কেন্ডি: ধারণা, খ্যাতি ও জনপরিসরের নির্মম রূপান্তর
সমকালীন জনপরিসর বুদ্ধিজীবীকে হয় পুরোহিত, নয় প্রতারক; এই দুই মেরুর একটিতে আবদ্ধ করতে চায়। কিন্তু চিন্তার জগতে এই দ্বিবিভাজন কার্যকর নয়।
ড. আইব্রাম এক্স. কেন্ডিকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ককে কেবল একটি ব্যক্তিগত উত্থান-পতনের গল্প হিসেবে পড়লে ভুল হবে; বরং এটি আমাদের সময়ের অর্থনীতির এক উন্মুক্ত কেস স্টাডি। কীভাবে একটি ধারণা, তার জন্মের প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, জনপরিসরের দ্রুতগতির বাজারে প্রবেশ করে এবং সেখানে নিজের অর্থ হারিয়ে ফেলে; কেন্ডির যাত্রা সেই প্রক্রিয়াটিকেই নগ্ন করে দেয়। একজন গবেষক যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠকক্ষ থেকে বেরিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা, কর্পোরেট ট্রেনিং, মিডিয়ার সংক্ষিপ্ত নীতিবাক্য, এমনকি ব্যক্তিগত পরিশুদ্ধির রীতিতে পরিণত হন, তখন তাঁর চিন্তার ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ অনিবার্যভাবে কমে যায়। তিনি নিজে যে অভিযোগ তুলেছেন; তাঁর প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে আক্রমণ করে তাঁর গবেষণাকে অস্বীকার করার চেষ্টা; তার মধ্যে আত্মরক্ষার সুর থাকলেও, এটিও অস্বীকার করা যায় না যে ইতিহাসে বহুবার ধারণাকে পরাস্ত করতে না পেরে মানুষ ধারণাবাহকের দেহ, চরিত্র, প্রতিষ্ঠান, এমনকি তাঁর চারপাশের গুজবকেই আক্রমণের ক্ষেত্র বানিয়েছে। ফলে একজন চিন্তাবিদের বিচার আর তাঁর গ্রন্থে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে তাঁর জীবনযাত্রার প্রতিটি স্তরে।
২০১৯ সালে প্রকাশিত How to Be an Antiracist কেন্ডিকে এই জনপরিসরের কেন্দ্রে টেনে আনে। বইটি প্রকাশ হয়, যখন আমেরিকার উদারপন্থী সমাজ বর্ণবৈষম্যের প্রশ্নে নিজের নৈতিক ভাষা খুঁজছিল। এর আগে Stamped From the Beginning তাঁকে একজন গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল, কিন্তু Antiracist তাঁকে এক প্রতীকে রূপান্তরিত করে। এই রূপান্তরের পেছনে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গভীরতাও কাজ করেছে; চতুর্থ পর্যায়ের কোলোরেক্টাল ক্যানসারের চিকিৎসার সময় লেখা এই বইয়ে আত্মরূপান্তরের যে তীব্রতা আছে, তা অনেক পাঠকের কাছে প্রায় ধর্মীয় অভিজ্ঞতার মতো মনে হয়েছে। “Antiracism”-এর স্বীকারোক্তিতে; এই বাক্যে এক ধরনের পাপবোধ, আত্মসমর্পণ এবং পুনর্জন্মের সুর ছিল, যা জর্জ ফ্লয়েড হত্যার পরের সামাজিক আবহে আরও গভীর প্রতিধ্বনি পায়।
কিন্তু এখানেই একটি সূক্ষ্ম বিপর্যয় লুকিয়ে ছিল। কেন্ডির তত্ত্ব মূলত নীতির ফলাফল, কাঠামোগত বৈষম্য, এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বিশ্লেষণ নিয়ে ছিল। তিনি “racist” শব্দটিকে কোনও চিরস্থায়ী পরিচয় হিসেবে দেখেননি; বরং এটিকে একটি বর্ণনামূলক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যা সেই নীতি বা ব্যবস্থাকে নির্দেশ করে, যা বৈষম্যকে বাড়ায়। অথচ জনপরিসরে তাঁর ধারণা দ্রুতই উল্টো দিকে মোড় নেয়। