা বলা যায়। ১৯৯১ সালের একটি ওয়ার্ড প্রসেসিং সফটওয়্যারের নির্দেশিকাকে এখন চরম ‘রেয়ার বুক’ বা বিরল গ্রন্থ বলে তকমা দেওয়া হচ্ছে। তবে বিরলতাও দু’রকম; একদিকে শেক্সপিয়রের ফার্স্ট ফোলিও, যার কদর বিশ্বজোড়া; অন্যদিকে সেই খাঁচাবন্দি কাকাতুয়া, যে বাংলা বলতে পারে কিন্তু তার খোঁজ কেউ রাখে না বলে সে বিরল। দ্বিতীয় ঘরানার এসব অবহেলিত বই-ই এখন ট্রাকে ট্রাকে বিকোচ্ছে। লাইব্রেরিতে জেন অস্টেনের পাশে ১৯৯১ সালের সফটওয়্যার ম্যানুয়াল সাজিয়ে রাখার মতো এই রহস্যময় সংগ্রাহকটি আসলে কে, তা নিয়ে বইওয়ালারাও কম মাথা ঘামাননি!
এই রহস্যের জট ছাড়াল গোয়েন্দাগল্পের ধাঁচেই; একেবারে সাদামাটা এক পন্থায়। কোনো এক বই বিক্রেতা একটি বইয়ের ভাঁজে অ্যাপল এয়ারট্যাগ লুকিয়ে রাখলেন, ঠিক যেমন গুপ্তচরেরা জুতোর সোলে মাইক্রোফিল্ম লুকিয়ে রাখে। এর পর শুরু হলো বইটির দীর্ঘ সফর। ক্যালিফোর্নিয়া, মিলওয়াকি ও কলোরাডো হয়ে গন্তব্য গিয়ে ঠেকল লাস ভেগাসে। বাহ্যিকভাবে একে কোনো পঞ্জিকানির্ভর তীর্থযাত্রা বলে মনে হলেও, শেষমেশ সেটি পৌঁছাল ‘ভিজিটি৩’ নামের এক অদ্ভুত গুদামে। গুদামটির লোগোতে অঙ্কিত ছিল এক হিংস্র ডাইনোসর, যার থাবায় নির্মমভাবে আঁকড়ে ধরা একটি বই। রূপকথার উপাদান ছড়ানো এই ছবির অন্তর্নিহিত অর্থ ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না; বিলুপ্তপ্রায় এক প্রজাতি আঁকড়ে ধরে আছে বইকে, যা এক অমোঘ ও নির্মম রূপক বই আর কিছু নয়!
ঐ গুদামে কী ঘটে চলে? কর্মীরা দিনভর অবিরাম বই স্ক্যান করে যান। এমনকি স্ক্যানিংয়ের কাজ দ্রুত ও সুবিধাজনক করতে অনেক সময় বইয়ের মেরুদণ্ডই কেটে ফেলা হয়, যাতে আলাদা হওয়া পাতাগুলো দ্রুত যন্ত্রে প্রবেশ করানো যায়। অথচ বই তো কেবল এক নিথর বস্তু নয়; মলাট তার চামড়া, আর বাঁধাই তার শিরদাঁড়া। তাই কোনো বই; যা একদা কাউকে অশ্রুসিক্ত করেছে, রাত জাগিয়েছে কিংবা নতুন তথ্যে সমৃদ্ধ করেছে; তাকে টুকরো টুকরো করে যন্ত্রের পেটে ঠেলে দেওয়াকে অঙ্গদানের সাথেই তুলনা করা চলে; তফাত শুধু একটাই, এতে দাতার কোনো সম্মতি থাকে না। এ বিষয়ে অ্যামাজনের মুখপাত্রের মন্তব্য ছিল অত্যন্ত মেপে-বলা ও চতুর: গ্রাহকদের পণ্য ও সেবার মান বাড়াতে কোম্পানি বাণিজ্যিক মাধ্যম থেকেই বই ক্রয় করে। কিন্তু এই ধোঁয়াশাপূর্ণ ব্যাখ্যার মাঝে এত ফাঁক রয়ে গেছে যে, তা দিয়ে অনায়াসে একটা প্রকাণ্ড হাতিও পার পেয়ে যেতে পারে!
