শুক্রবারের মাছ
রিটন খানের ছোটগল্প
আমাদের সম্পর্কের বয়স তখন ছয় মাস।
ছয় মাস খুব বেশি সময় না। আবার খুব কমও না। ছয় মাসে একজন মানুষের চা খাওয়ার ধরন জানা যায়। সে রেগে গেলে চুপ করে থাকে, না দরজা বন্ধ করে দেয়, সেটাও বোঝা যায়। তবে মানুষটি সত্যি আপন হয়ে গেছে কি না, তা বোঝা যায় না।
আরিফ প্রতি শুক্রবার আমার বাসায় আসত।
প্রথম দিকে আসার কোনো নির্দিষ্ট সময় ছিল না। কখনো বিকেল চারটায়, কখনো রাত আটটায়। একদিন সকাল দশটায় এসে হাজির। আমি তখন চুলে তেল দিয়ে বসে আছি। গায়ে পুরোনো একটি টি-শার্ট। টি-শার্টের সামনে লেখা, I NEED SPACE।
আরিফ লেখাটা পড়ে বলল, আমি কি চলে যাব?
আমি বললাম, কেন?
তুমি স্পেস চাচ্ছ।
আমি বললাম, টি-শার্টের কথা সব সময় বিশ্বাস করতে নেই।
আরিফ বলল, মানুষের কথাই বিশ্বাস করা যায় না, টি-শার্টের কথা কীভাবে বিশ্বাস করব?
এই বলে সে রান্নাঘরে ঢুকে গেল। ফ্রিজ খুলে দেখতে লাগল। যেন বাসাটা তার।
তারপর থেকে শুক্রবারে সে আসতে শুরু করল দুপুর বারোটায়।
প্রথমে গোসল করত। তারপর আমার সাদা তোয়ালেটা নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাথা মুছত। আমি বেশ কয়েকবার বলেছি, তোমার জন্যে আলাদা তোয়ালে রেখেছি। নীল রঙের।
সে বলেছে, সাদা তোয়ালে পানি ভালো টানে।
তোয়ালের রঙের সঙ্গে পানি টানার কোনো সম্পর্ক আছে কি না আমি জানি না। আরিফের সঙ্গে তর্ক করে লাভও নেই। সে এমনভাবে কথা বলে, মনে হয় কথাটা বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে সত্য বলে মেনে নিয়েছেন।
গোসলের পর সে চা বানাত।
চায়ে দুধ দিত না। চিনি আধা চামচ। কাপের ভেতর চামচ দিয়ে ঠিক সাতবার ঘুরাত। সাতবারের বেশি না, কমও না।
আমি একদিন বললাম, তুমি গুনে গুনে সাতবার নাড়ো কেন?
আরিফ বলল, চিনি ভালোভাবে মিশে যায়।
আটবার নাড়লে মিশবে না?
মিশবে।
ছয়বার?
তাও মিশবে।
তাহলে সাতবার কেন?
আরিফ কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, আমার আগের স্ত্রী সাতবার নাড়ত।
আরিফ আগে বিবাহিত ছিল। কথাটা আমি জানতাম। তার স্ত্রী তিন বছর আগে তাকে ছেড়ে চলে গেছে। কেন গেছে, তা সে স্পষ্ট করে কখনো বলে নি। শুধু বলেছে, মেয়েটার অভিযোগ ছিল, আরিফ খুব ভালো মানুষ।
এই অভিযোগ শুনে আমি প্রথমে হেসেছিলাম।
পরে আর হাসি নি।
শুক্রবার দুপুরে আমরা মাছ খেতাম। মাছটা আরিফ কিনে আনত। বেশির ভাগ সময় রুই। সে মাছের পেটের অংশ পছন্দ করত। আমি পিঠের অংশ।
একদিন সে মাছের পেটের টুকরোটা আমার প্লেটে দিয়ে বলল, খেয়ে দেখো। এতে স্বাদ বেশি।
আমি বললাম, তুমি খাও।
আমি সব সময় পেটের অংশ খাই।
আমি জানি।
সে অবাক হয়ে বলল, কীভাবে জানো?
আমি বললাম, ছয় মাস ধরে তোমার সঙ্গে শুক্রবারে মাছ খাচ্ছি। এতটুকু জানব না?
আরিফ হাসল। তার হাসিটা সুন্দর। হাসলে ডান গালে ছোট একটা গর্ত হয়। প্রথম দিকে গর্তটার দিকে তাকালে আমার বুক কেমন করত। এখন আর করে না। এখন আমি শুধু লক্ষ করি, গর্তটা আছে।
মানুষ খুব দ্রুত আশ্চর্য জিনিসে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
সুন্দর মুখে অভ্যস্ত হয়।
দুঃখে অভ্যস্ত হয়।
ভালোবাসাতেও হয়তো অভ্যস্ত হয়।
আমাদের শুক্রবারগুলো একই রকম হতে লাগল।
দুপুরে মাছ। খাওয়ার পর আরিফ বারান্দায় সিগারেট খাবে। আমি বিছানায় শুয়ে বই পড়ব। সে কিছুক্ষণ পর এসে বইয়ের নাম জিজ্ঞেস করবে।
আমি নাম বলব।
সে বলবে, ভালো?
