মদকে আমরা কী বলব? বিষ? ভগবান? ভৃত্য? নাকি ‘মিউজ’; অর্থাৎ কবির কানে কানে ফিসফিস করে দেওয়া গোপন প্ররোচনা? এইসব প্রশ্ন নতুন নয়। সভ্যতার বয়স যত, মদের সঙ্গে সাহিত্যের সহবাস প্রায় ততটাই প্রাচীন। অ্যান ও’নিল তাঁর প্রবন্ধ বুজ অ্যাজ মিউজ: রাইটার্স অ্যান্ড অ্যালকোহল, ফ্রম আর্নেস্ট হেমিংওয়ে টু প্যাট্রিসিয়া হাইস্মিথ-এ লিখছেন, গত কয়েক শতকের বিখ্যাত লেখকদের সৃজনজীবনে অ্যালকোহল কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। লুইস হাইড তাঁর ‘অ্যালকোহল অ্যান্ড পোয়েট্রি’ প্রবন্ধে হিসেব কষে দেখিয়েছেন; আমেরিকার ছয়জন নোবেলজয়ী সাহিত্যিকের মধ্যে চারজনই ছিলেন মদাসক্ত: উইলিয়াম ফকনার, ইউজিন ও’নীল, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে এবং জন স্টাইনবেক।
অলিভিয়া ল্যাং তাঁর ২০১৩ সালের বই দ্য ট্রিপ টু একো স্প্রিং-এ আরও সরাসরি বলছেন; লেখালিখি আর পান, এই দুই পেশাই যেন সমান্তরাল কেরিয়ার হয়ে উঠেছিল আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, জন বেরিম্যান, এফ. স্কট ফিৎসজেরাল্ড, টেনেসি উইলিয়ামস, জন চিভার এবং রেমন্ড কারভার-এর জীবনে।
হেমিংওয়ে একবার বলেছিলেন, “আই ড্রিঙ্ক টু মেক আদার পিপল মোর ইন্টারেস্টিং.” অর্থাৎ মানুষকে সহনীয় করে তুলতেই তাঁর পান। আর ফিটজেরাল্ড? তাঁর সতর্কবাণী আজও লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে; “ফার্স্ট ইউ টেক আ ড্রিঙ্ক, দেন দ্য ড্রিঙ্ক টেকস আ ড্রিঙ্ক, দেন দ্য ড্রিঙ্ক টেকস ইউ.” তিন স্তরের দখলদারি। প্রথমে তুমি মদকে নাও, পরে মদ তোমাকে নেয়। কিন্তু ফিটজেরাল্ডের নিজের জীবনটাই যেন তাঁর উক্তির ফুটনোট। চুয়াল্লিশ বছর বয়সে মৃত্যু। এত তাড়া ছিল? নাকি সময়কে ছাড়িয়ে যেতে চেয়ে সময়ের কাছেই হেরে গেলেন?
এই তালিকা ছোট নয়। এডগার অ্যালান পো, জ্যাক লন্ডন, ও. হেনরি, ডিলান থমাস; কারওই আয়ু দীর্ঘ হয়নি। যেন মদ আর প্রতিভা একসঙ্গে এলে ঘড়ির কাঁটা একটু দ্রুত ছোটে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে এসকাইলাসকে পাওয়া যায়। তাঁরও নাকি ওয়াইনের প্রতি টান ছিল প্রবল। তারপর পিন্ডার, হোমার, ইউরিপিদিস, অ্যারিস্টোফেনিস; গ্রিক-রোমান জগতে ওয়াইন ছিল প্রায় একমাত্র পানীয়, আর কবিরা তার জয়গান গেয়েছেন অকুণ্ঠে।
হাজার বছর পর চীনের তাং সাম্রাজ্যে লি বাই; এক দাউ মদ খেতে খেতে নাকি একশো কবিতা লিখে ফেলতেন। তিনি ছিলেন ‘এইট ইমর্টালস অব দ্য ওয়াইন কাপ’-এর অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। কল্পনা করুন, কবিতার আগে পান নয়; পানই কবিতাকে ডেকে আনছে।
ইংল্যান্ডে উইলিয়াম শেক্সপিয়র, বেন জনসন ও ক্রিস্টোফার মার্লোর নাটকে পানশালার সরস বর্ণনা ভরপুর। মার্লো তো উনত্রিশেই খুন হলেন এক ট্যাভার্নে। নাটক শেষ, আলো নেভেনি। রোমান্টিক যুগে লর্ড বায়রন, পার্সি বিশি শেলি, জন কিটস স্বল্পায়ু, তীব্র আবেগ, আর মদ্যপ্রীতি এক জটিল রসায়ন তৈরি করেছিলেন। সমালোচক আনিয়া টেইলর তাঁদের সময়কে বলেছেন নোটোরিয়াস ড্রিঙ্কার্সের যুগ। স্কটল্যান্ডে রবার্ট বারন্স; স্কচ হুইস্কির কবি, দারিদ্র্য ও পান দুটোই ছিল তাঁর জীবনের অংশ।