এই চর্চাটি মোটেও নতুন নয়, কেবল সম্প্রতি নতুনভাবে প্রকাশ্যে এসেছে। এ বছরের গোড়ার দিকেই অ্যানথ্রপিক নামের আরেকটি এআই প্রতিষ্ঠান প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়েছিল, কারণ তারা লাখ লাখ ছাপা বইয়ের বাঁধাই কেটে ফেলেছিল। এভাবে বই কেটে ফেলার পেছনে একটি বাস্তবসম্মত যুক্তি রয়েছে; বাঁধানো বইয়ের পৃষ্ঠা একে একে ওল্টাতে প্রচুর সময় লাগে, কিন্তু বাঁধাই কেটে পাতাগুলো আলগা করে নিলে দ্রুতগতিতে স্ক্যানারে চালিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। তবে এর পেছনে আরেকটি তুলনামূলক চতুর আইনি উদ্দেশ্যও কাজ করে। বইটি কিনে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেললে ‘ফেয়ার ইউজ়’ বা ন্যায্য ব্যবহারের যুক্তি দাঁড় করানো সহজ হয়, যেন তারা দাবি করতে পারে; যেহেতু অর্থ দিয়ে বইটি কেনা হয়েছে, তাই পরবর্তীতে যা-ই করা হোক না কেন, তাতে আইনের কিছু বলার থাকে না!
মূল বিষয়টি কতটা গুরুত্বাবহ, তা অনুধাবন করতে কিছুটা অতীতের প্রেক্ষাপট দেখা প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলগুলো মূলত ইন্টারনেট থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য শুষে নিয়ে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু অনলাইনের এই তথ্যের ভাণ্ডার সসীম, যা বর্তমানে শেষপ্রান্তে এসে ঠেকেছে। তার ওপর ইন্টারনেটের বড় অংশ জুড়ে এখন জায়গা করে নিয়েছে এআই-এরই তৈরি করা নিম্নমানের লেখালেখি। অর্থাৎ এআই নিজের উৎপাদিত সামগ্রী নিজেই পুনশ্চ গ্রহণ করছে; নিজের ছায়াকে গ্রাস করে জীর্ণ হয়ে পড়ার এই অদ্ভুত পর পর্যায়কে প্রযুক্তির ভাষায় বলা হয় ‘মডেল কোল্যাপ্স’। ফলে এআই-এর জন্য এখন প্রয়োজন এমন তাজা ও মানবধারা রচিত তথ্য, যা কম্পিউটারের দূষণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এমন অনাবিষ্কৃত ও খাঁটি লেখা সবচেয়ে বেশি রক্ষিত রয়েছে সেসব বইয়ে, যেগুলো আজও ডিজিটাইজ় বা স্ক্যান করা হয়নি এবং ইন্টারনেটের বাইরে থেকে গেছে। এগুলোকে ‘বিরল’ বা ‘রেয়ার’ বলা হচ্ছে এই কারণে যে, এরা দূষণমুক্ত ও অক্ষত; ঠিক যেন এক কুমারী অরণ্য, যা আজও কাঠুরের স্পর্শ পায়নি।
স্ক্যানিং সম্পন্ন হওয়া মাত্রই বইটি চিরতরে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। এর ফলে বইটিতে থাকা সমস্ত তথ্য, রসবোধ, ভুলত্রুটি ও অর্জিত জ্ঞানের একচ্ছত্র মালিকানা চলে যায় ক্রেতা কোম্পানির হাতে। অবশ্য ইলন মাস্ক এক্স-এ আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, তাঁর দল বই না কেটে বা নষ্ট না করেই, অর্থাৎ ‘হার্ড ওয়ে’-তে স্ক্যান করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ।
পরিশেষে, এই পুরো বিষয়টি সমগ্র এআই-শিল্পের নগ্ন সত্যকে সামনে এনে দাঁড় করায়। মানবজাতির সৃষ্ট কোটি কোটি শব্দের মশলায় যেন এক বিশাল সসেজ তৈরি হচ্ছে। সেই প্রক্রিয়াজাতকরণের যন্ত্রে ফেলার আগেই বিলীন করে দেওয়া হচ্ছে লেখকের নাম, পরিচিতি ও স্বত্বাধিকার। আর যে বইটি কোনো এক নির্ঝুম রাতে কেউ নিজের ঘুম বিসর্জন দিয়ে, চোখের জল ও শ্রম জল করে ফুটিয়ে তুলেছিলেন; তা আজ ডাইনোসর-চিহ্নিত গুদামে খণ্ড-বিখণ্ড অবস্থায় পড়ে আছে। পরিচয় হারিয়ে সেটি স্রেফ এক নির্জীব উপাত্ত মাত্র, যা জমা হচ্ছে বিশাল তথ্যভাণ্ডারে। সেখান থেকেই হয়তো কোনোদিন কোনো এক যন্ত্র সেই স্রষ্টার বাক্যশৈলী চুরি করে বানিয়ে নেবে নতুন কোনো কবিতা; প্রকাশ করবে না লেখকের নাম, দেবে না ন্যূনতম কৃতজ্ঞতাটুকুও ।