আমি বলব, এখনো বুঝতে পারছি না।
তারপর সে আমার পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়বে।
ঘুমের মধ্যে আরিফ বাঁ হাতটা আমার পেটের ওপর রাখে। প্রথম দিকে এই হাত আমাকে খুব শান্ত করত। মনে হতো, আমরা বহুদিন ধরে একসঙ্গে আছি। আমাদের মধ্যে আর ব্যাখ্যা করার কিছু নেই।
কখনো আবার হাতটা ভারী লাগত।
মনে হতো, এটা আমার জন্যে রাখা হাত না। এই হাত আগে অন্য কারও পেটের ওপরও এভাবেই রাখা হয়েছে। শুক্রবারের মাছ, সাদা তোয়ালে, সাতবার চা নাড়া, খাওয়ার পর ঘুম, সবকিছু হয়তো অনেক আগেই তৈরি করা একটি রুটিন।
আমি শুধু সেই রুটিনের নতুন মানুষ।
এই চিন্তা মাথায় এলে আমি তার হাত সরিয়ে দিতাম।
আরিফ ঘুমের মধ্যেই আবার হাতটা আমার পেটের ওপর রাখত।
এক শুক্রবার সে মাছ আনল না।
আমি বললাম, মাছ কোথায়?
আরিফ বলল, আজ মাছ খেতে ইচ্ছা করছে না।
আমি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। অতি সাধারণ একটা কথা। মানুষের মাছ খেতে ইচ্ছা না-ই করতে পারে। অথচ আমার মনে হলো, বড় কোনো ঘটনা ঘটেছে।
আমি বললাম, তাহলে কী খাবে?
যা আছে।
কিছু নেই।
ডিম আছে?
আছে।
ডিম ভাজি করো।
আমি ডিম ভাজলাম। আরিফ রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ বলল, তুমি ডিমে পেঁয়াজ দাও না?
না।
সে চুপ করে গেল।
আমি বললাম, তোমার আগের স্ত্রী দিত?
আরিফ বলল, হ্যাঁ।
আমি ডিমের মধ্যে পেঁয়াজ কুচি দিলাম। দিতে দিতে বললাম, তুমি চাইলে বলতে পারতে।
আরিফ বলল, তোমার রান্না তুমি তোমার মতো করবে।
কথাটা ভালো। কিন্তু আমার ভালো লাগল না।
খাওয়ার সময় আরিফ ডিমের এক টুকরো মুখে দিয়ে বলল, চমৎকার হয়েছে।
আমি বললাম, আগের মতো?
সে আমার দিকে তাকাল।
আমি বললাম, আগের স্ত্রীর মতো?
আরিফ কাঁটাচামচ নামিয়ে রাখল। বলল, তোমার আজ কী হয়েছে?
কিছু হয় নি।
তুমি বারবার ওর কথা তুলছ কেন?
আমি বললাম, কারণ সে এখানে আছে।
কে এখানে আছে?
তোমার স্ত্রী।
আরিফ চারপাশে তাকাল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল, কোথায়?
সাদা তোয়ালেতে। সাতবার চা নাড়ার মধ্যে। শুক্রবারের মাছে। ডিমের পেঁয়াজে। তোমার ঘুমের হাতেও আছে।
আরিফ অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
আমি ভেবেছিলাম সে রেগে যাবে। রাগ করল না। হাত ধুয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। অল্প বৃষ্টি। এই বৃষ্টিতে ছাতা লাগে না। আবার ছাতা ছাড়া বের হলেও জামা ভিজে যায়।
আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললাম, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?
আরিফ পেছন ফিরে তাকাল না।
বলল, জানি না।
আমি বললাম, জানো না?
আরিফ বলল, আমি তোমার কাছে এলে শান্তি পাই। তোমার সঙ্গে থাকতে কষ্ট হয় না। আমার কিছু ভাবতে হয় না।
আমি বললাম, ভালোবাসা কি এই জিনিস?
সে বলল, হতে পারে।
আমি বললাম, অভ্যাসও তো হতে পারে।
আরিফ এবার আমার দিকে তাকাল। তার মুখে ক্লান্ত ভাব। সে বলল, হতে পারে।
আমি বললাম, পার্থক্যটা কী?
সে বলল, জানি না।
মানুষ যখন জানি না বলে, তখন তাকে সত্যবাদী মনে হয়। অথচ পৃথিবীর সব নিষ্ঠুর উত্তর সম্ভবত এই দুটি শব্দের ভেতরেই আছে।
আরিফ সেদিন চলে গেল বিকেল পাঁচটায়।
যাওয়ার সময় আমার কপালে চুমু খায় নি। সাধারণত খেত। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে জুতার ফিতা বাঁধল। তারপর বলল, আগামী শুক্রবার আসব?
আমি বললাম, জানি না।
সে হেসে ফেলল।
আমি বললাম, হাসছ কেন?
তুমি আমার মতো কথা বলছ।
পরের শুক্রবার দুপুর বারোটায় দরজার ঘণ্টা বাজল।
আমি দরজা খুললাম না।
আরিফ তিনবার ঘণ্টা বাজাল। তারপর ফোন করল। আমি ফোনও ধরলাম না।
দরজার ওপাশে কিছুক্ষণ কোনো শব্দ হলো না। তারপর তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল।
আমি দরজা খুলে বাইরে তাকালাম।
মেঝেতে একটা প্যাকেট রাখা। প্যাকেটে রুই মাছ। সঙ্গে নীল রঙের নতুন একটি তোয়ালে।
ছোট্ট কাগজে লেখা,
চা আজ থেকে আটবার নাড়ব।
আমি কাগজটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।
তারপর মাছটা ফ্রিজে রেখে দিলাম।
নীল তোয়ালেটা বাথরুমে ঝুলিয়ে দিলাম।
শুধু চায়ের ব্যাপারটা ঠিক করতে পারলাম না।
চিনি আধা চামচ দিয়ে চামচ ঘোরাতে শুরু করলাম।
একবার।
দুইবার।
তিনবার।
সাতবার পর্যন্ত গিয়ে হাত থেমে গেল।
অষ্টমবার আর নাড়তে পারলাম না।