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, এবং উদারনৈতিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাঁর তত্ত্বকে এক ধরনের লেবেলিংয়ের সহজ পদ্ধতিতে পরিণত করে, যেখানে জটিল কাঠামোগত প্রশ্নের বদলে ব্যক্তিগত আত্মসমালোচনা এবং প্রদর্শনই মুখ্য হয়ে ওঠে। ফলে তাঁর কাজ, যা ছিল বিশ্লেষণের আহ্বান, তা পরিণত হয় আত্মপ্রদর্শনের উপকরণে। এই appropriation-এর প্রক্রিয়াটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি প্রতিষ্ঠান সহজে তাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে কেন্ডির বিরুদ্ধে দুই দিক থেকেই সমালোচনা ওঠে। রক্ষণশীলরা তাঁকে “critical race theory”-এর মুখপাত্র বানিয়ে রাজনৈতিক আতঙ্কের কেন্দ্রে স্থাপন করে, আর বামপন্থী সমালোচকেরা তাঁকে শ্বেত উদারপন্থীদের অপরাধবোধ-চালিত আত্মসহায়তা শিল্পের অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করে। এই দ্বিমুখী আক্রমণ আসলে একটি বড় সত্যের ইঙ্গিত দেয়: সমকালীন জনপরিসর ধারণাকে জটিলতার মধ্যে ধরে রাখতে অক্ষম; সে তাকে হয় পণ্য বানায়, নয় শত্রু।
২০২৩ সালে বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে তাঁর প্রতিষ্ঠিত Center for Antiracist Research-এর সংকট এই নাটকীয়তাকে আরও তীব্র করে তোলে। কেন্দ্রটি বিপুল অর্থসাহায্য পেয়েছিল, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে গবেষণা-উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা, কর্মী ছাঁটাই, এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগ সামনে আসে। এই পরিস্থিতিকে দ্রুতই একটি বিচারের মঞ্চে পরিণত করা হয়, যেখানে “grifter” শব্দটি অবলীলায় ব্যবহৃত হয়। এখানে প্রশ্ন ওঠে, কেন আমেরিকান জনপরিসরে কোনও বুদ্ধিজীবীর ব্যর্থতা এত দ্রুত অপরাধে রূপান্তরিত হয়। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জটিলতা, বিশেষ করে মহামারীর সময়ে তার নির্মাণের কঠিন বাস্তবতা, আর্থিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা; এই সব বিশ্লেষণের আগেই কেন চরিত্রহননের ভাষা সামনে আসে? সম্ভবত কারণ, সমকালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ধারণার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক রাখতে চায় না; সে তাত্ক্ষণিক নাটক চায়, যেখানে নায়ক দ্রুত ভিলেনে পরিণত হয়।
তবে অনুসন্ধানে কোনও আর্থিক দুর্নীতির প্রমাণ মেলেনি। কেন্ডি তহবিল অপব্যবহার করেননি, এবং অধিকাংশ অর্থ এমনভাবে সুরক্ষিত ছিল যে তাঁর সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগই ছিল না। তিনি স্বীকার করেছেন যে মহামারীর মধ্যে একটি বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করেছে। এই স্বীকারোক্তি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি জনপরিসরের প্রচলিত দুই ভঙ্গির বাইরে যায়; সম্পূর্ণ অস্বীকার অথবা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। কেন্ডি এখানে একটি মধ্যপথে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন, যেখানে ভুল স্বীকার আছে, কিন্তু নিজের বৌদ্ধিক কাজকে পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া নেই। তবু বাস্তবতা বলে, racial justice নিয়ে আমেরিকার আগ্রহ দ্রুত কমে যায়; অনুদান হ্রাস পায়, এবং কেন্দ্রটি শেষ পর্যন্ত ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর কেন্ডির হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটিতে প্রত্যাবর্তন এক ধরনের পুনর্গমন; খ্যাতির উচ্চতা থেকে শিকড়ের দিকে ফিরে আসা।
