স্বার্থ, আবেগ ও অদৃশ্য হাতের অন্তর্লিখিত ইতিহাস
রিটন খান
বইটি আকারে ক্ষুদ্র হলেও এর আত্মবিশ্বাস অটুট; এর মার্জিত ভাষা, সুসংহত গঠন এবং অকাট্য যুক্তি পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে যায়। মূলত মানুষের স্বার্থচিন্তার বিবর্তনই এই বইয়ের মূল উপজীব্য; কীভাবে তা একসময় নৈতিক অবক্ষয় হিসেবে গণ্য হলেও কালক্রমে রাজনৈতিক কৌশল এবং সভ্যতার প্রধান চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত হলো। একদা খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব একে গর্হিত পাপ এবং প্রাচীন দার্শনিকেরা অতৃপ্ত ক্ষুধা বলে অভিহিত করেছিলেন। তবে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর রক্তাক্ত ইউরোপে, যখন ধর্মীয় উন্মাদনা ও ক্ষমতার লড়াই চরম পর্যায়ে, তখন এই স্বার্থবোধকেই ধ্বংসাত্মক আবেগ দমনের হাতিয়ার হিসেবে প্রয়োগ করা হয়। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে সেই কথিত ‘লোভ’ই শেষ পর্যন্ত ‘কোমল বাণিজ্য’ বা le doux commerce হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার রক্ষাকবচ হিসেবে সভ্যতার চাকাকে সচল রাখে।
এই গ্রন্থটি পড়ার সময় আমি জানতাম না আলবার্ট ও. হির্শম্যা কেবল একজন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদই নন, বরং রাজনৈতিক দর্শনের এক অনন্য কারিগর। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন; স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রাম থেকে শুরু করে ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ; সেসবই তখন আমার অগোচরে ছিল। বিস্ময়কর বিষয় হলো, তাঁর সেই স্বচ্ছ ও প্রাঞ্জল ইংরেজি গদ্যটি তাঁর জন্মসূত্রে পাওয়া ভাষা নয়; বরং এটি ছিল তাঁর আয়ত্ত করা চতুর্থ বা পঞ্চম ভাষা; জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ এবং ইতালিয়ানের পথ পেরিয়ে অর্জিত। তবুও সেই লেখনিতে ভিনদেশি ভাষার কোনো আড়ষ্টতা নেই; পরিবর্তে সেখানে ফুটে উঠেছে এক প্রশান্ত সাবলীলতা, যেন বিচিত্র ভাষার সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এসে এই ভাষা আরও বেশি উন্মুক্ত ও ঋদ্ধ হয়েছে।
সে সময় আমার কাছে তাঁর পরিচয় একজন আকর্ষণীয় ও প্রথাভঙ্গকারী ইতিহাস গবেষক হিসেবেই মুখ্য হয়ে উঠেছিল। তাঁর জ্ঞানের পরিধি বিস্ময় জাগানিয়া; যেখানে সেন্ট অগাস্টিন, মাকিয়াভেলি বা মন্টেস্কিয়ুর পাশাপাশি লা রোশফুকো কিম্বা স্যার জেমস স্টুয়ার্টের মতো প্রান্তিক চিন্তকেরাও সমান গুরুত্বের সাথে ঠাঁই পান। তবে তাঁর রচনার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আমাকে অবাক করেছিল; তা হলো ফুটনোট বা পাদটীকার অনুপস্থিতি। প্রচলিত ইতিহাসচর্চায় পাদটীকাকে যেখানে নিরাপত্তার বর্ম হিসেবে দেখা হয়, হির্শম্যান সেখানে হেঁটেছেন সম্পূর্ণ বিপরীত পথে। উদ্ধৃতির আধিক্য কমিয়ে এবং ব্যাখ্যাকে সংক্ষিপ্ত রেখে তিনি তাঁর যুক্তিকে করেছেন অত্যন্ত সুসংহত। এই পরিমিতিবোধ খুব সচেতনভাবে করা; তিনি পাঠককে তথ্যের ভারে ন্যুব্জ না করে বরং নিজের চিন্তার গভীরে অবগাহন করতে প্ররোচিত করেন। (এই লেখার ধরনটি পরবর্তিতে আমি নিজে প্রাক্টিস করে থাকি)
পরবর্তীতে আমি বুঝতে পারি যে, এটি উচ্চমানের ঐতিহাসিক প্রবন্ধ। উনিশ শতকের দিকে যখন ইতিহাসকে কঠোর পেশাগত শৃঙ্খলার বলয়ে বন্দি করা হয়েছিল, তখন মুক্ত ও সঞ্চরণশীল চিন্তার এই বিশেষ ধারাটি প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে যায়। যেখানে একটি মনোগ্রাফ নির্দিষ্ট বিষয়ের গভীরে নিবিষ্ট হয়ে নিজেকে প্রামাণিক ও কর্তৃত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরে, সেখানে প্রবন্ধের ধর্মই হলো অবাধ বিচরণ; শতাব্দী থেকে শতাব্দীতে ঘুরে বেরিয়ে বিভিন্ন বিমূর্ত ধারণাকে একই সূত্রে গেঁথে ফেলা, যা পাঠককে কখনো নতুন সত্যের আলোয় আলোকিত করে, আবার কখনো করে বিমোহিত।