উনিশ শতকের শেষভাগে প্যারিসে এক অদ্ভুত দল: শার্ল বোদলেয়ার, পল ভেরল্যেন, আর্তুর র্যাঁবো, ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ, অস্কার ওয়াইল্ড, অঁরি দ্য তুলুজ-লোত্রেক; অ্যাবসিন্থ পান করতেন দল বেঁধে। সবুজ পানীয়, সবুজ বিভ্রম, আর ধূসর পরিণতি। জ্যাক লন্ডনের আত্মজীবনী জন বার্লিকর্ন যেন মদের সঙ্গে তাঁর প্রেম-ঘৃণার দলিল। পাঁচ বছর বয়সে বিয়ার, সাত বছরে ওয়াইন। তবু নিজেকে অ্যালকোহলিক বলতে নারাজ। বইয়ের শুরুতেই জন বার্লিকর্নকে তিনি বলেন— “হি ইজ দ্য কিং অব লাইয়ার্স… হি গিভস ক্লিয়ার ভিশন, অ্যান্ড মাডি ড্রিমস… হি ইজ আ রেড-হ্যান্ডেড কিলার, অ্যান্ড হি স্লেজ ইউথ।” অর্থাৎ মদ একই সঙ্গে সত্যদ্রষ্টা ও যুবহন্তা। বই প্রকাশের দু’বছর পর তাঁর মৃত্যু; ডিসেনট্রি, লেট-স্টেজ অ্যালকোহলিজম, ইউরেমিয়া। শরীর আর কাব্যের দ্বন্দ্বে শরীর হারল।
শার্লস বুকাওস্কি মদকে আড়াল করেননি। তাঁর সংকলন অন ড্রিঙ্কিং যেন আত্মপক্ষ সমর্থনের নোটবই। “আই ডু অল মাই রাইটিং হোয়েন আই’ম ড্রাঙ্ক.” “ইফ আই হ্যাডন’t বিন আ ড্রাঙ্কার্ড, আই প্রোবাবলি উড হ্যাভ কমিটেড সুইসাইড।” মদ তাঁর কাছে ওষুধ, সঙ্গী, অজুহাত; সবই।
কিংসলি এমিস-এর অন ড্রিঙ্ক ও এভরিডে ড্রিঙ্কিং-এ মদের দর্শন প্রায় প্রাত্যহিকতায় নেমে আসে। তাঁর উক্তি; অ্যালকোহল ভালো ভৃত্য, খারাপ প্রভু; এই কথাকে তিনি অর্ধেক বিশ্বাস করেন। তাঁর মতে, মদ জীবনকে কম বিরক্তিকর করে তোলে। এখানে মদ আর মিউজের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। কে কাকে ব্যবহার করছে? তাহলে মদ কি সৃষ্টির জ্বালানি?
প্রশ্নটা আসলে অন্যত্র। মদ কি সত্যিই সৃষ্টিশীলতাকে বাড়ায়, নাকি সে কেবল ভেতরের শূন্যতাকে সাময়িক কালারফুল করে? ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়; মদ অনেকের পাশে থেকেছে, কিন্তু কাউকে বাঁচতে দেয়নি। প্রতিভা এসেছে, কিন্তু আয়ু হয়েছে ছোট। হেমিংওয়ে নিজের জীবন শেষ করেছিলেন গুলিতে। ফিটজেরাল্ড হার্ট অ্যাটাকে। বুকোভস্কি লিভারের কাছে ঋণী। লি বাই নদীতে ডুবে মারা গিয়েছিলেন; লোকে বলে, চাঁদের প্রতিবিম্ব ধরতে গিয়ে।
মদ হয়তো কল্পনাকে একটু আলগা করে, সামাজিক মুখোশ সরায়, ভাষার ওপর থেকে সেন্সরের চাপ কমায়। কিন্তু সে একই সঙ্গে শরীরের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে নেয়। একদিকে সাহিত্যের বাক্য, অন্যদিকে লিভারের কোষ; দু’পক্ষেই খরচ। মিউজ শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর দূত হয়।
সম্ভবত মদ কখনও কবিকে তৈরি করে না। কবি আগে থেকেই থাকে। মদ কেবল তার ভিতরের অন্ধকার আর আলোর ফারাকটা বড় করে দেয়। কখনও তা থেকে কবিতা জন্মায়, কখনও পতন। আমরা কি মদকে দায় দেব, নাকি সেই তীব্রতা-লোভী মানসিকতাকে, যা সব কিছুই একটু বেশি করে চায়; একটু বেশি অনুভব, একটু বেশি ভাষা, একটু বেশি জীবন? সাথে হয়তো একটু বেশি মৃত্যু।
রিটন খান