এই পটভূমিতে তাঁর নতুন বই Chain of Ideas: The Origins of Our Authoritarian Age বিশেষ গুরুত্ব পায়। এখানে তিনি “Great Replacement” তত্ত্বকে আধুনিক কর্তৃত্ববাদের কেন্দ্রীয় ভাষ্য হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই ধারণা অনুযায়ী, একটি এলিট গোষ্ঠী “আসল” নাগরিকদের বদলে অন্যদের বসিয়ে দিচ্ছে; এই ভয়কে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কেন্ডি দেখাতে চান, এই তত্ত্ব শুধু ইউরোপীয় অভিবাসনভীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক ধরনের কাঠামোগত ভাষা, যা অর্থনৈতিক অসন্তোষকে সাংস্কৃতিক আতঙ্কে রূপান্তরিত করে। প্রকৃত সমস্যাগুলি; পুঁজি সঞ্চয়ের বৈষম্য, আর্থিক অনিশ্চয়তা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা; এই সবকে আড়াল করতে “জনসংখ্যা বদলে যাচ্ছে” ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়। ফলে মানুষের ক্রোধ প্রকৃত ক্ষমতাধারীদের দিকে না গিয়ে দুর্বল গোষ্ঠীর দিকে ঘুরে যায়।
এই বিশ্লেষণের শক্তি আছে, কিন্তু সীমাবদ্ধতাও আছে। সব ঘটনাকে এক সূত্রে গাঁথার চেষ্টা কখনও কখনও ঐতিহাসিক বিশেষত্বকে মুছে দেয়। কেন্ডি নিজেও সাক্ষাৎকারে তাঁর তর্কের একটি অংশ সংশোধন করেছেন; তিনি স্বীকার করেছেন যে “Great Replacement” তত্ত্বই বরং zero-sum চিন্তাকে জন্ম দেয়, উল্টোটা নয়। এই সংশোধন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বলে যে তিনি এখনও নিজের তত্ত্বকে সমালোচনার মাধ্যমে শোধরাতে প্রস্তুত। একজন গবেষকের জন্য এই আত্মসমালোচনার ক্ষমতা অপরিহার্য, যদিও জনপরিসর এটিকে দুর্বলতা হিসেবে পড়তে পারে।
কেন্ডির বর্তমান অবস্থান আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সমকালীন জনপরিসর বুদ্ধিজীবীকে হয় পুরোহিত, নয় প্রতারক; এই দুই মেরুর একটিতে আবদ্ধ করতে চায়। কিন্তু চিন্তার জগতে এই দ্বিবিভাজন কার্যকর নয়। কেন্ডিকে বোঝার জন্য তাঁর সাফল্য ও ব্যর্থতা, তাঁর তত্ত্ব ও তার অপব্যবহার, তাঁর আত্মরক্ষা ও আত্মসমালোচনা; সবকিছুকেই একসঙ্গে দেখতে হবে। কারণ তাঁর জীবনই দেখায়, একটি ধারণা জনপরিসরে প্রবেশ করলে তা অনিবার্যভাবে ব্যক্তি-নাট্যে রূপ নেয়। আর এই রূপান্তরের মধ্যেই আজকের বুদ্ধিজীবীর ট্র্যাজেডি নিহিত; তিনি যা বলেন, তা প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে; প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হলে দোষ তাঁর ওপর ফিরে আসে।
তাই কেন্ডিকে বিচার করতে গেলে আমাদের সংযমী হতে হবে। তাঁকে ২০২০ সালের প্রতীক হিসেবে স্থির করে রাখা যেমন ভুল, তেমনি তাঁকে একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতীক বানানোও অযৌক্তিক। তাঁর গবেষণাকে তাঁর গবেষণা হিসেবে পড়তে হবে, তাঁর তর্ককে তর্ক হিসেবে, তাঁর ভুলকে ভুল হিসেবে। কারণ যদি আমরা বুদ্ধিজীবীকে শুধু চরিত্রের ভাষায় বিচার করি, তবে আমরা হয়তো ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে পারি, কিন্তু সময়কে বুঝতে পারি না।