হির্শম্যানের এই রচনায় সেই ধ্রুপদী ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটেছে, যা একইসাথে যুক্তিনির্ভর এবং বুদ্ধিদীপ্তভাবে আকর্ষণীয়। তিনি পাঠককে যেমন তথ্য দিয়ে ঋদ্ধ করেন, তেমনি মোহাবিষ্টও করেন। এই বইয়ের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ‘অদৃশ্য হাত’-এর বিবর্তনমূলক ইতিহাস; যেখানে আদম স্মিথ, কান্ট এবং হেগেলের মতো চিন্তাবিদগণ দেখিয়েছেন যে, কীভাবে মানুষের ব্যক্তিগত স্বার্থকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তগুলো শেষ পর্যন্ত সমষ্টিগত বা সামাজিক কল্যাণ বয়ে আনতে পারে।
এখানে স্মিথের দেওয়া উদাহরণটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ: একজন স্কটিশ সামন্তপ্রভু, যাঁর নিজস্ব সেনাবাহিনী পুরো গ্রামাঞ্চলে ভীতি ও ত্রাস ছড়িয়ে রাখে। খাজনা দিতে অস্বীকৃতি জানালে চলত লুণ্ঠন আর অকথ্য নির্যাতন। তবে বাণিজ্যের প্রসারের সাথে সাথে যখন নতুন সব বিলাসবহুল পণ্যের আগমন ঘটল, তখন সেই প্রতাপশালী প্রভু তাঁর সম্পদ ব্যয় করতে শুরু করলেন নিজের ব্যক্তিগত শৌখিনতায়; যেমন একজোড়া হীরাখচিত জুতোবাকল। এই আত্মকেন্দ্রিক বিলাসব্যসন কালক্রমে তাঁর সামরিক শক্তিকে ভঙ্গুর করে দিল; ভাড়াটে যোদ্ধারা চলে গেল এবং দীর্ঘদিনের সেই ত্রাসের hiরাজত্বের অবসান ঘটল। এর ফলে সমাজে শান্তি ফিরল এবং বাণিজ্যের পথ প্রশস্ত হলো। এ যেন এক আশ্চর্য রূপান্তর, যেখানে ব্যক্তিগত লালসা ও অহংকার এক অদৃশ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সামাজিক কল্যাণে পর্যবসিত হলো; ঠিক যেন কোনো ঐশ্বরিক করুণার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে ঈশ্বর স্বয়ং অনুপস্থিত।
হির্শম্যানের বিশ্লেষণের গভীরতা এখানে আরও বেশি অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। তিনি স্পষ্টভাবে দেখান যে, ‘অদৃশ্য হাত’-এর এই প্রভাব শুধু অর্থনীতির বৃত্তেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এই ধারণার স্বপক্ষে উত্থাপিত যুক্তিগুলোর মধ্যেও এক ধরণের অনিচ্ছাকৃত ফলাফল কাজ করে। আমাদের মধ্যে যদি এই বিশ্বাস জন্মায় যে ব্যক্তিগত স্বার্থই উগ্র আবেগকে অবদমিত করে শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনবে, তবে সেই সমৃদ্ধির মোহই একসময় মানুষের স্বাধীনতার চেতনাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
উনিশ শতকের বেশ কয়েকজন চিন্তাবিদ বাণিজ্যের এই চারিত্রিক রূপান্তরটি ধরতে পেরেছিলেন। তাঁরা দেখেছিলেন কীভাবে 'le doux commerce' বা কোমল বাণিজ্য ক্রমে 'le commerce sauvage' অর্থাৎ এক বুনো ও অনিয়ন্ত্রিত শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। যখন কোনো সমাজ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বা স্বাধীনতার চেয়ে পার্থিব আরাম-আয়েশ এবং স্থিতিশীলতাকে অধিক গুরুত্ব দেয়, তখন সেখানে একনায়কতন্ত্রের পথ প্রশস্ত হয়। বাজারদর স্থিতিশীল থাকা এবং অর্থনীতি সচল থাকার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে সাধারণ মানুষ তখন স্বাধীনতার মৌলিক প্রশ্নগুলোকে অনায়াসেই বিসর্জন দিয়ে দেয়।
অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হওয়ার পর এই পঙ্ক্তিগুলো পুনরায় পাঠ করলে মনে এক গভীর শিহরণ অনুভূত হয়। এগুলো আজ আর নিছক অতীতের ব্যবচ্ছেদ নয়, বরং আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির এক প্রখর ও নির্ভুল প্রতিচ্ছবি হয়ে দেখা দিয়েছে। এখানে ইতিহাসের ভূমিকা কেবল পূর্বস্মৃতির রোমন্থনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা আমাদের সমকালীন বাস্তবতাকে এক নির্দয় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। সেই চিরন্তন দ্বিধাটি আবারও নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে: আমাদের অগ্রাধিকার আসলে কোনটি; নাগরিক আরাম-আয়েশ, নাকি ব্যক্তি-স্বাধীনতা?
*** বইটির একটি সুখপাঠ্য ভূমিকা লিখেছেন অমর্ত্য সেন।



